menu

উড়াল

মুজতাবা শফিক

  • ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ০৭ নভেম্বর ২০১৯
image

(পূর্ব প্রকাশের পর)

৬.

অফিস শেষ করে জ্যাম ঠেলে মতিঝিল থেকে বাসায় ফিরতে ফিরতে প্রায় সাতটা বেজে যায়। জামাকাপড় খুলে মুখ হাত ধুতে ধুতে রাত আটটা। পরদিন আবার অফিস। সকাল সাতটার মধ্যে বের হতে হবে। ঘণ্টা খানেক সময় থাকে আমানের হাতে একটু আরাম করার জন্য। এই সময়টুকু টিভি দেখা ছাড়া আর কিছু করার নাই। আমান জী বাংলার সিরিয়াল ছেড়ে বসে। আমানের জীবনের আনন্দ বলতে এইটুকুই এখন অবশিষ্ট আছে। এই অফিস টু বাসা করতে করতে একদম মোটা হয়ে গেছেন আমান। প্রায় চিন্তা করেন ব্যায়াম করবেন, করা হয় না! কিন্তু স্ত্রী শীলাকে হাসি মুখে ড্রয়িং রুমে আসতে দেখে মনে মনে প্রমাদ গোনেন আমান। এই মহিলা সাধারণত হাসেন না। আজকে হাসিমুখে চা নিয়ে আসছে মানে নিশ্চয় কোনো মতলব আছে। এমন কিছু একটা বলবে শুনেই আমানের মেজাজ খারাপ হয়ে যাবে। আমান তারপর ও ধৈর্য্য ধরে বসে থাকেন। শীলা পাশে বসে চা এগিয়ে দিয়ে শুরু করে,

- তোমার সাথে আমার কিছু জরুরি কথা ছিলো!

আমান মনে মনে বলে- “গেলো”! কিন্তু মুখটাকে যতটুকু সম্ভব স্বাভাবিক রেখে আমান বলে,

- বলো না!

- বলছি কি, সাজেদারা তো এখন নীচতলার পুরোটাই দখল করে ফেলছে! আগে ওরা একটা রুমে থাকতো। এখন নাকি দুই রুম নিয়ে থাকে!

আমান খুব ভালো করে জানতেন শীলা ঠিক এই বিষয়টা নিয়েই কথা বলবে। এবং বলেই তার মেজাজ খারাপ করে ফেলবে।

- দুই রুম নিয়ে থাকলে কী সমস্যা?

- মানে? ওরা তো পুরো বাড়ি দখল করে ফেলছে! তুমি কিইই?- বোঝো না, নাকি পাত্তা দিতে চাও না!

আমানের মেজাজের মিটার আস্তে আস্তে বাড়ছে। কতক্ষণ এভাবে মেজাজ ঠিক রাখতে পারবেন বুঝতে পারেন না আমান!

সাজেদা আশরাফ সাহেবের বাসায় ছোটবেলা থেকে কাজ করে। বড় হলে আশরাফ সাহেব নিজেই ওর বিয়ে দিয়ে জামাইসহ কাছে রেখেছেন। ওর জামাই মনসুরকে কে একটা গাড়ী কিনে দিয়েছেন। সেটা দিয়ে মনসুর উবার চালায় আর আশরাফ সাহেব বের হলে ঐ গাড়িতেই চড়েন। মিরপুর পীরেরবাগের দোতলা বাসার নীচতলাতে এখন ওদের সংসার। দোতলাতে বাবা একাই থাকেন। সাজেদাদের দুটি মেয়ে আছে। আশরাফ সাহেব বড়টিকে স্কুলে ভর্তি করে দিয়েছেন। একসময় এই মিরপুরের বাসায় আরিফ আর আমান দুই ভাই, বউবাচ্চাসহ থাকতেন! বিশাল এক একান্নবর্তী পরিবার ছিল সেটা। আরিফরা বাবাকে নিয়ে দোতলায় থাকতেন আর আমানরা থাকত নীচতলাতে। কিন্তু শীলাই প্রথম সেই বাসা ছেড়ে বের হয়ে আসেন! পীরেরবাগ নাকি খুব দুরের জায়গা। ঢাকায় থাকতে হলে নাকি ধানমণ্ডি থাকতেই হবে। ছেলের জন্য ভালো স্কুল চাই! আমান জানেন, আসল কারণটা তা নয়। শীলার আসলে আয়েশার সাথে যায় না। তার উপরে শ^শুরে কাজটাজ করা তার মোটেও পছন্দ না। এরপর ভাই আরিফরা তো কানাডাতেই চলে গেলেন। বাবা এখন একাই থাকেন সেই পীরেরবাগের বাসায়। সাজেদারা এখন তার একমাত্র অবলম্বন!

