menu

এ সংখ্যার কবিতা

  • ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ০৯ মে ২০১৯
image

অশ্বচালক

ইদ্রিস সরকার

কাঁটা তারে ছিন্ন হয় হৃদয়ের অনন্ত সাহস

সারিবদ্ধ পাখি বৃক্ষে বৃক্ষে খোঁজে জীবনের সাধ

তুই-ই শুধু আজও রয়ে গেলি ওই লুকানো স্মারকে

জলের বাড়িতে ঢেউ যায় বয়ে ছলাৎ ছলাৎ

আমি ওপারের সন্ধানে দরোজা খুলে বসে আছি

বিয়োগ বিলাসী চন্দ্র সূর্য দেখে কে হাসে স্বদেশে

কাঁটা তারে ছিন্ন হয় তবু মানুষের সংসার

কেউ কেউ হাসলেন তিনিই সৃষ্টির অন্তরে ব্যাকুল

এই ছোট্ট নীড় কতো দুঃখ কষ্টে গড়েছে বাবুই

কেউ বললেন আহা থাক কেউ কেউ উদ্ধত শিকারে

সৃষ্টি তার কতো কষ্টসাধ্য দূরযাত্রা পাখি বোঝে

প্রকৃতির শুভেচ্ছা কী ছিন্নভিন্ন দুর্বোধ্য সোহাগ

হায়েনা একান্ত নিজের না ভেবে খেয়ে ফেলে স্বর

মাইল মাইল রাস্তা অন্ধকারে তুই শুধু একা

এই কি সে তোর শিক্ষাগুরু দেখালো জীবনে যাহা!

যাই যাই বলে অস্থির মন আজও হয়নি যাওয়া।

কুসুমিত ইন্দ্রজাল

হাদিউল ইসলাম

বৃষ্টি ভেজা কামিনীর পাশ দিয়ে যেতে যেতে

আমার প্রেমিকাদের গন্ধ ভিন্ন ভিন্ন পুষ্পাকারে

অন্ধকারে ঝরে

তখন সন্দেহ

বিরহ কুঞ্জের গূঢ় বারান্দায় বেদনার রূপ

ঝোঁপের আড়ালে সুবর্ণ মাকাল অহেতু সৌন্দর্যে

উনুনে অঙ্গার হাসে

নিকটেই বাতাবি নেবুর নুয়ে পড়া ডালে

দীর্ঘশ্বাসের এক দমকা হাওয়ায় ঈষৎ নড়ে ওঠে

রাতের দোয়েল, ফল আর বোটার বিশ্বাস

অম্লমধুর জলে ও জোছনায়

টনটনে ফোঁড়ার মতো এক প্রেক্ষাপটের ভেতর

নাইট কুইন এতোদিন পর কোথাও ফুটেছে...

একটি হত্যার অভিলাষ

কবীর হোসেন

আমাকে ফালাফালা কর নদী।

মানুষের হাত থেকে পালিয়ে এসেছি তোমার কাছে

যাতে প্রকৃত অর্থেই মরতে পারি আমি

আমি চিরকুট লিখে রেখে যাচ্ছি

যাতে তোমার কোন শাস্তি না হয়

শুধু একটাই শর্ত:

মরার আগে অকৃপণ জল দিও মুখে।

আমি গণিত বুঝি না বলে

এ তল্লাটে আমার জায়গা হলো না।

সকলেরই মুখে বিষমাখা ছুরি

হাতে না এর বল্লম।

আমি ওদের হাত থেকে পালিয়ে এসেছি তোমার কাছে

এক্ষুণি ফালাফালা কর আমাকে।

না হয় গুম করে ফেল

যা পারেনি কাক্সিক্ষত নারীরও দুচোখ।

তবু ফিরিয়ে দিও না

যাতে শাদা পোশাকে শয়তানগুলো এসে

চোখে ধুলো না দেয়।

একটি মাত্র নাম

শ্যামল চন্দ্র নাথ

একটিমাত্র আকাশ রেখেছি বাতাস তার ছায়া ধরে রেখে হৃৎপিন্ড হয়ে ওঠে

একটিমাত্র ন্যায্যতায় বেড়ে উঠি, যেখানে অন্ধকার আলো হয়েছে ইস্তাম্বুল ও ঢাকায়

একটিমাত্র সবুজ পাতায় উজ্জ্বল দিন এঁকেছি দিনটি ফুরাবে না কখনো

একটিমাত্র রাস্তা হলুদ খামের ভিতর ভরে রেখেছি যা কখনো ফিরে আসবে না;

একটিমাত্র আলো ধরে রেখেছি যা জ্বলে-নিভে আবার রক্তে-মাংসে মিশে যায়

একটিমাত্র পাথর রেখেছি হৃদয়ে একটি হাত খুঁজতে, কিন্তু সকল হাত একা হয়ে গেছে।

একটিমাত্র জীবন রেখেছি শত বিবর্তণের পরে সেটা একবারই মানব জনম হয়ে আসে

একটিমাত্র আয়ু দিয়ে অনেক কিছু চেষ্টা করেছি সে বরফের মতো অদৃশ্য হয়ে যায়

একটিমাত্র দুঃখ ছিল তাকে বেহালায় তুলে ভেনিস শহরে সুরের কাছে

একটিমাত্র সুখ আছে সমস্ত দিন লুকিয়ে থাকে পাশে, বসন্তও চলে গেলো ফেলে

একটিমাত্র বিশ্বাস ছিল তা একটা অবিশ্বাসী কলস গাছ হয়ে গেছে

একটিমাত্র স্বপ্ন ছিল ঠান্ডা রক্ত নিয়ে চার শতাব্দি বেঁচে কালো সমুদ্রে চলে গেছে

একটিমাত্র পৃথিবী চেয়ে অদ্ভুত এ বিশ্বে প্রতরণার যুগে এসে দাঁড়িয়ে আছি

একটিমাত্র নাম ছিল গোপনে দ্বিতীয় হাত দিয়ে লিখতে চেয়েছি, বলতে পারিনি।

বৈশাখে, মাড়ের গন্ধওয়ালা শাড়িখানা চাই

সৈয়দ আখতারুজ্জামান

পাতিল উপুড় করে ছেড়ে এলাম বসত-বাড়ি

সেখানে আমরা মুড়িমুড়কি খেতাম, ইলিশ মাছ ছিলো না

দেখেছি মা সকাল সকাল একখানা নতুন সুতির শাড়ি পরেছেন

জড়িয়ে ধরলেই মাড়ের গন্ধ আসতো

চৈত্রের রোদের চেয়েও প্রখর ছিলো আমাদের অনুবাদ-দক্ষতা

বিকেলে হেমন্তপুর বাজারে মেলা বসবে- ঘোড়া আসবে গোটা-দশেক

বৈঠকখানার পাশে বেকুব সুপারি গাছটার ছাল-বাকল নখ দিয়ে খুঁটতে খুঁটতে

আব্বাকে বলতাম, আজকে কিন্তু টাকা বাড়িয়ে দিতে হবে, মেলায় যাবো।

আব্বা গম্ভীর কণ্ঠে জিজ্ঞেস করতেন, ‘কয় টাকা?’

কেঁচোর মতো কুকড়ে যেতে যেতে কোনমতে বলতাম, ‘পাঁচ টাকা।’

মনে মনে বলতাম, ‘আহাম্মক সুপারিগাছ, আমাকে একটু আড়াল করতেও শিখলি না!’

