menu

আমার আছে বই-৪

মালেকা পারভীন

  • ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ০৮ নভেম্বর ২০১৮
image

লেখক হতে গেলে নিয়ম করে প্রায় প্রতিদিন কিছু না কিছু লিখতেই হবে। সাথে নিয়মিত পড়া তো আছেই। প্রায় কথাটা বলা ঠিক হলো কিনা বুঝতে পারছি না। এ পর্যন্ত যে সমস্ত বড়/বিখ্যাত লেখকের বিভিন্ন লেখা/সাক্ষাৎকার পড়বার সুযোগ হয়েছে, কারো কারো সাথে সামনাসামনি কথা বলবার সৌভাগ্য হয়েছে, প্রত্যেকেই প্রতিদিন লেখার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছেন। মাঝে মাঝে রাইটার্স ব্লক এর সমস্যা হাজির হবে। স্বাভাবিকভাবে সেটা মেনে নেওয়াই শ্রেয়। একসময় তা কেটেও যায়। এটাও সম্ভব হয় কেবল নিয়মিত লেখার চর্চাটা ধরে রাখতে পারলেই। লেখা আসছে না, তাই লেখার টেবিলে বসে লাভ নেই- বিষয়টা ক্ষতিকর।

হেমিংওয়ের ‘এ মুভাবল ফিস্ট’ বইয়ে পড়েছিলাম, কীভাবে তিনি প্রতিদিন টাইপ করা শব্দ সংখ্যাগুলো আলাদা করে লিখে রাখতেন। একজন সিরিয়াস লেখকের জন্য প্রতিদিন লেখার ব্যাপারটা (হেমিংওয়ের জন্য রীতিমত কড়ায়-গন্ডায় লেখার হিসাব রাখা!) যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ সেটি হেমিংওয়ের নিয়ম মেনে পালন করা এই পদ্ধতি থেকে অনুধাবন করেছিলাম। পাপার অদ্ভুত, কিন্তু কার্যকর, নিয়মটি জানবার পর নিজে কিছুদিন অনুসরণ করবার চেষ্টা করলাম। বেশ একটা লেখক-লেখক ভাব অনুরণন তুললো মগজের আনাচে কানাচে। তারপর যে কে সেই। যা কিছু লিখতে চাই বলে এক মুঠো অবসরের জন্য উন্মুখ হয়ে থাকি, চাকরির ডামাডোলে তা তলিয়ে যেতে থাকে। তলিয়ে যায়। এভাবে কি লেখক হওয়া সম্ভব, নাকি কখনো লেখক হওয়া যায়!

এতো কথা বলার কারণ, লেখালেখি নিয়ে আমার দুরবস্থা। পেশাগত ব্যস্ততার অক্টোপাসে এমনভাবে জড়িয়ে গেছি যে চাইলেও তা থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে আনতে পারছি না। ফলাফল দিনের পর দিন লেখালেখির কাছ থেকে ক্রমবর্ধমান দূরত্ব। আমার অতিরিক্ত মানসিক অস্থিরতা, অশান্তি।

পড়াটা নিয়মিত করছি। যেহেতু আর কিছু করি বা না করি, প্রতিদিন কিছু না কিছু পড়তেই হবে। দীর্ঘদিনে গড়ে ওঠা অভ্যাস। পড়ার আনন্দে পড়ি; পড়তেই হবে তাই পড়ি; না পড়লে কীভাবে বাঁচবো সেকারণে পড়ি; না পড়ে কীভাবে বেঁচে থাকা যায় সেটা না জানা থাকার জন্য পড়ি; মরে গেলে আর পড়ার আনন্দ পাবো না সেজন্য পড়ি। এ তো গেলো কেন না পড়ে থাকতে পারবো না তার পক্ষে কিছু যুক্তি।

