menu

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের নেপথ্যকথা

অঞ্জনা দত্ত

  • ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২০
image

’৫২-এর ২১শে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হয়ে ওঠার কাহিনি বলার আগে ভাষা সম্পর্কে দুই একটা কথা বলে নিই। স্রষ্টার মহান সৃষ্টি হিসাবে মানবজাতি অন্যান্য প্রাণি থেকে ভিন্ন হয় বিশেষত ভাষার কারণে। মানুষ কথা বলতে পারে। গাছ লতাগুল্ম, পশুপাখি যে ভাষায় তাদের ভাব বিনিময় করে তা সংজ্ঞায়িত ভাষার পর্যায়ে পড়ে না। বিভিন্ন জাতিসত্তার মনের ভাব প্রকাশ করার মাধ্যম হল তার মুখের ভাষা। সেটি আবার বিভিন্ন রকমের হয়ে থাকে। তবু যে কোনো মানুষ চেষ্টা করলে অন্য ভাষাও আয়ত্ত করতে পারে। কিন্তু পশুকুলের সাথে যদি তুলনা করি তাহলে আমরা দেখতে পাই কুকুরের ডাক বিড়াল দিতে পারে না। অথবা সিংহের মতো গর্জন বিশালদেহী জলহস্তী করতে পারে না। তাই এই রকম অনেক কিছু মিলিয়ে মানুষকে বলা হয় ‘হোমো সাপিয়েন্স’।

মানুষের ভাষার সংজ্ঞা দেয়া খুব সহজ নয়। কেননা যে কোনো বিষয়ে সংজ্ঞা দিতে হলে ভাষার প্রয়োজন হয়। তবে ভাষার একটি সংজ্ঞা এভাবে দেয়া যেতে পারে যে ভাষা হলো মানুষের মস্তিষ্কজাত একটি মানসিক ক্ষমতা যা অর্থবাহী বাকসংকেতে রূপায়িত হয়ে মানুষের মনের ভাব প্রকাশ করতে পারে এবং পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করতে পারে। মানুষে মানুষে যোগাযোগে ভাষা হলো অন্যতম মাধ্যম। প্রতিটি মানুষ ভাষা আয়ত্ত করার সহজাত বৈশিষ্ট্য নিয়েই জন্মগ্রহণ করে। এটি বাগযন্ত্রের (কণ্ঠনালী, মুখবিবর, কণ্ঠ, জিহ্বা, তালু, দাঁত, নাক, ঠোঁট ইত্যাদি) মাধ্যমে উচ্চারিত অর্থবোধক ধ্বনির সাহায্যে মানুষের মনের ভাব প্রকাশ করে। এই ভাষা বিভিন্ন জাতির, বিভিন্ন অঞ্চলের ও বিভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের জন্য ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে। যেমন, বাংলাদেশে বাঙালি সংস্কৃতির অধিকারী বাঙালিরা বাংলা ভাষায় কথায় বলে। আবার এই দেশেই বসবাসকারী অন্যান্য আদিবাসী জনগোষ্ঠী তাঁদের নিজস্ব ভাষায় কথা বলে। এই ছাড়া রয়েছে প্রতিকী ভাষা। হাত ও বাহুর মাধ্যমে যোগাযোগ করার পদ্ধতিকে প্রতীকী ভাষা বলা হয়।

ভাষাবিজ্ঞানীরা গবেষণা করে পৃথিবীব্যাপী ভাষা সম্পর্কে কতগুলো সাযুজ্য বের করেছেন যা নিম্নে দেয়া হলো-

১) যেখানেই মানুষ আছে, সেখানেই ভাষা আছে। আদিম ভাষা বলে কিছু নেই।

২) মানুষের সব ভাষাই সমান জটিল এবং মহাবিশ্বের যে কোনো ধারণা প্রকাশে সক্ষম।

৩) যেকোনো ভাষার শব্দভাণ্ডারকে নতুন ধারণা প্রকাশের সুবিধার্থে নতুন শব্দগ্রহণ করে সমৃদ্ধ করা যায়।

