menu

ওসামা অ্যালোমারের অণুগল্প

অনুবাদ: ফজল হাসান

  • ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ২৩ মে ২০১৯
image

ওসামা অ্যালোমার

লাথি

দু’জন প্রশ্নকর্তা কয়েদীকে কক্ষের এক কোণে জবুথবু অবস্থায় ফেলে যায়। কয়েদীর ক্ষত স্থান থেকে প্রচুর পরিমাণে রক্তপাত হয় এবং ভয়ে সে থরথর করে কাঁপতে থাকে। সেই সময় কক্ষের কোনাও তাকে সজোরে লাথি দেয় এবং গড়িয়ে সে অন্য কোণে যায়। এভাবে কক্ষের চার কোনাই তাকে অনবরত লাথি দিতে থাকে, যতক্ষণ না পর্যন্ত তার উপর ছাদ ভেঙে পড়ে এবং আসল কাজ শেষ হয়।

হাড় বাছাই

জেলখানার পাহারাদার বিশাল এক স্তুপ হাড় এনে উদ্ধত ভঙ্গিতে কয়েদীকে বলল, ‘তুমি যদি বাছাই করে জন্তু-জানোয়ারের হাড় থেকে মানুষের হাড় আলাদা করতে পারো, তাহলে তোমাকে আমরা তৎক্ষণাৎ মুক্তি দিব।’

বলেই পাহারাদার ঠোঁটের ফাঁকে নিষ্ঠুর হাসির রেখা টেনে চলে যায়।

কয়েদী বছরের পর বছর হাড় আলাদা করার চেষ্টা করে, কিন্তু শেষপর্যন্ত তার সব চেষ্টাই বৃথা যায়। পরিণামে সে হাড়ের স্তুপের উপর পড়ে গিয়ে মৃত্যুবরণ করে এবং একটু একটু করে তার নিজের হাড় অন্য হাড়ের সঙ্গে মিশে যায়।

সংকোচন

আকরাম সেই দিনটিকে অভিসম্পাত করে, যেদিন সে নিজের বয়সকে সত্তর থেকে সংকুচিত করে কুড়িতে নিয়ে আসে। তার মনে হয়েছে, শৈশবের অক্ষমতা বার্ধক্যের অক্ষমতার সঙ্গে ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি করে। দুঃখভরা স্মৃতিরা সুখ ও আনন্দে ভরা স্মৃতির সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় এবং বিয়ের সঙ্গে বিচ্ছেদ একত্রিত হয়। হাসি-তামাশার সঙ্গে চোখের পানির সখ্য এবং একই জায়গায় বন্ধু ও শত্রুর উপস্থিতি দেখা যায়। ভালো এবং মন্দের মধ্যে পার্থক্যের সীমারেখা বিলীন হয়ে যায়। সময়ের অলৌকিক ক্ষমতা দুঃখ-বেদনাকে প্রশমিত করে এবং চরম দুর্দশা শূন্যতায় হারিয়ে যায়। সুতরাং সে সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, আসল বয়সই উপভোগ করবে। আকরাম সংকুচিত সময়ের বন্ধন আলগা করে।

তিক্ত ঠান্ডা

যেহেতু সে দীর্ঘ সময় তার পরিবারের সঙ্গে উষ্ণ পরিবেশে থেকেছে, তাই একসময় সমাজের তিক্ত ঠান্ডা পরিস্থিতিতে এসে অসুস্থ হয়ে পড়ে এবং মৃত্যুর দরজা থেকে ফিরে আসে।

আলোর রশ্মি

জীবনের বন্ধ দরজার সম্মুখে আমি আত্ম-অহমিকায় মাথা উঁচু করে রেখেছি। সেই কারণে আমি হামাগুড়ি দিয়ে দরজার নিচের সূক্ষ ফাঁক গলিয়ে আলোকরশ্মি প্রবেশ করতে দেখিনি, যতক্ষণ না পর্যন্ত বৃদ্ধ বয়স আমার মেরুদন্ড বাঁকা করেছে।

