menu

বিশেষ সাক্ষাৎকার

কিছুটা এমার্জেন্সি কবির বাঁচার মধ্যে থাকে

অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত

  • ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ১১ অক্টোবর ২০১৮

http://print.thesangbad.net/images/2018/October/10Oct18/news/Untitled-3.jpgপ্রশ্ন : এই যে এত বছর বিদেশে থাকা, বছরে একবার করে আসা, আবার চলে যাওয়া- মন খারাপ করে না দেশের জন্য, কলকাতার জন্য? ভালো হতো না কি এখানেই থেকে গেলে?

অলোকরঞ্জন: আমার এখন দেশবিদেশের ধারণাটা গুলিয়ে গিয়েছে। অনেক সময় আমার কলকাতাকেই ইউরোপের মতো লাগে। আবার অনেক সময় ইউরোপকে কলকাতার মতো। যখন দেখি ইউরোপের ছাত্ররা সন্দীপনের লেখা অনুবাদ করছে বা যখন দেখি পোল্যান্ডের একটা ইউনিভার্সিটিতে তিনজন ছাত্রছাত্রী- একজন পোল্যান্ডের, একজন চেকোস্লোভাকিয়ার আরেকজন আমেরিকার, বাংলা ভাষার কথা বলতে বলতে এগিয়ে চলছে, তখন মনে হয় কলকাতাটা কত বড়!

প্রশ্ন: দেশ ও বিদেশের ধারণাটাই তো আপেক্ষিক...

অলোকরঞ্জন: হ্যাঁ, আসলে কলকাতা তো কোনও ভৌগোলিক ধারণা নয়। সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে আমার মনে হয়, আরে বাবা! এটাও তো কলকাতা। কলকাতায় আমি শারীরিকভাবে থেকে গেলেই আমার যে কাজগুলো, বা কবিতার অকাজগুলো, এইসব করতে পারতাম সেটা কিন্তু আমার মনে হয় না। আমাকে দিয়ে কখন যে ঈশ্বর একটা কবিতা লিখিয়ে নেবেন, তোমার সঙ্গে কথা বলিয়ে নেবেন- এটা কিন্তু কালের দ্রাঘিমা। এটা কিন্তু দেশের ব্যাপার নয়। দেশ বলতে আমার যে দেশটাকে আমি আজকে বুঝি সেটা হলো আমার ভাষা। হাইডেগারের কথাটা বলে রাখি, আমার ভাষাই হচ্ছে আমার আবাসন।

http://print.thesangbad.net/images/2018/October/10Oct18/news/Untitled-5.jpgপ্রশ্ন : দেশ হোক বা বিদেশ, সর্বত্রই তো এখন ভীষণ অসহিষ্ণুতা। বহুমতের সহাবস্থান এবং পারস্পরিকতা নয়, বরং বিশেষ ভাবনা, মতকে প্রতিষ্ঠা, আর তার জন্য হিংসা। এই প্রেক্ষিতে আপনার বর্তমান সময় সম্পর্কে কী মনে হয়?

অলোকরঞ্জন: অসহিষ্ণুতা বা অস্বস্তির একরকম উত্তর কবিতার মাধ্যমে বেরিয়ে আসে। কবিকে যে জনসভায় গিয়ে কিছু বলতে হবে, তা নয়। তার লেখার একটা জায়গা আছে। সেই জায়গা থেকে তার কবিতা একেবারে মূল্যবোধের দর্পণ হবে না। কিন্তু জায়মান মূল্যবোধের একটা মাধ্যম তাকে হতেই হবে। ‘জয় অস্ত সূর্য জয় অলখ অরুণোদয় জয়’ এখানে তো দুটো চয়েস, দুটো শর্ত দিয়ে দিচ্ছেন জীবনানন্দ। তোমাকেই বেছে নিতে হবে। সেখানে যদি মহতী অনিশ্চয়তার কবিতাও আসে, তাকে বরণ করে নিতে হবে। অবিশ্বাসকেও জোরালো হতে হবে। কবিতা এখন অনেক এগিয়ে গিয়েছে এইদিক থেকে। কলকাতার পরিপ্রেক্ষিত থেকে বলি, এখন প্রায় প্রত্যেক রচয়িতাকেই, কবিতায় এই জায়গা থেকে তাদের নিজের পথ ভেবে এগোতে হবে। জায়মান মূল্যবোধের একটা মাধ্যম হিসেবে তাকে লিখে যেতে হবে। এছাড়া আর সে কিছুই করতে পারে না। তার কিছু করারও নেই। একটু সময় লাগছে এখন। যে সময়টা চলছে, তা একধরনের সন্ধিক্ষণের সময় তো বটেই। সন্ধিক্ষণ মানেই, সেখানে একজন শিল্পীকে নানান সম্ভাবনার মুখোমুখি এসে তার নিজের কাজ করে যেতে হয়। একজন কবিকে সেই কাজ-ই করে যেতে হবে, কবিতার পক্ষে যতটা কাজ করে যাওয়া যায়। এখানেই হচ্ছে মূল্যবোধের দিকে অভিযাত্রা।