কিন্তু ধানমন্ডিতে নিজেদের ফ্ল্যাট থাকা সত্ত্বেও পীরেরবাগের ওই তিন কাঠার বাড়ি থেকে চোখ সরে না শীলার। সারাক্ষণ তার চিন্তা ওই বাড়ি নিয়ে। সাজেদারা কী করছে, বাড়ি দখল হয়ে গেলো নাকি, বাবা কি বাড়ি লিখে দিলো নাকি- এই সব হাবিজাবি চিন্তা! আজকেও সে সেই একি প্রলাপ শুরু করেছে! আমান এবার আর ধৈর্য্য ধরে রাখতে পারেন না,

- বাবার খোঁজখবর নাও তুমি? লাস্ট কবে তুমি বাবাকে ফোন করছিলা?

- মানে? তোমার সামনে খোঁজ করতে হবে নাকি! আমার যখন সময় হবে খোঁজ নিবো। তোমার চিন্তা করা লাগবে না!

- তাই, না? কোন দিন তো দেখলাম না শ্বশুরের জন্য কিছু রান্না করে পাঠালা। কি তার শরীরের খোঁজখবর নিলা। বাসায় আসতে বললা- শুধু তার বাড়িটার দিকে নজর।

- একদম বাজে কথা বলবা না তুমি! আরিফ ভাই তো মারাই গেছেন। ওই আয়েশা ভাবী আর নন্দিনী ঢাকায় ফিরবে না! টেকনিক্যালি ওই বাড়ি এখন আমাদের। আমাদের ওই বাড়ি আমাদের রক্ষা করতে হবে না? নাকি ওই কাজের লোকদের বাড়ি দিয়ে দিবো?

- হ্যাঁ দিতে হবে। ওরা বাবাকে দেখে রাখছে। তুমি বা আমি দেখি না! তাছাড়া বাবা বেঁচে আছেন। তার যাকে ইচ্ছা বাড়ি দিয়ে দিবেন! আর বাবা যে বেঁচে আছেন সেটা যদি তোমার পছন্দ না হয়- একটা দা নিয়ে আসো, বাবাকে মেরে আসি!

এই পর্যায়ে শীলা চিৎকার করে ওঠেন,

- বেকুব একটা! বেকুবের সাথে আমার বিয়ে হইছে!

গজগজ করতে করতে শীলা রান্না ঘরে চলে য্না! মনে মনে ভাবেন,

“খাবার পাঠাই না! এইটা আমার দোষ! আচ্ছা দাঁড়াও এখনি পাঠাচ্ছি!” পাশের বাসার ছেলের মুসলমানি হয়েছে! একগাদা কী সব খাবার পাঠাইছে বাসায়। কেউ খাবে না! এই খাবারগুলো পাঠালেই হয়!

শীলা একটা টিফিন বক্স বের করেন। এক্ষণি ছেলেকে দিয়ে খাবার পাঠাবেন! (চলবে)

৭.

নাবিল ইউটিউবে হুজুরের বয়ান শুনছিল। চার ধরনের প্রাণি হত্যা করতে নিষেধ করা আছে। তার মধ্যে প্রথম হলো ব্যাঙ! কারণ নম্রুদ যখন নবী ইব্রাহীম (আ)কে পুড়িয়ে হত্যা করার জন্য আগুনে নিক্ষেপ করেছিল, এই ব্যাঙ তখন আগুনে প্রস্রাব করেছিল। এই ব্যাঙ তখন কেঁদে কেঁদে আল্লাহকে বলছিল যে, “আমি জানি আমার প্রস্রাবে এই আগুন নিভবে না, কিন্তু আমার যতটুকু সাধ্য আমি করলাম!” সেই কারণে ব্যাঙ হত্যা করা নিষেধ। বাকি তিনটা প্রাণির নাম আর জানা হলো না। দরজায় নাবিলের আম্মা শীলা এসে দাঁড়িয়েছেন,

- তোর সঙ্গে কী কথা ছিল?

- কী কথা?

- আমি বললাম না, প্রতি শুক্রবার তোর দাদুর ওখানে একটু যাবি। দাদুকে সময় দিবি, একটু কথাটথা বলবি-

- না না না- আমি পারবো না আম্মা! তোমার শখ থাকলে তুমি যাও। আমাকে আর বলবা না!

