menu

আমার আছে বই : ১২

মালেকা পারভীন

  • ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ১৪ মে ২০২০
image

সাহিত্যের প্রতি ভিনসেন্ট এর ভালোবাসা এতোটাই অপ্রতিরোধ্য ছিল যে তাঁর কিছু পোর্ট্রেট/স্থিরচিত্র এবং স্থিরচিত্রের মধ্যে সুস্পষ্ট শিরোনামসহ প্রিয় কিছু বইয়ের নাম অন্তর্ভুক্ত করেন। যদিও বইসহ তাঁর নিজের কোন আত্ম-প্রতিকৃতি নেই।

দ্য হেগ শহরে বাস করার সময় আন্তন মোভ এবং থেওফাইল দ্য বোক-এর মতো আলোকিত শিল্পীদের সংস্পর্শে আসার সুযোগ পান ভিনসেন্ট। এ সময়টাতে তাঁর কাছে সবচেয়ে বড় আনন্দের উৎস ছিল এমিলি জোলাকে নতুনভাবে খুঁজে পাওয়া। এর আগে জোলার কিছু লেখা বিচ্ছিন্নভাবে পড়লেও এবার তিনি তাঁকে একজন লেখক হিসেবে আবিষ্কার করলেন। এ সময় লেখা একটি চিঠি থেকে জানা যায়, জোলার ‘ইউন পাজ দা’মুর’ (‘একটি প্রেমপত্র’) বইটি পড়ে ভ্যান গঘ লেখকের সমস্ত লেখা পড়ে ফেলার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। ১৮৮৩-এর গ্রীষ্মে ভাই থেওকে লেখা চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন, “দ্য বোকও জোলার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন। ” তিনি থেও-র এর কাছে আরো জানতে চান যে, সে দ্য গোঙ্কু ভ্রাতৃদ্বয় (জুল এবং এডম- দ্য গোঙ্কু) রচিত ‘জারমিনি ল্যাসারতো’ বইটি সম্পর্কে জানে কিনা। তিনি বইটি সংগ্রহের চেষ্টা করছেন, কারণ “এটি একটি সুলিখিত বই হবার কথা, অনেকটা জোলার রীতিতে। ”

দ্য হেগের সমসাময়িক অন্যান্য শিল্পীদের মধ্যে কারো কারো সঙ্গে সাহিত্য এবং চিত্রশিল্প-এর মধ্যেকার সম্পর্ক বিষয়ে ভিনসেন্ট ভিন্ন মত পোষণ করতেন। উদাহরণস্বরূপ উল্লেখ করা যেতে পারে ভ্যান গঘ কর্তৃক শিল্পী মোভের সমালোচনা যখন মোভ তৎকালীন ব্রিটিশ চিত্রশিল্পকে সাহিত্যিক শিল্প বলে নাক সিটকানোর চেষ্টা করেন। কারণ, ভ্যান গঘের মতে ডিকেন্স, এলিয়ট, শার্লত ব্রনতে এবং বালযাকের মতো শিল্পীরা আসলে বিস্ময়করভাবে “জীবন্ত”। কোন লেখকই চার্লস ডিকেন্স-এর মতো এতো নিখুঁত “একজন চিত্রশিল্পী এবং নকশাবিদ নন” বলে তিনি মনে করতেন। এরকম একটি চিঠিতে এ বিষয়ে তিনি বলেন, “আমি ডিকেন্সের সব লেখা পছন্দ করি। তবে শিশুদের জন্য লেখা তাঁর দুটি বই (‘এ ক্রিস্টমাস ক্যারল’ এবং ‘দ্য হন্টেড ম্যান এ- দ্য গোস্ট’স বার্গেইন’) আমার শৈশবকাল থেকে প্রায় প্রতি বছর পড়ে আসছি এবং প্রতিবার পড়ার সময় বইগুলিকে একই রকম নতুন লাগে। ” বলাবাহুল্য, ভিক্টোরিয়ান যুগের সাহিত্যিকদের মধ্যে ডিকেন্স আমার অন্যতম প্রিয় লেখক বলে প্রিয় শিল্পীর সঙ্গে পছন্দের এই যোগাযোগ মনে এক অভূতপূর্ব আনন্দের কারণ ঘটায়- যা কোনো শব্দ দিয়ে প্রকাশ করা সম্ভব নয়। সাহিত্যিক রুচি বাছাইয়ের ক্ষেত্রে বিভিন্ন যুগের শিল্পী-কবি-লেখকদের সঙ্গে মানসিক একাত্মতার এই ব্যাপারগুলি আমার কাছে সবসময়ই রহস্যপূর্ণ মনে হয়। একই সঙ্গে যা দেশ-কাল-পাত্র ভেদে সর্বজনীন অনুভূতিজনিত ধারণাটিকে চোখের সামনে নিয়ে আসে।

