menu

আবুল হাসানের কবিতায় দুঃখবোধের বৈচিত্র্য

অনন্ত মাহফুজ

  • ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ০৭ নভেম্বর ২০১৯
image

জার্মানি থেকে চিকিৎসা নিয়ে ফেরার প্রাক্কালে বিমানবন্দরে আবুল হাসান

অবশেষে জেনেছি মানুষ একা।

জেনেছি মানুষ তার চিবুকের কাছেও ভীষণ অচেনা ও একা।

দৃশ্যের বিপরীত সে পারে না একাত্ম হতে এই পৃথিবীর সাথে কোনোদিন।

(পাখি হয়ে যায় প্রাণ, রাজা যায় রাজা আসে)

মানুষের একাকিত্ব ও নিঃসঙ্গতাবোধের এমন সহজ, সাবলীল অথচ করুণ উচ্চারণ খুব কম কবিতায় চোখে পড়ে। একাকিত্ব বা নিঃসঙ্গতা বোঝানোর জন্য হাজার রকমের বাক্য পৃথিবীতে সৃষ্টি করা হয়েছে। কিন্তু আবুল হাসানের এমন পঙ্ক্তিগুলো পড়লে আমাদের ভিতরে হাহাকার করে ওঠে। মানুষের চিবুকের কাছেও মানুষ অচেনা হয়, মানুষ চেনে না নিজেকেই। আর সে কারণেও তার মহাকালের নিঃসঙ্গতা। কবি আবুল হাসানের কবিতায় আছে নিঃসঙ্গতা, অপ্রাপ্তি, সমাজ বা সমকালীন রাজনীতি নিয়ে হতাশা। আর এইসব জটিলতা তার কবিতায় দুঃখবোধের নানা ভঙ্গিমার ভিতর দিয়ে উপস্থাপিত হয়েছে।

আবুল হাসান কবিতা চর্চা করেছেন এগারো বছরের মতো। এই অল্প সময়ে নিজেকে নিজেই চিনিয়েছেন বাংলা কবিতায়। মাত্র আটাশ বছর সাড়ে তিন মাস তার জীবন। আমাদের গড় আয়ুর অর্ধেকেরও কম সময় পেয়েছিলেন কবি। আবার এই সময়টুকুর ভিতর পাড়ি দিয়েছেন শৈশব এবং কৈশোর। এই যে অল্প সময়ের জীবন আর কবিতাচর্চার সময়কাল তাতেই তিনি সৃষ্টি করে গেছেন অসাধারণ কিছু কবিতা যা মানুষের মুখে মুখে ফেরে। আবুল হাসান জন্মেছিলেন ১৯৪৭ সালের ৪ আগস্ট আর মৃত্যুবরণ করেন ১৯৭৫ সালের ২৬ নভেম্বর। গত শতাব্দীর ষাটের দশকে তার কবিতাচর্চার শুরু। বাংলাদেশের ইতিহাসে এক উন্মাতাল কাল। কবির জন্মসালে ঘটে গেছে উপমহাদেশের সবচেয়ে বিয়োগাত্মক ঘটনা, দেশভাগ।

আমাদের গড় আয়ুর অর্ধেকেরও কম সময় পেয়েছিলেন কবি। আবার এই সময়টুকুর ভিতর পাড়ি দিয়েছেন শৈশব এবং কৈশোর। এই যে অল্প সময়ের জীবন আর কবিতাচর্চার সময়কাল তাতেই তিনি সৃষ্টি করে গেছেন অসাধারণ কিছু কবিতা যা মানুষের মুখে মুখে ফেরে

মৃত্যুকালও সাক্ষী হয়ে আছে এক অন্ধকার সুড়ঙ্গের পথে যাত্রার। জন্মের পর দেখেছেন আরেক উপনিবেশ, পাকিস্তান নামক মৌলবাদী রাষ্ট্রের জাঁতাকলের নিচে স্বদেশ। রাজনৈতিক আর অর্থনৈতিক শোষণ, ভাষা-সংস্কৃতির উপর কুঠারাঘাত এবং সার্বিকভাবে বাঙালির স্বাতন্ত্র্য বিনাশের চক্রান্ত। আবুল হাসান এগারো বছরের কাব্যচর্চায় লিখেন রাজা যায় রাজা আসে, যে তুমি হরণ করো এবং পৃথক পালঙ্ক। অনেক কবিতা তিনি কোনো গ্রন্থভুক্ত করে যেতে পারেননি। পরবর্তীতে কবিতাগুলো অগ্রন্থিত কবিতা আকারে প্রকাশ পেয়েছে।

