menu

কবিতা ও কবিগান

ইন্দ্রনীল সেনগুপ্ত

  • ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ১৩ জুন ২০১৯
image

কবিতা প্রাচীনতম সাহিত্য। প্রকৃতি ও জীবন, মহাবিশ্বের বিস্তৃত গ্রহতারা থেকে শুরু করে কীটপতঙ্গসমূহ এক ছন্দোবদ্ধতায় আবদ্ধ। পৃথিবীর সমস্ত ভাষার আদি সাহিত্য তাই কবিতা। ঋতু পরিবর্তন, শস্য উতপাদন, জীবনচক্র, চন্দ্রকলার হ্রাসবৃদ্ধি, শিরায় ধমনীতে রক্তের গমনাগমন- সমস্ত কিছুই যেন কাব্যময়। এমনকি শ্রমিক অথবা চাষির যে শ্রমদান তাও এক ছন্দের বহিঃপ্রকাশ। এমনকি শস্য উৎপাদনের পর মানুষের যে উৎসবের আয়োজন ঘটে সেখানেও কবিতা ছন্দ-নৃত্য-গীত যেন সহজাত। অবশ্য যা কিছু ছন্দোবদ্ধ তাই যে কবিতা হতে হবে তার কোন মানে নেই। চর্যাপদ বা শ্রীকৃষ্ণকীর্তন ছন্দোবদ্ধ হতে পারে, প্রাচীন যুগের সাহিত্য হিসেবে তাদের ঐতিহাসিক ভূমিকা থাকতে পারে, কিন্তু সেগুলিকে পদ্য বলা গেলেও কতোটা কবিতা বলা যাবে তা নিয়ে তর্কের অবকাশ থাকতেই পারে।

মধ্যযুগীয় মঙ্গলকাব্য ও গীতিকবিতার ধারা ক্রমশ তার আবেদন হারিয়ে ফেলছিল। রায়গুণাকর ভারতচন্দ্র রায় সতের শতকের মধ্যভাগে অন্নদামঙ্গল কাব্য রচনা করেন। নামে মঙ্গলকাব্য হলেও দেবদেবীর মাহাত্ম্য প্রচার তাঁর মুখ্য লক্ষ্য ছিল না। ভারতচন্দ্রের কাব্য মানবিক রসে পূর্ণ। অতীতকে অনুসরণ নয়, ভারতচন্দ্র ভবিষ্যতের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করেছিলেন। গীতি কবিতায় বিশেষত শাক্ত ও বৈষ্ণব পদাবলীর প্রভূত জনপ্রিয়তা সত্ত্বেও সেগুলিকে পরিপূরণ করার জন্য অন্য একটি খাতের প্রয়োজন অনুভূত হচ্ছিল। এর পেছনে বিজ্ঞানের অগ্রগতি ও চিকিৎসা শাস্ত্রের উন্নতিও একটি প্রধান কারণ। ঈশ্বর নির্ভরতাই যে বেঁচে থাকার শেষ কথা নয়, সমাজে এই অনুভূতি তখন জায়মান। এই যুগেই কবিয়ালদের উদ্ভব দেখা যায়। কবিগান এক তাৎক্ষণিক প্রতিযোগিতা নির্ভর প্রতিভা বিস্ফুরণ। আদিরস ও ভক্তিরসের মিশ্রণে কানুপ্রেম ঈশ্বরপ্রেমের মোড়কে ধর্মনিরপেক্ষ স্বাধীন মানবিকতার প্রকাশের মাধ্যম হয়ে উঠেছিল। অতীতের দিকে চোখ থাকলেও সমসাময়িক ছিল প্রধান উপজীব্য। ব্যাঙ্গাত্মক ভঙ্গিতে সামাজিক অন্যায়ের প্রতিবাদ এবং সমাজপতিদের অত্যাচারকেও তুলোধুনো করতে ছাড়তেন না কবিয়ালেরা। প্রতিবাদের মুখ হয়ে উঠতে পেরেছিলেন বলেই কবিয়ালদের সমাজের চোখে এক আলাদা সম্মান ছিল। কবিয়ালরাই বাংলা সাহিত্যে যেমনভাবে সর্বপ্রথম বহুত্ববাদের আস্বাদ সর্বসমক্ষে আনতে পেরেছিলেন অন্য কোন প্রতিষ্ঠান সেভাবে সম্ভবত কখনই আনতে পারেনি।

