menu

করোনানিশীথে জ্ঞানদেবীর সঙ্গে

নূরুদ্দিন জাহাঙ্গীর

  • ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ১৪ মে ২০২০
image

রাতভর জেগে চেষ্টা করছি। কিছুই লেখা হচ্ছে না। জ্ঞানদেবীও বুঝি করোনাকে ভয় পেয়ে কাছে আসছে না। যেন আমার মনের ভেতর এলে তাকেও করোনা ধরবে। আমি আমার লেখক বন্ধুদের ফেসবুক স্ট্যাটাস থেকে জানতে পারি, তারাও কেউ লিখতে পারছেন না। আমি তো কোন চুনোপুটি, সিনিয়র লেখক হাসনাত আবদুল হাই পর্যন্ত আজ ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছেন লিখতে পারছেন না।

ভাবছি, ঘুমোবো না। যতক্ষণ জ্ঞানদেবী আমার প্রতি সদয় না হবেন, আমি চেষ্টা চালিয়ে যাব। ভাবতে ভাবতে হঠাৎ আমার মনে একটা বদমতলব এল। বা্রর্ঁান্ড রাসেলের কথা মনে পড়ে গেল। তিনি বিধাতার দূতের ক্ষমতাকে অবজ্ঞা করছিলেন দূত তার কাছে চলে এসেছিলেন। আমি ছোটো লেখক হলেও লেখক তো! আমি যদি জ্ঞানদেবীর ক্ষমতাকে অস্বীকার করি, তাহলে কেমন হয়? যদি নিজের ক্ষমতায় আজ লিখতে চেষ্টা করি?

আচ্ছা, বুঝলাম, সে তোমার বোন। আর তুমি

জ্ঞানের দেবী। তা তুমি আমার কাছে কেন এসেছো? তুমি বললে, চুনোপুঁটি লেখকদের তুমি সময়ই দিতে পার না। আমি তো রবীন্দ্রনাথ বা আইনস্টাইনের মতো কেউ নই; এক তুচ্ছ লেখক মাত্র।

আমার মনে এ রকম দুর্ভাবনা আসতেই, নিজের ক্ষমতা সম্পর্কেও আমার আরো বেশি সন্দেহ দেখা দিল। তাহলে এতদিন যৎসামান্য যা লিখেছি, সবই কি জ্ঞানদেবীর কৃপায়? আমার নিজের সৃষ্টি কিছুই নেই! তখন নিজের অক্ষমতার উপর রাগ আর জ্ঞানদেবীর ক্ষমতার উপর ঈর্ষা হতে লাগল। কিন্তু আমি তো জ্ঞানদেবীর ক্ষমতাকে আজ প্রশ্ন করতে চেয়েছি। আর নিজের ক্ষমতার উপর আস্থা অর্জন করতে চাইছি। আমার মনে জেদ চাপে, আমি আজ লিখতে চাই নিজের মতো করে। হ্যাঁ। আমি জ্ঞানদেবীর কৃপা চাই না, কিন্তু লিখতে চাই।

আমি লেখা শুরু করি, রাত নিঝুম। স্তব্ধ নগর। এমন নগর আমরা বহুকাল দেখি নি। আমরা কেউ ঘর থেকে বের হচ্ছি না। এ নগরের সবখানে এখন অদৃশ্যমান মৃত্যু ঘুরে বেড়াচ্ছে। গোাঁ মানবজাতি, আসলে মানব জাতিসমূহ বলতে হবে, কখনো এক মানবজাতি ছিল না। তাকে কেউ সামলাতে পারছে না!

তুমি এসব কী ভাবছ? তোমাকে তো আমি ছিটেফোঁটা হলেও জ্ঞান দিয়েছিলাম।

কার যেন সুললিত কণ্ঠ, এমন লকডাউন অবস্থায় কারো আসার কথা নয়, কেউ সাহস করবে না। আর এখন তো রাত গভীর। কে এল আবার?

আমাকে চিনতে পারছো না? অবশ্য চেনার কথাও নয়। তোমার মতো এত ছোটোমাপের লেখকের কাছে আমার আসা হয় না। দূর থেকেই যা দেবার দিই।

না চিনতে পারছি না। কিন্তু এ অসময়ে আমার ঘরে কী? বড় মাপের লেখকের কাছে না গিয়ে আমার কাছে কেন?

কারো কাছে আসতে আমার সমস্যা নেই, আমি সর্বত্র গামিনী। যদিও আমার অত সময় নেই, তবু এই প্রথম একজন চুনোপুঁটি লেখকের সঙ্গে কথা বলতে এসেছি।

সর্বত্র গামিনী! তা চুনোপুঁটি লেখকের কাছে কেন? আর নিজের পরিচয় দিতেই বা এত ভণিতা কীসের?