৪) সব ভাষাই সময়ের সাথে পরিবর্তন হয়।

৫) প্রায় প্রতিটি ভাষাকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য নিজস্ব ব্যাকরণ রয়েছে।

বাংলা হলো পৃথিবীর ৪র্থ বৃহৎ ভাষা। বর্তমানে বাংলা ভাষাভাষীর সংখ্যা প্রায় ২৪ কোটি। বাংলাভাষীরা থাকে বাংলাদেশে, ভারতের পশ্চিমবঙ্গে, ত্রিপুরা, উড়িষ্যা, বিহার এবং আসামের কিছু অংশে। তবে বাংলাদেশী বাঙালি এবং ভারতীয় অভিবাসী বাঙালিদের কারণে পৃথিবীর অনেক দেশেই বাংলাভাষী মানুষ বসবাস করে। ভাষা নিয়ে অনেক কথাই বলা যায়। তবে এই স্বল্প পরিসরে আপাতত বিষয়ের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করি।

১৯৪৭ সালের আগস্ট মাসে দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ব্রিটিশরা উপমহাদেশটিকে ভারত ও পাকিস্তান নামে দুইটি দেশে বিভক্ত করে প্রায় দুইশত বৎসরের শাসনক্ষমতা ছেড়ে এই অঞ্চল ত্যাগ করে যায়। পূর্ববাংলার মুসলিম সমাজ এই দেশভাগে খুব আনন্দিত ছিল এই কারণে যে, তাঁদের জন্য পৃথক বাসভূমি হচ্ছে। তাই জিন্নাহর নেতৃত্বে মুসলিম লীগকে সমর্থন দিতে এই অঞ্চলের নেতাদের মধ্যে কোনো দ্বিধা কাজ করেনি। তবে ১৯৪৭ সালেই ডিসেম্বর মাসের দিকে পাকিস্তানি শাসকবর্গ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে উর্দু হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা। সেই সময়ে পাকিস্তানের পার্লামেন্টে পূর্ববাংলার কংগ্রেস নেতা ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত এর প্রতিবাদ করেন। ১৯৪৮ সালে জিন্নাহ ঢাকায় এক সমাবেশে ভাষণ দেয়ার সময় বলে ‘উর্দু, কেবলমাত্র উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’। ঐ সমাবেশেই জিন্নাহর সামনেই একজন ছাত্র প্রতিবাদ করে বলে ওঠে ‘নো’। সেইদিন থেকে শুরু হলো পূর্ব বাংলায় একটি সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক আন্দোলন। যার মূল উদ্দেশ্য ছিল বাঙালিদের নিজের মুখের ভাষা, মাতৃভাষাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদায় প্রতিষ্ঠা করার সংগ্রাম। তার কারণ বাঙালিরা ছিল পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার গরিষ্ঠ অংশ।

এই আন্দোলনে সামনের কাতারে চলে আসে ছাত্র সমাজ। সাথে ছিল জনতা। তারা আকস্মিক ও অন্যায্য সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারেনি। ছাত্র জনতার মধ্যে ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হতে থাকে। পাকিস্তানের প্রতি তাঁদের মোহ কাটতে শুরু করে। দ্রুত আন্দোলন দানা বেঁধে ওঠে। ঢাকা শহর হয়ে ওঠে মিছিলের নগরী। পুলিশ আন্দোলন দমন করতে লাঠিচার্জ করে এবং টিয়ার গ্যাস ছুঁড়ে মারতে শুরু করে। কখনও কখনও ১৪৪ ধারাও জারি করে ঢাকা শহরে মিছিল-সমাবেশ ইত্যাদি বেআইনি ও নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।

