menu

ওই মহাসিন্ধুর ওপার থেকে

হাসান অরিন্দম

  • ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ০৪ জুলাই ২০১৯
image

একটি চিহ্নিত ভূখন্ডে মানবসন্তানের জন্ম হয়, আর আমরা পাই এক-একটি মাতৃভাষাও। সেই রাষ্ট্র ও ভাষা জন্মের বাঁধনে আমাদের বিশেষ আপন, তা তুলনীয় নয় অন্য দেশ বা ভাষার সাথে। তবে এর অর্থ এই নয় যে, অপরাপর ভাষা ও জাতির প্রতি আমরা দৃষ্টিপাত করি না, অন্য জাতির শিল্প-সংস্কৃতিকে জানতে ও ভালবাসতে কোথাও বাধা আছে। বস্তুত এই পৃথিবী নামক গ্রহটিই তো আমার জন্মস্থান- এর উত্তর-দক্ষিণ, পূর্ব-পশ্চিম মেরুর ভেতরকার সবকিছুই আমার নিজের, কেউ আমাদের পর নয়- এই বোধ ও জাগরণ বহু সুবুদ্ধি-সহৃদয় মানুষেরই হয়, বিশেষ করে যারা শিল্পসাহিত্যের স্রষ্টা বা অনুরাগী- এরূপ চেতন তাদেরকে উজ্জীবিত না করাই অস্বাভাবিক। তাই বহু লোকে নিজের দেশের বা ভাষার বাইরেও বিচিত্র গ্রন্থের দিকে হাত বাড়ান বিশ্বনাগরিকোচিত ভালোবাসা, আকন্ঠ তৃষ্ণা আর দুর্দমনীয় কৌতূহল নিয়ে। লেখকেরাও জ্ঞাত ও নিকটপ্রাপ্য সাহিত্যের বাইরে নতুন কিছুর সন্ধানে ভিনদেশি সাহিত্যের জানালায় উঁকি দিয়ে থাকেন। এই কৌতূহল ও অনুসন্ধান তাকে দেয় বিচিত্রতার আস্বাদ, ঋদ্ধ হয় মন-মনন ও সৃজন। পৃথিবীর খুব কম মানুষই মাইকেল মধুসূদনের মতো বহুভাষাভিজ্ঞ। তাই বিদেশি সাহিত্যের রসাস্বাদন করতে আমরা মুখ্যত বাংলা ভাষায় অনূদিত কিংবা ইংরেজি গ্রন্থের দ্বারস্থ হই।