ষাটের দশকের মধ্যভাগে আবুল হাসান কবিতার রাজ্যে পা রাখেন। এভাবে আসলে বলা যায় না যে, তিনি অমুক সময়ে বা অত সালে কবিতা লেখা শুরু করেন। শিল্পের চর্চা সহজাত। না হলে হুট করে মধ্য-ষাটে আবুল হাসান কবিতা চর্চা শুরু করে দিলেনÑ এ রকম সরলায়ন যৌক্তিক নয়। আবুল হাসান আপাদমস্তক কবি, সারাজীবন ধরে কবি, হয়ত জন্ম থেকেই। তবু এ রকম তো বলতেই হয় যে, তার প্রথম কবিতাগ্রন্থ রাজা যায় রাজা আসে প্রকাশিত হয় ১৯৭২ সালে। আবুল হাসান হঠাৎ কবি নন, তিনি আজন্ম কবি। তিনি কবিতার যুবরাজ। এটিও সত্য, আবুল হাসানের কবিতায় দুঃখবোধ খোঁজার প্রয়াস এই নয় যে, কবির ব্যক্তিগত বেদনাবোধ, অপ্রাপ্তি বা নিঃসঙ্গতা তুলে ধরা। দুঃখবোধ এক অর্থে শৈল্পিকতাও। আবুল হাসান সময়ের কবি, সামাজিক দায়বদ্ধতার কবি। সময় ও সামাজিক দায় চিন্তা ও চেতনায় থাকলে, অন্তত আমাদের সমাজে, কষ্টের অভাব থাকবার কথা নয়। কবির প্রথম কবিতাগ্রন্থ রাজা যায় রাজা আসে-এর নামের মধ্যেও সময়ের আঁচ আছে। আর সেটি তো সচেতনভাবেই করা। এ গ্রন্থে নিজের নাম শিরোনাম করে লেখা কবিতা থেকে যদি তুলে ধরা যায় :

আমি বহুদিন একা একা প্রশ্ন করে দেখেছি নিজেকে,

যারা খুব হৃদয়ের কাছাকাছি থাকে, যারা এ ঘরে ও ঘরে যায়

সময়ের সাহসী সন্তান যারা সভ্যতার সুন্দর প্রহরী

তারা কেউ কেউ বলেছে আমাকে-

এটা তোর জন্মদাতা জনকের জীবনের রুগ্ন রূপান্তর,

একটি নামের মধ্যে নিজেরি বিস্তার ধরে রাখা,

তুই যার অনিচ্ছুক দাস।

(আবুল হাসান, রাজা যায় রাজা আসে)

একই কবিতায় তার পরের পঙ্ক্তিগুলোয় আবুল হাসান নিজেকে নিয়ে আরও দ্বিধান্বিত, মানুষ হিসেবে নিজের অস্তিত্বে নিজেই টান দিয়েছেন :

হয়তো যুদ্ধের নাম, জ্যোৎস্নায় দুরন্ত চাঁদে ছুঁয়ে যাওয়া,

নীল দীর্ঘশ^াস কোনো মানুষের।

সত্যিই কি মানুষের?

উত্তরাধিকার হিসাবে নিজের অবস্থানটি খুব দুর্বল এবং আশেপাশের মানুষগুলো তা তাকে স্মরণ করিয়ে দেয়। নিজের মনুষ্য অস্তিত্ব নিয়ে সন্দিহান কবি। তার ভিতরের এই সংশয়ের পশ্চাতের কারণগুলো কমবেশি আমাদের জানা। এই যে আবুল হাসান, হয়ত ‘মানুষের সাথে সম্পর্কিত ছিল’ এবং ভালোবেসেছিল ‘যুবতীর বামহাতে পাঁচটি আঙুল’ কিংবা ‘আলোর ইশকুল’ সেই আবুল হাসান পরের কবিতায় ভালোবাসার স্বীকৃতি চান :

আমি আমার ভালোবাসার স্বীকৃতি চাই

স্বীকৃতি দে, স্বীকৃতি দে, স্বীকৃতি দে,

মৃত্যুমাখা মাটির উপর দাঁড়িয়ে আছি একলা মানুষ,

বেঁচে থাকার স্বীকৃতি চাই,

স্বীকৃতি দে, স্বীকৃতি দে, স্বীকৃতি দে।

(স্বীকৃতি চাই, রাজা যায় রাজা আসে)