ফ্রান্সের দক্ষিণে অবস্থিত আর্লেস অঞ্চলে যাবার আগ পর্যন্ত ভিনসেন্ট-এর বই পড়ার এই অভ্যাস অটুট ছিল বলে তাঁর আরো দুয়েকটি চিঠি থেকে জানা যায়। এভাবে ভিক্তর উগোসহ অন্যান্য পুরোনো প্রিয় লেখকদের প্রতি তাঁর ভালো লাগা অব্যাহত ছিল এবং এ প্রসঙ্গে দ্য হেগ-এর সমকালীন অন্যান্য সহশিল্পীদের বিরূপ মতের ব্যাপারে তেমন কোন আগ্রহ বা উৎসাহ বোধ করতেন না। ভ্যান গঘ উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন যে, লেখক এবং শিল্পীদের বিষয়ে তাঁর মতামত অনেকটা আবেগপ্রসূত এবং পুরনো ধাঁচের; তবে তিনি থমাস কার্লাইল কর্তৃক সংজ্ঞায়িত শ্রেষ্ঠত্বের ধারণার বিষয়ে আগ্রহী ছিলেন। বন্ধু আন্থন ভ্যান রাপার্ড-এর কাছে অনেকটা দুঃখ করেই তিনি লিখেছিলেন, “বালযাক এবং ডিকেন্সের দিনগুলি, অথবা গাভারনি এবং মিলে এর সময়কাল, আজকের দিনে তা খুঁজে পাওয়া কঠিন। ” ফরাসি অনুবাদে তাঁর কাছে ডিকেন্স-এর প্রায় সবগুলি বই ছিল। আর জোলাকে তিনি দ্বিতীয় বালযাক মনে করতেন যা ওই সময় পাঠক সমাজে একটি সাধারণ ধারণা হিসেবে চালু ছিল।

এভাবে ভ্যান গঘ অতীত আর বর্তমানের ভেতরে একটি যোগসূত্র তৈরি করে নিতে পারতেন এবং সেটি তিনি তাঁর সারাটা জীবন ধরেই করে গেছেন; যদিও এ জীবনের পরিধি ছিল নিতান্তই সংক্ষিপ্ত। মাত্র সাঁইত্রিশ বছরের শেকলে আটকে যাওয়া একটি ক্ষুদ্র আয়ুষ্কাল। আর্লেস-এ থাকার সময় বোন উইলেমকে লেখা এক চিঠিতে তিনি তাকে ফরাসি বাস্তববাদী লেখকদের লেখা পড়বার পরামর্শ দেন যাঁদের লেখা তিনি নিজে অত্যন্ত পছন্দ করতেন। সে সময় ভ্যান গঘ বালযাক-এর লেখাগুলি পুনরায় পড়ছিলেন। সঁ হেমি নামক স্থানে অবস্থিত মানসিক হাসপাতালে চিকিৎসা গ্রহণের সময় তিনি শেক্সপিয়রের ঐতিহাসিক নাটকগুলি আবার পড়তে শুরু করেন। যদিও ওভেরস অঞ্চল থেকে লেখা ভিনসেন্টের শেষ চিঠিগুলিতে বই বিষয়ে কোন কথার উল্লেখ নেই; তারপরও নিঃসন্দেহেই বলা যায়, বই বা পাঠাভ্যাস থেকে তিনি দূরে ছিলেন না মোটেও।