আমি জ্ঞানের দেবী।

আচ্ছা, তুমি তাহলে জ্ঞানদেবী? ইয়ার্কি করার আর জায়গা পাও নি বুঝি! লুকিয়ে লুকিয়ে কি আমার কথা শোনা হচ্ছিল? আমি তো যা বলছিলাম, মনে মনেই বলছিলাম।

ভালো করে তাকাও। এ রকম ঘুম ঘুম চোখে তাকালে তো আমাকে তুমি চিনতে পারবে না। আমাকে চিনতে হলে গভীর শ্রদ্ধা আর একনিষ্ঠতা নিয়ে আমার দিকে তাকাতে হয়। অবশ্য তোমার যে জ্ঞান তাতে বোঝার কথা নয়। রবীন্দ্রনাথ বা আইনস্টাইনের মতো জ্ঞান পেলে তোমার সমস্যা হতো না।

আমি তোমার কী সমস্যা করলাম?

সমস্যা আমার নয়। মূর্খ কোথাকার, সমস্যা তুমি তৈরি করেছো।

আমি সমস্যা তৈরি করেছি?

সমস্যা না হলে কি আমি তোমার মতো তুচ্ছ লেখকের কাছে আসতাম?

আমার হাসি পেল, আর বা্রর্ঁান্ড রাসেলের কথা মনে পড়ল। বললাম, বা্রর্ঁান্ড রাসেলের কাছে তাহলে তুমি গিয়েছিলে?

না সে আমি নই। আমার বোন। সম্পদের দেবী।

বা্রর্ঁান্ড রাসেলের সঙ্গে সম্পদের দেবীর সাক্ষাতের ঘটনাটা মনে পড়ায় আমার আবার হাসি পেল। আমি সশব্দে হাসলাম।

হাসছো যে?

আচ্ছা, বুঝলাম, সে তোমার বোন। আর তুমি জ্ঞানের দেবী। তা তুমি আমার কাছে কেন এসেছো? তুমি বললে, চুনোপুঁটি লেখকদের তুমি সময়ই দিতে পার না। আমি তো রবীন্দ্রনাথ বা আইনস্টাইনের মতো কেউ নই; এক তুচ্ছ লেখক মাত্র। তাও আমার কাছেই?

সমস্যা তো সেখানেই। তারা কেউ আমার ক্ষমতা সম্পর্কে সন্দেহ পোষণ করে নি, প্রশ্ন করে নি। তোমার দুঃসাহস দেখে আমার এমন রাগ হয়েছিল যে, আমি আর নিজেকে স্থির রাখতে পারি নি।

এবার আমি ভালো করে তাকালাম। অন্ধকার ঘরে এক আলোকোজ্জ্বল মূর্তি দাঁড়িয়ে আছে। রাসেল যেমনটি বলেছিলেন তেমনই একজন। আমার তবু সন্দেহ হলো, পবিত্র গ্রন্থে বলা হয়েছে, শয়তান নানান রূপ ধরে তোমাদের কাছে উপস্থিত হবে। তোমাকে তার দলে ভেড়ানোর জন্য নানা রকম কৌশল নেবে। তুমি বিভ্রান্ত হবে না।

তুমি এখনো সন্দেহমুক্ত হতে পারছো না, আমি বুঝতে পারছি। শোনো, তুমি আমাকে বিশ্বাস করতে পারো। তোমার যে কোনো সমস্যার সমাধান আমি করতে সক্ষম।

আমার মাথায় তখন নিজের বুদ্ধি খেলে গেল। আমরা এত বড় একটা সমস্যা মোকাবেলা করছি। কিন্তু কিছুতেই কিছু করতে পারছি না। এ সংকট চলতে থাকলে এ দেশের মানুষ বাঁচবে না। আমার না হয় বয়স হয়েছে। কিন্তু এ জাতির কী হবে?

তুমি আমার ক্ষমতা দেখতে চাও? আমি কি এক্ষুনি তোমার লেখার ক্ষমতা বরীন্দ্রনাথের চাইতেও বাড়িয়ে দেব?

না। আমি তা চাই না।

আমি চুপ করে ভাবতে থাকি, জ্ঞানদেবী হোক আর শয়তানের দেবী হোক, যদি সে সমস্যাটা দূর করে দিতে পারে তাহলে দেশটা তো বেঁচে যাবে।

তুমি কী চাও বলো? আমার হাতে অত সময় নেই।

আমার জাতি যদি না বাঁচে তাহলে আমার কেন, রবীন্দ্রনাথ-জীবননান্দের লেখা কে পড়বে?

