menu

কমলকুমার বিষয়ে ভাব প্রকাশ

মামুন হুসাইন

  • ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ১০ অক্টোবর ২০১৯
image

(পূর্ব প্রকাশের পর)

কৃতি সমালোচকের বাক্য নকল করে বলি- লেখা তার ঈশ্বর সাধনা; নাকি বলবো পুরাণ, ব্রতকথা, ধ্রুপদী সঙ্গীত, মন্দির ভাস্কর্যের ছায়া এবং কোরাস, যা তাঁর লেখায় আমরা আবিষ্কার করি অনররত। অথবা তিনি নিজেই আমাদের জন্য এক যোগসূত্র তৈরি করেন- ‘...লেখকের মনে অনেক গভীরেই ভক্তি ভালোবাসা ইত্যাদি পরীর মতন আছে,’ কিংবা ‘শ্রোতার আনন্দ হওয়া কিছু বাজে নয় যখন যে চমকিত হইবে, যে কোথাও সংজ্ঞা নিভাঁজ রহিয়াছে।’

কমলকুমারের বাতিল পাঠক হিসেবে, কমলকুমারের ভালবাসা-ভক্তি দেখতে-দেখতে আমরা এবার সত্যিই চমকিত হই-

‘এই তরুণী, যে বহু রাত্রি জাগিয়া এই কলিকাতার আনন্দবর্ধন করিতে আছে; এ ক্ষেত্রে সাধারণ সাপটা করা যায় এইরূপে- বিশেষ শহর না লিখিয়া, মরজগত, যে মরজগতের আনন্দবর্ধন করিতেছে-।’

(খেলার দৃশ্যাবলী)

“মৃত্যু বাঙালির নিকট বড় আদরের। মৃত্যুকে এবং কেমনে ভালবাসিতে হয় ইহাই তাহার সাধনা,... একটি কামনা আমি কাশীতে যেন মরি, হে ভোলানাথ!... আজও একটু চন্দনকাঠ অনেকেই প্রাণে ধরিয়া তোরঙ্গতে রাখে, কেহ ঘাট খরচাও সযতেœ জমাইতে আছে।’ (ফাৎনা মনস্কতা)

“জানতি যদি পারি বলব, ঠাকুর... সোনাদানা চাই না ঠাকুর, আমাদের বাঁদ তুমি অচল করে দাও- লোহার করি দে যাও- নোনাজল যেন কখনও না এর মদ্দি আসতি পারে...’। (জল)

“মনুষ্য জনমে গড় করি, আমি আর চাইনা ক’নে বউ... কৃমিকীট কুকুর হওয়া অনেক ভালো, তাদের জাগা ঘরে চুরি নেই...।” (অন্তর্জলী যাত্রা)

“...মন সকল আমাদের, বড় দুঃখাইতেছে যে, হা এমনও জালিয়াৎ আছে, তাহারা অচেনা পরগণাতে ঢেড়া দিয়াছে, আমরা বীজ ধান খাইয়া থুইলাম। ইস কত বড় মিথ্যা! জানে না, কি প্রচ- জল দুদ্দাড়ে সবকিছু ভাসিয়া আসিল। জল লবণাক্ত; অবশ্যই আমাদের যোগ হইয়াছিল, নিমকহারামি হইয়াছে, নিমক হালালি শিখাইতে এতোক গলাজল, শুধু নুন।’ (খেলার প্রতিভা)

“স্বপ্ন ইহাদের নাই, স্বপ্ন এই মহালে নেই; স্বপ্ন আর এক সভ্যতার, ইহা এখান হইতে বিশ ক্রোশ দূরে, সেখানে যে সকল গ্রাম যেখানে শুধু বামন কায়েতের বাস, সেখানে নারী পুরুষে শিশুরাও স্বপ্ন দেখে; স্বপ্নে পর্যন্ত যদি খারাপ ভবিতব্য প্রত্যক্ষ হয় তখনই মানসিক করিলে পূজা দেয়।” (খেলার প্রতিভা)