শেষদিকের চিঠিতে উল্লেখ না থাকলেও বইয়ের উপস্থিতি শিল্পীর জীবনে সবসময় ছিল। এটি ছিল তাঁর দীর্ঘদিনের পাঠাভ্যাসের ফল। এসবের নমুনা হিসেবে ভিনসেন্ট এর আঁকা বিখ্যাত কিছু চিত্রকর্মে উপকরণ হিসেবে বইয়ের উপস্থিতির কথা না বললেই নয়। ‘ড. গাশের পোর্ট্রেট’ শীর্ষক চিত্রকর্মে দ্য গোঙ্কু ভ্রাতৃদ্বয়ের দুটি উপন্যাসের নাম তিনি পরিষ্কারভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন: একটি হচ্ছে ‘মানেত সালোমন’ যেটি ওই সময় দ্য হেগ-এর প্রত্যেক শিল্পীর স্টুডিওতে সোফার আশেপাশে শোভা পেতো; আরেকটি হচ্ছে ‘জারমিনি ল্যাসারতো। ’ এভাবে ভ্যান গঘ বিশেষত এই ফরাসি লেখক ভ্রাতৃদ্বয়ের প্রতি গভীর ভালোবাসা প্রদর্শনের পাশাপাশি সাধারণভাবে শিল্পের সত্য হিসেবে ফরাসি বাস্তববাদী সাহিত্যিক মতবাদের প্রতি তাঁর একনিষ্ঠ অনুরাগেরও প্রকাশ ঘটান।

এসব লেখায় তিনি একটি বিষয়ই ভীষণ অপছন্দ করতেন আর তা হলো এগুলোতে ফুটে ওঠা তিক্ততা, নিষ্ঠুরতা বা আবেগহীনতার নিষ্করুণ বাস্তবানুগ প্রতিচ্ছবি। দ্য গোঙ্কু অথবা জোলার লেখায় হাস্যরসের কোন হদিস পাওয়া যেতো না। অথচ ভ্যান গঘের বিশেষ প্রয়োজন ছিল হাসি-ঠাট্টা বা কৌতুকের মতো জীবনের হাল্কা মেজাজের বিষয়গুলি। সেদিক থেকে ভলতেয়ার রচিত ‘ক্যান্ডিড’ (১৭৫৯) এর পানগ্লোসকে শিল্পীর নায়ক বলে অভিহিত করা যায়। ‘মেটাফিজিকো-থেওলজিকো-কোজমলজি’র এই শিক্ষক দারুণ মুনশিয়ানায় দেখিয়ে দেন যে, সম্ভাব্য সবচেয়ে উৎকৃষ্ট মানের পৃথিবীতে সবকিছুই ভালোর জন্য। ভিনসেন্ট-এর চিঠিগুলিতে পানগ্লোসের সঙ্গে পরবর্তীতে যোগ দেন তারতারান দ্য তারাসকোন, ফরাসি লেখক আলফোনসে দোদে কর্তৃক সৃষ্ট একটি বিখ্যাত চরিত্র যার মধ্যে স্প্যানিশ লেখক সারভেন্তেসের অমর সৃষ্টি দন কিহোতে আর সাঁচো পাঁযা আধাআধিভাবে মিশে আছে।

ভ্যান গঘের জীবনে বাস্তববাদী দর্শনের প্রভাব ব্যাখ্যা করতে সমসাময়িক আরেকজন বিখ্যাত শিল্পী ও তাঁর বন্ধু পল গগাঁ কর্তৃক বর্ণিত একটি ছোট ঘটনার উল্লেখ করা যেতে পারে। শিল্পীর আঁকিয়ে জীবনে গগাঁর সরব উপস্থিতি সম্পর্কে নতুন করে বলবার কিছু নেই। একবার প্যারিসে পাঁচ ফ্রাঁর বিনিময়ে ভিনসেন্ট তাঁর একটি শিল্পকর্ম বিক্রয় করবার সুযোগ পেয়েছিলেন। নিজে নিদারুণ অর্থ-কষ্টে থাকলেও ওই সামান্য উপার্জনটুকুও তিনি তাঁর চেয়েও খারাপ অবস্থায় থাকা এক দেহপসারিণীর হাতে নির্দ্বিধায় তুলে দেন আর অভুক্ত পেটে নিজের এই বদান্যতায় নিজেই লজ্জা পেয়ে পালিয়ে যান। শিল্পীর এই অদ্ভুত আচরণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে গগাঁ বলেন, সুপাঠক হিসেবে ভিনসেন্টের ওই সময় এডম- দ্য গোঙ্কু কর্তৃক রচিত ‘লা ফি এলিসা’ (‘এলিসা নামের মেয়েটি’)-র চরিত্রটির কথা মনে হয়েছিল। গগাঁ সম্ভবত গল্পটি বানিয়েই বলেছিলেন ধরে নেওয়া হলেও ঘটনাটি নিঃসন্দেহে একটি কাল্পনিক চরিত্রের সঙ্গে শিল্পীর একাত্ম হয়ে যাবার মানবিক সামর্থ্যরে দিকটি ফুটিয়ে তোলে এবং সেটি ভ্যান গঘের জীবনে ঘটে যাওয়া এ ধরনের ব্যবহারের একটি বিচ্ছিন্ন উদাহরণমাত্র নয়।