আরও পড়ুন : অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তের কবিতা : চলতে থাকার চালচিত্তির

‘প্রতিবার তরী কান্নায় শুরু হয়/ কান্নায় ডোবে জলে/ হাসিমুখে তবু কেন হে বিশ্বময়/ তোমার তরণী চলে?’-

প্রশ্ন : বারবার মনে হয় আপনার আস্তিক্যবোধ প্রথম কাব্যগ্রন্থ থেকেই এক ভিন্ন পথের পথিক। যেখানে ঈশ্বরের প্রতি সমস্ত অভিমান কান্না রাগ আবার ভালোবাসাও কত সহজে বলা হয়ে যায়... একে কি কথোপকথন বলা যায়?

অলোকরঞ্জন: আমি তো ঈশ্বর বিশ্বাসকে কবিতার একটা জঙ্গম উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করি- একটা নির্মিতি হিসেবে ব্যবহার করি। তাতে প্রমাণ হবে না কিন্তু যে আমি ঈশ্বরে বিশ্বাস করি না। তুমি অগ্রজ হিসেবে আমার ওপর একটা বিশ্বাস রাখো। কিন্তু তার মানে তো এই নয় যে, তোমার সঙ্গে আমার একটা চিন্ময় মতান্তর হতে পারবে না। সেই জায়গাতে আমি এসে গিয়েছি আসলে কুয়েত যুদ্ধের পর। আমি অনেক শরণার্থী কবিদের সঙ্গে বসবাস করেছি। এখনও করি। তাদের দেখে প্রশ্ন হয় তাহলে কি ঈশ্বর আছেন? থাকলে, কোথায় তিনি? এত অবিচার! তুমি লক্ষ্য করো এই যা ঘটছে এখন সারা জগৎ জুড়ে- এই দক্ষিণপন্থার উদগ্র উল্লাস এবং কত অকারণ মৃত্যু। এরপরে আমি ঈশ্বরকে গিয়ে, ধূপ না জ্বালিয়ে, যদি তাঁকে চ্যালেঞ্জ করি? এমনকি রামপ্রসাদের লেখাতেও দেখবে এই রকম ঈশ্বরকে চ্যালেঞ্জ করে লেখা আছে। এটা বিশ্বাসেরই আরেকটা বিন্যাস কিন্তু।

প্রশ্ন : যেভাবে রামপ্রসাদ মায়ের প্রতি অভিমান জানান, অভিযোগ কখনওবা...

অলোকরঞ্জন: শুধু অভিযোগ! অভিযোগ মানে কী? সে তো মারাত্মক রকম। ধর্মাধর্ম ছেড়ে দিয়ে তিনি তাঁকে আহার করবেন। এইরকম একজন কবি আছেন, কবি হারবার্ট, তাঁর কবিতাতেও আছে- ঈশ্বরকে আহার করা হচ্ছে। আমাদের তো সানডে রিলিজিয়ন নয়। তাও দেখবে এখন রবিবারে গির্জায় প্রায় লোকই থাকে না। শূন্য হয়ে গেছে গির্জাগুলো। তুমি এটা জিজ্ঞাসা করতে পারতে যে অলোকদা আপনি কী ঈশ্বর মানেন? এর উত্তরে আমি বলব, হ্যাঁ। কিন্তু ঈশ্বর সম্পর্কে আমার যে নিস্বার্থ মুগ্ধতাবোধ তা কিন্তু নয়।

প্রশ্ন : সেটাই প্রশ্ন তো... দ্বন্দ্ব অহর্নিশ...