এরকম উদ্ধৃতি আরো দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর করা যায় নিশ্চয়; তবে সহজে অনুমান হয়- কমুলমজুমদার গল্পবলার ছলে, এই ভাবে আমাদের অজ্ঞাত পুরাতন পৃথিবীর লুপ্ত পূজাবিধি সম্পর্কে ক্রমাগত সজাগ করে গেছেন তাঁর ব্যক্তিগত ‘ভালবাসা-ভক্তি’ দিয়ে। কমলকুমার যে জন্য বলেন, ‘আমরা কখনও একটা চরিত্র ছিলাম না, আমরা একটা অবস্থা।’ কিন্তু আমাদের অবস্থা এমন হয় যে,- তক্ষণি উচ্চকিত গলায় বলতে পারি না, ‘...আমার মস্তিষ্ক সন্ন্যাসধর্মে পরিপুষ্ট সঠিক বাঙালী।’ ফলে অপুষ্ট-দীক্ষাহীন মস্তিষ্ক জুড়ে আমাদের জন্য বরাদ্দ হয় তীব্র এক অসম্মান-অবমাননার কাল। ভাবি, ‘...শরীরেও তো সীমা আছে? সারাদিন অনবরত রাস্তায় রোদে রোদে ঘুরে আর ভাল লাগে না।’ দুর্বল শরীর এবং আত্মায় ভয় বাসা বাঁধে। কমলকুমার নিজেও থমকে দাঁড়ান- ‘সত্যি আমার অদ্ভুত ভয় হল, তখন আমি তা বেশ স্থিরভাবেই স্থিরতার সাথে গণনা করেছিলাম, অবশেষে আরও ভয় পেলাম ভয়ঙ্কর ভয়, এত বৃহৎ হলের মধ্যে কতলোক, মৃদু গল্প, হাসি, কফিপান, গুঞ্জন রসালাপ। দেয়ালের ফিকে সবুজতা, ব্রাউন চেয়ারের হাতল, চাকা চাকা বেশি স্যাঁকা মুখগুলি, আমার মনে কেবলই ভীতি সঞ্চার করলে, আমি বড্ড অসহায় কেননা আমি কিছুই সঠিক চিন্তা করতে পারলুম না। ভয় কেননা, এইসব মুখের, চেয়ারের টেবিলের কোন কিছুরই লাইন নেই।’

আমি এবার ভয় এড়ানোর জন্য বলি, ‘...আমি কিছুই চাই না, শুধু সাহস... ভয় নেই ভয় নেই।’ মৃদু সাহস নিয়ে অনন্তকালের ভয় রাজ্য পাড়ি দিতে দিতে নিজের যোগ্যতা আঁচ করতে এখন আর কষ্ট হয় না- স্থির হয়, কোনভাবেই কমল মজুমদারের সেই অবিস্মরণীয় তিরিশ জন পাঠকের খাতায় নিজের নাম অন্তর্ভুক্ত করা গেল না শেষমেশ! অতএব কমলকুমারের ‘শিল্পভাবনা ও মানুষ’ নিয়ে আমার কোন প্রবন্ধ দাঁড়ায় না; আমি রুক্সিনীকুমার, মল্লিকাবাহার, গোলাপ সুন্দরী, নিয়ে আলোচনা করার সাহস এড়িয়ে হয়ত হঠাৎ-ই ওঁর আঁকা ছবি দেখতে দেখতে থমকে তাকাই- সেখানে একটি বাগান কেয়ারি করা, অথবা পৃষ্ঠা জুড়ে ভেসে আছে বাগান বিষয়ক ‘দৈববাণী’। আমাদের অনুভব হয়- কোথাও যেন এবেলা একখ- মায়া রহিয়া গেল! এই মায়া এবং ভালবাসা বাঁচিয়ে রাখার জন্য কমলকুমারের তাবৎ রচনাসম্ভার বিস্মৃত হয়ে এবার আমরা কতিপয় ব্যাকবেঞ্চার ‘কমলকুমার বিরচিত ম্যাক্সিম’ নামের একটি ব্যক্তিগত সংকলন করার যৌথ পরিকল্পনা নিই কোন অনুমতি ছাড়াই; যেন বা একদা লাল-বইয়ের মত পুস্তিকাটি জমা রাখতে পারি বুক পকেটে, আর মাঝে-মাঝে স্তবগানের মত আওড়াতে পারি ‘মৃত্যুপর্যন্ত মনমরা’ আমাদের আত্মার শুশ্রƒষার জন্য-