তাহলে কী চাও, তাড়াতাড়ি বলো।

তুমি আন্দাজ করতে পারছো না, আমার কী ক্ষমতা। আমি তোমার জন্য কী করব বলো। আমাকে আরো কয়েকটা দেশে যেতে হবে। তোমাদের পৃথিবীর জ্ঞান সম্পর্কিত সব সমস্যা আমাকেই সমাধান করতে হয়।

আমি তখন বলেই ফেললাম, আচ্ছা, একটা সমস্যার সমাধান করে দাও, আমার দেশটা করোনামুক্ত করে দাও।

জ্ঞানদেবী থমক গিয়ে আমতা আমতা করে বললেন, সেটা হবে একসময়।

কখন হবে! এদেশের সব মানুষ মরে গেলে পর?

টীকা আর ওষুধ আবিষ্কার হলে পৃথিবী থেকেই একসময় করোনা বিদায় হবে।

আমরা অত সময় অপেক্ষা করতে পারব না, তার আগেই সর্বনাশ হয়ে যাবে। তুমি এখনই করোনার ওষুধ আর টীকার জ্ঞান আমাদের দিয়ে দাও।

এটা বাদ, তুমি অন্য কিছু চাও।

অন্য কিছু কেন?

এ দুটো জ্ঞান আমি চীন আর আমেরিকাকে দেব বলে কথা দিয়ে দিয়েছি। এত এত লোক মরছে বলে ইউরোপও অবশ্য কান্নাকাটি করছে। তাদের বলেছি, চীন না দিতে চাইলেও আমেরিকা যাতে দেয়, সেটা আমি নিশ্চিত করব।

তাহলে আমাদের কী হবে?

পাবে। তোমরা অত ভাবছ কেন? তোমাদের তো জনসংখ্যা বেশি আর গ্রোথও বেশি। তোমাদের কিছু লোক মরলেও ইউরোপের মতো সমস্যা হবে না। তোমাদের আচরণ দেখেও মনে হচ্ছে না মৃত্যুকে খুব ভয় পাও। আর তেমনটা হলে, আমেরিকা তোমাদেরও তখন ওষুধ আর টীকা দেবে। তাদের তো তোমাদেরও দরকার পড়বে, আলুপেঁয়াজ কাটার জন্য হলেও তো লোক লাগবে।

আমার কি মেজাজ আর ঠিক থাকে? আমি বললাম, তুমি এখন যেতে পার।

  • সাব-অল্টার্ন স্টাডিজের ‘মহামারি’ ভাবনা

    মিল্টন বিশ্বাস

    newsimage

    সাব-অল্টার্ন স্টাডিজ গোষ্ঠীর অন্যতম লেখক দীপেশ চক্রবর্তীর Community, state and the body

  • নিমাই সরকার

    আগুনের পরশমনি

    newsimage

    হঠাৎ করেই ভেঙেচুরে কিছু একটা পড়ার শব্দ। কী হলো, কী হলো! আর

  • অফিসে একদিন

    হাইকেল হাশমী

    newsimage

    অমিত মাত্র বি-বি-এ করেছে। কতো কষ্ট করে এই প্রতিষ্ঠানে দুইটা লিখিত পরীক্ষা তিনটি মৌখিক পরিক্ষা,

  • সাময়িকী কবিতা

    কোয়ারেন্টিনকে আমি বিসংরব বলি। তুমি তো সেই কস্মিনকাল থেকেই বিসংরবে তোমাকে জীবন্ত কবর জীবন্ত চিতায় একা রেখে

  • আমার আছে বই : ১২

    মালেকা পারভীন

    newsimage

    সাহিত্যের প্রতি ভিনসেন্ট এর ভালোবাসা এতোটাই অপ্রতিরোধ্য ছিল যে তাঁর কিছু পোর্ট্রেট/স্থিরচিত্র

  • সোহরাব হাসানের কবিতা

    newsimage

    নারীর ভেতরে দ্রোহ দেখলেন মহান মার্কস তাঁর স্বপ্ন ছিল নারী-পুরুষের সুষম সমাজ

  • গাব্রিয়েলা মিস্ত্রালের কবিতা

    অনুবাদ : অনন্ত মাহফুজ

    newsimage

    বিষণ্ণ মা ঘুমাও, ঘুমাও, প্রিয়তম আমার চিন্তাহীন, ভয়হীন, যদিও আমার আত্মা ঘুমায় না, যদিও