কবি দেখেছেন দেশভাগের ক্ষত তখনও দঘদঘে ঘায়ের মতো। এই ক্ষত, আমরা জানি, শুকাবার কিংবা সেরে উঠবার নয়। মানুষের মাঝে থেকে মানুষ ভীষণ একা হয়ে যাওয়ার বয়ান “পাখি হয়ে যায় প্রাণ” কবিতায় পাওয়া যায় :

স্মরণপ্রদেশ থেকে এক একটি নিবাস উঠে গেছে

সরজু দিদিরা ঐ বাংলায়, বড়ভাই নিরুদ্দিষ্ট,

সাইকেলের ঘণ্টাধ্বনি সাথে করে নিয়ে গেছে গাঁয়ের হালট।

হারাতে হারাতে মানুষের থাকে না কিছুই। আত্মীয় হারানোর বেদনা মানুষের শূন্যতাবোধের মাতৃস্বরূপ। স্মরণপ্রদেশ থেকে কাছের মানুষের নিবাস উঠে যাবার পর সাইকেলের ঘণ্টাধ্বনি সাথে করে নিয়ে যায় গাঁয়ের হালট। এর পর যে অপার নিঃসঙ্গতা ঘিরে থাকে কবির চারপাশ তা থেকে আজন্ম তার মুক্তি মিলে না। সরজু দিদি তার ভিতর গভীর নিঃসঙ্গতা বোধের জন্ম দেয়।

কবিতায় অহেতুক দুর্বোধ্যতা সাম্প্রতিক সময়ের। গত শতাব্দীর শেষের দিকে শুরু হয়ে শূন্য দশকে এসে পূর্ণতা লাভ করা বাংলাদেশের কবিদের কবিতার মধ্যে দুর্বোধ্যতা নিয়ে বিতর্ক আছে। এই যে দুর্বোধ্যতা তা কিন্তু ঢালাওভাবে সবার জন্য সত্য নয়। সময়ের চলমানতার সঙ্গে শিল্প-সাহিত্যে নানা বাঁকবদল হয়। এটি শিল্পের ধর্ম। ষাটের দশকের কবি আবুল হাসান সহজ সরল এবং খুব চেনা আটপৌরে শব্দ দিয়ে কবিতা নির্মাণ করেন :

মৃত্যু আমাকে নেবে, জাতিসংঘ আমাকে নেবে না,

... ... ...

আমাদের জীবনের অর্ধেক সময় তো আমরা

সঙ্গমে আর সন্তান উৎপাদনে শেষ কোরে দিলাম,

সুধীবৃন্দ, তবু জীবনে কয়বার বলুনতো

আমরা আমাদের কাছে বোলতে পেরেছি

ভালো আছি, খুব ভালো আছি?

(জন্ম মৃত্যু জীবনযাপন, রাজা যায় রাজা আসে)

আবুল হাসানের কবিতার বিষয়বস্তু বিস্তর। নিজেকে দিয়ে খুঁটিয়ে উপলব্ধি করেছেন মানুষের অন্তর্গত নিঃসঙ্গতা এবং এর বহুমাত্রিক বেদনা। এ কারণে প্রেম ও বিরহ, বৈচিত্র্যময় মানুষ ও তার মনোজাগতিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া, প্রকৃতি তার কবিতার বিষয় হয়ে এসেছে। তিনি লিখেছেন আমাদের মুক্তিযুদ্ধ, যুদ্ধ পরবর্তী এ দেশের মানুষের কষ্ট ও সংগ্রাম, সমসাময়িক ঘটনা, আকাক্সক্ষা আর অতৃপ্তি, পাওয়া-না পাওয়া এবং সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকা নিয়ে। তার সব উচ্চারণই আসলে বেদনার মধ্য দিয়ে। আমরা হয়ত বুঝে যাই কেন তিনি ‘দুঃখের এক ইঞ্চি জমিও’ অনাবাদি রাখতে চান না। পাঠকও কবির সঙ্গে লীন হন:

ও জল, ও বৃক্ষ, ও রক্তপাত, রাজনীতি ও নিভৃতি, হরিৎ নিভৃতি

পুনর্বার আমাকে হোমার করো, সুনীতিমূলক এক থবোথবো দুঃখের

জমিন আমি চাষ করি এ দেশের অকর্ষিত অমা!