আমার স্বরের প্রতিধ্বনি আমাকেই আতঙ্কিত করে। চরাচরে অতিকায় শীতলতা মুহ্যমান; স্তব্ধতার কাঁধে হাত দিয়া এখনও দাঁড়াইয়া আছি।

আমার আত্মা মৃত্যু পর্যন্ত মন মরা।

চিত্র নিজে অর্পিত কিছু নয়, চিত্র নিজেই একটি বাস্তবতা, যে নিজস্ব একটি লীলা-সংঘাত করতে সক্ষম।

এ দেশটার মতো এমন গানপাগলা দেশ আর কোথাও নেই।

কি সুন্দর সকাল হয় এদেশে।... জীবন শুধু শহরে নয়, গাঁয়েও।

যাদের কান মোটেই তোয়ের নয় তাদের কাছে গভীরতার যা কিছু ঐশ্বর্য তা বৃথা- বৃথাই, তাদের স্বরবৈভব কোন কিছু দেখানো যাবেনা।

এ সময় পৌষ মাস। রোদ শুধুই মানুষের পিঠে চড়ে থাকে।

পটুয়া যখন লিখবার চায়, তুলির রহস্যে বিরাট বাস্তবতা রঙে রেখায় হাজার লোকের যন্ত্রণা হয়ে উঠে।

প্রকৃতি মানুষের সকল তত্ত্বই জানে, তাহার মধ্যে আরও রক্তিমতা আছে এবং ধমনীর মধ্যে যাহা রক্ত।

আমরা সারা ভারতীয় হিন্দুরা রাখাল বড় ভালবাসি, একটি অল্পবয়সী রাখালই আমাদের জীবনের সর্বতর্ক বিচারের শেষ এবং সর্বউচ্চসিদ্ধান্তের প্রতীক।

মৃত্যু বাঙালীর নিকট বড় আদরের মৃত্যুকে এবং কেমন ভালবাসিতে হয় উহাই তাহার সাধনা।

শব্দ সকল কণ্ঠস্বর বৈ আর কি।

আমরা খুব গ্রাম্য; পাশ্চাত্য আমাকে মা বলিতে শিখায় নাই।

শরৎবাবু সাহিত্যের এক সৌন্দর্য।

লিখতে লিখতে ঘটে।

গঙ্গার অন্ধকার নাই। গঙ্গায় আমার ভক্তি পাঁচসিকে পাঁচ আনা।

আমার মা কখনও নিগঙ্গার দেশে মরিতে চাহেন নাই।

আমরা গদ্যকে সর্বময় ভাবিয়া থাকি যে, উহা কবিতার ইনভার্স। অবশ্য কতক যুক্তিতে অনেকটা অঙ্কের মনে হইবে, গদ্যের দিক দিয়া কবিতাটা কেমন!

আমি এখনও কচি আম হাতে গঙ্গার তীরে দাঁড়াইয়া আছি। বারম্বার ইহা আভাসিত হয়, আমি কখনও গঙ্গা দেখি নাই।

সত্যিই আমি কি মহৎ, আমি আমার বিশ্রী কাম কুৎসিত ক্রোধ ইত্যাদি লইয়াই বড় সুন্দর।

¯েœহ কথাটাকে রেখে যাব আমরা প্রেম কথাটাকে রেখে যাব আমরা ভালবাসা কথাটাকে বাঁচিয়ে যাব।

আমি যদি সাম্যবাদী হইতাম তাহা হইলে নিশ্চিত কিঞ্চিত বুদ্ধিমান সাজিতাম।

আমি গঙ্গাজলে দাঁড়াইয়া বলিতে পারি, আমার মত সরল খুব নাই, সত্যিকারের বাঙালীরাই আমার মত সরল।