পাঠক হিসেবে বিভিন্ন সময় নানা কারণ কিংবা সূত্রে যে-সব বিদেশি সাহিত্য পাঠ সম্ভব হয়েছে, তার সবগুলো মনে স্থায়ী ছাপ রেখেছে, এমন নয়। পড়বার পর আমাকে কোনো না-কোনোভাবে আন্দোলিত-উদ্বেলিত করে এমন কিছু রচনা বিষয়েই কেবল পাঠক-বন্ধুদের সাথে অভিমত বেটে নিতে চাই। গ্রিক নাট্যকার সফোক্লিসের প্রসঙ্গ পেড়ে কথার উপক্রম হতে পারে। কালজয়ী এই কবির ইডিপাস প্রথমবার পড়তে গেলে ভীষণ এক ব্যথায় ও বিস্ময়ে কাতর ও আপ্লুত হতে হয়। গ্রিক লোককাহিনিকে আশ্চর্য কুশলতায় নাট্যরূপ দিয়েছেন সফোক্লিস। বস্তুত, আমার দৃষ্টিতে এটি বিশ্বসাহিত্যের সবচেয়ে মর্মভেদী ট্রাজেডি। নিয়তি-তাড়িত হয়ে সম্পূর্ণ নিজের অজ্ঞাতে ইডিপাস তাদের পিতার হত্যাকারী ও মায়ের স্বামীতে পরিণত হয়। জোকাস্টা যখন বুঝতে পারে ইডিপাস যে অনুসন্ধানে নেমেছ তার ফল কী ভয়াবহ হতে যাচ্ছে- সে সর্বশক্তি দিয়ে তাকে নিবৃত্ত করতে চেয়েছিল। সকলের কাছে সত্য উদঘাটিত হওয়ার প্রাক্কালে জোকাস্টা আত্মহত্যা করে মর্মযন্ত্রণা থেকে মুক্তি পায়। কিন্তু ইডিপাস সে পথে যায়নি। নিজের শাস্তি নিজেই নির্ধারণ করে, জোকাস্টার বসন থেকে কাঁটা খুলে নিয়ে তা দিয়ে নিজের দুচোখ অন্ধ করে ফেলে, আর নিজের প্রতি আরোপ করে নির্বাসন দন্ড। বিশ্ববিধানকে নিয়তির খেলায় সম্পূর্ণ নিজের অজ্ঞাতে ভঙ্গ করেছিল ইডিপাস। আমার মনে হয়েছে শেষ পর্যন্ত নিজের দুচোখ রক্তাক্ত ও অন্ধ করে ফেলা, নিয়তির নিষ্ঠুর খেলার বিরুদ্ধে ইডিপাসের নীরব অথচ বিক্ষুব্ধ প্রতিবাদ। এই নাটকটি বিশ্বসাহিত্যতত্ত্বের ওপর বিপুল প্রভাব বিস্তার করে। এরিস্টটল তাঁর পোয়েটিকস গ্রন্থে ট্রাজেডি সম্পর্কে আলোকপাত প্রসঙ্গে ইডিপাসকেই সামনে রেখেছিলেন। সিগমুন্ড ফ্রয়েড যে ইডিপাস কমপ্লেক্সের কথা বলেন তার উৎস সফোক্লিসের ওই নাটকই। সফোক্লিস ও তাঁর সমসাময়িক কবি-নাট্যকার-চিন্তাবিদদের রচনা সম্পর্কে অবহিত হলে সহজেই অনুধাবন করা যায় বিশ্বের অধিকাংশ মানুষ যখন প্রায় আদিম অন্ধকারাচ্ছন্ন জীবন যাপন করছে ঠিক সেই সময় গ্রিক সাহিত্য-শিল্প ও চিন্তাচর্চা কতখানি উচ্চতা লাভ করেছিল।

বাঙালির অত্যন্ত প্রিয় পারস্যের কবি ওমর খৈয়াম। তাঁর রুবাইয়াত এদেশে বহুল পঠিত কাব্য। এ যাবত অনেকেই এ-সাহিত্য অনুবাদ করেছেন। তবে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে নজরুলের অনুবাদ, হাতের কাছে থাকায় সেই বইটিই বারবার পড়া হয়। বেশ কম বয়সেই আমি রুবাইয়াত পড়বার সুযোগ পেয়েছিলাম। এ বইয়ের বিচিত্র জীবনদর্শন, সাহসী জিজ্ঞাসা, আধ্যাত্মিকতা ও সংশয় আমাকে দারুণভাবে আপ্লুত করেছিল। তখন ওমর খৈয়ামের অনুকরণে লিখেও ফেলি বেশকিছু চরণ :

আর কতকাল থাকবি রে তুই কীটের মত অন্ধকারে

দ্যাখ তাকিয়ে লক্ষ আলো হাতছানি দেয় বারে বারে,

রূপের কথাই আসল ভেবে বৃথাই তারে মরিস খুঁজে

সাত আসমানে নেই তো সে যে, আছে তোরই অন্তরে।

আরেকটি :

