menu

একজন মানুষ

মূল : ভায়াকম মোহাম্মদ বশীর
ভাষান্তর : নীতিন রায়

  • ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ০৪ জুলাই ২০১৯
image

শিল্পী : সঞ্জয় দে রিপন

আপনার নির্দিষ্ট কোন পরিকল্পনা নেই। আপনি বাড়ি থেকে বেরিয়ে বহুদূরে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। আপনার কাছে কোন পয়সাকড়ি নেই। আপনি সেখানকার স্হানীয় ভাষা জানেন না, শুধু ইংরেজি কিংবা হিন্দি বলতে পারেন। কিন্তু খুব কম লোকই এর যে কোন একটি ভাষা জানে বা বোঝে। আপনি বিপজ্জনক অবস্থায় পড়তে পারেন, এমন দুঃসাহসিক অভিযাত্রা অনেক বিপদ ডেকে আনতে পারে। আপনি নিজে এক ভয়াবহ অবস্থার সম্মুখীন হলেন। জনৈক অপরিচিত, অচেনা, অজানা ব্যক্তি আপনাকে বিপদ থেকে উদ্ধার করলো। এমনকি বহু বছর পরেও সেই মানুষটির কথা আপনার মনে পড়বে এবং ভেবে বিস্মিত হবেন কেন সে আপনাকে উদ্ধার করেছিল। যাহোক, আপনি নন, আমি সেই মানুষটির কথা স্মরণ করি। আমি এখন আমার এক অভিজ্ঞতার কাহিনী বর্ণনা করছি। মানুষ সম্পর্কে এমনকি নিজের সম্পর্কেও আমার ধারণা স্পষ্ট নয়। আমার চারপাশে ভাল মানুষ এবং চোরছেঁচড়, যারা বিভিন্ন সংক্রামক ব্যাধি ও বিকৃত মস্তিষ্কে ভুগছে, তাদের ব্যাপারে সচেতন থাকা দরকার। পৃথিবীতে ভাল কম, মন্দ বেশি। শুধুমাত্র কষ্টভোগের পর আমরা তা উপলব্ধি করতে পারি।

আমি এখন এমন একটি ঘটনা লিপিবদ্ধ করছি, যা তুচ্ছ ও তাৎপর্যহীন মনে হতে পারে। পার্বত্য উপত্যকার একটি বড় শহর। আমাদের বাড়ি থেকে হাজার পাঁচশো মাইল দূরে। সেখানকার আদিবাসীরা মানুষের প্রতি দয়া-দাক্ষিণ্য বা ক্ষমা প্রদর্শন করা কি তা জানে না। তারা নির্মম, নিষ্ঠুর। হত্যা, ডাকাতি, পকেট মারা, ছিনতাই সেখানে নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। ঐতিহ্যিকভাবে সেখানকার মানুষ পেশাদার সৈনিক। তাদের কেউ কেউ দূরবর্তী অঞ্চলে মানুষকে ঋণ দিয়ে চড়া সুদের ব্যবসা করে। অনেকে শহরের ব্যাংক, কলকারখানা, বড় বড় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে প্রহরীর কাজ করে। ধনার্জন এদের প্রধান লক্ষ্য। অর্থের জন্য এরা সবকিছু করতে পারে, এমনকি মানুষ খুন করতেও দ্বিধাবোধ করে না।

সেই শহরের আবর্জনাময় রাস্তার পাশে একটি নোংরা ঘরে আমি বসবাস করতাম। রাত সাড়ে নয়টা থেকে এগারটা পর্যন্ত বহিরাগত শ্রমিকদের ইংরেজি শিখাতাম। তাদেরকে শিখাতাম কীভাবে ইংরেজিতে ঠিকানা লিখতে হয়। ইংরেজিতে ঠিকানা লিখতে জানা একটি বিশেষ যোগ্যতা হিসেবে সেখানে বিবেচিত হতো। নিশ্চয় লক্ষ্য করেছেন, ডাকঘরে কতিপয় লোক অন্যদের ঠিকানা লিখে দেয়। ঠিকানা লেখার জন্য তারা এক আনা থেকে চার আনা পরিমাণ পারিশ্রমিক পায়।