লেখা ব্যাপারটাকে আমি গান আঁকার মত শক্ত ভাবি।

আমি নিজে কবিতা খুব ভালবাসি; কেন না উহা আমাকে উদ্ঘাটন করে।

লেখা আমি দুর্বোধ্য করি না- এত সরল যে তাহা দুর্বোধ্য হইয়া যায়।

ভোটদাতা বা নাগরিক বিষয় আমরা ভাবি কিন্তু মানুষটা জীবনটা লইয়া ক্বচিৎ ভাবিনা।

আমরা পাঠককে ভোটদাতা বা ইউনিয়ন করে বলিয়া ভাবি নাই।

আমার একমাত্র রোদনে ছাড়া আর কিসেইবা অধিকার থাকিতে পারে।

বাসনা ছিল কোন বিরাট শাল বৃক্ষকে স্পর্শ করি, সে গাছ এত পবিত্র যে তাহার গায়ে উই লাগে নাই, নদীবৃক্ষ, পাহাড় এসকল আমার নিকট সত্য;

ছবি হল চিন্ময় আর চলচ্চিত্র হল একাধারে চিন্ময় ও বাক্সময়।

নিজের জন্য কিছু লিখ; তোমার মধ্যে ভগবানের খেলা আছে, আনন্দ কর!

দারিদ্র্য দুঃখ উচ্চবর্ণেরা মনে রাখে- আর নিম্নরা ভোগে- আর কবিতা পদ্য লেখাই একটা বিদ্রোহ।

একমাত্র একজন সুস্থ থাকিতে পারে যদি সে খবরের কাগজে কাজ করে অথবা কোন রাজনৈতিক দলের সদস্য হয় কেননা ইহার সমক্ষে অনেক মতলব আছে।

রসে বসে রাখিস মা। (রামকৃষ্ণ)

গল্প অর্থই পুরনো পৃথিবী; বিশ্বাস, সম্পর্ক, বুকে টানা!

পুরুষ হল বাঁশি, আর স্ত্রী হল গিয়ে ডুগি-তবলা।

বোমা এক অভয়! আধাত্মিকভাবে- রাজনৈতিকভাবে নহে।

আমার বাবা বিড়ির তামাকে মধু ও রস মিশাইয়া উন্নত ধরনের বিড়ি করাইয়া দিলেন।

ধর্ম বলিতে আমি আচারও বুঝি, স্বভাবও বুঝি, কাপুরুষের মত বলিব না আচার বড় নয়!

‘কৃত্তিবাস’ ছিল খুবই স্নেহমমতা জড়িত এক গ্রাম! এখন সে শহর। অতএব ইহার মান মর্যদা অনেক বেশি!

আমি খবরের কাগজ কখনও পড়ি না, কারণ ঠাকুর বলেন উহাতে বৈষয়িকদের কথা, আমার কথা- ইংরেজরা ছিল তখন পড়িতাম সময়ে সময়ে- এখন একটা ডিম খাওয়া ভাল (দুদিনে)।

শিশুরা উজ্জ্বল খেলে।

কমলকুমারের ধ্যানমগ্ন পাঠক এ রকম ব্যক্তিগত ম্যাক্সিম-এর তালিকা নিশ্চয় আরো বিস্তৃত করতে সক্ষম। কিন্তু আমরা ‘পাখির কণ্ঠে ভোর আসিয়াছে’- এই অজুহাতে প্রবচন লেখার উচ্চাকাক্সক্ষা দ্রুত রহিত করি। আমাদের লেখাপড়া লোপ পায় এবং আমরা চিলড্রেনস অপেরা গ্রুপে নাম লেখানোর তাগিদে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে পাঠ্যপুস্তক পরিত্যাগ করি। কারণ ‘শিশুরা উজ্জ্বল খেলে।’ লক্ষ্য করি- চিরকালের স্কুলত্যাগী কমলমজুমদার কেন নতুন স্কুল গড়তে চাইছেন, তা নিয়ে কেউ সহসা জবাব দেয় না। তখন কোথাও তিনি চিঠি লেখেন- ‘একেবারে বস্তির ছেলেদের আজ ৮/৯ মাস যাবৎ গীত নৃত্য আবৃত্তি শিখাইতেছি।’ পথশিশুদের জন্য স্বউদ্ভাবিত এই শিক্ষাক্রম দেখে ব্রাজিলের পওলো ফ্রেরি’র সঙ্গে আমি কল্পনায় কমলমজুমদারের সাক্ষাৎকার পর্ব তৈরি করি- রাজনীতিবিমুখ কমলমজুমদার কখনও কি ঠাকুরের কৃপায় ‘পেডাগোগি অফ দা অপ্রেস্ড’-এর প্রুফ কপি আগাম পাঠ করে ফেলেছিলেন? নাকি তিনি হালের ‘উন্নয়ন থিয়েটার’ নামক অন্য এক প্রপঞ্চ দ্বারা তাড়িত হয়েছিলেন, যখন কোলকাতা শহরের সমস্ত ‘ক্রন্দন প্রবণতা’ নিঃশেস করেছিল কতিপয় খবরের কাগজ। খবর তৈরির, কাগজ তৈরির ‘রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক’ রহস্য নিয়ে আমাদের বন্ধুরা এবেলা প্রবন্ধ লিখলে, আমরা কমলকুমারের বেদনাক্লিষ্ট মুখ দেখতে পাই হঠাৎ- অপেরা দলের শিশুদের জন্য সাহায্য প্রার্থনা করা চিঠিটি প্রাপকের কাছে না পৌঁছে দিল্লী থেকে আবার ফিরে এসেছে ৫০ ডি হাজরা রোডের বাড়িতে।