কবিগান বাংলা লোকসংগীতের একটি বিশেষ ধারা। কবিয়ালরা একাধারে গায়ক ও কবি। তাঁদের মুখে মুখে কাব্যপদ রচনা এবং তাৎক্ষণিক সুরারোপণের প্রতিভা আবশ্যিক। প্রতিযোগিতামূলক আসরে উপস্থিত গায়ক কবিবর্গ দুটি দলে বিভক্ত। তাঁদের প্রতিপাদ্য পরস্পরবিরোধী। নেতৃত্বে থাকেন একজন মূল গায়েন বা কবিয়াল। ধুয়া ধরেন সহকারী গায়ক বা দোহারগণ। এঁরা সাধারণত নেতার উক্তির পুনরাবৃত্তি করেন। শুরুর বন্দনা বা গুরুভজনার মাধ্যমে পরিবেশ তৈরি হতে থাকে। বন্দনা অংশটি বাগদেবী, গণেশ ও শ্রোতাদের উদ্দেশ্যে নিবেদিত। এরপর রাধাকৃষ্ণ বিষয়ক আগমনী গান গাওয়া হয়। অতঃপর চারটি বিষয়ভিত্তিক গান গাওয়া হয়: ‘সখী সংবাদ’, ‘বিরহ’, ‘লহর’ও ‘খেউড়’।

সঙ্গতকারীদের মধ্যে ঢুলির প্রধান ভূমিকা থাকে। দল দুটি আসরে এসে পালা করে গান পরিবেশন করে। গানগুলি কয়েকটি অঙ্গে বিন্যস্ত, যেমন : ডাক, মালসি, সখীসংবাদ, কবি, কবির টপ্পা, পাঁচালি ও ধুয়া এবং জোটের পাল্লা। পাঁচালি অংশে পয়ার ও ত্রিপদীতে কবিয়ালগণ ছড়া কাটেন। জোটের পাল্লা অংশে দু’কবিয়াল কোনো একটা গানের সুরে ছড়া কাটতে কাটতে গান শেষ করেন। আঠারো শতক কবিগানের উদ্ভবকাল। বাংলাদেশের একাধিক লোকসঙ্গীতের সমন্বয়ে এ গানের সৃষ্টি হয়েছে।

উনিশ শতকের গোড়ার দিকে কলকাতায় কবিগান এক ঐতিহাসিক তাৎপর্য অর্জন করে। বাংলার নব জাগরণ, ইয়োরোপের সঙ্গে ব্যবসাবাণিজ্য, ইয়োরোপীয় রেনেসাঁর প্রভাবে নব জাগ্রত মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিনোদনের মাধ্যমে তখন ঈশ্বরভজনার স্থান গৌণ হতে থাকে। এই শূন্যতা পূর্ণ করে কবিগান। কালখন্ড ও বক্তব্য প্রাধান্য গুণে এ গান বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে বিশেষ মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত।

উনিশ শতকের কলকাতায় উল্লেখ্য কবিয়ালদের মধ্যে হরু ঠাকুর (১৭৪৯-১৮২৪), নিতাই বৈরাগী (১৭৫১-১৮২১), রাম বসু (১৭৮৬-১৮২৮), ভোলা ময়রা, এন্টনি ফিরিঙ্গি নাম সর্বাগ্রে আসে। উনিশ শতকের অন্তিমলগ্নে কবিগান শহরের গুরুত্ব হারাতে শুরু করে। শহরে তখন ব্রিটিশ বিরোধী নানা কর্মকান্ডের সূত্রপাত হতে থাকে। ধর্মীয় চিন্তা ভাবনায় রামকৃষ্ণদেব এবং স্বামী বিবেকানন্দের উদারতার বার্তায় বেশ কিছু মানুষ আকৃষ্ট হতে থাকেন। নাটক ও নাট্যালয়ের উদ্ভব হতে থাকে। এক কথায় কবিগান ছাড়াও বিনোদন তথা সময় কাটানোর বহু উপকরণ তখন সাধারণের করায়ত্ত হতে থাকে। কবিয়ালদের প্রকৃত বিকাশকাল হলো ১৭৬০ থেকে ১৮৩০ সালের মধ্যবর্তী সময়। এই সময় বাংলা কাব্যের ধর্মীয় ও আনুষ্ঠানিক উপাদানগুলো ফিকে হয়ে আসতে শুরু করেছিল। বৈষ্ণব কবিতার ধারা থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছিল বাংলা কাব্যও। অষ্টাদশ শতাব্দির মাঝের দিকে মুদ্রণ যন্ত্রের প্রয়োগ বাংলা সাহিত্যচর্চাকে স্মৃতি ও শ্রুতি নির্ভরতা থেকে মুক্তি দেয়। ফলে সাহিত্যচর্চার নানা আঙ্গিক উন্মুক্ত হতে থাকে। এই সময়ে কবিয়ালেরা ধর্মনির্ভরতার বিষয়বস্তু পরিবর্তন করতে থাকেন। ফলে নব্যকবিগানের প্রতিও আক্রমণ ঘটে। অষ্টাদশ শতাব্দির শেষভাগ থেকে পরবর্তী অর্ধশতাব্দিকাল নব্য কবিগান ও পাঁচালি গান কলকাতা ও তৎসংলগ্ন অঞ্চলে এতটাই জনপ্রিয়তা অর্জন করে যে সাহিত্যের অন্যান্য ধারাগুলির অস্তিত্বই বিপন্ন হয়ে পড়ে।