যে তুমি আমাকে বেসেছ ভাল থাক কেন আড়ালে

জাত-কুল-মান ছুঁড়ে ফেলে এসো পা যদি সত্যি বাড়ালে,

সখী মনে ভাব রাই বিনোদিনী তুমি, আমি সেই কালা

কী লাভ দুজনে অনল পুষে বুকে অগ্নিদহন বাড়ালে।

একদিকে জারতন্ত্র কর্তৃক শাসনের নামে ভয়াবহ নিষ্পেষণ অপরদিকে যাজকদের কঠোর নিয়ন্ত্রণ সাধারণ মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে ফেলেছিল। এই পরিবেশের ভেতর মানুষের মানবিক বৈশিষ্ট্য কীভাবে হারিয়ে যায় তার বাস্তব উদাহরণ ক্রাইম এন্ড পানিশমেন্ট উপন্যাসের রাসকলনিকভ। এই উপন্যাসের নায়কের ধারণা জন্মেছিল সে প্রচলিত বিধানকে অস্বীকার করে নতুন বিশ্ববিধান প্রতিষ্ঠা করতে পারে কেবল অসাধারণ কিছু মানুষ। অভাবে জর্জরিত রাসকলনিকভ বৃদ্ধা লিজাভেটার কাছে আংটি আর ঘড়ি বন্দক রেখে টাকা ধার চাইতে গিয়ে বুঝতে পারে সে কতটা নিকৃষ্ট শ্রেণির মানুষ। তিন হাজার রুবল পাওয়ার আশায় সে বৃদ্ধাকে ঠান্ডা মাথায় হত্যা করে। কিন্তু তার অপরাধ প্রকাশ পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা দেখা যায় না। বিবেকের দ্বারা দংশিত হয়ে সে অপরাধ স্বীকার করে নেয়। আদালতে কোনোকিছুই গোপন করে না রাসকলনিকভ, আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনো চেষ্টা থাকে না। তার আট বছরের নির্বাসন দন্ড হয় সাইবেরিয়ায়। উপন্যাসের পরিণামে রাসকলনিকভের বোধোদয় হয়। এক বছর মওকুফ পেয়ে সাত বছরের কারাভোগ শেষে নতুন এক জীবনের স্বপ্ন বাসা বাঁধে তার ভেতর। নতুন এক জগতে নিজেকে অন্যভাবে দেখতে চায় সে। বাইবেল তাকে আকৃষ্ট করে, সে উপলব্ধি করে নতুন জীবন লাভের জন্য তাকে কঠোর পরিশ্রম করতে হবে, দুঃখভোগ করতে হবে।

স্প্যানিশ কবি ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকার কবিতাগুলো বেশ দাগ কেটেছিল আমার মনে। তাঁর কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য বোধ হয় অত্যন্ত সরলভাবে জীবনের গভীর বোধের কথা বলা। সরল-সৌন্দর্যের মোড়কে মৃত্যু ও শিল্পের কথা বলেছেন তিনি। চিন্তার বিশ্বজনীনতার কারণেই বোধহয় স্বল্পায়ু জীবনে খুব অল্প কবিতা লিখেও তিনি কালজয়ী হয়েছেন। মৃত্যুচেতনাকে সার্বক্ষণিক সঙ্গী করেই অঙ্কুরিত হয়েছিল লোরকার কবিসত্তা। লোরকা তাঁর অনেক ভাবনাই স্পষ্ট করে বলেন না, কোথাও আভাসমাত্র দিয়ে চলে যান অন্যকথায়। বস্তুত স্পষ্টতা অনেক সময় উৎকৃষ্ট শিল্পসৃষ্টির অন্তরায়। বরং খানিকটা অস্পষ্টতা যদি কিঞ্চিত দুর্বোধ্য বা রহস্যময় করে তোলে বিষয়কে তবে তাতেই আধুনিক পাঠক অধিক আকৃষ্ট হয়। জীবন-মৃত্যু, মহাকাল সম্পর্কে আকারে-ইঙ্গিতে কিছু চিত্র তুলে ধরতেই তিনি অধিক আগ্রহী।