কমলমজুমদার অপেরা দলের ভাঙন তথা শিশুদের উজ্জ্বল খেলাধুলার মৃত্যু দশা আঁচ করে ব্যথিত হন, অথবা হঠাৎ-ই অনুভব করেন- ‘মৃত্যু বাঙালীর নিকট বড় আদরের...!’ কিন্তু এবেলা তিনি যেনবা সামান্য ভয় পান, অন্যমনস্ক হন, ক্রুদ্ধ হল, অসহায় হন, অথবা অসুস্থতা অনুভব করেন। দেখতে পাই ততদিনে অসুস্থতা আমাদের ঘর বাড়িতেও তীব্র ছায়া বিস্তার করেছে- ভারতবর্ষের বর্ডার পেরিয়ে মায়ের কারসিনোমা ব্রেস্টের হিস্টোপ্যাথলজি রিপোর্ট হাতে মহাত্মা গান্ধী রোড অতিক্রম করার কালে, ভাবতে থাকি- এই রোডের ৭৭/১ নং বাড়ি থেকে তিনি ‘অঙ্ক ভাবনা’ প্রকাশ করেছিলেন একদা, আর বলেছিলেন ‘সংখ্যা আমার ভাই’। এদিকে মৃত্যুর সৌন্দর্য, মৃত্যুর রকমফের, অঙ্ক রহস্য ইত্যাদি বিবিধ সংবাদ বাতাসে মিলিয়ে যেতে-যেতে একদিন আচমকা সত্যি খবর হয়, আমাদের দেশ গাঁয়ে- অ্যালোপ্যাথি বিমুখ কমলমজুমদার একদা ৯ই ফেব্রুয়ারি কমপ্ল্যান এবং ফলের রস গ্রহণ করতে-করতে মৃত্যুকে ভালবাসা জ্ঞাপনের জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়েছেন গোপনে। ‘অন্তর্জলী যাত্রা’র অসুস্থ কমলকুমার আধো ঘুম আধো জাগরণের ভেতর তখন যেনবা স্বপ্ন দেখার শৌখিনতা অনুভব করেন একবার- বৈজুর কণ্ঠস্বর আসছে- ‘...ধুক ধুক করা নরদেহ বড় ভালবাসি আমি...’; কমলমজুমদার কথাটি শুনে সামান্য ভ্রুকুটি করেন। বৈজু গঙ্গার জলে হেঁটে চলেছে, আর হঠাৎ-ই কমলালয় স্টোর্সের রাম হালদার, ‘অন্তর্জলী যাত্রা, আমাকে কই বুঝিয়ে দিলেন নাতো!’ জবাব দিয়েছিলাম কি?- ‘আমার যখন অন্তর্জলী যাত্রা হবে সেদিন বুঝিয়ে দেব।’ কমপ্ল্যানের স্রোত গলার ভেতর চিবুতে-চিবুতে একবার বুকের খোলা চত্বরে গঙ্গার জল-হাওয়া অনুভব করেন, নাকি পায়ের আঙুল ছুঁয়ে যাচ্ছে গঙ্গার ছল-ছল জলের ধারা; কিন্তু পরক্ষণেই মুমূর্ষু- বাটি-চামচের কলধ্বনি ও শুকনো বিছানা-চাদর দেখে অনুভব করেন এটি নিশ্চয় ‘নিগঙ্গার দেশ!’ জানালায়, অলস-অবসন্ন চোখ ছড়িয়ে গেলে বহুদিন বাদে মনে হল ‘কলিকাতা একটি নয়নাভিরাম মায়াময় গভীর নগর- ...আবার এই সুন্দর কলিকাতায় আত্মগোপন করিতে হইবে; তাই সে রাস্তা সমুদয়ের বেশ কিছু পরিভ্রমণ করে, কোথাও স্কুল পাঠের উচ্চস্বর, কোথাও সাইকেলের ঘণ্টি, ফুটপাতের ঘুম, বৃহৎ কলেজ স্কোয়ারের মৎস্যদল, উন্নয়নের সর্পিল ধুম, বৃদ্ধের গমন, ভিখারির ভগবানের নাম, ডাস্টবিনের নিকট পরিত্যক্ত ভ্রূণ, রাস্তার কলে ডাগর রমণী দেহের সরমে স্নান, ভিস্তির জল লইয়া তৎপরতা, ঘোড়ার হ্রেষাধ্বনি, গড়ের মাঠ হইতে চৌরঙ্গী ট্রামবাসের মধ্যে আলো উদ্ভাসিত চৌরঙ্গি ইত্যাদি অনেক মায়া তাহাকে দ্রবীভূত করিয়াছে।’ কমলকুমারের বুক দ্রবীভূত হয়, আর আবারও অসুস্থ শরীর দিয়ে, আত্মা দিয়ে অনুভব করেন- কোথাও এখনও যেন একখ- মায়া রহিয়া গেল! দেখা গেল মায়ারাজ্যে ডুবে যেতে-যেতে পত্রিকায় এবার তিনি নতুন এক স্কুলের স্বপ্ন বর্ণনা করে চলেছেন- K.K. Majumdar Arts and Crafts School.