অভিব্যক্তির স্বাধীনতা

সরকার ইশতেহার জারি করেছে যে, এখন থেকে জনগণ তাদের মুখভঙ্গি প্রকাশ করার জন্য স্বাধীন। সবাই এই সিদ্ধান্তকে অগ্রগতির পদক্ষেপ হিসাবে গণ্য করেছে। কেননা এধরনের অভিব্যক্তি প্রকাশের স্বাধীনতাকে অনেক দেশেই সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সরকারের সিদ্ধান্তকে পূর্ণ সমর্থন জানিয়ে অগণিত নাগরিক গণতন্ত্রের বিজয় মিছিল বের করে। মিছিলে চলায় সময় তারা মুখ বড় করে হাসে। অসম্ভব আনন্দের মুখোশ পরা তাদের মুখ।

পিরামিডের চূড়া

রৌদ্রের তাপে সামাজিক পিরামিডকে উত্তেজনায় টগবগ করে ফুটতে দেখে বিশাল এক আবর্জনার থলির মনের মধ্যে সাধ জাগে যে, সে পিরামিডের চূড়ায় আরোহণ করবে। উপরে ওঠার জন্য সে আন্তরিকভাবে চেষ্টা করে, কিন্তু প্রত্যেরবারই পুনরায় নিচে নেমে আসে। অনেক ব্যর্থ চেষ্টার পরে সফল হয়। অবশেষে সে পিরামিডের চূড়ায় বসে। সেই সময় প্রচন্ড ক্লান্তি-অবসাদে এবং বিজয়ের মহাআনন্দে তার দম ফুরিয়ে আসছিল। প্রাপ্তির অনুভূতি তাকে সমস্ত দুঃখকষ্ট এবং পরিশ্রমের কথা ভুলিয়ে রাখে।

কিন্তু পিরামিড এক মুহূর্তের মধ্যেই থলির গায়ে একটা ছিদ্র তৈরি করে। আবর্জনার সঙ্গে পানি মিশে নিচের দিকে চারপাশে গড়িয়ে পড়তে থাকে। একসময় দৈত্যকার পিচ্ছিল আবর্জনার আড়ালে পুরো কাঠামোই তলিয়ে যায় এবং অনেক দূর পর্যন্ত দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে।

লড়াই ছেড়ে দিও না

বন্য ঘোড়াটি মাঠের মধ্যে যখন তিড়িং বিড়িং করে লাফাচ্ছিল, তখন সে দেখে যে পানির তীব্র চাপে নলের মাথা বারবার এলোপাতাড়ি ঘাসের উপর আছড়ে পড়ছিল এবং চতুর্দিকে পানি ছড়াচ্ছিল। অনেক কসরত করেও কৃষক তাকে আয়ত্তে আনতে পারছিল না। ঘোড়াটি সমস্ত শক্তি দিয়ে চিৎকার করে এবং নলটিকে সাহস যোগায়, ‘লড়াই ছেড়ে দিও না।’

দারুণ উদ্যমী হয়ে পানির নল জবাবে বলল, ‘ঠিক বলেছ, প্রিয় বন্ধু।’

জলাভূমি

আমি অকর্মার জলাভূমিতে পরিণত হয়েছি এবং তার জন্য কেউ আমার অতলে লুকানো মণিমুক্তা দেখতে পারে না।

হাসি মুখের লোকজন

নেতার ছবির দিকে না হেসে তাকানোর জন্য ওয়াদি আল-মানতুফকে গ্রেফতার করা হয়েছে। গুপ্ত পুলিশ তাকে বেদম ঘুষি মেরেছে এবং সজোরে লাথি দিয়েছে, এমনকি পথচারীরাও পিটুনিতে অংশগ্রহণ করেছে। এছাড়া ছেলেমেয়েরাও তার প্রতি চরম ঘৃণা প্রকাশ করতে বিন্দুমাত্র কার্পণ্য করেনি। লোকটির উদ্দেশ্যে তারা জিহ্বা বের করে ভেংচি কেটেছে এবং তার উপর থুতু ছিটিয়েছে। একসময় লোকটিকে পুলিশের ঘাঁটিতে নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেখানে তাকে দীর্ঘ সময় আটক করে রাখে। অবশেষে তাকে বিচারের জন্য আদালতে নিয়েছে। বিচারে তাকে শাস্তি দেওয়া হয় যে, সে সারাজীবন হাসিমুখে নেতার ছবির দিকে তাকিয়ে থাকবে। এধরনের ঘটনা যেন পুনরায় না ঘটে, তার জন্য অগণিত হাসিমুখের মুখোশ তৈরি করে দুগ্ধপোষ্য শিশু থেকে শুরু করে বুড়ো বয়সী জনগণের মাঝে বিতরণ করা হয়। তারপর থেকে সব জায়গাতেই হাসিমুখ দেখা যায় এবং দুঃখবোধ বিস্তৃতির আড়ালে চলে যায়...