১৯৫২ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারি এই আদেশ অমান্য করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু ছাত্র এবং প্রগতিশীল রাজনৈতিক নেতাকর্মী প্রথমে পাঁচজন পাঁচজন করে গ্রুপ করে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা হতে বের হতে শুরু করে। এটি একসময় বিক্ষোভ মিছিলে পরিণত হয়। মিছিলটি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের কাছাকাছি এলে পুলিশ ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করার অজুহাতে মিছিলের ওপর গুলি চালায়। এতে রফিক, জব্বার, সালাম, বরকত নিহত হন। আহত হয় ১৭ জন ছাত্র যুবক। শহীদের রক্তে রঞ্জিত হয় রাজপথ। এই ঘটনায় সারা পূর্ব বাংলায় প্রতিবাদের আগুন দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে। সারাদেশে ছাত্রজনতার মধ্যে বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে। ২২ এবং ২৩ শে ফেব্রুয়ারি ছাত্র, শ্রমিক, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক এবং সাধারণ জনতা পূর্ণদিবস হরতাল পালন করে এবং সভা ও শোভাযাত্রা সহকারে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে। ২২শে ফেব্রুয়ারি পুলিশের গুলিতে শফিউর রহমান শফিক, রিক্সাচালক আউয়াল এবং এক কিশোর শহীদ হন। ২৩শে ফেব্রুয়ারি ফুলবাড়িয়ায় ছাত্র- জনতার মিছিলেও পুলিশ অত্যাচার নিপীড়ন চালায়। এই বর্বর অত্যাচারের কারণে পূর্ব বাংলা আইন পরিষদের চলমান অধিবেশন থেকে সদস্যরা বের হয়ে এসে প্রতিবাদ জানাতে থাকেন। এই পাশবিক, পুলিশি নির্যাতনের প্রতিবাদে মুসলিম লীগ সংসদীয় দল থেকে সেদিনই পদত্যাগ করে। ভাষা আন্দোলনের শহীদ স্মৃতিকে অম্লান করে রাখার জন্য মেডিক্যাল কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গণে রাতারাতি ছাত্ররা শহীদ মিনার নির্মাণ করে ফেলে। ২৪শে ফেব্রুয়ারি শহীদ শফিউর রাহমানের পিতা এটি উদ্বোধন করেন। ২৬শে ফেব্রুয়ারি ‘দৈনিক আজাদ’ পত্রিকার সম্পাদক জনাব আবুল কালাম শামসুদ্দীন আনুষ্ঠানিকভাবে শহীদ মিনার উদ্বোধন করেন। ক্রমবর্ধমান গণান্দোলনের মুখে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার অবশেষে নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয় এবং ১৯৫৪ সালের ৭ই মে পাকিস্তান গণপরিষদে বাংলা অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসাবে গৃহীত হয়। ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের প্রথম সংবিধান প্রণীত হলে ২১৪ নং অনুচ্ছেদে বাংলা ও উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসাবে উল্লেখ করা হয়। এই হলো তৎকালীন পূর্ব বাংলায় (১৯৫৬ সালে পূর্ব পাকিস্তান নামে অভিহিত হয়) বাংলা ভাষা কে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদায় আসীন করার সংগ্রামের ইতিহাস। ১৯৫৩ সাল হতে পুলিশের চোখ রাঙানিকে উপেক্ষা করে সারা দেশে একুশের প্রথম প্রহরে আবালবৃদ্ধবনিতা দলবদ্ধভাবে খালি পায়ে ফুল হাতে শহীদ মিনারে যেত শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করতে। মুখে থাকত অমর একুশের সেই কালজয়ী গান ‘আমার ভাই-এর রক্তে রাঙানো

একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কী ভুলিতে পারি!’ ক্রমে ক্রমে এটি দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়ে। ঐ সময়টায় পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার যদিও বাঙালিদের প্রতি সদয় ছিল না, তবু এই বীর জাতি পূর্ব বাংলার যেখানে পেরেছে সেখানে শহীদদের প্রতি সম্মান জানাতে শহিদ মিনার নির্মাণ করেছে। পরবর্তীতে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন পূর্ব বাংলার জনগণের ন্যায্য অধিকার আদায়ের যে কোনো আন্দোলনে অনুপ্রেরণা হয়ে দাঁড়ায়। একুশে ফেব্রুয়ারি একাধারে শোক, শক্তি, সংহতি, শহীদদের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ ছাড়াও বাংগালির ন্যায্য অধিকার আদায়ের সংগ্রামে অনুঘটক হিসাবে কাজ করার প্রেরণা হয়ে বাঙালি জাতির মন ও মননে স্থায়ী আসন করে নেয়। এটা শুধু নিছক শোক দিবস পালনে সীমাবদ্ধ থাকে না।