অলোকরঞ্জন: যৌবন বাউল পর্বেই তো দেখেছ যে বন্ধুরা বিদ্রুপ করে... তাহলে তখন থেকেই এই ব্যাপারটা আছে। এখন বিশ্ব জটিল হয়ে গেছে। কবিতার যে চরাচর তাও চূড়ান্ত জটিল হয়ে গেছে। কত লেখা তুমি লিখে ফেলে দিচ্ছ পাশের বেতের টুকরিতে। এখন, সেই থেকে যে নির্যাসটা এগিয়ে আসে, সেটার প্রতি তুমি একটু লক্ষ্য রাখো। কবি তাঁর ক্যাটেগরিকে ভেঙে যতদূর এগোতে পারেন, মৃত্যু পর্যন্ত , তারপরেও তো সব কথা বলা হয় না।

প্রশ্ন : এর চেয়ে নির্বাণের দ্বীপে / মুক্তি যদি নেওয়া যেত, সান্তনার সমুদ্রবলয়ে যৌবন বাউলের এই যে আর্তি, তা আপনার সারাজীবনের কবিতায় অনুরণন হলেও, কোথাও মনে হয়, সেই বাংলার নিজস্ব মন্থরতার জীবন থেকে সরেও গেছে আপনার কবিতা। তাই না?

অলোকরঞ্জন: কবিতা লিখতে লিখতে চতুর্দিক পালটে যায়। কবি চেষ্টা করেন প্রাণপণে তাঁর ঘর, ঠিকানিয়া জায়গা থেকে বিশ্বের দিকে এগোতে। সেই জায়গায় যৌবন বাউলের যে জগৎ এবং আমাদের স্বদেশ সমস্তই তো পালটে গেছে। সেই পরিবর্তনের সঙ্গে শামিল হওয়াটাও তো একটা চ্যালেঞ্জ। আমাকে যদি বলো যে আমি সেখানেই আটকে আছি, তাহলে আমি সেটাকে আমার একটা পরাভব বলে মানব।

http://print.thesangbad.net/images/2018/October/10Oct18/news/Untitled-4.jpgপ্রশ্ন : যেমন আধুনিকতার অসুখ সংক্রান্ত ভাবনাও উঠে আসে, তেমন এখন উঠে আসছে দেশজ আধুনিকতার কথাও। যে অর্থে রামপ্রসাদ বা লালনের হাত ধরে উঠে আসছিল বাংলার নিজস্ব আধুনিকতা- এরকম কেউ কেউ মনে করেন। আধুনিকতার যে ইউরোপীয় সংজ্ঞা, তার বাইরে একটি ভাষার বা সাহিত্যের নিজস্ব আধুনিকতার একটা জার্নি থাকে, সেটি সম্পর্কে আপনার কী মনে হয়? আমরা কি তা হারিয়েছি?

অলোকরঞ্জন: দেশজ আধুনিকতা বলে কি আদৌ কিছু আছে? আধুনিকতাটা একটা আন্তর্জাতিক জিনিস- সেটা শুধু ইউরোপের ব্যাপার নয়। তার মধ্যে যেমন বোদলেয়রও আছেন তেমনি পাবলো নেরুদাও আছেন। নেরুদা যখন সুররিয়ালিস্টিক কবিতা লিখছেন তার মধ্যে তাঁর দেশের কথাও তিনি লিখছেন একই সঙ্গে। আমাদের এখানে যখন প্রথম রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায় আধুনিক শব্দটা ব্যবহার করেছিলেন, তাঁর আগে আধুনিক শব্দটা ছিলও না। তিনি চেষ্টা করছেন যে আবিশ্ব আধুনিকতার সঙ্গে সমান্তরস্পর্শী একটা ব্যাপার তৈরি করতে। এখন আমার নিজের একটা রিদম আমি লক্ষ্য করেছি- যখন আমি একটা সংজ্ঞায়ন তৈরি করেছি তার পরমুহূর্তেই আরেকটা সংজ্ঞায়নের মুখোমুখি হওয়ার আমি চেষ্টা করেছি। বারবারই দেখবে ওই আহ্বানটা- ‘এবার চলো বিপ্রতীপে’। দেশজ আধুনিকতা বলতে একটা বিচ্ছিন্ন প্ল্যাটফর্ম আমি তৈরি করার কথা ভাবতে পারি না। পৃথিবীর কোনও দেশেই কিন্তু এটা প্রায় আসেনি। আমাদের দেশটাও তো জগতেরই অন্তর্গত।