(কালো কৃষকের গান, যে তুমি হরণ করো)

তবে তিনি অন্ধ হোমারের গভীর চেতনাবোধের দ্বারা অথবা বলা যায় বাইরের চোখ দুটো বন্ধ করে মানুষের ভিতরে ডুব দিতে চান যেখানে মুক্তোর মতো কষ্ট থেকে যায় :

কোথায় ঘোরে সারা দুপুর, ক্লান্ত কিশোর কোথায় ঘোরে?

বুকের মধ্যে কিসের একটা কঠিন দুঃখ রুক্ষ দুপুর শাসন করে,

কিশোর তুমি তার ভিতরে বসেই তাকে বাড়ি ফেরো না... বাড়ি ফেরো না!

(ক্লান্ত কিশোর তোমাকে ভীষণ ক্লান্ত দেখায়, রাজা যায় রাজা আসে)

রাজা যায় রাজা আসে কাব্যগ্রন্থ স্বাধীন বাংলাদেশে প্রকাশিত। তখন বাংলাদেশ মাত্র স্বাধীনতা অর্জন করেছে। এর জন্য দেশকে ত্যাগ করতে হয়েছে লক্ষ লক্ষ প্রিয় সন্তানদের। মা এবং বোনেদের সম্ভ্রম, তাজা প্রাণ আর প্রকৃতি এবং ভৌত সব অবকাঠামো বিরাণ। এমন সময়ে আবুল হাসান নিজের মাকে উৎসর্গ করেন তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ। উৎসর্গে লেখা হয় : আমার মা আমার মাতৃভূমির মতো অসহায়। মা এবং দেশ কবির কাছে একাকার। সদ্যোজাত স্বদেশ দারুণ অসহায় তখন। যে তুমি হরণ করো প্রকাশিত হয় প্রথম গ্রন্থ প্রকাশের দুই বছর পর। উৎসর্গ করা হয় বর্তমান সময়ের বাংলার অন্যতম প্রধান কবি নির্মলেন্দু গুণকে। উৎসর্গে লিখেন, “আমরাই তো একমাত্র কবি, আমার উদ্বাস্তু-উন্মূল যৌবনসঙ্গী নির্মলেন্দু গুণ-কে।” দুটো কাব্যগ্রন্থের উৎসর্গপত্র দুটো অবশ্যই আলোচনার দাবি করে কিছুটা। মা আর স্বদেশের অসহায়ত্ব এবং সমসাময়িক আরেক কবির সঙ্গে হৃদ্যতার সম্পর্কটি তখনকার সময়কে হাজির করে পাঠকের সামনে। নির্মলেন্দু গুণ এখনো লিখে চলেছেন দুই হাতে। আবুল হাসানকে থামতে হয়েছে ঊনত্রিশ বছরের কম সময়ে। খুব কম সময়ে চেলে গেছেন আবুল হাসান।

যে তুমি হরণ করো কাব্যগ্রন্থে জায়গা পেয়েছে চল্লিশটি কবিতা। এই যে চল্লিশটি কবিতা তার প্রায় সবগুলোতে প্রবাহিত বেদনার নীল ধারা। কবি ব্যক্তিগত বেদনাবোধ, নিঃসঙ্গতা কিংবা অপ্রাপ্তিবোধ দিয়ে কবিতার শরীর ভারি করে তোলেন না। সে রকম কিছু হলে হয়ত সেগুলো কবিতা হয়ে উঠত না। কবির উপস্থাপন চারপাশের। ব্যক্তি, সমাজ আর রাজনৈতিক অবস্থান থেকে কবি দেখেন। আবার দেখেন ভিতর থেকে ভিতরে। তাই কবি দেখানও। এই দেখা আর দেখানোর কাজটা আবুল হাসান বেশ সুচারুভাবে করতে পেরেছেন। “কালো কৃষকের গান”, “পরাজিত পদাবলী”, “পাতকী সংলাপ” এবং “ঘুমোবার আগে” পাড়ি দিয়ে আমরা এসে পড়ি ‘নিঃসঙ্গতায়’ :

অতটুকা চায়নি বালিকা!

অত শোভা, অত স্বাধীনতা!

চেয়েছিল আরো কিছু কম,

... ... ...

একটি জলের খনি

তাকে দিক তৃষ্ণা এখনি, চেয়েছিল

একটি পুরুষ তাকে বলুক রমণী!