কাহ্লিল জিবরানের দি প্রফেট বইটি হাতে পেয়ে এক বসায় শেষ না করে উঠতে পারিনি। বইটির সমগ্র অংশেই রয়েছে এক কল্পিত মহামানব বা প্রফেটের বাণী। বিধাতার প্রেরিত পুরুষ ভালোবাসা, বিবাহ, শিশু, আনন্দ ও দুঃখ, অপরাধ ও শাস্তি, আইন, মুক্তি, বেদনা, আত্মজ্ঞান, প্রার্থনা, সৌন্দর্য, ধর্ম, মৃত্যু বিষয়ে তাঁর বক্তব্য পেশ করেন। এই বক্তব্যে জগৎ-জীবনের বিভিন্ন জিজ্ঞাসার মৌলিক কিছু জবাব মেলে। বস্তুত গ্রন্থটি কাব্যের আঙ্গিকে রচিত এক দর্শনগ্রন্থ। কবি অজস্র অত্যুজ্জ্বল উপমা-রূপক প্রভৃতি অলঙ্কারের আশ্রয়ে তাঁর বক্তব্যকে পাঠকের জন্য হৃদয়সংবেদী করে তোলেন। এটি যেন প্রচলিত ধর্মগ্রন্থের বাইরে অধ্যাত্মবোধ ধর্মচেতনাজাত ছায়াগ্রন্থ, যেখানে মহামানবের বাণী স্মরণ করিয়ে দেয় বিশ্ববিশ্রুত প্রেরিত পুরুষদের। এ বইয়ের বক্তব্য কবির অকৃত্রিম ও গভীর চেতনাজাত বলেই তা মানুষের অন্তরে এতোখানি সংবেদন সৃষ্টি করতে পারে। তাঁর রচনায় অতিজাগতিক, ইন্দ্রিয়াতিরিক্ত যে বোধের প্রকাশ তা আমাকে দারুণ বিস্মিত করেছিল। যেমন সৌন্দর্য সম্পর্কে এখানে বলা হয়েছে :

সৌন্দর্য হল মৃদু গুঞ্জন। সে কথা বলে আমাদের আত্মার গভীরে।...