ক্ষণজন্মা তুচ্ছ মানব আমি, ছাড় দিতে শিখিনি ঋতুবিলাসে

যদি অমোঘ বয়সের মতো এসেই পড় দুয়ারে, তাহলে

ঐ মাড়ের গন্ধওয়ালা শাড়িখানা আমি চাই- ছাড় তুমি পাবে না বাছা

হাজার বছর ধরে কচ্ছপের কপালে খেলা করুক ভোরের আলো

তাতে আমার কিচ্ছু যায় আসে না।

ঋষিঋণ

গিরীশ গৈরিক

চোখ বুঁজলেই শ্মশান দেখতে পাই-

শ্মশানে বরফ জমে আছে!

কোথাও আগুন পাচ্ছি না, একটা বিড়ি ধরাবো।

আচ্ছা। আপনার খুঁতি থেকে একফোঁটা আগুন ধার দেবেন?

এই দেখেন- আমার বিড়ির ব্রান্ডের নাম পৃথিবী

পৃথিবীকে পোড়াবো, আমার হৃদয় পৃথিবীকে পোড়াবো!

রবিবাবু- একফোঁটা আগুন ধার দেবেন?

আমাদের জীবনের ধারাপাত জ্বালাবো...

গোড়াপির হেঁশেল-২৫

শিমুল জাবালি

একটি ভেজা শরীর যেভাবে কাত হয়ে ঘুমিয়ে থাকে সেভাবে অগণিত তুমি কাত হয়ে পড়ে থাকে। আর আমরা দোলনচাঁপা কাঁধে নিয়ে ঘুরতে থাকি বাঁচার আনন্দে। কতদূর কতদূর বলে চিহ্নিত চিৎকার দিয়ে যাচ্ছে অসংখ্য তুমিরা। এই যে আমি রক্ত টেনে খাচ্ছি হরদম, খুব খেয়াল বেখেয়ালে। রক্তের ভেতর জোছনা কিলবিল কিলবিল করে। অন্ধ তীরান্দাজ, তোমার ধনুকের সুতোতে কামড় বসিয়ে হাঁটতে থাকো পশ্চাতে, প্রাচীনে, সাদা রক্তের ভেতর। আবিষ্কার করতে পারো নাদান ভক্তকুল, রক্ত যোগী হুর। প্রেমমিশ্রিত শ্লোকে জাগরণ তুলে দেওয়া দৃশ্য দেখতে দেখতে হুর সকল ভেজা শরীরের ভাঁজের ভেতর লুকিয়ে পড়বে। আমরা বা আমি একে একে ধ্বংসের দিকে চক্ষু তাক করে উড়ে যাবো বায়ুনিশ্বাসে। বায়ু থেকে ছিটকে পড়বে খেয়াঘাট। খেয়াঘাট, তুমি আরেক শৃঙ্গার তাড়না, অথবা সঙ্গম যন্ত্রণা। আরেকটি বেগবান শরীর বেয়ে নেমে পড়বে অহিংস বুদ্ধবাণী। যাইহোক, তাতে কি আসে যায় গোড়াপি। তোমার ঝুলিতেই তো দুনিয়ার তাবৎ দ-ায়মান ইতিহাস।

অহম

এনাম রাজু

...এবং তাজমহলের ইতিহাস পুড়ে হবে ছাই!

একদিন মাছের পিঠে উঠবে টাইটানিক জাহাজ

সেদিন পিরামিড ধ্বংস হবে শিল্পীর দ্বন্দ্বে

জন্ম নিবে কতো ইতিহাস খাদক

ট্রয়ের ঘটনা রচিত হবে ধর্মযুদ্ধের বিষবৃক্ষের সাক্ষীস্বরূপ

পৃথিবীর কান ধরে মারবে টান হিংস্রবালক।

কবিদের কণ্ঠ বন্ধক থাকবে অক্টোপাসের কাছে

বিবেক বিক্রি হবে একুরিয়ামের ছাদে।

সেদিনও শিক্ষিত ধর্মান্ধ খুঁজবে-

অন্যের দোষ।

আধেক ভালোবাসা

রায়না নীলা

অনাদিকালের দীর্ঘশ্বাসে...