কমলকুমার সদ্য ফেব্রুয়ারির শীত-শীত ঘুম-ঘুম চোখে অথবা স্বপ্ন দেখার সৌখিনতায় আবার কমপ্ল্যানে চুমুক দেন অথবা সামান্য কমলালেবুর রস। অন্তর্জলী যাত্রার আয়োজন নস্যাৎ করে ততক্ষণে ভাড়া করা অক্সিজেন এসেছে। নার্স এসেছে, কিন্তু নার্স সিরিঞ্জ আনতে ভুলে গেছেন। কমলমজুমদারের হাত স্ত্রীর চুড়িতে ঘষে মৃদু সংগীত আনে। সংগীতের সৌন্দর্য, নার্সের ধব ধবে পোশাকের স্থাপত্য, এবং ফলমুলের প্রতিধ্বনি দ্রুত মিলিয়ে যেতে থাকে, আর হঠাৎ-ই কেউ ফুঁপিয়ে ওঠেন- ‘কনে বউ তুমি বড় সুন্দর গো, ...কনে বউ তুমি পুড়বে... লাউ... লাউ তুমি পালাও... কনে বউ পালাও।’ চিলড্রেন্স অপেরা গ্রুপ-এর শেষ কয়েকজন ছাত্র, যারা আমরা প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম কে কে মজুমদারস্ আটর্স এ্যান্ড ক্রাফটস্ স্কুলে ভর্তি হওয়ার- এবার ঘরের ভেতর ছড়িয়ে পড়া কান্নায় সংক্রমণ অনুভব করি আমাদের শীর্ণ বুক জুড়ে। এই ‘ক্রন্দন প্রবণতা’কে স্মরণীয় রাখার জন্য কোলকাতা শহরের বহুদূরে আমাদের মাষ্টার মশাইয়ের লেখা থেকে, ভুল উচ্চারণে এবার সমবেত পাঠ করি- ‘আমি নিজে মৃত্যুকে বড়ই ভালবাসি; বৈদান্তিক অর্থে নয়। বা অমৃতের পথ বলিয়া নহে। উহা বড়ই সৌন্দর্য! কিন্তু তখনই আমিও বালকের মত কাঁন্দিয়া উঠি- যখন কেহ চলিয়া যায়! তখন আর আমাতে সেই বাহাদুরী থাকে না! এই এক রহস্য! শুধু ভগবানের নিকট প্রার্থনা করি, যে ঠাকুর সব ক্ষমতা আমার যাক যেন কান্দিবার ক্ষমতার আকাল না দেখা দেয়।’