শীলা ছেলের কাছে এসে মাথায় হাত বুলিয়ে দেন,

- বাবা এরকম করে না। আমি আগামী শুক্রবার যাবো। তুই প্লিজ যা!

- আরে কেন যেতে হবে তাই তো বুঝলাম না! আর গেলেই বুড়া উল্টা-পাল্টা কথা বলে। আমার ভালো লাগে না! আমি যাবোই না।

- তুই যাবি না? ঠিক আছে মনে রাখিস! হাত খরচের টাকা চাস আরেক বার। মনে থাকে যেন।

নাবিল বাধ্য হয়ে বাসা থেকে বের হয়। ঢ্যাঙা শরীরটা টেনে টেনে রাস্তায় এসে দাঁড়ায়। বয়সের তুলনায় একটু বেশি লম্বা নাবিল! আজ কে কত কিছু করার প্ল্যান ছিল। সব ভেস্তে গেলো। এখন অই বুড়ার ওখানে যেয়ে ভ্যাজর ভ্যাজর শুনতে হবে। নাবিল ভাবে, “তুমি নিজে কেন যাও না! এতো শখ থাকলে নিজে যাও”। নাবিল জানে আম্মা কেন তাকে ঠেলে পাঠায় দাদুর কাছে। সম্পত্তি বেহাত হয়ে যাবার ভয়ে। যত্তসব ফালতু। নাবিল খসখস করে দাড়ি চুলকায়! উদভ্রান্তের মতো এদিক ওদিক তাকায়। বুঝে উঠতে পারে না কী করবে! দাড়ি ওঠার পর থেকে আর কাটেনি নাবিল। থাক। দাড়ি রাখা সুন্নত। প্যান্ট টাও এখন আর কিনে পড়ে না। গিরার একটু উপরে প্যান্ট পড়তে হয়। সেরকমটা কেনা প্যান্টে হয় না। তাই বানিয়ে নিতে হয়। এ বছর, ‘এ’ লেভেল পরীক্ষা দেবার কথা ছিল নাবিলের। বাবা মা অন্তত তাই জানে! কিন্তু নাবিলের ইচ্ছা অন্যরকম। কী, সেটা বলা যাবে না! জুম্মার নামাজ পড়ে খেয়েদেয়ে একটু ল্যাপটপটা নিয়ে বসেছিল নাবিল! আম্মার সহ্য হলো না। ‘এ’ লভেল পরীক্ষায় কাজে লাগবে বলে এই ল্যাপটপটা নিয়েছিল নাবিল। কিন্তু পরীক্ষার কোনো কাজে এখন আর এই ল্যাপটপ লাগছে না! পুরো সময় নাবিল ইউটিউবে নানান ভিডিও দেখে। তার মধ্যে বেশিরভাগ সময় কাটে হুজুরদের বয়ান শুনে। আবার আর কিছু সময় কাটে ওই মিয়া খলিফা টলিফা মার্কা সাইট দেখে। আরো কিছু সাইট নাবিল দেখে, যেটা বলা যাবে না!

ধানম-ি থেকে মিরপুর যাওয়া সোজা ব্যাপার না। ভাল্লাগে এভাবে ছুটির দিন টা নষ্ট করতে? মাথা চুল্কে নাবিল পাশের বিল্ডিং-এর ইরফান এর বাসার দিকে হাঁটা দেয়। ইরফান বাসায় ছিল। কিছুক্ষণ পর নাবিল ইনিয়ে বিনিয়ে বলে,

- দুইটা বড়ি দে না দোস্ত! লালটা!

- কিইই! মামা, তুমি আগের গুলার দাম দেও নাই, মাম্মা!

- আম্মা ইদানীং টাকাপয়সা দেয় না রে! এই যে আজকে দাদুর বাসায় যাচ্ছি! কালকেই টাকা পেয়ে যাবো। বিশ্বাস কর!

- আইচ্ছা! দাদুর বাড়ি যাবি দেইখা মুখটা চ্যাংটা কইরা রাখছো মামা!

- তো! অই বুইড়ার ভ্যাজর ভ্যাজর শুনতে হবে এখন! নাইলে টাকা দিবো নারে! আম্মা বলে দিছে।

ইরফান নাবিলের কথা শুনে খ্যাক খ্যাক করে কিছুক্ষণ হাসে,

- কী কয় তর দাদু আমারে একটু ক দেখি! বুঝি ব্যাপারটা!