কিন্তু সৌন্দর্য কোনো প্রয়োজন নয়, বরং একটা পরম আনন্দ।

তা তৃষ্ণার্ত কোনো মুখ নয়, তার পানে প্রসারিত কোনো শূন্য হাতও তা নয়,

বরং তা একটা প্রজ্জ্বলিত হৃদয় এবং একটা মন্ত্রমুগ্ধ আত্মা।

উচ্চমাধ্যমিকের ছাত্রাবস্থায় পড়া এডগার এলেন পোর কালো বিড়াল গল্পটি মনের ওপর ভীষণ প্রভাব বিস্তার করেছিল। একটা বিড়ালকে কেন্দ্র করে আধুনিক একটি ছোটগল্প যে এমন হতে পারে সে ধারণা আমার ছিলো না। এ গল্প পড়ে আমি প্রথম অবহিত হই কেবল ইতিবাচক ভাবনা, সুস্থ চিন্তাই সাহিত্যের বিষয় নয়- বিচিত্র নেতিবোধ, বিকৃতি-বিকারও শিল্পসাহিত্যের বিষয়বস্তু হয়ে উঠতে পারে। উত্তম পুরুষে লেখা গল্পটির নায়ক শৈশব থেকে পশুপাখিকে খুব ভালোবাসত। সে ছিলো শান্ত শিষ্ট ও মমতাশীল প্রকৃতির। বয়স বাড়ার সাথে সাথে পশুপাখির প্রতি ভালোবাসা আরও বৃদ্ধি পায়, ওদের সান্নিধ্য সহজেই তার অন্তরকে স্পর্শ করে যায়। যুবক নায়ক মদ্যপানসহ নানা রকম অমিতাচারে অভ্যস্থ হয়ে পড়ে। এরই মধ্যে তার অজ্ঞাতে-অবচেতনে মানসিক বিকার পেয়ে বসে। সে খেয়ালি, বিরক্ত আর সামান্য কারণেই অন্যের প্রতি অসহিষ্ণু হয়ে উঠছিল। একসময় এমনকি তার প্রিয় কালো বিড়ালটিকে পর্যন্ত অসহ্য মনে হতে লাগল। এক পর্যায়ে মদ্যপ অবস্থায় সে বিড়ালটির গলা টিপে ধরে ছুরি দিয়ে একটা চোখ তুলে ফেলে, বিড়ালটি সুস্থ হয়ে উঠলে কিছু দিন পরে ফাঁস লাগিলে হত্যা করে। কাকতালীয়ভাবে সে রাতেই আগুন লেগে বাড়িঘর-সম্পদ সব পুড়ে যায় নায়কের। কিছুদিন পর আগের বেড়ালটির মতো আরেকটি বিড়াল খুঁজে পায় নায়ক। কিন্তু একসময় সেটিও তার বিরক্তির কারণ হয়ে ওঠে। সেটাকে কুঠার দিয়ে মারতে গিয়ে স্ত্রীকে হত্যা করে ফেলে। ভাঁড়ারঘরের নড়বড়ে দেয়ালের কিছু ইট সরিয়ে তার ভেতর লাশটা রেখে আবার একইভাবে মেরামত করে দেয় সে। পুলিশ একাধিক বার চেষ্টা করেও কেসটির কিনারা খুঁজে পায় না। কিন্তু অস্বাভাবিক আচরণ করে শেষে খুনি নিজেই দেয়ালের ওই স্থানটির প্রতি সন্দেহ জাগিয়ে দেয়। পরে সেখানে কালো বিড়ালটিকেও পাওয়া গেলে নায়কের মনে হয় এই বেড়ালটা একটা শয়তান, তার কারসাজিতে সে খুন করতে বাধ্য হয়েছিল, আবার সেই তাকে জল্লাদের হাতে ধরিয়ে দিল। গল্পটিতে রয়েছে বিড়াল সম্পর্কিত প্রচলিত বিশ্বাস, ভৌতিক পরিবেশ আর এক বিপথগামী একটি মানুষের বিকৃত চিত্তের রোমহর্ষক কর্মকান্ড। নায়ক এখানে যে বীভৎস কান্ডগুলো করেছে তা পুরোপুরি পরিকল্পিত নয়, তার মনের গতিপ্রকৃতি খেয়াল করলে বোঝা যায় সে অনেকটা মানসিক বিকারগ্রস্ত যুবক। ফলে পাঠকের ঘৃণা তার প্রতি তীব্র হতে পারে না। প্রকৃতির শৃঙ্খলা বিনষ্ট করায় তাকে শাস্তির পথে যেতে হয়। পুরো ঘটনা আমাদের ভেতর ভয়, করুণা ও শোক সৃষ্টি করে।