গ্রামাঞ্চলেও কবিগানের জনপ্রিয়তা অটুট থাকে। সাধারণ মানুষের কবিগানের জগতে প্রবেশের কোন বাধা ছিল না। উচ্চশিক্ষারও প্রয়োজন ছিল না। কবিগানের মধ্যে সাধারণ মানুষের কবিপ্রতিভা, সৃজনশীলতা এবং সঙ্গীতসাধনার এক অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছে। এক্ষেত্রে প্রথম প্রতিভাধর কবিয়াল ছিলেন তারকচন্দ্র সরকার (১৮৪৭-১৯১৪)। বিশ শতকে সর্বাধিক জনপ্রিয় কয়েকজন কবিয়ালের নাম হরিচরণ আচার্য (১৮৬১-১৯৪১), রমেশ শীল (১৮৭৭-১৯৬৭), রাজেন্দ্রনাথ সরকার (১৮৯২-১৯৭৪), মানিকগঞ্জের রাধাবল্লভ সরকার, উপেন্দ্র সরকার, ভাসান সরকার, কুমুদ সরকার, অভয়চরণ সরকার, বিজয়কৃষ্ণ অধিকারী (১৯০৩-১৯৮৫), গুমানী দেওয়ান প্রমুখ।

ময়মনসিংহের মুগ ভালো, খুলনার ভালো কই।

ঢাকার ভালো পাতাক্ষীর, বাঁকুড়ার ভালো দই।।

কৃষ্ণনগরের ময়রা ভালো, মালদহের ভালো আম।

উলোর ভালো বাঁদর পুরুষ, মুর্শিদাবাদের জাম।।

রংপুরের শ্বশুর ভালো, রাজশাহীর জামাই।

নোয়াখালীর নৌকা ভালো, চট্টগ্রামের ধাই।।

দিনাজপুরের কায়েত ভালো, হাবড়ার ভালো শুঁড়ি।

পাবনা জেলার বৈষ্ণব ভালো, ফরিদপুরের মুড়ি।।

বর্ধমানের চাষী ভালো, চব্বিশ পরগণার গোপ।

গুপ্তিপাড়ার মেয়ে ভালো, শীঘ্র-বংশলোপ।।

হুগলির ভালো কোটাল লেঠেল, বীরভূমের ভালো বোল।

ঢাকের বাদ্যি থামলেই ভালো, হরি হরি বোল।

উনিশ শতকে কবিয়াল ভোলা ময়রা কবি-গায়ক হিসেবে প্রভূত খ্যাতি অর্জন করেন। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর স্বীকার করেছেন “বাংলাকে জাগাতে যেমন রামগোপাল ঘোষের মতো বাগ্মী, হুতোম প্যাঁচার মতো আমুদে লোকের প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন ভোলা ময়রার মতো লৌকিক গায়কদের।”

আসলে কবিগান এক অর্থে তরজা বা তরজার উত্তরসূরি। খ্রিস্টীয় ষোল শতকে অদ্বৈতপ্রভু শ্রীচৈতন্যকে একটা “আর্য্যা- তরজা” লিখে পাঠান। আধ্যাত্মিক থেকে শুরু করে আদিরস, এই তরজা পড়ে শ্রীচৈতন্য বলেছিলেনÑ “মহাযোগেশ্বর আচার্য্য তরজাতে সমর্থ, আমিহ না জানি তাঁহার তরজার অর্থ।”