প্রশ্ন : ঔপনিবেশিকতা পূর্ববর্তী যে ধারণাগুলি, সেগুলির কথা ভাবলে?

অলোকরঞ্জন: ধরো সেই দিক থেকে ধরতে গেলে তুমি যে স্বদেশি আধুনিকতার কথা বলছ সেটা ‘নিষিদ্ধ কোজাগরী’তে নেই। এমনকি ‘যৌবন বাউলে’ও, তার কোনও পূর্বসূরি আমাদের দেশে ছিল কিনা সেটাও জানা নেই। কিন্তু এটা তো ঠিকই যে নিজের মধ্যে থেকেই একটা আধুনিকতার ধ্যানধারণা তৈরি হতে থাকে। সেটাকে আমি ভাঙতে ভাঙতে গড়তে গড়তে চেষ্টা করেছি লিখে যেতে। এই বিপ্রতীপে হাঁটার চেষ্টা আমার প্রথম থেকেই ছিল। হারিয়েছি, এবং হারাচ্ছি তো বটেই। সব থেকে কষ্টের হলো, শিকড় থেকে হারিয়ে যাওয়া।

প্রশ্ন : শুধু বাংলা বা ভারত নয়, আন্তর্জাতিক প্রেক্ষিতে এই হারিয়ে যাওয়ার এক ভিন্ন ভাষ্য দেখি আপনার নব্বই-পরবর্তী কবিতায়...

অলোকরঞ্জন: আমি বলছি জীবনানন্দ যখন ইয়েটসের হাত ধরে এগিয়ে যান, বা মালার্মে যখন ডেলামেয়ারের হাত ধরে এগিয়ে যান, তার কথা। সমস্ত পৃথিবীর সমস্ত কবিদের মধ্যে একধরনের স্বগোত্রিতা থাকে। কিন্তু এটাও ঠিক যে দেশে যদি তার শিকড়টা না থাকে, এমন যদি হয় অধমর্ণ হয়ে শিকড় থেকে আমি লিখে যাচ্ছি তাহলে সেটা খুব আপত্তির ব্যাপার হবে। তুমি যে কবিতাটার কথা প্রথমেই উল্লেখ করলে, তার কি কোনও পূর্বসূরি কবিতা তুমি পেয়েছ? আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও পেয়েছ কি? পাওনি। কবিদের সমস্ত জায়গায় একটা সমান্তরাল এবং আদিগন্ত রাখীবন্ধনের ব্যাপার আছে। সেই জায়গাতে আমাকে শনাক্ত করার কাজটা কিন্তু তোমাদেরই করতে হবে।

(ফোনের মধ্যেই শোনা যাচ্ছিল চারপাশের কিছু গলার আওয়াজ) এই যে শোনা যাচ্ছে তোমাদের আশেপাশে গলার আওয়াজ, একটু অসহিষ্ণু, এই চিৎকারটা আমি আমার কবিতার মধ্যে অন্তর্গত করে নিতে চাই, এবং একটু বলতেও পারো যে এখানে একটা আত্মদেবায়নের অভাব আছে। আমার মধ্যে একটা খুব ভয়ংকর অনপরিমেয় অতৃপ্তির অস্বস্তি আছে, আর সেটা না থাকলে আমি লিখব কী করে?

