menu

কানিজ পারিজাতের শিহরন জাগানো গল্পগ্রন্থ ‘জলশিহরন’

অঞ্জনা সাহা

  • ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ০৪ জুলাই ২০১৯
image

কানিজ পারিজাত একজন গল্পকার। কিন্তু তাকে আমি কবি বলেই জানতাম! প্রথম যেদিন তার সঙ্গে দেখা হয়, সেদিন তার নিজের লেখা কবিতা আওড়াতে শুনেছি! সেসব অসাধারণ পংক্তি আমাকে মোহাবিষ্ট করে রেখেছিলো। কিছুদিন পর এক সন্ধ্যায় ডাক পড়লো ২১শের বইমেলায় তার প্রথম বইয়ের মোড়ক-উন্মোচনে। তার প্রিয় দাদা ও বৌদিকে থাকতেই হবে সে-অনুষ্ঠানে। একটু আশীর্বাদ-প্রার্থনায় এই জরুরি তলব। আমার ধারণা ছিলো, কবিতার বই! কিন্তু গল্পের বই শুনে একটু যেন দমে গেলাম। আমার দলের নয় বলে মনে মনে একটু আক্ষেপ হলো! তবে বইয়ের নাম শুনে একটু চমৎকৃত হলামÑ‘মেঘের চিত্রকর’। প্রাণ খুলে নামের প্রশংসা করলাম। এটা ছিলো ২০১৮-এর কথা। সেবার ওর গল্প নিয়ে কিছু লিখবো ভেবেছিলাম। কিন্তু নানা পাকেচক্রে হয়ে ওঠেনি। এবার ২০১৯-এর বইমেলায়ও আমাদের ডাক পড়লো। ফের গল্পের বই ‘জলশিহরন’! শিহরন লাগানোর মতোই নাম। উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গেই এক তীব্র আকর্ষণ অনুভব করলাম। বইটি হাতে পাওয়ার পর যখন পড়তে শুরু করলাম, তখন প্রতিটি গল্প আমাকে টেনে নিয়ে গেলো শুরু থেকে শেষ-অব্দি। চারপাশের মানুষের জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনা এমন নিবিড় পর্যবেক্ষণে প্রকাশ করার মতো মেধা ও দক্ষতা না থাকলে এ-ধরনের গল্প লেখা অসম্ভব।

কানিজ পারিজাত শুধু কবি হিসেবে নন, গল্পকার হিসেবেও আমাদের হৃদয় জয় করে নিতে সক্ষম হয়েছেন। তার ‘জলশিহরন’ গল্পগ্রন্থে মোট পাঁচটি ভিন্ন স্বাদের গল্প সন্নিবেশিত হয়েছে। পাঁচটি গল্পই যে পাঠকের মনে ভালোলাগার একটি আচ্ছন্ন আবেশ তৈরি করবে, তা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়। তার ‘শেষরাতের জোনাকি’ গল্পে আবহমানকাল ধরে বাংলার নারীরা যে শোষণ ও বঞ্চনার শিকার হয়েছে, তার সার্থক রূপায়ণ দেখতে পাই। উল্লেখযোগ্য, “মোমেনা যেন শীতল বরফ, হঠাৎ উষ্ণতার স্পর্শে গলতে শুরু করল।” কিংবা “মানুষের গুঞ্জন ছাপিয়ে মোমেনার কানে একটা কথা আছড়ে পড়েÑ‘পাপে ছাড়ে না বাপেরে’। মোমেনা শূন্য দৃষ্টিতে পাপের সন্ধানে খাবি খেতে থাকে।” সবশেষে সে বলে, “ঘর এখন অন্ধকারÑসে ভালোই হয়েছেÑঅন্ধকারেই অন্ধকার যাত্রা। কিন্তু না সে দেখতে পায় আলোর কণিকাÑবাঁশের বেড়ার ফাঁক দিয়ে কয়েকটা জোনাকি ঢুকে পড়েছে ঘরেÑসবুজ মিট-মিট আলো জ্বেলে উড়ে উড়ে নেচে নেচে বেড়াচ্ছে। আহ, কী সুন্দর! জীবন কী সুন্দর!” এখানে মোমেনা চরিত্রে নারীর একটি সুদৃঢ় রূপ ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন লেখিকা। শত লাঞ্ছনা সয়েও সে ঘুরে দাঁড়াতে পেরেছে!

‘বরফপানি’ গল্পে স্কুলপড়ুয়া কিশোরীদের স্কুলজীবনের টুকরো টুকরো ঘটনার সংমিশ্রণে তৈরি গল্পটিতে কানিজ যখন বলেন, “সমাজ ও নৈতিক শিক্ষার ক্লাশ নিতে নতুন ম্যাডাম এলেন। কী চমৎকার কথা বলেন। সবুজ শাড়ির সঙ্গে সবুুজ রঙের ফুলসিøভ ব্লাউজে ম্যাডাম যেন একটকুরো সবুজ আবেশ।” তখন তার বর্ণনারীতির মোহনীয় অবেশে পাঠকও আবিষ্ট হয়ে পড়েন। সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় নিয়ে লেখা ফেইসবুক নিয়ে লেখা ‘জলশিহরন’ গল্পটিতে লেখিকা মানুষের অবক্ষয়ের বাস্তবচিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন অত্যন্ত দক্ষ হাতে। এই অস্থির সময়ের পাঁকে মানুষ কেমন করে অন্ধকারে তলিয়ে যায়, তার এক জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত ‘জলশিহরন’ গল্পটি।