চন্দ্রাত্মা ডুবিয়ে রাখা এক মৃণ্ময়ী

প্রত্ন জমিনের পাঁজর খুঁড়ে

... গোর দেয় একবুক হাহাকার!

এরই মাঝে...

জন্ম-জন্মান্তরের কাছ থেকে ধার-পাওয়া

একজনমের আধেক ভালোবাসা

নিয়তির আঁচলের গিঁটে

বাঁধা পড়ে রয়!

আমি না থাকলেও রয়ে যাবে...

রেহেনা মাহমুদ

আমি না থাকলেও আমার না থাকা জুড়ে রয়ে যাবে আমার আমি।

বিছানায় রয়ে যাবে দু’চারটে চুল, চুলের কাঁটা,

কস্তুরিত সুবাস।

সে সুবাসে জড়িয়ে রবে কিছু উত্তাল হাওয়া

মাখামাখি করে রবে পূর্ণিমার নরম আলো

হাওয়ায়-আলোয় ঢেউ খেলে যাবে আমার অনুপস্থিতিতে তারা।

বদ্ধ শার্শির বাইরে ঠোকর মেরে যাবে একটি চড়ুই

বৈদ্যুতিক তারে বসে থাকা দুটো শালিক।

খিড়কি খুললেই যে আলোটা চোখ ধাঁধিয়ে দেবে

সে ছুঁয়ে যাবে অতল তোমার

তুমি বন্ধ চোখেও খুঁজে পাবে উড়ে যাওয়া প্রজাপতি

কলকল হাসি অথবা বয়ে যাওয়া রুপোলি নদী,

আলোকোজ্জ্বল বন্দরে শেষ বিকেলের নোঙর,

ভেড়া পানসি, মিশে যাওয়া দুটো ছায়া...

তুমি ছুটছো তবু সে ছায়া দীর্ঘ হতে থাকে কায়ার অনুপাতে

তুমি প্রাণপণ চাইছো শ্বাস নিতে, তবু সে সুবাস ঢুকে যায় অলিন্দে তোমার

আমি না থাকলেও আমার না থাকা জুড়ে রয়ে যাবে

আমার ভালোবাসা।

দূরত্ব

কুহেলি কেয়া

আঙুলের সাথে আঙুলের কাটাকাটি খেলায়

করতলের কাছে হেরে যাওয়া বিষাদের গন্ধ এখনো লেগে আছে-

প্রেমানন্দ উৎসব বাড়ি আজ-

মৌনতার মৌতাতে মগ্ন বিরোহী স্থায়ী নিবাস।

তোমার পাঠানো হাতের লেখারা-

পৃথিবীর চূড়ায় কাঁটা তারের বেড়ায় অবরুদ্ধ,

কোন এক কোজাগরী পূর্ণিমায় হয়তো এসে পৌঁছাবে;

হয়তোবা ফসিল হবে হাহাকারের

অতল গহ্বরে-

স্বপ্ন মন্দিরের বেদিতে তুলে রেখেছি

তোমার দ্বিধা, ঠোঁটের আড়ষ্টতা এবং দীর্ঘশ্বাস-

শব্দাতীত শব্দরা কড়া নেড়ে যাবে মনের দুয়ারে।

অনুভূতির একক অনুরণনে-

অনাদিকাল তুমি থাকবে-

নিশ্বাস ও নোলকের দূরত্বে।

আড়ালের গল্প

তামীম চৌধুরী

তোমার মন বুনোবৃক্ষের বীজ ছিলো না

ওটা অঙ্কুরিত করতে আমার খুব কষ্ট হয়েছে

কী করে তোমাকে পেয়েছি

তা বলতে হলে, বলতে হবে

ছোট একটি পাতার ওপরে বসে

ঢেউসমেত সীমাহীন জল পাড়ি দিয়ে

একটি পিঁপড়ে

কী করে ওপারের সবুজ ঘাসের ডগায় উঠেছে।