প্রশ্ন : মনে পড়ছে একবার কথা হয়েছিল আপনার সঙ্গে সরল এবং তরল কবিতা নিয়ে। একই ছন্দে সরল এবং গভীর কবিতা যেমন হয়, তেমন আবার তরল ও লঘু কবিতাও। কিন্তু অনেকেই দেখি তার জন্য ছন্দকে দোষারোপ করে। আবার ছন্দকে বর্জনও করে। আবার অনেকের ধারণা ছন্দের দিন ফুরিয়েছে। আপনার কী মনে হয় এ প্রসঙ্গে?

http://print.thesangbad.net/images/2018/October/10Oct18/news/Untitled-6.jpgঅলোকরঞ্জন: একটা জায়গায় ছন্দ থাকবেই। রবার্ট ফ্রস্ট বলতেন না যে, যেমন জাল না টেনে ব্যাডমিন্টন বা টেনিস খেলা সম্ভব নয়, তেমন স্বরবৃত্ত বা তানপ্রধান বা মাত্রাবৃত্ত- তাতে সরাসরি না লিখলেও যে কবিতার মধ্যে ছন্দ নেই সেইরকম কোনও কবিতাকে আমি কিছুতেই অভিনন্দিত করতে পারব না। এটা তুমি লক্ষ্য করবে যে অরুণ মিত্রের পরে গদ্যছন্দটা অনেকটাই এসেছে। তার মাঝামাঝি, তার পাশাপাশি, তার আড়াআড়ি তাঁর কোনাকুনি যদি ছন্দ থেকে যায় তাহলে মহাভারত অশুদ্ধ হবে না বলে আমি মনে করি। আমি জানি অনেকেই বিশ্বাস করেন না এটা। কোন ঠাকুর? অবন ঠাকুর ছবি লেখে। এটাও তো একটা ছন্দ। এটাকে তো স্ক্যান করা যায়। যে গদ্যকে আমি স্ক্যান করতে না পারি সেই গদ্যকে কবিতার রাজকিরিট পরানোর আগে মাথা নত করে ভাবব যে তাহলে কি এতকাল আমি ভুল ভেবেছি? (কিছুক্ষণ চুপ)

দ্যাখো, কবিতা একটা হাতের কাজ। সুভাষদা যেটা ভাবতেন। কিন্তু সেই সুভাষদার কবিতা- ‘ফুল ফুটুক না ফুটুক আজ বসন্ত’ সেখানেও কিন্তু স্বরবৃত্ত ছন্দ এসে যাচ্ছে। সুভাষদা এগুলোকেই এমনভাবে এক একটা কবিতায় ব্যবহার করছেন যে সেইগুলো মিছিলের মন্ত্র হয়ে উঠছে। সেইগুলো, আমরা যাকে মেমোরেল স্পিচ বলি, স্মৃতিধার্য বাগ্মিতা, তার চূড়ান্ত উদাহরণ হয়ে উঠছে। এটাও কিন্তু এক ধরনের হাতের কাজ। উনি কবিতাগুলোকে সেইভাবে দাঁড় করিয়েছেন। অন্যদিকে দেখো, কাগজ ভাঁজ করার খেলা, অরিগ্যামি যেটাকে বলে। অনেক কবিরা সেটা খেলেন। এটা খুব স্বগত খেলা। তুমি তাকে দিঘির মধ্যে ভাসিয়ে দিতেও পরো একটা নৌকোর মতন। আবার তুমি তাকে পরমুহূর্তে ঘুড়ি করে আকাশে উড়িয়ে দিতে পারো। এটাও একটা হাতের কাজ হচ্ছে। এই হাতের কাজ করতে করতে কিন্তু দেখা যাচ্ছে প্রায় চৌদ্দ পনেরো শতক থেকে অরিগ্যামি চলছে। এখন যারা অরিগ্যামির কাজ সারা জগত ধরে করছেন। হাতের কাজ। সেখানে একটা অদ্ভুত ধরনের সময়ের পর্ব বিভাগ আছে। কতক্ষণের মধ্যে সেটাকে করে মাটি থেকে আকাশের দিকে উড়াল দিয়ে দেওয়া যায়। এটাও একটা হাতের কাজ। এই হাতের কাজটা যদি না থাকে, বিশেষ করে আজকের ডিজিটাল যুগে, তাহলে তো আমার বাঁচার এবং বাঁচাবার কোনও মানদ থাকবে না।