দ্য গোঙ্কু ভ্রাতৃদ্বয়, এমিলি জোলা এবং আরও কয়েকজন লেখক কর্তৃক প্রচলিত বাস্তববাদ তত্ত্বের একজন একনিষ্ঠ অনুরাগী ছিলেন ভিনসেন্ট। ১৮৮২ সালের দিকে দ্য হেগ এ থাকাকালীন এই লেখকদের সঙ্গে শিল্পীর পরিচয় ঘটে। এ সমস্ত বিষয় আলোচনার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হিসেবে পাওয়া যায় শিল্পীর পিতার উপস্থিতি যিনি ইতিমধ্যে তাঁর পুত্রের পাঠরুচি নিয়ে দ্বিমতসূচক সমালোচনা করেছেন। পিতার মৃত্যুর অব্যবহিত পরে ভিনসেন্ট-এর আঁকা একটি গম্ভীর স্থিরচিত্রে স্পষ্টতই তাঁদের পিতা-পুত্রের সম্পর্কের বৈপরীত্যের দিকটি পরিষ্কার হয়ে ওঠে। ছবিটিতে অঙ্কিত দুটি বই, একটি বিশাল উন্মুক্ত বাইবেলের পাশে জোলার ‘লা জোয়া দ্য ভিভর’ (‘জীবনের আনন্দ’) যথাক্রমে পিতা এবং পুত্রের বিপরীতধর্মী পছন্দের বিষয়টি জোরালোভাবে জানান দেয়। ছবিটি একই সঙ্গে মৃত্যুর অনিবার্যতা সম্পর্কিত একটি তীক্ষè নিরাবেগ স্মরণিকা নির্দেশ করার পাশাপাশি আধুনিক কালের প্রতি বিশ্বাসকেও প্রতিফলিত করে।

কিছু কিছু প্রিয় বই পুনঃপাঠের পাশাপাশি ভ্যান গঘ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই জোলার ‘দ্য মাস্টারপিস’ (L’Oeuvre) শীর্ষক উপন্যাসটি পড়তে শুরু করেন। ফরাসি সাহিত্যের সাম্প্রতিক ধারা বা প্রবণতার সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকবার জন্য তিনি তাঁর সাধ্যমতো চেষ্টা করতেন এবং এ উদ্দেশ্যে তিনি পত্রিকায় প্রকাশিত আলোচনাসমূহ ছাড়াও প্যারিস থেকে পাঠানো ভাই থেও-এর খবরের ওপর নির্ভর করতেন।

ফ্রান্সে থাকাকালীন বোন উইলহেলমিনা জাকোবা-এর কাছে লেখা চিঠিগুলি থেকে সবচেয়ে ভালোভাবে ভ্যান গঘের সাহিত্যিক চিন্তাভাবনা সম্পর্কে একটি পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায়। বয়সে ছোট হলেও উইল ভাইয়ের কাজের প্রতি আগ্রহ দেখাতেন। আর ভাই ভিনসেন্টও তাঁর শিল্পকর্মে কী অর্জন করতে চাচ্ছেন সে বিষয়ে বোনের কাছে ধৈর্য সহকারে ব্যাখ্যা করতেন। তিনি উইলের সাহিত্যিক পরামর্শকও ছিলেন এবং তাঁকে ফরাসি বাস্তববাদী লেখকদের বই পড়ার ওপর জোর দিতেন। ব্যাপারটি বেশ অস্বাভাবিক এই কারণে যে সাধারণভাবে ওই সময় মহিলাদের কাছে সুপারিশ করবার জন্য জোলাকে উপযুক্ত লেখক বিবেচনা করা হতো না। এ প্রসঙ্গে ছোট ভাই থেও-এর একটি চিঠির কথা উল্লেখ করা যায় যেটি তিনি ক্যারোলিন ভ্যান স্টোকাম-হানেবিক নামের এক ভদ্রমহিলাকে লিখেছিলেন। দ্য হেগ-এ থাকাকালীন ক্যারোলিনের সঙ্গে দুই ভাইয়ের বন্ধুত্বের সম্পর্ক ছিল। ১৮৮৭ সালে প্যারিস থেকে লেখা সেই চিঠিতে তৎকালীন সমাজে ব্যাপকভাবে প্রচলিত রুচিবাগীশ ধারণার প্রতি নির্দেশ করে থেও লিখেন, “এটা ভেবে আমার ভীষণ খারাপ লাগে যে এতো দারুণ সব বিষয় লেখা হয়েছে অথচ সেগুলি নিয়ে কেউ খুব কমই আলোচনা করবার সুযোগ পায়, অন্ততপক্ষে মহিলাদের সঙ্গে তো নয়ই। জোলা, গী দ্য মোপাসাঁর মতো অন্যরা আরো অনেক কাল ধরে নিষিদ্ধ ফলের মতোই বিবেচিত হতে থাকবেন। ” অন্যদিকে, পিয়ের লোতি নামের একজন লেখক যথেষ্ট মার্জিত বলে গণ্য হতেন- যার লেখা ভিনসেন্ট আগ্রহ নিয়ে পড়তেন।