- কী কয় মানে! এর আগে একবার গেছি; কয়- বলো তো দাদু আলেকজান্ডার কবে ভারত এসেছিল- আমি কই আলেকজান্ডার আবার কে?- আর যায় কই- এই যুগের ছেলে মেয়েরা কিছু জানে না- কিছহু শিখে না!- আরে ভাই, আলেকজান্ডার ভারত আইছিল না পাকিস্তান গেছিল তাতে আমার কী?

শুনে ইরফান আরেক দফা খ্যাক খ্যাক করে হাসে,

- তুই কিন্তু আসলেই বলদ মামা! আলেকজান্ডার একটা রাজা আছিল! কোন দেশের জানি! আফ্রিকার হইতে পারে! নামটা মনে নাই। যাইজ্ঞা, বড়ি পাবি, কিন্তু টাকা কাইল্কা। প্রমিস?

- প্রমিস মামা, প্রমিস! বাচাইলা আমারে। এখন একটা মুখে দিয়ে রওনা দিবো আর দাদুর বাড়িতে গেট দিয়া ঢুকতে ঢুকতে আরেকটা। ব্যাস তাইলে সব ক্লিয়ার। কী কস?

আশরাফ সাহেব তখন বিছানায় শুয়ে ছিলেন। নাবিল কে দেখে তিনি চিনতে পারলেন না। এরকমটা আগে কখনো হয়নি। আশরাফ সাহেব মোটামুটি নিরোগ মানুষ। বয়সা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ওই একটু প্রেশারের ওষুধ খান। এই টুকুই। বাকি সব ঠিক আছে। নিয়মিত চেক আপ করান। আর স্মৃতিশক্তি অসাধারণ। কারো নাম বা চেহারা সহজে ভোলেন না। একবার কারো সঙ্গে পরিচয় হলে সহজে আর তাকে ভোলেন না। কিন্তু নাবিলকে আজ তিনি চিনতে পারছেন না। চেহারাটাও ঘোলা ঘোলা লাগছে। অনেক কষ্টে মাথার ভেতরটা খুঁড়ে খুঁড়ে তিনি স্মৃতিটা খুঁজে পান। হা তাই তো। আমানের ছেলে নাবিল। এই তো মাসখানেক আগে একবার এসেছিল। সব মনে পড়ছে। আশরাফ সাহেব ছোট করে বলেন,

- কেমন আছো দাদু ভাই!

নাবিল তখন অবাক হয়ে দাদু কে দেখছিল। দাদুকে কখনো তার বুড়ো মনে হয় নি। যদিও সে জানে দাদুর অনেক বয়স। কিন্তু মনের দিক দিয়ে শক্ত একজন পুরুষ তার দাদু। কিন্তু আজকে তার মনে হচ্ছে একটা বুড়ো মানুষ গুটিসুটি বিছানায় শুয়ে আছে। নাবিল শুধু বলে,- ভালো।

অমিতকে প্রথম দেখেই নন্দিনী প্রেমে পড়ে গিয়েছিল। অথচ তার আগে নন্দিনীর ধারণা ছিল সে লেসবিয়ান। এই দেশে অনেক ছেলেমেয়েই বড় হয় অনেকটা ডিসওরিয়েন্টেশন নিয়ে। “আমি কি গে না স্ট্রেইট” এটা চিন্তা করতে করতেই একসময় তারা বড় হয়ে যায়। নন্দিনীর ক্ষেত্রে তাই ঘটেছে। টীন-এজে, ষোল সতের বছর বয়সে, একবার সে ঠিক করে এর একটা বিহিত করতে হবে। খালি বাসায়, বান্ধবী এরিকাকে জড়িয়ে ধরে গভীর চুমু খায় নন্দিনী। মা কখন পেছনে এসে দাঁড়িয়েছিলেন টের পায়নি! একটা আস্ত কাপড় রাখার হ্যাঙ্গার নন্দিনীর পিঠে ভাঙেন আয়েশা। ভয়ে এরিকার ফেইন্ট হয়ে যাবার মতো অবস্থা। নন্দিনী ইচ্ছে করলে পুলিশে কল করতে পারতো। আয়েশার জেল হয়ে যেতো। এমনকি পুলিশ আয়েশাকে আর কোনোদিন হয়ত নন্দিনীর কাছে আসতে দিতো না। এদেশের আইন বড্ড কড়া। বাচ্চাদের গায়ে হাত তোলা বড় অপরাধ। এরিকাকেও পুলিশে ফোন করতে দেয়নি নন্দিনী। দরজা বন্ধ করে নীরবেই কেদেছে। মনে মনে মাকে একটা কথাই বলেছে, “এসেছো কেনো তুমি? ফিরে যাও তুমি তোমার এতো ঘিনঘিনে পৃথিবীতে! আমাদের এই পৃথিবী তো তোমার জন্য নয়। এখানে আকাশ অনেক উঁচু আর নীল! এখানে সমাজ অবারিত! তুমি এই পৃথিবীতে আসলে কেনো? তুমি যদি নিজেকে নাই মানাতে পারো!”