এবারে আসি কীভাবে বাংলা ভাষা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষার স্বীকৃতি পেল! এই সম্মানজনক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে কারা ছিলেন কুশীলব? কাদের নিরলস পরিশ্রমে ১৯৫২ সালে ভাষার জন্য শহীদ হওয়া বীরদের আত্মদান আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি পেল?

বাঙালি সবসময় স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসে।মাতৃভাষাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদায় আসীন করার আন্দোলনের সময় এই অঞ্চলের জনগণের পাকিস্তান সম্পর্কে মোহভঙ্গ শুরু হয়। তারা বুঝতে পারে জিন্নাহ ব্রিটিশ শাসকদের মুসলমানদের জন্য পৃথক বাসভূমির প্রয়োজনীয়তা বোঝাতে পূর্ব বাংলার বাঙালিদের সাথে নিয়েছিলেন মুসলিমদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা বোঝাতে। কিন্তু বাঙালি জাতির প্রতি তার কোনো সম্মানবোধ ছিল না। পূর্ব বাংলার রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ অনুধাবন করতে পেরেছিলেন পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার তাঁদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করবে। সেই ধারণা থেকে ’৫২-এর ভাষা আন্দোলনের পরে কোনো একসময় পূর্ব পাকিস্তানের জন্য স্বায়ত্তশাসন চেয়ে ৬ দফা প্রণয়ণে আওয়ামী লীগকে উদ্বুদ্ধ করে। পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার কর্তৃক ৬ দফার স্বীকৃতি আদায়ের লক্ষ্যে গড়ে তোলা আন্দোলনই পরবর্তীতে বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনে রূপ নেয়। নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধে ত্রিশ লক্ষ শহীদের আত্মদানে, তিন লক্ষাধিক অত্যাচারিত মা বোনের সম্মানের বিনিময়ে এবং এক কোটি মানুষের বাস্তুভিটা ত্যাগ করে প্রতিবেশী দেশ ভারতে প্রাণ বাঁচানোর তাগিদে আশ্রয় গ্রহণকারীদের মানবেতর জীবনযাপনের ফল স্বরূপ ১৯৭১ সালে ১৬ই ডিসেম্বর বীর বাঙালি গেরিলা ও সন্মুখ যোদ্ধারা ভারতীয় মিত্রবাহিনির সহায়তায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীদের পরাজিত করে চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করে।

বিভিন্ন কারণে দেশের রাজনৈতিক পটভূমি পরিবর্তন হয়। এরপরেও বাঙালিদের অহংকারের জায়গা ’৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস এবং ভাষা শহীদদের কথা কীভাবে বিশ্ববাসীদের জানানো যায় এই নিয়ে কিছু বাঙালির মনে বিষয়টি গেঁথে থাকে। এর প্রথম স্বপ্নদ্রষ্টা/ রূপকার ছিলেন কানাডার ভ্যাঙ্কুভারবাসী রফিকুল ইসলাম। সেই সময়টায় আওয়ামী লীগ দীর্ঘ ২১ বৎসর পরে (১৯৭৫ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু এবং তাঁর পরিবারের নারকীয় হত্যাযজ্ঞের পর) দ্বিতীয়বারের মতো ক্ষমতায় আসে। ধারণা করি বাংলা ভাষাকে নিয়ে দেখা তাঁদের স্বপ্নের বাস্তবায়নে এই সময়টাকে হয়তোবা তাঁরা উপযুক্ত সময় ভেবেছিলেন। ১৯৯৭ সালে কোনো একসময় রফিফুল ইসলাম তাঁর বন্ধু আবদুস সালাম, হাফিজুর জাহাঙ্গীর এবং দেশি ও বিদেশী অন্যান্য বন্ধুদের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেন। এই উপলক্ষে তাঁরা ভ্যাঙ্কুভারে “মাদার ল্যাঙ্গুয়েজ লাভারস অফ দ্য ওয়ার্ল্ড সোসাইটি” নামে একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। শিশু-কিশোরদের মধ্যে মাতৃভাষার প্রচলন, বিলুপ্তপ্রায় ঝুঁকিগ্রস্ত ভাষা বাঁচানো, আদিবাসীসহ মাল্টিকালচারাল সমাজে ভাষা সংস্কৃতি, জাতিসত্তার ঐতিহ্য নিয়ে এই সংগঠন কাজ করে। প্রতিদিনই কোনো না কোনো ভাষা পরিচর্যার অভাবে পৃথিবী থেকে ঝরে পড়ে। তাঁরা সিদ্ধান্ত নেন যে পৃথিবী থেকে আর কোনো ভাষাকে হারিয়ে যেতে দেবেন না।