প্রিয় বোনকে তাঁর পাঠাভ্যাসের ব্যাপারে পরামর্শ দিতে গিয়ে ভিনসেন্ট সামাজিকভাবে প্রচলিত রুচিশীলতার ধারণা নিয়ে খুব একটা চিন্তিত ছিলেন না বলে ধরে নেওয়া যায়। যদিও তিনি তাঁর বোনের সাহিত্য-প্রীতি উৎসাহিত করবার জন্য নিজে থেকে তেমন কিছুই করেননি, তথাপি তাঁর লেখা চিঠিগুলি থেকে একটি প্রাণবন্ত ভাব বিনিময়ের সুস্পষ্ট চিত্র পাওয়া যায়। বলা প্রয়োজন, বোন উইলহেলমিনাই ভাই ভিনসেন্ট-এর সঙ্গে এই চিঠি আদান-প্রদানের কাজটি শুরু করেন যখন তিনি তাঁকে ‘তরুরাজি এবং বৃষ্টি’ বিষয়ে একটি ছোট্ট লেখা পাঠান। এরকম এক চিঠিতে ভিনসেন্ট স্বীকার করেন যে, তিনি ‘আঙ্কেল টম’স কেবিন’ উপন্যাসটি সর্বোচ্চ মনোযোগ দিয়ে পুনরায় পড়েছেন শুধু এ কারণে যে বইটি একজন মহিলা তাঁর বাচ্চাদের জন্য স্যুপ তৈরি করতে করতে লিখে শেষ করেছেন। অন্যদিকে, তিনি ভলতেয়ার এর ডক্টর পানগ্লোস আর ফ্লবার্ঁ-এর বুভারড ও পেকুশে নামের চরিত্রগুলির কথা উল্লেখ করেন যাদের নাকি তৎকালীন পুরুষ পাঠকদের কাছে বিশেষ আবেদন ছিল। একই সঙ্গে নারী পাঠকরা এ সমস্ত চরিত্রকে ঠিকঠাক অনুধাবন বা হৃদয়ঙ্গম করতে পারবেন কিনা সে ব্যাপারে তাঁর সংশয় প্রকাশ করেন মূলত এ বিশ্বাস থেকে যে ওই সমস্ত চরিত্রের বুদ্ধিদীপ্ত পরিহাস বা খোলামেলা হাস্যরস নারী মানসের পক্ষে গ্রহণ বা আস্বাদন করা বেশ কঠিন হবে বলেই তাঁর কাছে মনে হয়েছে।