আরেকটা কথা আমি তোমাকে বলি। সেটা খুব জরুরি। মনে রেখো। ওয়াল্টার বেঞ্জামিনের একটা সূত্র ছিল যে পৃথিবীর সব যুগেই এমার্জেন্সি ছিল। পৃথিবীর সব যুগে। কিছুটা এমার্জেন্সি কবির নিজের বাঁচার মধ্যে থাকে। যেমন ধর বিনয় মজুমদার। এখন বিনয় মজুমদারকেও পয়ারের দিকে একটু ঝুঁকতে হয়েছে। শক্তিকেও ঝুঁকতে হয়েছে একটু স্বরবৃত্তের দিকে। তার মানে আবার একদম শাক্তপদাবলীর মতো এমনও নয়। সেভাবে হবেও না। এখন ধরো ইন্দিরা গান্ধীর এমার্জেন্সির সময় লোকে ভয়ে ভয়ে লিখছে। এখন হয়ত সেই ভয়টা কেটে গেছে। কিন্তু এমার্জেন্সি সম্পর্কে একটা চেতনা না থাকলে এটা একটা আত্মপ্রসাদের ক্ষীণ অনুবাদ হবে। কবিতা কবিতা হয়ে উঠবে না।

প্রশ্ন : এমার্জেন্সি সত্ত্বেও কবিতার এই কাজটি কিন্তু চলছে...

অলোকরঞ্জন: এখনও নিশ্চয় একটা এমার্জেন্সি চলছে। এখন বিশ্ব জুড়েই একটা এমার্জেন্সি চলছে। বার্মাতে দেখছি সাংবাদিকদের মুখ চেপে ধরা হচ্ছে। তবে আমি শুধু সরকারি প্রশাসনের দিক থেকে বলছি না। এমন একটা জায়গা তো এসেছে যেখানে মানুষ প্রশ্ন করতে শিখেছে। প্রশ্ন করছে। আর কলকাতায় যত কবিতার পত্রিকা এমন কি পৃথিবীতে কোথাও আছে? নেই তো! তুমি যদি সেগুলো পড়ো তাহলে দেখতে পাবে, কেউ কেউ করছেন ওই হাতের কাজ সুভাষদার ধরনের। আর কেউ করছেন ওই অরিগ্যামির খেলা। তার মধ্যে দিয়ে ওই কবিতার কাজটা কিন্তু চলছে। এটা আমি বলব। কবিকে আমি দেখব না। আমি দেখব কবিতা থেকে কবিতায় বিবর্তনের মধ্যে দিয়ে যেটা চলছে সেটা কিন্তু বাংলা ভাষার মতো ভারতীয় সবকটা ভাষায় চলছে বলে আমার মনে হয় না। এখন দেখো এমন বিবর্তন মারাত্মক ধরনের কিছুটা মারাঠি কবিতায় গেছে। কিন্তু দিলীপ চিত্রের মৃত্যুর পর সেদিকে আর এগোয়নি। কবিতার এই যে বিচিত্র পথসঞ্চার, আমি সেইদিকে খুব আশা রাখি। আর এইখানে একজন তরুণ কবি, রাজাধিরাজের মতো কলকাতার পথে পথে হেঁটে চলেছেন।

প্রশ্ন : বিশ্বসাহিত্যের সঙ্গে আপনার প্রত্যক্ষ সহবাস। বিশ্বসাহিত্যের সঙ্গে বাংলা সাহিত্যের এবং বাংলা সাহিত্যের সঙ্গে বিশ্বসাহিত্যের যোগাযোগ কি একটু ক্ষীণ হয়ে আসছে না? অল্প কয়েকজন ছাড়া কাজ সেভাবে হচ্ছে না বলেই মনে হয়।