অধ্যাত্ম আর প্রেম নিয়ে বৈঠকী গান বিশেষভাবে শুরু হয়-অষ্টাদশ শতাব্দীতে।

ঠিক এই সময়েই শান্তিপুরের অঞ্চলে গ্রাম্যভাষায়, টপ্পার সুরে নিতান্ত আদিরসাত্মক গান চালু হয়। একে বলা হতো খেঁড়ু বা খেউড়। প্রশ্নোত্তর ভিত্তিক এই গান ভারতচন্দ্রের আমলে নবদ্বীপ অঞ্চলে চালু ছিল। পরে কলকাতাসহ দক্ষিণবঙ্গে এর আগমন ঘটে। রাজা নবকৃষ্ণ দেব আর তাঁর ছেলে রাজকৃষ্ণ এই সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষক ছিলেন বলা যায়। নবকৃষ্ণ দেবের সভাসদ, কুলুইচন্দ্র সেন রাগ-রাগিনী ও যন্ত্রানুষঙ্গে এই খেউড় গানকে পরিবর্তিত রূপ প্রদানে ব্রতী হন। তাঁর সঙ্গে রামনিধি গুপ্ত তথা নিধুবাবু (১৭৪১- ১৮৩৪) এই কাজে আত্মনিবেদিত হন। বলা বাহুল্য তৎকালীন শিক্ষিত সারস্বত সমাজে নিধুবাবুর গ্রহণযোগ্যতা ছিল এবং সে সময়ের অর্থবান বাঙালিরা নিধুবাবুর প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিলেন।

আখড়াই গানে রাগ-রাগিনীর ব্যবহার থাকায়, এই গান গাওয়া ছিল সাধনা সাপেক্ষ। ঊনবিংশ শতাব্দির প্রারম্ভেÑ শ্রীদাম দাস, রাম ঠাকুর, নসীরাম স্যাকরা; পেশাদার আখড়াই গানে খুব নাম করেছিলেন।

সজনীকান্ত দাশ তাঁর “বাংলার কবিগান” বইতে লিখেছিলেনÑ “বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন সময়ে প্রচলিত বিভিন্ন সাংগীতিক ধারার মিলনে কবিগানের জন্ম। এই ধারাগুলির নাম বহু বিচিত্রÑ তরজা, পাঁচালি, খেউড়, আখড়াই, হাফ আখড়াই, ফুল আখড়াই, দাঁড়া কবিগান, বসা কবিগান, ঢপকীর্তন, টপ্পা, কৃষ্ণযাত্রা, তুক্কাগীতি ইত্যাদি।” ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত ও ড. হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়ের মতো খ্যাতনামা সাহিত্য গবেষকরাও কবিগান নিয়ে গবেষণা করেছেন। একটি উজ্জ্বল অধ্যায়কে তাঁরা পুনর্নির্মাণের চেষ্টা করেছেন।

ড. সুশীল কুমার দের মতে, কবিয়ালরা ছিলেন সমাজের নিচুতলার মানুষ। তাই এই অংশের চিন্তাভাবনা অনুভূতিগুলি তাঁরা ভাল বুঝতেন। সমাজের তথাকথিত অশিক্ষিত অংশে এঁরা অবিসংবাদী জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন।

অষ্টাদশ থেকে বিংশ শতাব্দীর মধ্যবর্তীকালে কেবলমাত্র বীরভূম জেলাতেই তিন শতাধিক কবিয়াল ছিলেন। কবিয়াল গোঁজলা গুঁই ও তাঁর সমসাময়িক লালুনন্দলাল, রঘু ও রামজি অষ্টাদশ এই পর্বের আদি কবিয়াল। ঊনবিংশ শতাব্দির কলকাতার বিখ্যাত কবিয়ালরা ছিলেন হরু ঠাকুর (১৭৪৯-১৮২৪), নিতাই বৈরাগী (১৭৫১-১৮২১), রাম বসু (১৭৮৬-১৮২৮), ভোলা ময়রা (জন্ম মৃত্যুর সাল জানা যায়নি) ও অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি। ভোলা ময়রা এবং অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি দুজনেই কিংবদন্তিতে পরিণত হয়েছেন তাঁদের প্রতিভা এবং গীত পারদর্শিতার কারণে। পর্তুগীজ নাগরিক হ্যান্সম্যান অ্যান্টনি (১৭৮৬-১৮৩৬), পরবর্তীতে অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি ১৯ শতকের প্রথম দিকে বাংলাতে আসেন এবং চন্দননগরের ফরাসডাঙ্গা এলাকায় বসবাস শুরু করেন। প্রথমে তার বাংলা গানগুলোর রচয়িতা ছিলেন কবিয়াল গোরক্ষনাথ, পরে অ্যান্টনি নিজেই গান রচনায় পারদর্শী হন। তার গানে জাতি ও বর্ণগত ভেদাভেদের উর্ধে মানুষ ও মানবতার কথা পাওয়া যায়। তার অন্যতম জনপ্রিয় গান ‘সাধন ভজন জানিনে মা, জেতে তো ফিরিংগি’। কথিত আছে তিনি সৌদামিনি নামক এক ব্রাহ্মণ মহিলাকে সতীদাহ থেকে উদ্ধার করেন ও বিবাহ করেন। তিনি মধ্য কলকাতায় একটি কালী মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন, যা ফিরিঙ্গি কালীবাড়ি নামে পরিচিত হয়।