‘ফাঁকি’ গল্পে দেখা যায়, মৃত্যুশয্যায় শায়িত মকবুলের স্ত্রী। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তিনি ডাক্তারের ভুলের শিকার। দরিদ্রের ঘরে জন্ম নেয়া একজন সচ্ছলতাহীন মানুষকে নিয়ে চিকিৎসকরা কী করতে পারেন, এই গল্পে তা ফুটে উঠেছে। মকবুলের এক আত্মীয় বিদেশ থেকে এলে মকবুল তার কাছে সাহায্য চাইতে গেলে তিনি জানান, বিদেশে দীর্ঘদিন এমন কষ্ট বহন না করে রোগী চাইলে স্বেচ্ছামৃত্যু মানে ‘ইউথেনেশিয়া’ পদ্ধতি গ্রহণের জন্য আবেদন করতে পারেন। কিন্তু শেষে প্রমাণিত হয় মকবুলের স্ত্রী খোদেজার আসলে কিছুই হয়নি। চিকিৎসকরাই তাকে এমন রোগী বানিয়ে বলতে গেলে প্রায় মৃত্যুর দরোজায় ঠেলে দিচ্ছিলো। অন্যদিকে খোদেজার মৃত্যু নিশ্চিত জেনে মকবুল আবার অন্য এক নারীকে বিয়ে করার জন্য প্রস্তুতি নেয়। ফলে এই কাহিনির মধ্য দিয়ে মকবুল, আত্মীয় ও ডাক্তারদের অমানবিক ত্রিমুখী ভূমিকাকে লেখিকা স্পষ্ট করে তুলে ধরতে সক্ষম হন।

গল্পগ্রন্থটির শেষ গল্পের নাম ‘আড়াল’। এখানেও দেখতে পাওয়া যায়, নৈতিক অবক্ষয়ের ছাপকে কী নিবিড় দক্ষতায় তিনি তুলে এনেছেন! কানিজ পারিজাত যে একজন কুশলী গল্পকার হয়ে উঠেছেন, তা তার দ্বিতীয় গল্পগ্রন্থ ‘জলশিহরনে’ অধিকতর স্পষ্ট হয়েছে।

ভবিষ্যতে কানিজ পাঠকদের আরো গভীর ও পরিণত গল্প উপহার দিতে সক্ষম হবেন, এই গল্পগ্রন্থ তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

  • বিশ্বসাহিত্য সংখ্যা চার

    ক্যারল অ্যান ডাফি এই সময়ের কবি

    উদয় শংকর দুর্জয়

    newsimage

    আবেগপ্রবণতা অথবা কাঠিন্য, কৌতুকরসবোধ অথবা গীতিবিন্যাস, রীতিবিরুদ্ধ মনোভাব অথবা প্রচলিত ধারা, যাদুবাস্তবতা

  • ক্যারল অ্যান ডাফির কবিতা

    ভাষান্তর : উদয় শংকর দুর্জয়

    newsimage

    তাঁর মুক্তাগুলোকে উদ্দীপ্ত করা আমার নিজের ত্বকের পাশে, তাঁর মুক্তা খচিত গহনা। আমার

  • ওই মহাসিন্ধুর ওপার থেকে

    হাসান অরিন্দম

    newsimage

    একটি চিহ্নিত ভূখন্ডে মানবসন্তানের জন্ম হয়, আর আমরা পাই এক-একটি মাতৃভাষাও। সেই

  • ডব্লিউ এস গ্রাহাম-এর অপ্রকাশিত কবিতা

    ভূমিকা ও অনুবাদ : মিলটন রহমান

    newsimage

    সম্প্রতি স্কটিশ কবি ডব্লিউ এস গ্রাহাম-এর কিছু অপ্রকাশিত কবিতা প্রাপ্তির কথা জানিয়েছে

  • একজন মানুষ

    মূল : ভায়াকম মোহাম্মদ বশীর
    ভাষান্তর : নীতিন রায়

    newsimage

    আপনার নির্দিষ্ট কোন পরিকল্পনা নেই। আপনি বাড়ি থেকে বেরিয়ে বহুদূরে ঘুরে বেড়াচ্ছেন।

  • আষাঢ়ে, বরিষণে

    newsimage

    তোমার কথা ভাবছিলাম বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর তোমার কথা ভাবছিলাম তুমি এলে না, বৃষ্টি এলো সেই

  • নিরাপত্তা

    জান্নাতুল ফেরদৌস

    newsimage

    বেলা এগারোটার দিকে আমি পৌঁছালাম সেই গ্রামটাতে। এখন আমি ভিকটিমের বাড়ির ছোট

  • ভারতের বুকে বসন্তের বজ্রনির্ঘোষ

    মাটি চাপা হুঙ্কারের ইতিহাস ও নকশালবাড়ি

    গৌতম গুহ রায়

    newsimage

    (পূর্ব প্রকাশের পর) তেভাগা’র আন্দোলনে জলপাইগুড়ির ডুয়ার্সের ইতিহাস এক ব্যতক্রমী ঘটনা। এখানে কৃষকের