ইংরেজিতে ঠিকানা লেখা শিখিয়ে আমার নিজেরও- যা রোজগার হতো, তা থেকে কিছু সঞ্চয় করার চেষ্টা করতাম। সারাদিন ঘুমিয়ে বিকেল চারটায় উঠতাম। এ সময়ে ঘুমিয়ে সকালের চা-নাশতা ও দুপুরের খাবার খরচ বাঁচাতাম। একদিন নিয়ম মাফিক বিকাল চারটায় উঠে ঘরের দৈনন্দিন টুকিটাকি কাজ সেরে খেতে বেরিয়েছি। যথারীতি স্যুট পরিধান করেছি। কোট পকেটে আমার ওয়লেট। সঞ্চিত চৌদ্দ রুপি নিয়েছি আমার ওয়লেটে। জনবহুল একটি রেস্তোরাঁয় মাংস চাপাতি ভরপেট খেয়ে এক কাপ চাসহ বিল হয়েছে এগার আনা।

বিল পরিশোধের জন্য কোট পকেটে হাত দিতেই আমার শরীর থেকে অস্বাভাবিক ঘাম বের হতে লাগলো এবং যা খেয়েছি সব যেন মুহূর্তে হজম হয়ে গেল। কারণ আমার পকেট থেকে ওয়লেট উধাও। আমি বললাম, “কেউ আমার পকেট থেকে ওয়লেট নিয়ে গেছে।” রেস্তোরাঁয় প্রচন্ড ভিড়। আমার কথা শুনে রেঁস্তোরার মালিক সজোরে অট্টহাসি দিতেই চারপাশের লোকজন সচকিত হয়ে উঠলো। আমার কোটের কলারের ভাঁজ করা অংশ চেপে ধরে সে জোরে ঝাঁকাতে লাগলো এবং চিৎকার করে বললো, “এসব চালাকি, ছল-চাতুরি এখানে চলবে না। বিল পরিশোধ কর, তারপর যাও। তা না হলে বাটালি দিয়ে তোমার চোখ দুটো উপড়ে ফেলবো।” আমি আশেপাশের লোকগুলোর দিকে অসহায়ভাবে তাকালাম। এমনকি একজন হৃদয়বান মানুষও এগিয়ে এলো না। সবাই ক্ষুধার্ত নেকড়ের মতো একে অপরের দিকে তাকাতে লাগলো। লোকটি বলছে আমার চোখ উপড়ে ফেলবে, তাহলে সত্যিই উপড়ে ফেলবে! আমি বললাম, “আমার কোট এখানে রেখে যাচ্ছি, আমি গিয়ে বিলের পয়সা নিয়ে আসি।”

রেস্তোরাঁর মালিক আবারও হাসলো। সে আমাকে কোট খুলতে বললো। আমি কোট খুললাম। আমার জামা খুলতে বললো, আমি জামা খুললাম। আমার জুতোজোড়া খুলতে বললো, আমি জুতা খুললাম। সব শেষে আমাকে আমার ট্রাউজারস্ খুলতে বললো। মনে হলো আমাকে বিবস্ত্র করে, চোখ উপড়ে ফেলে উলঙ্গ অবস্থায় বের করে দেবে। “আমি বললাম, আমার নিচে কিছু নেই।” শুনে সবাই হো হো করে হেসে উঠলো।

রেস্তোরাঁর মালিক বললো, “আমার সন্দেহ হচ্ছে, তোমার তলদেশে কিছু আছে।” প্রায় অর্ধশত লোক পুনরাবৃত্তি করলো, “নিশ্চয় তোমার ট্রাউজারসের নিচে কিছু না কিছু আছে।” আমি হাত নড়াতে পারছিলাম না। দিব্যদৃষ্টিতে দেখলাম একটি মানুষ জনারণ্যে দাঁড়িয়ে আছে, সম্পূর্ণ বিবস্ত্র, দৃষ্টি শক্তিহীন। তার জীবনের করুণ পরিসমাপ্তি হতে চলেছে। হোক শেষ হোক... আমি কিছু মনে করি না... হে বিশ্ববিধাতা... আমার পরমেশ্বর... আমার বলার মতো কিছু নেই। সবকিছু শেষ হতে চলেছে... সকলে সুখী হোক।...

আমি একটার পর একটা ট্রাউজারসের বোতাম খুলতে লাগলাম। তখন একজনের কণ্ঠস্বর আমার কানে এলো, “থামুন, আমি ওর পাওনা পরিশোধ করবো।”

একথা শুনে সবাই ঘুরে দাঁড়াল। ফর্সা চেহারা, ছয় ফুট লম্বা, মাথায় লাল পাগড়ি, সাদা ট্রাউজারস্ পরিহিত একজন দাঁড়িয়ে আছে। নীলাভ চোখ, হাত দিয়ে সে গোঁফে মোচড় দিচ্ছে। এখানে অধিকাংশ মানুষের চোখের রং নীল। লোকটি এগিয়ে এসে রেস্তোরাঁর মালিককে জিজ্ঞাসা করলো, “তোমার কত পাওনা হয়েছে, বলো তো?’’