ভ্যান গঘের ছবিতে বইয়ের দৃশ্যমান উপস্থিতি প্রসঙ্গে দুটি বিশেষ শিল্পকর্মের নাম উল্লেখ করা যায়। ১৮৮৮-৮৯ সালে আঁকা ‘দ্য আরলেজিয়েন’ শীর্ষক ছবিতে চিন্তামগ্ন নারীটির সামনের টেবিলে ফরাসি ভাষার অনুবাদে যে দুটি বই দেখা যায় তার মধ্যে প্রথমটি ‘আঙ্কেল টম’স কেবিন’ এবং দ্বিতীয়টি শিল্পীর পুরনো সহচর ডিকেন্স-এর ‘এ ক্রিস্টমাস ক্যারোল’। ছবির মহিলা ভ্যান গঘের অন্যান্য অনেক ছবির মতো সরাসরি জীবন থেকে নেওয়া কোনো বিশেষ চরিত্র নয়। এটি বরং বন্ধু গগাঁর একটি ড্রয়িং থেকে ধার করা ‘আইডিয়া’। ‘দ্য নভেল রিডার’ নামের ১৮৮৮ সালের আরেকটি চিত্রকর্মেও ভ্যান গঘ গগাঁর ধারণা ব্যবহারের চেষ্টা করেন। গগাঁর অনুরূপ ছবির মতো ভ্যান গঘের ছবির উপন্যাস পাঠিকাকেও একটি পাঠাগারে পাঠরত অবস্থায় দেখতে পাওয়া যায়। শিল্পরীতির সাদৃশ্য ছাড়াও অঙ্কনের বিষয়বস্তু একই এবং মনে করা অসঙ্গত হবে না যে, ছবির নারী সমসাময়িককালে পঠিত কোন একটি ফরাসি পেপারব্যাক উপন্যাস হাতে নিয়ে পড়ছেন- যা বইটির সুস্পষ্ট হলুদ জ্যাকেট কাভার থেকে প্রতীয়মান হয় এবং যা প্রায়শই ভ্যান গঘের শিল্পকর্মে দেখা যায়।

ভিনসেন্ট একজন ক্লান্তিহীন পাঠক এবং পত্রলেখক ছিলেন। ‘বিশাল প-িত ব্যক্তি’ হিসেবে যেমনটা একজন প্রত্যক্ষদর্শী তাঁকে বর্ণনা করেছেন। গগাঁ পরবর্তীতে লিখেছেন, “দোদে, দ্য গোঙ্কু, বাইবেল, এসব কিছুই এই ডাচ মস্তিষ্ককে সমৃদ্ধ করেছে। ” গগাঁর কথাটি বিশেষ করে ওই সময়টার জন্য উপযুক্ত যখন এই দুই শিল্পী বন্ধু একত্রে আরলেসে কাজ করছিলেন। তারতারান দ্য তারাসকোন নামের চরিত্রটির প্রতি ভ্যান গঘের বিশেষ অনুরাগ ছাড়াও দোদের লেখা পড়বার অন্যতম প্রধান কারণ ছিল তাঁর বেশ কিছু গল্পের পটভূমি ফ্রান্সের দক্ষিণ অঞ্চল কেন্দ্রিক যেখানে শিল্পী তাঁর জীবনের সবচেয়ে ফলপ্রসূ সময় কাটিয়েছেন।

বাস্তববাদী লেখকদের মধ্যে দোদের লেখা দ্য হেগ-এ বাস করার সময় থেকেই ভিনসেন্ট উপভোগ করতেন; তবে যে লেখকের নাম বারবার তাঁর চিঠিতে এসেছে তিনি এমিলি জোলা। সবচেয়ে বেশি সংখ্যক, প্রায় একশো বারের মতো জোলার উল্লেখ আছে তাঁর চিঠিগুলিতে যার মধ্যে চল্লিশটিতে কোন বিশেষ বইয়ের নাম বলা হয়নি। জোলা, মিশেলে এর মতো ফরাসি লেখকবৃন্দ ভ্যান গঘের পাঠ-রুচি তৃপ্ত করতে পেরেছিলেন যেরকমটা অতীতে করেছিলেন ইংরেজ লেখক ডিকেন্স, খানিকটা কম মাত্রায় হলেও।

বাস্তববাদী লেখকদের পূর্বসূরি বালযাকও ভ্যান গঘের পড়ার তালিকায় একটি বিশেষ স্থান দখল করেছিলেন। ফ্রান্সের দক্ষিণে থাকাকালীন বালযাক এর সমস্ত লেখা পড়ে ফেলবার চিন্তা করেন তিনি এবং এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে আংশিক সফলও হন। অনুমান করা যায়, অল্প বয়সে ভিনসেন্ট প্রথম বালযাক পড়েন, যদিও তাঁর লেখা চিঠিপত্রে এর কোন উল্লেখ নেই যা তিনি শুরু করেছিলেন ১৮৭২ সাল থেকে। প্রথম দিকের তাঁর আরেক প্রিয় লেখক ছিলেন ভিক্তর উগো। কিন্তু এক্ষেত্রেও জানা যায় না নির্দিষ্ট ঠিক কোন সময় উগোর কোন লেখা তিনি পড়বার সুযোগ পেয়েছিলেন।