এবং তারপর হুড়োহুড়ি করে পর্যটন ব্যবসার ব্যাপক প্রসার ঘটে।

বিক্রীত জাতি

আদান-প্রদানের পরে ব্যবসায়ী সমস্ত অর্থকড়ি নিজের পকেটের ভেতর পুরে রাখে। একটা নোট প্রচন্ড বিরক্তির সঙ্গে তার সহকর্মীকে বলল, ‘অতি সহজে এক হাত থেকে অন্য হাতে যাওয়ার জন্য আমি ভীষণ ক্লান্ত। অবশ্যই আমাদের স্থিতিশীলতা প্রয়োজন।’

সহকর্মী মুখ গম্ভীর করে বলল, ‘হস্তান্তর হওয়ার জন্যই আমাদের তৈরি করা হয়েছে।’

বলেই একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়ে। একটু থেমে সে পুনরায় বলতে শুরু করে, ‘আমরা বিক্রি হওয়া অনেক জাতির মতোই। আমাদের গায়ে অগণিত মানুষের আঙুলের ছাপ এবং অসংখ্য পকেটের মধ্যে আমরা জীর্ণ-শীর্ণ হয়ে থাকি।’

এক মিনিট পরে আরো একবার আদান-প্রদানের পরে ব্যবসায়ী পকেট থেকে তড়িৎ গতিতে একটা নোট বের করে। অন্যজনের শীতল ওয়ালেটে থিতু হওয়ার আগে নোটটি তার সহকর্মীদের বিদায় বলারও সুযোগ পায়নি।

শক্তি

নদীর ধারে আমি শুয়ে মৃদুমন্দ বাতাস উপভোগ করছিলাম। আমার থেকে কয়েক মিটার দূরে একটি পালক প্রচন্ড গতিতে ওড়াউড়ি করছিল এবং ঘূর্ণিঝড়কে অভিশাপ দিচ্ছিল।

অপমান

একজন নীতিবান লোককে জোর করে অপমান গেলানো হয়েছে। সে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মারা যায়। চাটুকার সমস্ত শক্তি দিয়ে অপমানকে তাড়া করে। তার ভয় যে, সে হয়তো ক্ষুধায় মারা যাবে।

পিঁপড়া

দুর্ঘনাক্রমে আমি যখন অসংখ্য পিঁপড়াকে পদদলিত করি, তখন উপলব্ধি করতে পারি যে অন্যায় না করলেও দুর্বলতা একধরনের শাস্তি।

যে জন সুখী

আমি শহরের সবচেয়ে উঁচু পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়েছি এবং লোকজনের উদ্দেশ্যে চিৎকার করি, ‘যারা সুখে আছেন, তারা আমাকে অনুসরণ করুন।’

মাত্র ছোট্ট একটা দল আমার আহ্বানে সাড়া দেয়। তাদের সংখ্যা কোনো মতেই এক হাতের আঙুলের সংখ্যার চেয়ে বেশি হবে না। বাকিরা আমার দিকে সন্দেহের চোখে তাকায় এবং একসময় তারা আমার দিকে পিঠ দিয়ে দাঁড়ায়।

আমি আগের থেকে আরো জোরে চিৎকার করে তাদেরকে বারবার আহ্বান করি। তারপরও জনতার ভিড় যেন জীবনবিহীন এবং প্রতিক্রিয়াহীন। আমি আর্তচিৎকার করে তৃতীয় বারের মতো আহ্বান জানাই। তারা ঘৃণার দৃষ্টিতে আমাকে দেখে। কয়েকজন আমার দিকে টমেটো এবং পচা ডিম নিক্ষেপ করে। এবার আমি আহ্বানের ভাষা পরিবর্তন করি। পুনরায় তারস্বরে ডাকি, ‘যারা দুঃখে আছেন, তারা আমাকে অনুসরণ করুন।’