“এগার আনা।”

লোকটি পাওনা মিটিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বললো, “জামাকাপড় পরো।”

আমি আমার কাপড় চোপড় পরলাম।

“এসো।” আমাকে ডাকলো। আমি তার সঙ্গে হাঁটতে লাগলাম। আমি কি বলে তাকে আমার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবো? আমি বললাম, “আপনি আমার এতো বড় উপকার করলেন। আপনার মতো এমন ভাল মানুষ আমি দেখিনি।” লোকটি হাসলো।

“তোমার নাম কী?’’ লোকটি আমাকে জিজ্ঞাসা করলো, আমি আমার নাম বললাম, কোথা থেকে এসেছি বললাম। আমিও তার নাম জিজ্ঞাসা করলাম। লোকটি উত্তর দিল ,“আমার নাম নেই।” আমি বললাম, “তাহলে আপনার নাম করুণা।” আমার কথায় সে হাসলো না। আমরা দুজন হাঁটতে হাঁটতে একটা জনমানবশূন্য সাঁকোর ধারে এলাম, লোকটি চারপাশে তাকাল। কোথাও কেউ নেই। “শোনো, তুমি কোনদিকে না তাকিয়ে এখান থেকে চলে যাবে। কেউ যদি জিজ্ঞাসা করে, আমাকে তুমি দেখেছ কিনা, তুমি সোজা বলবে, না কাউকে দেখিনি।”

আমি রাজি হলাম।

সে তার পকেট থেকে পাঁচটি ওয়লেট বের করলো। এর মধ্যে একটি আমার।

“কোনটা তোমার?” লোকটি আমাকে জিজ্ঞাসা করলো।

আমি আঙ্গুল দিয়ে দেখালাম।

“খুলে দেখো।”

আমি খুলে দেখলাম। আমার টাকাপয়সা যা রেখেছিলাম সব ঠিক আছে। আমার ওয়লেট আমি পকেটে রাখলাম।

লোকটি আমাকে বললো, “সৃষ্টিকর্তা তোমার মঙ্গল করুন।”

আমিও সবিনয়ে বললাম, “পরম করুণাময় আপনারও মঙ্গল করুন।”

লেখক পরিচিতি

ভায়াকম মোহাম্মদ বশীর (১৯০৮-১৯৯৪) মালায়ালাম সাহিত্যে একটি সুপরিচিত নাম। তিনি ছিলেন একাধারে মানবতান্ত্রিক, মুক্তিযোদ্ধা, ঔপন্যাসিক ও ছোটগল্প রচয়িতা। উপমহাদেশে বৃটিশবিরোধী স্বদেশী আন্দোলনে তিনি সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন এবং কারারুদ্ধ হন। স্বাভাবিক, সরল ও সাবলীল গদ্যে রচিত তার ছোটগল্প ও উপন্যাস সমগ্র বিদ্যোৎসাহী পাঠক মহলে বিপুলভাবে আদৃত ও প্রশংসিত। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে Balyakalasakhi, Pathummayude Aadu, Premlekhanam, Shabdangal, Poovan Banana And Other Stories ইত্যাদি। মালায়ালাম ভাষায় রচিত তার ‘Oru Manushyan’ নামক মূল গল্পটি ‘A Man’ শিরোনামে V. Abdulla কর্তৃক ইংরেজিতে অনূদিত, যা পরবর্তীকালে “Poovan Banana And Other Stories” গ্রন্থে সংকলিত হয়েছে। ‘A Man’ একটি চমকপ্রদ ছোটগল্প। জীবিকার অনে¦ষণে কেউ দূর-দূরান্তে গিয়ে অকস্মাৎ বিপদে পড়তে পারে। সেই সংকটাপন্ন অবস্হা থেকে উদ্ধার করে এমন এক ব্যক্তি যে পরোক্ষভাবে তাকে বিপদাপন্ন করেছে। এই গল্পটির প্রতিপাদ্য হলো, একজন অসৎ, অপরাধপ্রবণ, দুর্বৃত্তের হৃদয়েও মনুষ্যত্ববোধ বিরাজমান।