এই উদ্দেশ্য নিয়ে রফিকুল ইসলাম বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারিকে মাথায় রেখে বিশ্বের অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর ভাষার রক্ষণাবেক্ষণ ও সম্মান জানানোর লক্ষ্যে বিভিন্ন ইস্যুতে জাতিসংঘ কর্তৃক বিভিন্ন আন্তর্জাতিক দিবস পালনের কথা বিবেচনা করে একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসাবে ঘোষণা করার জন্য জাতিসংঘের সেক্রেটারি জেনারেল কফি আনান বরাবরে ৯ই জানুয়ারি ১৯৯৮ সালে এক পত্র লেখেন। কিছুদিন পর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ থেকে পত্র মারফত রফিকুল ইসলামকে জানানো হয় যে এই জাতীয় শিক্ষা, সংস্কৃতি ও ভাষা সংক্রান্ত বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের এখতিয়ার ইউনেস্কোর এবং এই ব্যাপারে ব্যক্তিগত উদ্যোগ যথেষ্ট নয়।

এই পরিপ্রেক্ষিতে তাঁদের উদ্যোগকে এগিয়ে নিতে তাঁরা ভ্যাঙ্কুভারে রফিকুল ইসলামকে সভাপতি করে দশজন পরিচালক নির্বাচিত করে “ইন্টারন্যাশনাল মাদার ল্যাংগুয়েজ লাভারস অফ দ্য ওয়ার্ল্ড সোসাইটি” (IMLLWS) গঠন করেন। দশজন পরিচালকের মধ্যে দুইজন বাঙালি, দুইজন ব্রিটিশ, দুইজন ভারতীয়, একজন জার্মান, একজন চাইনিজ এবং দুইজন ফিলিপিনো ছিলেন। কালবিলম্ব না করে তাঁরা জাতিসংঘের নির্দেশনা অনুযায়ী IMLLWS-এর পক্ষ থেকে তাঁদের দাবিটি পেশ করেন। উল্লেখ্য যে পরিচালকরা তাঁদের নিজেদের ভাষায় (সাতটি ) উক্ত পত্রে স্বাক্ষর করেন।

সৌভাগ্যবশত ১৯৯৯ সালে ১৭ই নভেম্বর ইউনেস্কোর পূর্ণাঙ্গ সাধারণ অধিবেশন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। তবে ইউনেস্কো থেকে জানানো হয় এই ধরনের প্রস্তাব পেশ করতে হবে কোনো ব্যক্তি বা সংগঠন দ্বারা নয়। এটি আসতে হবে ইউনেস্কোর নির্ধারিত সদস্য রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে। বিষয়টি জানতে পেরে তখন রফিকুল ইসলাম এবং তাঁর বন্ধুরা বাংলাদেশে যথাযথ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেন। তবে কাজটি খুব সহজ ছিল না। অনেক দৌড়ঝাপ, নিরলস চেষ্টা এবং সহযোগী সকলের বিভিন্ন যোগসূত্রের সহায়তায় শেষ পর্যন্ত তাঁরা বিষয়টি বাংলাদেশ সরকারের দৃষ্টিগোচর করতে সক্ষম হন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেই সময়ে সফরে থাকা সত্ত্বেও বিষয়টি সম্পর্কে জ্ঞাত হয়ে অত্যন্ত আনন্দিত এবং গর্ববোধ করেন এবং এর পিছনে সর্বশক্তি নিয়োগ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। তিনি তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী জনাব এইচ কে সাদেককে তড়িৎ ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেন। কিন্তু তখন ইউনেস্কোর দ্বিবার্ষিক বোর্ড মিটিং-এ প্রস্তাব উত্থাপনের জন্য অল্প সময়ই বাকি ছিল।