অকস্মাৎ লোকজনের দুঃখ ও ক্ষোভের মুখভঙ্গি বদলে গিয়ে খুশির আমেজে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। তারা শিশুদের মতো উৎসাহ নিয়ে আমার দিকে দৌড়ে আসে এবং আনন্দের সঙ্গে আমার প্রশ্নের জবাব দেয়।

কিন্তু প্রথম আহ্বানে যে মুষ্টিমেয় কয়েকজন সাড়া দিয়েছিল, নিজেদের ভুলের জন্য তারা অগণিত মানুষের ভিড়ে পদদলিত হয় এবং পরিশেষে তাদেরকে সুখের খেসারত দিতে হয়েছে।

শক্তিমান এবং দুর্বল

শক্তিমান এবং দুর্বল একটি শান্তি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে। দুর্বল তার চুক্তির কাগজটি সোনার ফ্রেমে বাঁধাই করে রাখে। অন্যদিকে শক্তিমান চুক্তির কাগজটি তার বাচ্চার ময়লা পাছা মোছার জন্য ব্যবহার করে।

অবাধ নির্বাচন

অন্য করোর কোনো প্ররোচনা ছাড়া ক্রীতদাসেরা যখন নিজেদের ইচ্ছায় পুনরায় আইন প্রয়োগকারীকে নির্বাচন করে, আমি বুঝতে পারি যে, তখনো গণতন্ত্র এবং মানব মর্যাদা সম্পর্কে আলাপ-আলোচনা করার সময় হয়নি।

আমরা আত্মসমর্পণ করবো না

নদীর স্রোত স্যামন মাছকে, যে কিনা তার বিপরীতে যাওয়া থামায়নি, বলল, ‘তোমার একগুঁয়েমি তোমাকে সাহায্য করবে না।’

কিন্তু স্যামন মাছ দৃঢ়তার সঙ্গে পাল্টা জবাব দেয়, ‘আমরা আত্মসমর্পণ করবো না।’

ছোরা

সে রূপার চামচ মুখে নিয়ে জন্মগ্রহণ করেছে এবং সে-ই ছিল ছোরার প্রথম শিকার।

অবগুণ্ঠন

আমি একটা ফিনফিনে এবং অত্যন্ত রঙচঙা কল্পনার অবগুণ্ঠনে ঢেকে দিই বাস্তবতার দূর্গম ভূখন্ড। বাইরে থেকে দেখতে খুবই সুন্দর দেখায়, কিন্তু অবগুণ্ঠনের আড়ালে বাস্তব ভূখন্ড আগে যা ছিল, এখন তাই আছে।

আগুন ছাড়া চোখের পানি

সদ্য মারা যাওয়া বিধবার কান্না দেখে মোমবাতি যারপরনাই স্তম্ভিত।

‘কেমন করে সম্ভব?’ মোমবাতি নিজেকে প্রশ্ন করে, ‘মহিলার চোখের পানি গড়িয়ে পড়ছে, অথচ তার মাথার মধ্যে কোনো আগুন নেই।’

জোড়া বিপ্লব

জনগণের বিপ্লব সুনামীর তান্ডবে ক্ষতিগ্রস্ত উপকূলীয় শহরের দিকে তাকায়। দুর্দশা কবলিত অগণিত মানুষ, লাশ, আহত এবং গৃহহীনদের দিকে তাকিয়ে সে মনের মধ্যে গভীর বেদনা অনুভব করে। তাই সে প্রকৃতিকে বলল, ‘নিপীড়ন এবং দুঃশাসনের বিরুদ্ধে আমি বিপ্লব। তোমার ঘটনা কী? তুমি নিজেকে কীভাবে মূল্যায়ন করো? তোমার বিধ্বংসী কর্মকা-কে তুমি কেমন করে প্রতিষ্ঠিত করবে?’