মায়ের সঙ্গে কখনই যায় না নন্দিনীর। মা হচ্ছেন সনাতন বাঙালি ঘরানার। খালি এটা করো না, ওটা করো না! এটা হতে হবে! ওটা হওয়াই যাবে না! এবং কানাডা আসার পড় এতটুকু বদলান নি আয়েশা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নন্দিনী ঠিক বদলে গেলো। একসময় মা মেয়ে দুজন দেখলো তাদের মাঝে যোজন যোজন ফারাক। কোনভাবেই আর এই বিস্তর ফারাক পূরণ করা যাবে না। আর সেই ফারাকটুকু কবে তীব্র ঘৃণায় পরিণত হলো নন্দিনী জানে না। শুধু এইটুকু জানে মাকে তার একদম পছন্দ নয়।

কাস্টমারের চুল রঙ করা ভিডিও শুট করতে করতে, অনেক কথাই ভাবছিল নন্দিনী। যা কিনা খুব বিপজ্জনক ও বটে। একটু এদিক ওদিক হয়ে গেলেই সর্বনাশ। এতদিনে গড়ে তোলা রেপুটেশন সব যাবে। নন্দিনীর এই কাজটা যেমন মায়ের একদম পছন্দ না! খুব সাধারণ বাঙালি মায়েদের মতো, মার ইচ্ছা ছিল মেয়ে ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার হবে। নিদেন পক্ষে ইউনিভার্সিটি অফ টরন্টো থেকে কিছু পড়বে। কানাডার সব বাবা মা’র এটাই ইচ্ছা! কিন্তু নন্দিনী ওসবের ধার দিয়েই হাঁটলো না। মায়ের তুলনায় বাবাকে নন্দিনীর মনে হতো অনেক বেশি আধুনিক। সে নিজে নতুন পৃথিবীকে ধার করতে না পারলেও, নতুন পৃথিবীটাকে বুঝতে চাইতো,

- ব্লগ মানে তো বুঝি কিছুটা, কিন্তু ভ্লগ (vlog) টা আবার কি মা?

নন্দিনী নিজের জন্য একটা ভ্লগ (vlog) তৈরি করেছিল। তাই নিয়ে কথা হচ্ছিল। ছোটবেলা থেকেই নন্দিনীর একটা ব্যাপারেই আগ্রহ, তা হলো সাজগোজ করা। একদম ছোটবেলায় মার লিপস্টিক চুরি করে ব্যবহার করত। তারপর এই একটু মাস্কারা বা ফাউন্ডেশন দেয়া। এভাবে হাতেখড়ি। বড় হতে হতে ইউটিউব দেখে দেখে আরো হাত পাকায় সে। শেষ পর্যন্ত মায়ের স্বপ্নের ভরাডুবি করে ভর্তি হয় কানাডিয়ান বিউটি কলেজে। মেকাপ আর্টিস্টির উপরে চার বছরের ডিপ্লোমা কোর্স। পড়ার ফাঁকে সে নিজের একটা ভ্লগ (vlog) তৈরি করে। সেটা নিয়েই কথা!

- ব্লগ হচ্ছে শুধু তুমি লেখা আপলোড করছো। বুঝলা! আর ভ্লগ হলে, তুমি লিখা আর ভিডিও দুটোই আপলোড করছো।

- তা তুই কি ভিডিও আপলোড করছিস?

- এই যে বিভিন্ন বিউটি প্রোডাক্ট বের হচ্ছে, ওগুলা কীভাবে ইউজ করে। এই সব আর কি!