পাশাপাশি পড়ার এই দারুণ অভ্যাস এখন পর্যন্ত আমাকে বাঁচিয়ে দিয়েছে অনেক অহেতুক মনুষ্য-সৃষ্ট যন্ত্রণা আর মানসিক নিপীড়ন থেকে। কিছু মানুষ নামধারী প্রাণির উল্লম্ফন/আস্ফালন সহ্য করতে পেরেছি কেবল এই পড়ার গুণটি থাকার বদৌলতে। এটা ঠিক কোন ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। পুরোটাই অনুভব এবং উপলব্ধির ব্যাপার। এ বিষয়ে আগেও একবার প্রিয় লেখক সমারসেট মমের কথা উল্লেখ করেছিলাম। বিশেষ এই অবস্থাটি প্রকাশ করবার জন্য আমার কাছে মমের উদ্ধৃতিটাকেই সবচেয়ে উপযুক্ত মনে হয়েছে। তাই সুযোগ পেলে প্রাসঙ্গিক বিবেচনায় কথাটি উল্লেখ করতে ভুল করি না একদম। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার জারক রসে সিক্ত বলে উদ্ধৃতিটির বিষয়ে আমার বিশেষ দুর্বলতা আছে। আবার প্রিয় লেখকের কথা বলে কথা। জীবনের এক বিশেষ কঠিন সময় পার করবার কালে যখন আমি পড়ি, “বই পড়ার অভ্যাসটি আয়ত্ত করার মধ্য দিয়ে তুমি আসলে তোমার জন্য জীবনের প্রায় সর্ব প্রকার দুর্বিষহ যাতনা থেকে পরিত্রাণের একটি নিরাপদ আশ্রয় নির্মাণ করে ফেলতে পারো”, তখন মনে না হয়ে পারে না যে, এটি কেবল আমার জন্যই লেখা। যদিও ঘটনা তা নয়। মহৎ সাহিত্যের আবেদনটাই এমন যে স্থান-কাল-পাত্র নির্বিশেষে তা এভাবে চিরকালীন মানব মনের সাথে একাত্মতা অনুভব করবার সুযোগ করে দেয়। আমার মতো অযুত-নিযুত সাহিত্যপ্রেমী ভাবে, আশ্চর্য, এটা তো আমাকে উদ্দেশ্য করেই লেখা!

যা হোক, বলছিলাম, ইদানীংকালে আমার পড়ার ধরনধারণ বা বিষয়বস্তু নিয়ে। হাতের কাছে আছে কয়েকটি বইÑ একটু একটু করে সবগুলো পড়ছি। একসাথে একাধিক বই পড়ার দোষ-গুণের কারণে এই যুগপৎ ঘটনার ঘনঘটা। কলম্বো থেকে দেশে ফিরে আসার কয়েকদিন আগে কিনেছিলাম ‘দ্য স্টোরি অফ আ ব্রিফ ম্যারিজ’ নামের উপন্যাসটি। তরুণ শ্রীলঙ্কান লেখক আনুক আরুদপ্রাগাসাম-এর প্রথম উপন্যাস।

যা না বললেই নয়। বেশ ক’মাস আগে ‘লস অ্যাঞ্জেলস রিভিউ অফ বুকস’-এর অনলাইন সংস্করণে বইটির একটি রিভিউ/সমালোচনা পড়বার সুযোগ হয়েছিল। সেটি পড়েই নোট করে রেখেছিলাম, বইটি সংগ্রহ করে পড়বো। কাহিনির অভিনবত্ব বা আকর্ষণ যাই বলি, মনে দাগ কেটেছিল। যেহেতু কলম্বোতে আছি, যে কোন সময় বইটি পেয়ে যাবো এমন ধারণা ছিল। তারপর যা হয়, অনেক বইয়ের খোঁজ-খবরের ভেতরে বিষয়টা চাপা পড়ে গিয়েছিল। গত বছরের (২০১৭) নভেম্বরে ‘ঢাকা লিট ফেস্ট’-এ ডিএসসি সাউথ এশিয়ান সাহিত্য পুরস্কারটি ঘোষণা করা হলে দেখি সেই বইটার নাম যে বইটার রিভিউ পড়ে ‘সম্ভাব্য পড়ার তালিকায়’ টুকে নিয়েছিলাম। বেশি দিন ভুলে থাকা গেলো না। দিনে দিনে গড়ে ওঠা নিজের সাহিত্য রুচি নিয়েও মনে মনে কিছুটা গর্ব অনুভূত হলো। এ কেবলই নিজে নিজে নিজের সাথে আনন্দ উপভোগ করা। যা অন্য কাউকে বলে যেমন ঠিক বোঝানো যায় না, তেমনি ঠিক ভাগ করেও নেওয়া যায় না।