প্রকৃতি হাসে। বলল, ‘আমি বিপ্লব। আমার প্রতি মানুষের নিপীড়ন ও দুঃশাসন, তাদের লোভ-লালসা, একঘেয়েমি স্বভাব এবং স্বার্থপরতার বিরুদ্ধে আমিও বিপ্লব। আমার বিপরীতে দাঁড়ানোর মতো সাহস তাদের নেই, এমনকি আমার মনোভাবের প্রতিবাদ করারও শক্তি নেই। তবে তোমার কী হবে, তা ভিন্ন কথা। কারণ আমার প্রতি মানুষের দুর্ব্যবহার আসলে তাদের নিজেদের প্রতি দুর্ব্যবহারের শামিল। জীবন কখনই পরাজিত হয় না।’

বলেই প্রকৃতি এক পলকের জন্য থামে। তারপর পুনরায় সে বলতে শুরু করে, ‘আমার মর্যাদা এবং চুরি করে নেওয়া অধিকারকে সর্বদা পুনরুদ্ধার করার জন্য আমি অত্যন্ত আনন্দিত।’

তিক্ত এবং পরশ্রীকাতর জনগণের বিপ্লব কিছুই বলল না।

মূল্যহীন শূন্য

বামপাশে দাঁড়ানো শূন্য সংখ্যার দিকে তাকিয়ে সাত সংখ্যা বলল, ‘তুই কিছুই না। তোর কোনো মূল্য নেই। তুই ভিক্ষুকের মতো এবং মানব জাতির বিষফোঁড়া। তোর কাছ থেকে ভালো এবং লাভজনক কিছুই আশা করা যায় না।’

শূন্য সংখ্যা কোনো কথা না বলে সাত সংখ্যার ডান পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। অপ্রত্যাশিত ঘটনায় সাত সংখ্যা দারুণ ভাবে আশ্চার্যান্বিত হয় এবং ভীষণ শ্রদ্ধার সঙ্গে শূন্য সংখ্যার দিকে তাকায়।

‘আপনি কি চিরদিনের জন্য আমার অতিথি হয়ে থাকবেন?’ সাত সংখ্যা তোষামোদি গলায় শূন্য সংখ্যাকে জিজ্ঞাসা করে, ‘যদি যুক্ত করার জন্য আপনি আপনার সঙ্গে শূন্য থেকে সম্ভাব্য সর্বাধিক সংখ্যাকে আমন্ত্রণ জানান, তাহলে কী হতে পারে?’

আবর্জনার অহংকার

ময়লা ফেলার জন্য গৃহকর্তা যখন আবর্জনার থলি হাতে নেয় এবং রাস্তার দিকে রওনা হয়, তখন আবর্জনার থলি তার সহকর্মীদের পাশে স্তুপ করে রাখার ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে যায়। কিন্তু গৃহকর্তা তাকে ময়লা ফেলার জায়গায় সবার উপরে রাখে। নিজের বড়ত্বের জন্য আবর্জনার থলি মনের মধ্যে আত্ম-অহমিকা অনুভব করে এবং অবজ্ঞার দৃষ্টিতে নিচের আর্জনার দিকে তাকায়।

পারমাণবিক বোমা

অধমের অন্তর জগতের গভীরে পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণ ঘটে এবং সে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। তখন বিশাল জায়গা বিলুপ্ত হয়ে যায় এবং সাগর ও নদীর পানি বিষাক্ত হয়। তার ভেতরে আনন্দ-ফুর্তিতে থাকা লক্ষ-কোটি জীবাণুর মৃত্যু ঘটে। এছাড়া অগণিত জীবাণু বিকলাঙ্গ হয় এবং জীবাণুদের জীবনে দুর্ভোগ নেমে আসে। দীর্ঘ সময় ধরে নিষ্ক্রিয় আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাত ঘটে। ভূমিকম্প সবকিছু তছনছ করে দেয়, যা তৈরি করতে অনেক বছর সময় লেগেছিল। ভূমিধ্বসে উঁচু পাহাড় ভেঙে পড়ে।