অলোকরঞ্জন: তুমি একটা কথা ভাবো। প্রুস্তের লেখা বাংলায় অনুবাদ করতে পারবে না। দম বেরিয়ে যাবে। তেমনি কমলকুমার মজুমদারের লেখা তুমি অনুবাদ করতে পারবে না। ইংরেজিতেও খুব অসুবিধে হবে। আমাদের একটা অনুবাদের আকাদেমি নেই সেই অর্থে। তবে বিশ্বের কবিতার বাংলায় অনুবাদ করে তার একটা প্রতিমান দেখানো এবং সেগুলো যে একেবারে নিরর্থক নিরীক্ষা হয়েছে তা কিন্তু নয়। এই জায়গাতে আমাদের একটা অভাব রয়েছে। একটা গ্যাপ। মাঝখানে একটা ভাসা ভাসা বিরতির কাজ চলছে যেটা খুব ক্ষতিকারক বলে মনে হয়। এই জায়গায় সরকারের একটা ভূমিকা আছে বলে মনে করি। দিল্লির সরকারের। সাহিত্য অকাদেমিকে তো সরকার বলে দেবে না। সাহিত্য অকাদেমি থেকেও অনুবাদের কাজ হয়েছে। কিন্তু আরও বেশি হওয়ার প্রয়োজনীয়তা ছিল। ন্যাশনাল বুক ট্রাস্টে আরও যে কাজগুলো হওয়া উচিত ছিল ততটা এগোয়নি। গুন্টার আইশ বা গুন্টার গ্রাসের মতো কবি বাংলায় নেই। কিন্তু এটা ঠিকই যে একই আদর্শে প্রাণিত হয়ে যারা লিখছেন, আলাদা করে বলা যাবে না অঙ্গীকারের কবি, হাতের কর গুনে বলাটা খুব মুশকিল হবে, দ্বিতীয়ত এটা তো ঠিকই যখন কোনও গদ্য লেখা হবে, যে গদ্যটা আজকে কেউ লিখছেন তা তিনি দশ পনেরো বছর আগেও লিখতে পারতেন না। সময় তাঁকে দিয়ে লিখিয়ে নিচ্ছে। কবিতার ক্ষেত্রেও এটি সমান সত্য। বিশ্বে বাংলার ভুবন এবং বাংলায় বিশ্বের ভুবন যত বিস্তৃত হবে, ততই মঙ্গল।

  • সমর সেন : কেন প্রাসঙ্গিক

    দারা মাহমুদ

    newsimage

    কবি বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত ‘কবিতা’ পত্রিকা হাতে পেয়ে রবীন্দ্রনাথ দু’জন অপরিচিত তরুণ

  • কবি জাহাঙ্গীরুল ইসলাম

    স্মৃতি ও কবিতা থেকে

    সৈকত রহমান

    newsimage

    জাহাঙ্গীরুল ইসলাম সম্পর্কে কিছু বলতে বা লিখতে যদি যাই, দেখি আমাদের ব্যক্তিগত

  • রমা চৌধুরী

    মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক নভেলায়

    খালেদ হামিদী

    newsimage

    আমার মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক একমাত্র উপন্যাসিকা ‘সব্যসাচী’তে রমা চৌধুরী আছেন, নভেলাটির শেষাংশে, এভাবে:

  • দিদি ও আমার দিন-যাপনের খসড়া

    আলাউদ্দিন খোকন

    newsimage

    ২ সেপ্টেম্বর ২০১৮, বিকেল ৫টা। দিদি চট্টগ্রাম মেডিকেলের আইসিইউ-তে। জন্মাষ্টমির বন্ধ চলছে।

  • এ সংখ্যার কবিতা

    newsimage

    একটি মনোরম সন্ধ্যার আর্তি কাজী সুফিয়া আখতার বেঙ্গল বইয়ের লাইব্রেরিতে বুধবার বিকেলে হঠাৎ করেই

  • অপ্পো কথার গপ্পো

    লিটন চক্রবর্তী মিঠুন

    newsimage

    আর দশটা বিষয়ের মতো সাহিত্যও হরেক রকম। নানা তার চেহারা, বিচিত্র তার

  • জনক

    শামীম আহমেদ

    newsimage

    বাড়ির আঙিনায় ঢুকেই মনটা খারাপ হয়ে গেল সৈকতের। চারদিকে বিদঘুটে অন্ধকার। জেনারেটর