কান্নার ক্ষমতা দেখতে-দেখতে, কিম্বা আমরা হয়ত মাষ্টার মশাইয়ের ‘ইশারা’ খোঁজার ছলেই দু’একটি কথা আবার মনে করতে চাইছিলাম; কিন্তু শ্লেষ্মাজড়ানো গলায় অস্পষ্টতা তৈরি হয় বাক্য জুড়ে- ‘স্নেহ কথাটাকে রেখে যাব আমরা প্রেম কথাটাকে রেখে যাব আমরা ভালবাসা কথাটাকে বাঁচিয়ে যাব।’ খানিকটা প্রতিজ্ঞার মত, মন্ত্রের মত, স্তবের মত, এই সমবেত পাঠ শেষে কমলমজুমদারের হতদরিদ্র ছাত্ররা এবার বালকের মত কাঁদিয়া উঠে- কে জানে এরিখ ফ্রমের ‘আর্ট অফ লাভিং’ এমনিতর এক গভীর অভিজ্ঞান থেকেই হয়ত শুরু হয়েছিল, যখন খবর হয়- কে কে মজুমদার স্কুলের মৃত বারান্দায় শোকার্ত শিশুরা এত তীব্র মায়া এবং প্রেমে নিমজ্জিত হয়েও শেষমেশ আর অন্য কোন বিশেষ ‘উজ্জ্বল খেলা’ প্রদর্শনের সুযোগ পায়নি, কলিকাতা নামক নয়ানাভিরাম মায়াময় এক গভীর নগরে।

  • সিলভিয়া প্লাথ

    মৃত্যু, নৈঃসঙ্গ্য ও আত্মবিনাশের কবি

    কামরুল ইসলাম

    newsimage

    সিলভিয়া প্লাথ ছিলেন আমেরিকান কনফেশনাল কবিদের অন্যতম। সাহিত্যে কনফেশন বলতে বোঝায় সেই আত্মজীবনীমূলক রচনা (প্রকৃত

  • জীবন প্রলয়ী সিলভিয়া প্লাথ

    মিলটন রহমান

    newsimage

    আমার অন্তর্গত অনুসন্ধান এবং পর্যবেক্ষণিক সিলভিয়া প্লাথের বয়স বাইশ বছরের কম নয়। প্রথমদিকে কাব্যের চেয়েও বেশি অনুরক্ত এবং

  • সিলভিয়া প্লাথের কবিতা

    অনুবাদ : অশোক কর

    দু’জন, নিঃসন্দেহে ওরা দু’জনই। এখন খুবই স্বাভাবিক বলেই মনে হয়Ñ একজন

  • ফিরে যাব রাজপথে

    সৌর শাইন

    newsimage

    মৃত্যুর দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে। স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি জীবননাশী দূতকে, যদিও চোখ দুটো বাঁধা। মৃত্যু আমার নিচের ঠোঁটটা আলতো ছুঁয়ে গেল।

  • উত্তাপ

    ফরিদা ইয়াসমিন সুমি

    newsimage

    ঘুম ভেঙে যায় বিথীর। দরদর করে ঘামছে। মনে হচ্ছে সারারাত ধরে স্বপ্ন দেখছিল। এরকমটা হয় মাঝেমাঝে। স্বপ্নের কথা মনে করে ভীষণ লজ্জা

  • সাময়িকী কবিতা

    নোরা টোরভাল্ডের প্রাণ বাঁচিয়েছে। মিস লিন্ডে মৃত্যুশয্যাশায়ী মার পাশে ছিল, তার