কিন্তু এই ধ্বংসযজ্ঞের পরেও অধমের আত্মার শেষপ্রান্তে একটুকরো জমিতে সবুজ ঘাস অক্ষত থাকে। ক্রমশ সেই ঘাস বড় হয়ে চতুর্দিকে বিস্তার লাভ করে। তার অন্তরের গভীরে সুন্দর জগত তৈরি হয়। আগের তুলনায় আরো বেশি জীবাণুর জন্ম হয়। অধম ধীরে ধীরে সুস্থতা লাভ করে এবং আগের স্বাস্থ্য ফিরে পায়। পুনরায় সমাজে সে একজন কর্মঠ সদস্য হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে।

লেখক পরিচিতি: সিরীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন লেখক ওসামা অ্যালোমার একাধারে একজন ছোটগল্প লেখক, কবি এবং প্রাবন্ধিক। তবে অণুগল্প লেখায় তিনি ইতোমধ্যে পারঙ্গমতা অর্জন করেন এবং অণুঅল্প লেখক হিসাবে সুখ্যাতি লাভ করেছেন। তিনি মনে করেন, অণুগল্প হলো একধরনের গুলি, যা অত্যন্ত তীব্র গতিসম্পন্ন। ফ্রাঞ্জ কাফকা, আর্নেস্ট হেমিংওয়ে এবং আর্থার রেবোঁর অল্প কথার গল্প তাকে অণুগল্প লেখায় প্রভাবিত করেছে। তাঁর অণুঅল্প সম্পর্কে বিশ্বনন্দিত অণুগল্প লেখিকা লিডিয়া ডেভিস মন্তব্য করে বলেছেন, ‘তিনি (অ্যালোমার) জাদুকরী কল্পনাশক্তির দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে গভীর, নৈতিক এবং অকথিত রাষ্ট্রদ্রোহিতার বিষয়গুলো অল্প কথায় তুলে ধরেন।’

ওসামা অ্যালোমার জন্ম সিরিয়ার রাজধানী দামাস্কাসে, ১৯৬৮ সালে। ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় এবং লেখক হবার প্রতিশ্রুতি নিয়ে শরণার্থী হিসাবে ২০০৮ সালে তিনি সপরিবারে আমেরিকায় যান। জীবিকার তাগিদে তিনি প্রথম আট বছর ট্যাক্সি চালক ছিলেন। কিন্তু সেই সময় কাজের মাঝে ফুরসৎ পেলেই কাগজ ও কলম নিয়ে লিখতে বসতেন। অবশেষে ২০১৭ সালে তিনি ‘রাইটার-ইন-রেসিডেন্সি’ লাভ করেন। তাঁর প্রথম ছোটগল্প সংকলন ‘ও ম্যান’ প্রকাশিত হয় ১৯৯৯ সালে এবং প্রথম কাব্য গ্রন্থ ‘ম্যান সেইড দ্য মডার্ন ওয়ার্ল্ড’ প্রকাশিত হয় ২০০০ সালে। আরবী ভাষায় প্রকাশিত তাঁর অন্যান্য ছোটগল্প সংকলনের মধ্যে রয়েছে ‘টাঙ টাই’ (২০০৩) এবং ‘অল রাইটস্ নট রিজার্ভড্’ (২০০৮)। এছাড়া তাঁর ঝুড়িতে রয়েছে ইংরেজিতে অনূদিত ছোটগল্প সংকলন ‘ফুলব্লাড অ্যারাবিয়ান’ (২০১৪) এবং ‘দ্য টথ অব দ্য কম্ব অ্যান্ড আদার স্টোরিজ’ (২০১৭)। তিনি ২০০৭ সালে মিশরের ‘নাজলা মুহাররম শর্ট স্টোরি’ প্রতিযোগিতায় শিরোপা লাভ করেন। আরবি ভাষায় লেখা তাঁর সাহিত্য আরব বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রকাশিত হয় এবং বিবিসি অ্যারাবিক সার্ভিসে প্রচারিত হয়। ইংরেজিতে অনূদিত তাঁর লেখা অণুগল্প ‘দ্য নিউ ইয়র্কার’, ‘ওয়ার্ডস্ উইদাউট বর্ডার্স’, ‘প্যারিস রিভিউ’ এবং অনলাইন ম্যাগাজিনে, যেমন ‘নুন’, ‘কঞ্জাংশন’, ‘দ্য কফিন ফ্যাক্টরি’, ‘দ্য আউটলেট’ (‘ইলেকট্রিক লিটারেচার’-এর ব্লগ) এবং ‘লিটারেরি রিভিউ’, প্রকাশিত হয়। বর্তমানে তিনি শিকাগোতে বাস করেন।