আমি এ যাবত যে-সব বিদেশি সাহিত্য পড়বার সুযোগ পেয়েছি সেগুলোর মধ্যে মার্কেজের গল্প আমাকে সবচেয়ে বেশি মোহিত করে। মানব জীবনের রহস্যমন্ডিত নানান দিক তাঁর গল্পে বিচিত্র রঙে ও ভঙ্গিতে ধরা পড়ে। কেবল যাদুবাস্তব কথাটির দ্বারা তাঁর লেখাকে চেনা যায় না। সমগ্র ল্যাটিন আমেরিকার জীবন ও সংস্কৃতি সম্পর্কে মার্কেজের গভীর ধারণা ছিলো। দক্ষিণ আমেরিকার জনগোষ্ঠী তাঁর লেখার মধ্য দিয়ে নিজেদের নতুন করে চিনতে পেরেছে। কলম্বিয়া ছাড়াও প্যারিস, মাদ্রিদ, ভিয়েনা, হাভানা, মেক্সিকো প্রভৃতি শহরের অভিজ্ঞতা মার্কেজের গল্পকে বৈচিত্র্যমন্ডিত করেছে। বাস্তবজীবন প্রতিনিয়ত আমাদের সামনে বিচিত্র দৃশ্যপট সৃষ্টি করে। সে-বাস্তবের একটানা বর্ণনায় শিল্পী, শিল্পবোদ্ধা পাঠক ক্লান্তিবোধ করতেই পারেন। বাস্তবকে হুবহু তুলে ধরার মধ্যে এখন আর শিল্পী-লেখকের নৈপুণ্য বা স্বাতন্ত্র্য প্রকাশ পায় না। তাই চিত্রশিল্পে, ভাস্কর্যে, সাহিত্যে, চলচ্চিত্রে, সংগীতে, নৃত্যকলায় আসে জীবনকে দেখার নতুন নতুন দৃষ্টিভঙ্গি, আসে উপস্থাপন-কৌশলের ভিন্নতা। কথাশিল্পী মার্কেজ বাস্তবকে ভিন্নদৃষ্টিতে দেখেছেন। মানুষের ভাবনা-কল্পনার, চোখে দেখা আপাত অলৌকিততার, পুরাণ-ধর্মবিশ্বাসের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যায় না গিয়ে সরলদৃষ্টিতে দেখে তা গল্প-উপন্যাসে তুলে এনেছেন। একেই যাদুবাস্তবতা বলে চিহ্নিত করা হয়। মার্কেজের মনের উপর শৈশবেই তাঁর নানী ও নানা বিশেষ প্রভাব বিস্তার করেন। বস্তুত তাঁর যাদুবাস্তবতার জগৎ নির্মাণে রয়েছে নানীর প্রত্যক্ষ ভূমিকা। মার্কেজ জানান, ‘নানীর যাদু-বিশ্ব আমাকে দারুণ আকৃষ্ট করতো। আমার সমগ্র ব্রহ্মাণ্ডই ছিল সেই যাদুর জগৎ। কিন্তু রাত নেমে এলে আমার ভয় জাগতো। এমনকি এখনও, পৃথিবীর কোনো এক প্রান্তে, কোনো অজানা-অচেনা হোটেলে একা ঘুমাতে গেলে রাতে ভয় পেয়ে জেগে উঠি, একা অন্ধকার-বাসের মারাত্মক ভয়ে কাঁপতে থাকি। আবার অনেক সময় পার হলে তবেই স্থির হয়ে ঘুমাতে পারি।’ তিনি অল্প বয়সেই আরব্যরজনীর উপাখ্যান পাঠ করেন। শৈশবের পারিবারিক-চতুর্পার্শ্বিক পরিবেশ তাঁর যে কল্পনাপ্রিয় মনটি গড়ে তুলেছিল সেই মনই মার্কেজের যাদুবাস্তব জগতের প্রধান স্থপতি। একদিকে যাদুবাস্তবতা অপরদিকে তিনি প্রবলভাবে বাস্তবনিষ্ঠ। বামপন্থী রাজনীতিতে তাঁর প্রবল আস্থা ছিল। তাঁর প্রসন্ন প্রত্যুষ গল্প আমার ভেতরে এক অপার বিস্ময় জাগিয়ে দিয়েছিল। এ-গল্পে স্বপ্ন-কল্পনা-ইহলোক-পরলোক-জীবন-মৃত্যু একাকার। শহরের বহু বুড়োর মতো তোবিয়াস সাগর থেকে গোলাপের গন্ধ পেতে থাকলো। গন্ধটা আরও পেল জ্যাকবের স্ত্রী। ধারণা করা হলো শহরে এই গন্ধ পাওয়া মানে স্রষ্টার বার্তা- অর্থাৎ গন্ধটা যে পাচ্ছে তার মৃত্যু আসন্ন। পুরো শহরটাই ব্যাপারটাতে উদ্বিগ্ন হয়ে উঠল। জ্যাকবের স্ত্রী আগস্ট মাসে মারা যাওয়ায় তোবিয়াসের ভয় আরও বেড়ে গেল। এর মধ্যে শহরে হার্বার্ট নামক এক অদ্ভুত লোকের আগমন ঘটল। সে নিজেকে বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ও দাতা বলে দাবি করল, সে মানবজাতির যাবতীয় সমস্যার সমাধান করতে চায়। শহরবাসীকে সে সমৃদ্ধ জীবনের স্বপ্ন দেখিয়ে অচেতন হয়ে দিনের পর দিন ঘুমাতে লাগলো। ঘুম ভাঙার পর হার্বার্ট বলল, বহুক্ষণ ঘুমালাম। বৃদ্ধ জ্যাকব বলল, কয়েক শতক। তোবিয়াসকে নিয়ে জ্যাকব পরে খাদ্যের অন্বেষণে সাগরে নেমে পড়ে। জলে নেমে তারা এতই গভীরের অনুসন্ধান পেল যে পরলোকবাসীদের জগতে প্রবেশ করল। সেখানে জ্যাকবের বউকেও দেখা গেল। সাগরের তলায় তারা উদ্যান বাড়িঘর প্রভৃতি দেখল, তা যেন স্বর্গের প্রতিরূপ। সেখানে তারা মৃতব্যক্তিদের দেখতে পায়। তোবিয়াস ভেবেছিল সে পৃথিবীর কাউকে সাগরতলার এই রহস্য-জগতের কথা বলবে না। কিন্তু সে পরে স্ত্রীকে বিষয়টা জানালে স্বামীর ভাবনাকে সে নিছক পাগলামী ছাড়া আর কিছুই ভাবে না। এই গল্পে মার্কেজ হয়তো বলতে চান আমরা চর্মচক্ষুতে দেখে যাকে সত্য বলে জানি তার বাইরেও অন্য এক গভীরতর সত্য লুকিয়ে আছে যা সাধারণের কাছে বোধগম্য নয় বলেই অবিশ্বাস্য।