(নিঃসঙ্গতা, যে তুমি হরণ করো)

যে তুমি হরণ করো কাব্যগ্রন্থের কষ্টপ্রবাহ পাঠককে আলোড়িত করে। হয়ত এ কারণে আবুল হাসানের কবিতা ব্যাপক জনপ্রিয়তাও পায়। কিছু কিছু কবিতা আবৃত্তির জন্য দারুণ যোগ্য হয় এবং মানুষের ঠোঁটে ঠোঁটে ফিরতে থাকে। বহুবার বহু জায়গায় এই কবিতাটি শোনা হয়েছে :

আমার এখন নিজের কাছে নিজের ছায়া খারাপ লাগে

রাত্রি বেলা ট্রেনের বাঁশি শুনতে আমার খারাপ লাগে

জামার বোতাম আটকাতে কী কষ্ট লাগে, কষ্ট লাগে

তুমি আমার জামার বোতাম অমন কেন যত্ন করে লাগিয়ে দিতে?

(আমি অনেক কষ্টে আছি, যে তুমি হরণ করো)

আবুল হাসানের তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ পৃথক পালঙ্ক প্রকাশিত হয় ১৯৭৫ সালে। আগের কবিতাগুলোয় যে হৃদয়ছেঁড়া বেদনার প্রবাহ দেখা যায়, এ কাব্যগ্রন্থের কিছু কবিতায় তা থেকে ঘুরে দাঁড়াতে চান আবুল হাসান :

মারী ও বন্যায় যার মৃত্যু হয় হোক। আমি মরি নাই- শোনো

লেবুর কুঞ্জের শস্যে সংগৃহীত লেবুর আত্মার জিভে জিভ রেখে

শিশু যে আস্বাদ আর নারী যে গভীর স্বাদ

সংগোপন শিহরণে পায়- আমি তাই।

... ... ...

আমি মরি না, মরি না কেউ কোনোদিন কোনো অস্ত্রে

আমার আত্মাকে দীর্ণ মারতে পারবে না।

(নচিকেতা, পৃথক পালঙ্ক)

এই যে ঘুরে দাঁড়ানো তা-ও তো বেদনার বীজ থেকেই উৎসারিত। অনেকে হয়ত বলতেও পারেন কিছুটা সাহস সঞ্চয় করে নিজেকে প্রবোধ দেওয়ার মতোই। প্রতীক এবং সংকেতময়তার ভিতর দিয়ে কবি বলেন :

যেমন করে শস্যভিটায় শস্য ঝাড়ার সময় এলে, শস্যে কুড়োই সচ্ছলতা,

এবার আমার ঝরাপাতার শস্য হবার দিন এসছে,

শস্য কুড়োই, শস্যমাতা!

(ধরিত্রী, পৃথক পালঙ্ক)

শস্য যেন কবিকে জীবনের জয়গান গাইতে শেখায়। তার উঠোন জুড়ে সুদিনের আলোর রেখা। “যুগলসন্ধি” কবিতায় সে রকম ইঙ্গিত পাওয়া যায় :

ছেলেটি খুঁড়েনি মাটিতে মধুর জল!

ছেলেটি তবুও জীবনের গান,

মেয়েটিকে দেখি একাকী আত্মহারা!

এ রকম এবং আরও সাহসী কথা কবি বলেন “বিচ্ছেদ” কবিতায় :

আগুনে লাফিয়ে পড়ো, বিষ খাও, মরো

না হলে নিজের কাছে ভুলে যাও

এত কষ্ট সহ্য করো না।

মানুষের জীবনে নানা অপ্রাপ্তি, নিঃসঙ্গতা, দুঃখ-বেদনা থেকে মানুষ উঠে দাঁড়াতে চায়, প্রতিবাদ করে। এ এক অন্তর্গত শক্তি এবং অর্জন কারণ “মেশিনে চুল্লিতে আমি টের পাই আমার আত্মায় এক অন্য আগুন!” কিছু কিছু বিষয় কখনো কখনো নীরবে সয়ে যাওয়াও এক উত্থান :

ঝিনুক নীরবে সহো

ঝিনুক নীরবে সহো, ঝিনুক নীরবে সহে যাও

ভিতরে বিষের বালি, মুখ বুজে মুক্তা ফলাও!