এদিকে রফিকুল ইসলাম এবং তাঁর সহযোদ্ধারা চরম উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছিলেন। প্রতিটি মুহূর্ত তাঁদের কাছে ছিল অতি মূল্যবান। কেননা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্রস্তাবটি পেশ করতে না পারলে পরের অধিবেশন বসবে দুই বৎসরের পরে। তবে বাংগালির সৌভাগ্য সকল আমলাতান্ত্রিক জটিলতা পাশ কাটিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে এবং উদ্যোগে ফাইল অনুমোদন করে রাষ্ট্রীয় প্রস্তাবটি একেবারে শেষমুহূর্তে ৯ই সেপ্টেম্বর ১৯৯৯ সালে ফ্যাক্স যোগে ইউনেস্কোর সদর দফতর প্যারিসে পাঠানোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। তবে সময়ের স্বল্পতার অজুহাতে নিয়মানুযায়ী হার্ড কপির পরিবর্তে ফ্যাক্সে পাঠানো রাষ্ট্রীয় প্রস্তাবটি ইউনেস্কো অনুগ্রহ করে গ্রহণ করে বাংলাদেশকে এক অনন্য সম্মান প্রদর্শন করেছিলেন। এর সাথে আর একটি কাকতালীয় ব্যাপার ঘটেছিল যে পাকিস্তান সরকার বাঙালির প্রাণের দাবিকে বুলেট দিয়ে রুখে দিতে যেয়ে ঢাকার রাজপথ শহীদদের রক্তে ভিজিয়েছিল, ইউনেস্কোতে বাংলাদেশের প্রস্তাবের সহউপস্থাপক হয়েছিল সেই পাকিস্তান সৌদিআরব, কানাডা, ভারত, ইরান, রাশিয়া সহ ২১ টি দেশের সাথে। ভাগ্যের কী পরিহাস!

সকল প্রচেষ্টা, দৌড়াদৌড়ি, অধীর প্রতীক্ষা শেষে ১৯৯৯ সালে ১৭ই নভেম্বরে প্যারিসে ইউনেস্কোর “৩০তম পূর্ণাঙ্গ সাধারণ অধিবেশনে” পূর্ণ ১৮৮টি সদস্য দেশের সর্বসন্মত সিদ্ধান্তে অবশেষে এল সেই মাহেন্দ্রক্ষণ, যেদিন দেশের সীমানা পেরিয়ে বাঙালির রক্তে ভেজা ঐতিহাসিক “আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি” স্বীকৃতি পেল “আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস” হিসাবে। মুক্তিযুদ্ধে শক্তিশালী পাকিস্তানি হানাদার বাহিনির বিরুদ্ধে এক অসম যুদ্ধে দেশ জয়ের পর এটি ছিল যেন বাঙালির বিশ্বজয়। অমর একুশের সাথে পরিচিত হলো সারা বিশ্ব। সেইসাথে দুনিয়াব্যাপী পরিচিতি পেল বাংলাদেশ এবং শান্তি পেল ’৫২ ভাষা আন্দোলনের শহীদদের বিদেহী আত্মা। সেই থেকে আমাদের প্রিয় শহীদ দিবস হয়ে গেল “আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস”। প্রথমাবারের মত ২০০০ সালে ২১ শে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসাবে পালিত হল বিশ্বজুড়ে।