হমম, চিন্তা করেন আরিফ,

- আচ্ছা তুই নিজে ইউজ না করে, যারা করছে তাদের রিভিউ করে ভিডিও বানাচ্ছিস না কেনো! তাদের প্রোডাক্টটা ভালো লাগছে কিনা বা আর কিরকম হলে তারা পছন্দ করত, এভাবেও ভ্লগ করতে পারিস।

বাবার আইডিয়াটা দারুণ পচ্ছন্দ হয় নন্দিনীর। তাইতো! কেমন করে লিপস্টিক দিতে হবে সেটাতো অনেকেই করতে পারে, তার চেয়ে নতুন লিপস্টিকটা দশ জনের কেমন লাগছে সেটা জানাটা জরুরি। তাতে করে ওই প্রোডাক্ট যারা কিনতে যাবে তাদের উপকার হবে। চমৎকার বুদ্ধি। ব্যাস, শুরু করে দেয় নন্দিনী। সাবস্টেশনে, পার্কে, মলে, মেয়েদের রিভিউ নেয়া শুরু করে, “আচ্ছা তুমি কি অমুক কোম্পানির উমুক প্রোডাক্টটা ব্যবহার করেছো? কেমন লাগছে তোমার?” নন্দিনীর ভ্লগ দারুণ হিট। ভ্লগের ভিউ মিলিয়ন ছাড়িয়ে যায়। কলেজ থেকে পাস করার পরে বিউটি প্রোডাক্ট কোম্পানিগুলোই নন্দিনীকে খুঁজে বের করে। রিভিউগুলো তাদেরই যে সবচাইতে বেশি প্রয়োজন! এখন আর নন্দিনীর পিছনে ফেরার অবকাশ নেই। টরন্টো ছেড়ে নন্দিনী চলে আসে নিউইয়র্ক!

নিউইয়র্ক এসে নন্দিনীর টরন্টো শহরকে মনে হয় নিতান্তই গ্রাম! টরন্টো শহরে কোনো প্রাণ নেই। একদল গোমড়ামুখো মানুষের শহর! এখানে মানুষ কত উচ্ছল। টাইম স্কোয়ারে গেলে মনে হয়, কী ভীষণ জীবন্ত আশেপাশের সব কিছু! হাডসন নদীতে ক্রজে গেলে মনে হয়, নাহ জীবনের মানে তো এটাই। বিয়ারের বোতল দাঁত দিয়ে খুলতে খুলতে নন্দিনী হারিয়ে ফেলে তার ফেলে আসা শৈশব, কৈশোর, মা বাবা আর অমিতকে!

আর ঢাকা- ঢাকার কথা নন্দিনীর মনে নেই!

  • বিশুদ্ধির বিরল উত্থানে সে

    ইমতিয়ার শামীম

    newsimage

    সাধারণ এক সংখ্যাই ছিল সেটা,- সাপ্তাহিক বিচিত্রার ওই সংখ্যা হয়ত এখন কোনওমতে টিকে আছে কারও ব্যক্তিগত সংগ্রহের ভিড়ে- সংগ্রাহকও

  • একাকিত্বে ও আমার একান্ত স্বজন

    মাসুদার রহমান

    newsimage

    প্রিয় কবি! এই অভিধাটি নিয়ে এ পর্যন্ত আমার কোন ভাবনা নেই। এই মুহূর্তে লিখতে বসে তা নিয়ে ভাবনা ও ধন্ধে পড়া গেল। প্রিয় কবি; এই

  • আবুল হাসানের কবিতায় দুঃখবোধের বৈচিত্র্য

    অনন্ত মাহফুজ

    newsimage

    জেনেছি মানুষ তার চিবুকের কাছেও ভীষণ অচেনা ও একা। দৃশ্যের বিপরীত

  • সুহিতা সুলতানার কবিতা

    newsimage

    এমন বৃষ্টিমুখর সন্ধ্যায় স্তব্ধতা নেমে আসে দক্ষিণ দিগন্ত বেয়ে; বিশ্বাস অবিশ্বাসের জলে ভেসে বেড়ায় শাদা হাঁস যদিও ভয়ঙ্কর শীত নামেনি এখনও

  • ধারাবাহিক ভ্রমণ কাহিনি : চার

    সিমলা-মানালির পথে

    কামরুল হাসান

    newsimage

    সেন্ট্রাল বাসস্টপে যাত্রা বিরতি ১৫ মিনিট। আমি এ সুযোগে নিচে নেমে ডাবল

  • সাময়িকী কবিতা

    কখনও-সখনও, অবেলায় নদীপাড়ে, নীল প্রজাপতি