(ঝিনুক নীরবে সহো, পৃথক পালঙ্ক)

ব্যক্তি আবুল হাসানের জীবনের অসম্পূর্ণতা, অসুখ এবং অপ্রাপ্তি কবিতায় উঠে এসেছে। এই প্রবণতা স্বাভাবিক। তবু কবিতায় এসবের উপস্থাপন সহজাতভাবেই আর কবির নিজের কথা থাকেনি। হয়ে গেছে মানুষের একান্ত নিজের কথা :

হা সুখী মানুষ, তোমরাই শুধু জানলে না

অসুখ কত ভালো, কত চিরহরিৎ বৃক্ষের মতো শ্যামল

কত পরোপকারী, কত সুন্দর!

(অসুখ, পৃথক পালঙ্ক)

সমাজের তথাকথিত সুখী মানুষদের অসুখের ভিতরকার সৌন্দর্য জানবার কথা নয়। এসব নিয়ে তাদের ভাববার সময়ও নেই। আবুল হাসানের সংক্ষিপ্ত কবিতার কাল বিচিত্র সব অভিজ্ঞতায় ভরা। আর এ কারণে তার কবিতার বিষয়বস্তু বিচিত্র। এই বিচিত্রতার মূল সুরটি কিন্তু দুঃখবোধ, অপ্রাপ্তি এবং নিঃসঙ্গতা। কবির আরাধ্য যে সমাজ, রাজনীতি, মানুষ ও মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্ক তার শিল্পিত রূপটি কোথাও দেখতে পাননি কবি। এ কারণে আবুল হাসানের কবিতার সরল পাঠ আমাদের ভিতর এ ধারণার জন্ম দিতে পারে যে, আবুল হাসান মূলত দুঃবোধের কবি। তবে তার কবিতার ব্যাপক পঠন সাম্প্রতিক কালের কবি এবং কবিতাপাঠকের ভিতর অন্য অনুভূতির জন্ম দিয়েছে। পাঠক জেনেছেন, আবুল হাসানের বিষয়ের ব্যাপক বৈচিত্র্যময়তা এবং এই বৈচিত্র্যময়তার এক শিল্পিত উপস্থাপন রীতি। শুধু দুঃখবোধের তকমা আবুল হাসানের প্রতি সুবিচার নয়। আবুল হাসানের কবিতার ভিতর ম্রিয়মাণ নদীর জলপ্রবাহের মতো বয়ে যায় কষ্টের মিহি স্রোতে। তার দুঃখবোধের বৈচিত্র্যময়তা কবি আবুল হাসানকে বিভিন্ন আঙ্গিকে উপস্থাপন করেছে। এ কারণে তার কবিতার চর্চা আমাদের আরাধ্য শিল্পচর্চার অন্যতম অংশও বটে।

  • বিশুদ্ধির বিরল উত্থানে সে

    ইমতিয়ার শামীম

    newsimage

    সাধারণ এক সংখ্যাই ছিল সেটা,- সাপ্তাহিক বিচিত্রার ওই সংখ্যা হয়ত এখন কোনওমতে টিকে আছে কারও ব্যক্তিগত সংগ্রহের ভিড়ে- সংগ্রাহকও

  • একাকিত্বে ও আমার একান্ত স্বজন

    মাসুদার রহমান

    newsimage

    প্রিয় কবি! এই অভিধাটি নিয়ে এ পর্যন্ত আমার কোন ভাবনা নেই। এই মুহূর্তে লিখতে বসে তা নিয়ে ভাবনা ও ধন্ধে পড়া গেল। প্রিয় কবি; এই

  • উড়াল

    মুজতাবা শফিক

    newsimage

    অফিস শেষ করে জ্যাম ঠেলে মতিঝিল থেকে বাসায় ফিরতে ফিরতে প্রায় সাতটা বেজে যায়। জামাকাপড় খুলে মুখ হাত ধুতে

  • সুহিতা সুলতানার কবিতা

    newsimage

    এমন বৃষ্টিমুখর সন্ধ্যায় স্তব্ধতা নেমে আসে দক্ষিণ দিগন্ত বেয়ে; বিশ্বাস অবিশ্বাসের জলে ভেসে বেড়ায় শাদা হাঁস যদিও ভয়ঙ্কর শীত নামেনি এখনও

  • ধারাবাহিক ভ্রমণ কাহিনি : চার

    সিমলা-মানালির পথে

    কামরুল হাসান

    newsimage

    সেন্ট্রাল বাসস্টপে যাত্রা বিরতি ১৫ মিনিট। আমি এ সুযোগে নিচে নেমে ডাবল

  • সাময়িকী কবিতা

    কখনও-সখনও, অবেলায় নদীপাড়ে, নীল প্রজাপতি