গল্পসূত্র : সবগুলো অণুগল্পই লেখকের ‘ফুলব্লাড অ্যারাবিয়ান’ এবং ‘দ্য টীথ অব দ্য কম্ব অ্যান্ড আদার স্টোরিজ’ ছোটগল্প সংকলনে প্রকাশিত এবং সেখান থেকে নেওয়া হয়েছে। উল্লেখ্য, গ্রন্থ দুটি আরবি থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ করেন সি জে কলিন্স।

  • নজরুলের ‘বিদ্রোহী’

    মঈনউদ্দিন মুনশী

    newsimage

    ‘বিদ্রোহী’ নজরুল ইসলামের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবিতা। ‘বিদ্রোহী’ যখন প্রথম প্রকাশিত হয়, তখন

  • বিশ্বসাহিত্যের সাম্প্রতিক প্রবণতা

    ইকোক্রিটিসিজম ও ইকোফিকশন

    মাহফুজ আল-হোসেন

    newsimage

    ইকোলজি বিষয়টি মানুষের পরিবেশ সচেতনতার মধ্য দিয়ে একটি শাস্ত্রে রূপান্তরিত হয়েছে ঊনবিংশ

  • হেনরি জেমস

    দুঃসাধ্যের স্থপতি

    কামরুল ইসলাম

    newsimage

    আমেরিকায় জন্মগ্রহণকারী ব্রিটিশ ঔপন্যাসিক হেনরি জেমস (১৮৪৩-১৯১৬) তাঁর বেশ কিছু লেখার মধ্য

  • স্লোভেনিয়ান কবি গ্লোরিয়ানা ভিবারের সাক্ষাৎকার

    ‘বাংলাদেশ আমাকে গোলাপের কথা মনে করিয়ে দেয়’

    newsimage

    সম্প্রতি একুশে বইমেলায় মার্কিন প্রবাসী বাংলাদেশী কবি ও অনুবাদক রাজিয়া সুলতানার সঙ্গে

  • আমার আছে বই ৮

    মালেকা পারভীন

    newsimage

    গতবার ইরানি কুর্দিশ লেখক বেহরুজ বুচানি সম্পর্কে লিখেছিলাম। অনেকেই বুচানি বা তাঁর

  • অসম্পূর্ণ গল্প (পর্ব ৪)

    মুজতাবা শফিক

    newsimage

    (পূর্ব প্রকাশের পর) সপ্তম অধ্যয় মুমিনের ক্লাস ফাইভের বৃত্তি পরীক্ষার সময়, আব্দুল হক সাহেব

  • নির্মম যম

    অনুবাদ : শামসুজ্জামান হীরা

    newsimage

    আমি এক দন্ডপ্রাপ্ত ভবঘুরে আত্মা। এক অস্থির আত্মা। এখানে সেখানে অনবরত ঘুরে

  • কামরুল হাসানের কবিতা

    newsimage

    উনিশ বছর একটি পাখির আর কতটুকু বয়স? উনিশ বছর অনাঘ্রাত রোম নিয়ে বসন্তের বাগানে

  • পথচারী

    রে ব্র্যাডবেরি

    newsimage

    নভেম্বরের রাত আটটায় কুয়াশা ঢাকা শহরের নীরবতায় ডুব দেওয়া, কংক্রিটে মোড়া ফুটপাথে

  • চয়ন শায়েরীর কবিতা

    newsimage

    স্কিজোফ্রেনিয়া : দুই একটা হাত হ্যাঁচকা টানে মগজ বের করে আনে গাছ গজিয়ে ওঠে

  • এ সংখ্যার কবিতা

    হৃদযন্ত্র নভেরা হোসেন তোমার ঘরের পাশেই আরেকটি ঘর তার পাশে আরেকটি তার