ঊনবিংশ শতাব্দির চারণকবি মুকুন্দ দাস (১৮৭৮-১৯৩৪) প্রকৃতপক্ষেই ছিলেন একজন কবিয়াল। স্বদেশী চেতনা উদ্বুদ্ধ করতে তার গানগুলি এক অনস্বীকার্য উজ্জ্বল ভূমিকা পালন করেছে।

রমেশ শীল বা কবিয়াল রমেশ শীল (১৮৭৭-১৯৬৭) বাংলা কবিগানের অন্যতম রূপকার। কবিগানের লোকায়ত ঐতিহ্যের সাথে আধুনিক সমাজ সচেতনতার সার্থক মেলবন্ধন ঘটিয়ে তিনি ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন। কবির বাবার নাম চন্ডীচরণ শীল। এগার বছর বয়সে বাবার অকালপ্রয়াণে সাংসারিক দায়িত্ব এসে পড়ে কবির কাঁধে। নিজেই লিখেছিলেন:

“আমিই বালক, চালক, পালক, আমার আর কেহ নাই।

মায়ের অলংকার সম্বল আমার, বিক্রি করে খাই”

প্রথমে জীবিকা হিসাবে পারিবারিক পেশা কবিরাজি চিকিৎসা শুরু করেছিলেন। ঘটনাক্রমে কোনরকম পূর্ব অভিজ্ঞতা ছাড়াই ১৮৯৭ সালে প্রথম মঞ্চে কবিগান পরিবেশন করেন আর সঙ্গে সঙ্গেই পান স্বীকৃতি। ১৮৯৯ সালে কবিগান পরিবেশনায় প্রতিদ্বন্দ্বি তিনজন কবিয়ালকে পরাজিত করলে উদ্যোক্তা ও শ্রোতাদের কাছ থেকে, তের টাকা সম্মানী লাভ করেন, যা পেশা হিসাবে পরবর্তীকালে কবিগানকে বেছে নিতে রমেশ শীলকে অনুপ্রাণিত করে।

নকুলেশ্বর সরকার (জন্ম: ১৮৯৪-মৃত্যু: ১৯৮৭) ছিলেন এই সময়ের আর একজন বিখ্যাত কবিয়াল।

নকুলেশ্বরের আদি নিবাস বর্তমান বাংলাদেশের বরিশালের ঝালোকাঠি। তিনি ছাত্রবৃত্তি পরীক্ষা পাস করেছিলেন। ১৭ বছর বয়েসে বরিশালের কুঞ্জবিহারী দত্তের গানে আকৃষ্ট হয়ে তিনি বহু বাধা অতিক্রম করে কবিগান চর্চায় মন দেন। দীর্ঘ ৬০-৬৫ বছর ধরে তিনি পূর্ববঙ্গের কবিগানের শ্রেষ্ঠ শিল্পী বলে স্বীকৃতি পেয়েছেন।

স্বল্প পরিসরে আলোচনা দীর্ঘায়িত করার অবকাশ নেই। বহু আঙ্গিক তথা বিবরণ অধরাই থেকে যায়। আমার উদ্দেশ্য কিছুটা অতীতচারণা এবং ইতিহাস সম্পর্কে পাঠককে স্মরণ করিয়ে দেওয়া। অবশ্যই এ বিষয়ে আরও অনুসন্ধানে ব্রতী হব ভবিষ্যতে।

কৃতজ্ঞতা স্বীকার

১। শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, বাংলা সাহিত্যের কথা

২। উইকিপিডিয়া

৩। রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্য

৪। তুষ্টি ভট্টাচার্য।

৫। অশ্রুকুমার শিকদার, হাজার বছরের বাংলা কবিতা