পর্তুগালের লেখক জোসে সারামাগোর ব্লাইন্ডনেস বিষয়বস্তুর দিক থেকে অদ্ভুত এক উপন্যাস। ঔপন্যাসিকের হঠাৎ একদিন মনে হয়েছিল- পৃথিবীর কোনো মানুষের যদি দৃষ্টিশক্তি না থাকতো তাহলে কেমন হতো সেই জগৎ; এরূপ খেয়ালের বশেই সৃষ্টি হয় ব্লাইন্ডনেস। নামহীন এক শহরে সংক্রামক ব্যাধির মতো অন্ধত্ব ছড়িয়ে পড়তে থাকে। যারা অন্ধ তাদেরকে আলাদা একটি স্থানে বন্দি করে রাখা হয়। বন্দিশালায় অন্ধদের কুৎসিত আদিম জীবন শুরু হয়। কিন্তু সংক্রমণ প্রতিরোধ করা সম্ভব হয় না। সারা শহরে, সমগ্র দেশে ছড়িয়ে পড়ে এই শ্বেতঅন্ধত্ব, কেউ দেখতে পেলেও সেটা গোপন রাখে। তখন অন্ধদের বন্দিশালা মুক্ত হয়ে যায়। প্রচলিত ধারায় চরিত্রগুলোর নামকরণ না করে লেখক ডাক্তার, ডাক্তারগিন্নী, প্রথম অন্ধ লোকটি, ট্যাক্সি ড্রাইভার, কালো চশমার মেয়েটি, প্রমুখের মাধ্যমে চরিত্রগুলোকে চিহ্নিত করেন। এখানে উচ্চস্তরের কল্পপ্রবণ মনের পরিচয় রয়েছে। অন্ধ হবার পর মানুষের হীন ও নগ্ন রূপ লেখক অকপটে তুলে ধরেন রূপকধর্মী এই উপন্যাসে।