বইটির পাতায় পাতায় চলমান গৃহযুদ্ধাবস্থার প্রেক্ষিতে সাধারণ মানুষের জীবনের যে অসহায় নিষ্করুণ চিত্র ফুটে উঠেছে, তা এক কথায় শিহরণ জাগানো। কিছুক্ষণের জন্য চিন্তাশক্তি স্তব্ধ করে দেওয়া মুহূর্তগুলি পড়বার পর ঠিক আর কোন বোধ-বুদ্ধি সচেতনভাবে কাজ করে না। শ্রীলঙ্কায় প্রায় তিন দশক ধরে সংঘটিত জাতিগত দাঙ্গার পটভূমিতে উপন্যাসটির কাহিনি গড়ে উঠেছে। এখনো বইটির আরো কিছু পাতা পড়া বাকি আছে। তবে যে সিংহ ভাগ পড়ে ফেলেছি, তার প্রতিটি পাতায় অপ্রয়োজনীয় অমানবিক যুদ্ধের নৃশংসতা আর ভয়াবহতার যে অবিকল আবেগহীন বিবরণ ফুটে উঠেছে, কোন যুক্তি দিয়েই তার কোনরকম কার্যকারণ খুঁজে পাই না।

এর আগে ব্রাসেলস থেকে কলম্বো যাওয়ার কিছুদিন পূর্বে প্রিয় বইয়ের দোকান ওয়াটারসটোনস থেকে ‘দ্য ইংলিশ পেশেন্ট’ খ্যাত শ্রীলংকান লেখক মাইকেল ওনদাতযের ‘অনিল’স গোস্ট’ উপন্যাসটি কিনেছিলাম। দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের বর্ণনা কোন ফ্যাক্টস-ফিগার্স থেকে নয়, একজন সাহিত্যিকের চোখে দেখার অভিপ্রায় থেকে বইটি সংগ্রহ করেছিলাম। কলম্বো পৌঁছে প্রথম এই বইটি পড়ে শেষ করি। অন্য কোন মাধ্যম নয়, একটি নতুন দেশকে বা এর ইতিহাসকে জানবার প্রয়োজনে আমি সাহিত্যের দ্বারস্থ হয়েছিলাম। আমার সেই প্রচেষ্টা বিফল হয়নি। কিছুটা হলেও দেশটির জাতিগত বিভাজন বা এর মনস্তত্ব সম্পর্কে জ্ঞান লাভ হয়েছে। পরবর্তীতে অন্যান্য বিভিন্ন পড়া থেকে এই জ্ঞান সমৃদ্ধ হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে, ‘অনিল’স গোস্ট’ উপন্যাসটি পড়তে পড়তে আমার ভেতরে প্রায় চেতনানাশক মানসিক অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল। যুদ্ধের একমাত্র ফলাফল মানুষের মৃত্যু। মানুষই যদি না থাকে, তাহলে এই শূন্য পৃথিবীতে কার কী বাণিজ্য হবে, বোকার মতো এই প্রশ্ন কেবল মাথায় ঘুরতে থাকে। তেমন কোন উত্তর পাবো না জেনেও।

তো লেখাটায় যা বলবো বলে ভেবেছিলাম, ইদানীং অনেক কিছু পড়া হয় যা অনেকটা পড়ার খাতিরে পড়া। ঠিক যেভাবে পড়লে নিজের লাভ হতো, সেভাবে নয়। তথ্য প্রযুক্তির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমের নামে যা কিছু আবিষ্কার হয়েছে, তা আমাদের কাজে বা উপকারে আসছে যতটা, ক্ষতির পরিমাণটাও আতঙ্কজনক। মাঝে মাঝে দ্বিধান্বিত হয়ে পড়ি। ভাবি, সত্যিই কি এসব তথাকথিত সামাজিক মাধ্যমের/অবাধ তথ্য প্রবাহের কোন দরকার ছিল? নাকি সামাজিকতার নামে এগুলো আমাদের আরো অসামাজিক, পারস্পরিক অনুভূতিশূন্য করে ফেলেছে? পরস্পর ঈর্ষা-বিদ্বেষ, রেষারেষি, অহেতুক অমূল্য সময় হেলায় নষ্ট করা ছাড়া কী লাভ হয়েছে মানুষের একান্ত ব্যক্তিগত গোপন জীবনে অনুপ্রবেশকারী এসব অহেতুক বিড়ম্বনার অজুহাতে?