অবসান হলো প্রহর গোনার, সকল উৎকণ্ঠার। সেদিন রফিকুল ইসলাম, আবদুস সালাম, হাফিজুর জাহাঙ্গীরসহ যারা বুকের রক্তে অর্জিত বাঙালির মুখের ভাষা বাংলাভাষাকে বাংলাদেশের সীমানা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক পরিম-লের স্বীকৃতি আদায়ের কাজে অগ্রসৈনিক ছিলেন, গর্বে তাঁদের বুক ফুলে উঠেছিল। চোখে ছিল আনন্দাশ্রু। মুখে ছিল “আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি”। কেউ বা গুনগুন করে গাইছিলেন “আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি আমি কি ভুলিতে পারি”। শিক্ষামন্ত্রী জনাব এইচ কে সাদেক সাহেবের সফল তৎপরতা এই ব্যাপারে বিশেষ প্রসংশার দাবি রাখে। ফ্রান্সে বাংলাদেশের তৎকালীন রাষ্ট্রদূত জনাব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন, টনি হক, বাংলাদেশ কমিশন ফর ইউনেস্কোর সচিব কফিলউদ্দিন আহমেদ এব্যাপারে যথেষ্ট সহযোগিতা করেন। সর্বোপরি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ব্যক্তিগতভাবে বিষয়টি সার্বক্ষণিক নজরদারিতে রেখেছিলেন দেখেই বোধ হয় ‘বাঙালির ভাষা’ তথা বিশ্বের ‘সকল মাতৃভাষার’ এই অমূল্য স্বীকৃতি অর্জন সম্ভব হয়েছিল। এইজন্য আমরা শেখ হাসিনার অবদানকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি। ‘ইন্টারন্যাশনাল মাদার ল্যাংগুয়েজ ডে’ স্বীকৃতি আদায়ের প্রচেষ্টায় “অংকুরস্থান ভ্যাঙ্কুভার”-এ জন্ম নেয়া “মাদার ল্যাংগুয়েজ লাভারস অফ দ্য ওয়ার্ল্ড সোসাইটি” এই সংগঠনকে বাংলাদেশ সরকার রাষ্ট্রীয় “একুশে পদক” এবং রফিকুল ইসলাম এবং আবদুস সালামকে “স্বাধীনতা “পুরস্কারে ভূষিত করেছে।

বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারির আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হয়ে ওঠার পিছনের কাহিনি সম্পর্কে খুঁটিনাটি জানার সৌভাগ্য হয় এর অন্যতম কুশীলব হাফিজুর জাহাঙ্গীর প্রদীপ কুমার দত্ত-এর কৈশোর-যৌবন সময়ের বন্ধু এবং আমাদের এক আত্মীয় সিডনী প্রবাসী বিলাস ধরের বন্ধু আব্দুস সালামের কারণে।

আজকের দিনে একুশে ফেব্রুয়ারি আর শোক প্রকাশের দিন নয়। এখন একুশে ফেব্রুয়ারি বাঙালির জন্য গর্ব করার দিন। সেদিন পূর্ব বাংলার ছাত্র জনতাসহ সর্বস্তরের বাঙালিরা প্রাণের মায়া তুচ্ছ করে জীবন বিসর্জন দেয়ায় আজ ’৫২-এর একুশে ফেব্রুয়ারি ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসাবে পরিচিতি পেয়ে হয়ে উঠল অত্যন্ত অহংকারের একটি দিন সারা বিশ্ববাসীর জন্য।

সূত্র

১) উইকিপিডিয়া।

২) কানাডার ভ্যাঙ্কুভার প্রবাসী বাংলাদেশী প্রকৌশলী হাফিজুর জাহাঙ্গীর থেকে প্রাপ্ত তথ্য।

৩) অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী বাংলাদেশী নৌ প্রকৌশলী বিলাস ধর-এর মাধ্যমে ভ্যাঙ্কুভার প্রবাসী বাংলাদেশী নৌ বিশেষজ্ঞ আবদুস সালাম থেকে প্রাপ্ত তথ্য।