অন্য দেশের, অন্য ভাষার সাহিত্য আমার ভেতরে নতুন নতুন বোধের জন্ম দেয়। সাহিত্যের মধ্য দিয়ে মানবের চিন্তা ও জীবনযাপনের বৈচিত্র্য আমাকে বিস্মিত করে। বইয়ের পাতায় ভর রেখে আকাশে ডানা মেলি কখনো- বাংলার মাটিতে বসে ভালোবেসে ফেলি মিশর, পর্তুগাল, আয়ারল্যান্ড, কলম্বিয়া কিংবা রাশিয়ার মানুষ ও প্রকৃতিকে। সাথে সাথে এ অতৃপ্তিও মনের ভেতর উথলে ওঠে, এক জীবনে এইসব সৃষ্টি সম্ভারের কতটুকুই বা আমরা জানতে পারি। তবু সিন্ধুর ওপারের মানুষের গান শুনবার জন্য আমি প্রতিনিয়ত কান পেতে থাকি- মহাসিন্ধুর ওপারে কত নিযুত সুর, মানবপাখির বিচিত্র কলতান!

  • বিশ্বসাহিত্য সংখ্যা চার

    ক্যারল অ্যান ডাফি এই সময়ের কবি

    উদয় শংকর দুর্জয়

    newsimage

    আবেগপ্রবণতা অথবা কাঠিন্য, কৌতুকরসবোধ অথবা গীতিবিন্যাস, রীতিবিরুদ্ধ মনোভাব অথবা প্রচলিত ধারা, যাদুবাস্তবতা

  • ক্যারল অ্যান ডাফির কবিতা

    ভাষান্তর : উদয় শংকর দুর্জয়

    newsimage

    তাঁর মুক্তাগুলোকে উদ্দীপ্ত করা আমার নিজের ত্বকের পাশে, তাঁর মুক্তা খচিত গহনা। আমার

  • ডব্লিউ এস গ্রাহাম-এর অপ্রকাশিত কবিতা

    ভূমিকা ও অনুবাদ : মিলটন রহমান

    newsimage

    সম্প্রতি স্কটিশ কবি ডব্লিউ এস গ্রাহাম-এর কিছু অপ্রকাশিত কবিতা প্রাপ্তির কথা জানিয়েছে

  • একজন মানুষ

    মূল : ভায়াকম মোহাম্মদ বশীর
    ভাষান্তর : নীতিন রায়

    newsimage

    আপনার নির্দিষ্ট কোন পরিকল্পনা নেই। আপনি বাড়ি থেকে বেরিয়ে বহুদূরে ঘুরে বেড়াচ্ছেন।

  • আষাঢ়ে, বরিষণে

    newsimage

    তোমার কথা ভাবছিলাম বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর তোমার কথা ভাবছিলাম তুমি এলে না, বৃষ্টি এলো সেই

  • নিরাপত্তা

    জান্নাতুল ফেরদৌস

    newsimage

    বেলা এগারোটার দিকে আমি পৌঁছালাম সেই গ্রামটাতে। এখন আমি ভিকটিমের বাড়ির ছোট

  • কানিজ পারিজাতের শিহরন জাগানো গল্পগ্রন্থ ‘জলশিহরন’

    অঞ্জনা সাহা

    newsimage

    কানিজ পারিজাত একজন গল্পকার। কিন্তু তাকে আমি কবি বলেই জানতাম! প্রথম যেদিন

  • ভারতের বুকে বসন্তের বজ্রনির্ঘোষ

    মাটি চাপা হুঙ্কারের ইতিহাস ও নকশালবাড়ি

    গৌতম গুহ রায়

    newsimage

    (পূর্ব প্রকাশের পর) তেভাগা’র আন্দোলনে জলপাইগুড়ির ডুয়ার্সের ইতিহাস এক ব্যতক্রমী ঘটনা। এখানে কৃষকের