মাঝে মাঝে পড়ার যোগ্য কিছু লেখার উপকরণ পাওয়া গেলেও তার কার্যকারিতা সবসময় কতটুকু সে প্রশ্ন তোলাই যায়। দেখা যাচ্ছে, মোবাইল ফোনের সহজলভ্যতায় সারা দিনই কিছু না কিছু পড়া হয়ে যাচ্ছে। অনেক সময় বাধ্য হয়ে। ইচ্ছা না থাকা সত্ত্বেও। কিন্তু দৃষ্টিশক্তির জন্য ক্ষতিকারক এই পড়া কোনভাবেই বই পড়ার আনন্দের সাথে তুলনীয় নয়। বই পড়া থেকে অর্জিত জ্ঞান বলি, তথ্য বলি, নির্মল আনন্দ বলি, তার রেশ মগজে-মননে কিছুটা হলেও রয়ে যায়। বিরামহীন তথ্য প্রবাহের স্রোতে ভেসে (গড্ডালিকা প্রবাহে ভেসে যাওয়া মনে করিয়ে দিলো!) আসলে কতখানি তথ্য আমরা আমাদের সত্যিকার প্রয়োজনে কাজে লাগাতে পারছি তা নিয়ে নতুন করে ভাববার সময় এসেছে।

আগেই বলেছি, তথ্যপ্রযুক্তির কল্যাণ বা উপকারিতা নিয়ে দ্বিমত পোষণ করবার কোন সুযোগ নেই। কিন্তু যা ভাববার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে তা হলো আমরা কতটুকু গ্রহণ করবো। আমাদের কতটুকু না হলেই চলবে না। সত্যি সত্যিই কি এতো এতো সংবাদ আর এতদসংক্রান্ত সবকিছু আমাদের প্রয়োজন আছে? পাত্রে প্রয়োজনের অতিরিক্ত খাবার নিলে বদহজমসহ নানাবিধ শারীরিক সমস্যা দেখা দিতে পারে। যা আমি পড়তে চাই, যা আমার কাজে লাগবে এর বাইরে অন্য যা কিছু সবই আমার মস্তিষ্কের জন্য বাহুল্য, ক্ষতিকর। মস্তিষ্কের ধারণ ক্ষমতা যতই থাকুক, অপ্রয়োজনীয় উপাদানে ভরিয়ে ফেললে লাভ ছাড়া ক্ষতির আশঙ্কা বেশি।

কিছুদিন আগে মুহম্মদ জাফর ইকবাল তাঁর একটি লেখায় আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স কথাটির প্রবক্তা হারবাট সাইমন সম্পর্কে জানিয়েছেন, এই জোর করে চাপিয়ে দেওয়া সংবাদের ঘোর বিরোধী ছিলেন তিনি। মুহম্মদ জাফর ইকবালের লেখা থেকে উল্লেখ করে বলছি, “তার ভাষায়, যখন আমার প্রয়োজন হয় তখন আমি কারো সাথে যোগাযোগ করবো, সবাই ঢালাওভাবে না চাইতেই আমাকে দুনিয়ার খবর দিয়ে ভারাক্রান্ত করে ফেলবে আমি তাতে রাজি নই।” আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স কথাটার গায়েই কেমন একটা নকল নকল গন্ধ! এর সাময়িক উপযোগিতা মূল্যকে প্রাধান্য না দিয়ে বরং সুদূর প্রেক্ষাপটে এর কার্যকারিতা কতখানি ফলপ্রসূ তা নিয়ে বিজ্ঞজনেরা যত দ্রুত ভাবতে শুরু করবেন, ততই মানব জাতির জন্য মঙ্গল। তা না হলে, লক্ষণ যা দেখা যাচ্ছে, তাতে নিকট ভবিষ্যতে একটি বোধহীন সভ্যতার অংশীদার হতে হবে আমাদের সকলকে। আমার তো মনে হয়, ইতিমধ্যে আমরা সাধারণ মানবিক সংবেদনশীলতার অনেকটাই হারিয়ে ফেলেছি। আমাদের নিত্য দিনের রবোটিক আচরণই তার প্রমাণ। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স-এর মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব এখন আমাদের প্রতিটি পদক্ষেপে/ব্যবহারে দৃশ্যমান।

কল্পনা করুন এ প্রজন্মের কয়েকজন তরুণ ছেলেমেয়ে (বয়স্করাও কম যান না!) একসাথে কোথাও বসে আছে। উদ্দেশ্য গল্প করা, আড্ডা দেওয়া। তারা কি আসলেই তা করছে? তারা যে সেটি করছে না আপনি জানেন। আমিও জানি। বন্ধুদের উপস্থিতি ভুলে তারা প্রত্যেকে কোন মরীচিকা নিয়ে মশগুল আছে আমরা সবাই জানি। তাই আর বলবার প্রয়োজন দেখছি না। দুঃখজনক হলো, আমি বা আপনিও এর বাইরে নই!