প্রকৃতপক্ষে, শুধু চিঠির ওপর ভিত্তি করে পাঠক হিসেবে ভ্যান গঘকে বিচার করবার কোন সুযোগ নেই এবং বিষয়টি বিশেষ করে কবিসহ অন্য লেখকদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। এ প্রসঙ্গে মার্কিন কবি ই টি এ হফম্যান এবং এডগার অ্যালান পো-এর কথা উল্লেখ করা যায় যাঁদের নাম শিল্পীর চিঠিতে যথাক্রমে মাত্র দুই এবং তিন বার উল্লেখ আছে মাঝখানে বেশ কয়েক বছরের ব্যবধানসহ। দ্য হেগ থেকে ভিনসেন্ট শুধু লিখেছিলেন যে মাঝেমাঝে তাঁদের লেখা তিনি উপভোগ করেছেন। আরলেস থেকে লেখা একটি চিঠিতে খুব সামান্য ইঙ্গিত থেকে অনুমান করা যায় যে, তিনি এই লেখকদের লেখায় অতিরিক্ত ফ্যান্টাসি প্রবণতা খুব একটা পছন্দ করতে পারেননি। এসব বর্ণনা/পর্যালোচনা থেকে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করবার যথেষ্ট কারণ ঘটে যে, ভিনসেন্ট ছিলেন মাটির কাছাকাছি থাকা একজন জীবনঘেঁষা মানুষ যিনি তাঁর চিন্তা-ভাবনায় এবং শিল্পকর্মে জীবনের প্রকৃত সত্যকেই, তা যত রুঢ় বা কঠিনই হোক না কেন, তুলে ধরতে চেয়েছেন এবং আজীবন সেই সত্যের অনুসন্ধানে ব্রতী ছিলেন। এ যেন কবিগুরুর ভাষায় সেই ধ্রুবসত্যের জয়গান গেয়ে যাওয়া: “ভালো-মন্দ যাহাই আসুক সত্যরে লও সহজে। ”

ফ্যান্টাসি প্রবণতার প্রতি ভিনসেন্টের সুস্পষ্ট উপেক্ষা থেকে এটি সহজে অনুমান করা যায় যে, তিনি তাঁদের ফরাসি গুরু কবি শার্ল বোদলেয়ার পড়বার পেছনে খুব একটা সময় ব্যয় করেননি। একইভাবে বোদলেয়ারের অনুসারী অন্যান্য সিম্বলিস্ট/প্রতীকবাদী লেখকদের প্রতিও তাঁর তেমন কোনো আকর্ষণ ছিল না। পত্রিকা এবং সাহিত্য সাময়িকীগুলো থেকে তিনি সাহিত্যের এই নতুন (প্রতীকবাদী) আন্দোলন সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ছিলেন, কিন্তু সঙ্গত কারণেই এসবের প্রতি তাঁর কোন আগ্রহ ছিল না।

আরও কিছু বিষয় বা লেখকের মধ্যে আধুনিক ডাচ সাহিত্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লেখক এডুয়ার্ড ডুওয়েস ডেকের সম্পর্কে সামান্য উল্লেখ পাওয়া যায় ভ্যান গঘ-এর চিঠিগুলিতে। ডেকের মুলটাটুলি ছদ্মনামে লিখতেন। ১৮৬০ সালে প্রকাশিত তাঁর ‘ম্যাক্স হাভেলার’ বইয়ে ইস্ট ইন্ডিজে ডাচ প্রশাসনের বিরুদ্ধে কঠোর সমালোচনা করা হয়।

ভ্যান গঘের পাঠাভ্যাস মাঝেমাঝে অসঙ্গতিপূর্ণ বা সামঞ্জস্যহীন মনে হলেও তাঁকে ওই সমস্ত হাতেগোনা শিল্পীদের মধ্যে একজন হিসেবে ধরা হয়/যায় যার সাহিত্যিক রুচির ধারাবাহিক ক্রমবিকাশ ধাপে ধাপে নির্ধারণ করা সম্ভব। হয়তো তাঁর পড়াশোনার পরিধি ওই অর্থে খুব অসাধারণ বা ব্যতিক্রমী কিছু নয়, তবে যা অনন্যসাধারণ তা হলো সাহিত্যের প্রতি তাঁর নিখাঁদ আবেগ বা ভালোবাসা যা দিয়ে তিনি এর অমৃত সুধা পান করেছেন আকণ্ঠ, এর নির্যাস গ্রহণ করে সাহিত্যকে করেছেন নিজের মধ্যে ধারণ। এভাবে তিনি সাহিত্যকে নিজস্ব সত্তার একটি অপরিহার্য বা অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত করেছেন এবং তাঁর কিছু শিল্পকর্মের উদ্ভাবনী চিন্তায় প্রয়োগ করেছেন। সাহিত্যের প্রতি ভিনসেন্ট এর ভালোবাসা এতোটাই অপ্রতিরোধ্য ছিল যে তাঁর কিছু পোর্ট্রেট/স্থিরচিত্র এবং স্থিরচিত্রের মধ্যে সুস্পষ্ট শিরোনামসহ প্রিয় কিছু বইয়ের নাম অন্তর্ভুক্ত করেন। যদিও বইসহ তাঁর নিজের কোন আত্ম-প্রতিকৃতি নেই।

তবে যত নিবিড়ভাবেই সাহিত্য আর শিল্প তাঁর আত্মার সঙ্গে মিশে থাকুক না কেন, ভ্যান গঘ কখনো এ দুটিকে এক করে মিলিয়ে ফেলেননি। বরং দুটিকে নিজস্ব অবস্থানে রেখে সাহিত্য ও শিল্পের চিরন্তন স্ব-মহিমার প্রতি তাঁর শিল্পী মনের প্রগাঢ় অর্ঘ্য নিবেদন করেছেন। অসাধারণ শিল্পকর্মের ¯স্রষ্টা হিসেবে কেবল নয়, একজন মার্জিত রুচিশীল নিমগ্ন পাঠক রুপে ভ্যান গঘ এর যে পরিচয় আমরা বিশেষ করে তাঁর লেখা চিঠিগুলিতে পাই, তাতে এই মহান শিল্পীর প্রতি আমাদের বিস্ময়মিশ্রিত ভালোবাসার মাত্রা কেবল বাড়তেই থাকে। জয়তু ভিনসেন্ট ভ্যান গঘ! জয়তু তোমার অমর সাহিত্যপ্রেম!

(পাঠসূত্র : ভিনসেন্ট ভ্যান গঘ বিশেষজ্ঞ এবং শিল্প-ইতিহাস বিষয়ে ডাচ অধ্যাপক এভার্ট ভ্যান ইটার্ট কর্তৃক শিল্পীর সাহিত্যিক জীবনের ওপরে লেখা বিবিধ রচনাসহ এতদসংক্রান্ত একাধিক নিবন্ধ)

  • সাব-অল্টার্ন স্টাডিজের ‘মহামারি’ ভাবনা

    মিল্টন বিশ্বাস

    newsimage

    সাব-অল্টার্ন স্টাডিজ গোষ্ঠীর অন্যতম লেখক দীপেশ চক্রবর্তীর Community, state and the body

  • করোনানিশীথে জ্ঞানদেবীর সঙ্গে

    নূরুদ্দিন জাহাঙ্গীর

    newsimage

    রাতভর জেগে চেষ্টা করছি। কিছুই লেখা হচ্ছে না। জ্ঞানদেবীও বুঝি করোনাকে ভয়

  • নিমাই সরকার

    আগুনের পরশমনি

    newsimage

    হঠাৎ করেই ভেঙেচুরে কিছু একটা পড়ার শব্দ। কী হলো, কী হলো! আর

  • অফিসে একদিন

    হাইকেল হাশমী

    newsimage

    অমিত মাত্র বি-বি-এ করেছে। কতো কষ্ট করে এই প্রতিষ্ঠানে দুইটা লিখিত পরীক্ষা তিনটি মৌখিক পরিক্ষা,

  • সাময়িকী কবিতা

    কোয়ারেন্টিনকে আমি বিসংরব বলি। তুমি তো সেই কস্মিনকাল থেকেই বিসংরবে তোমাকে জীবন্ত কবর জীবন্ত চিতায় একা রেখে

  • সোহরাব হাসানের কবিতা

    newsimage

    নারীর ভেতরে দ্রোহ দেখলেন মহান মার্কস তাঁর স্বপ্ন ছিল নারী-পুরুষের সুষম সমাজ

  • গাব্রিয়েলা মিস্ত্রালের কবিতা

    অনুবাদ : অনন্ত মাহফুজ

    newsimage

    বিষণ্ণ মা ঘুমাও, ঘুমাও, প্রিয়তম আমার চিন্তাহীন, ভয়হীন, যদিও আমার আত্মা ঘুমায় না, যদিও