menu

অসম্পূর্ণ গল্প ( শেষ পর্ব )

মুজতাবা শফিক

  • ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ১৩ জুন ২০১৯
image

(পূর্ব প্রকাশের পর)

নবম অধ্যয়

গতকাল সন্ধ্যার এই সময়টার কথা মনে করার কথা চেষ্টা করে মুমিন! তার একমাত্র আদরের মেয়েটার কথা মনে করার কথা চেষ্টা করে! অনন্যা! এই নামটি তারই দেয়া। মুমিন হাসতে হাসতে নাইমুনকে বলেছিলো

- আর কিছু দিতে পারি আর না পারি, অন্তত মেয়ের নামটা আমাকে দিতে দাও!

অবশ্য নাইমুনের ও নামটা ভালো লেগেছিলো। এক কথাতেই রাজি হয়ে গিয়েছিলো। অনন্যা মুমিনের প্রাণভ্রমরা! রুপকথার রাক্ষসের প্রাণ যেমন এক ভ্রমরের ভিতর থাকে! ছোটবেলায় মায়ের মুখে গল্প শোনার ভাগ্য খুব একটা হয়নি মুমিনের। কিন্তু বাবা প্রচুর বই কিনে দিতেন। যখন যে বই হাতের কাছে পেতেন বাবা কিনে নিয়ে আসতেন। মাঝে মাঝে উদ্ভট বই চলে আসতো। হয়তো রাস্তায় বাবা পেয়ে গেছেন “খোয়াবনামা সমগ্র”, নিয়ে আসেøন। একবার নিয়ে আসলেন “অর্শ্ব রোগের সহজ চিকিৎসা”। মুমিন তাও পড়ে ফেললো! বাবা বলতেন

- বাজান, আমাদের ধর্মে কী বলছে জানো! বলছে ইকরা, মানে পড়ো।

মুমিন তার জীবনে, আর কিছু হতে না পারলেও মেয়ের বাবা হতে ঠিক পেরেছিলো। মেয়েকে খাওয়ানো, ঘুম পাড়ানো, ন্যাপি পরিষ্কার করা হাসি মুখে সব করেছিলো মুমিন। আর মেয়ে যখন প্রথম তাকে বাবা বলে ডাকে, সেই মুহূর্তটা সে বোঝাতে পারবে না! প্রত্যেক বাবার জীবনে এই মুহূর্তটা আসে, মুমিনের জীবনে প্রবলভাবে এসেছিলো! অনন্যা ছিলো মুমিনের নিস্তরঙ্গ আশার পুকুরে বুদ্বুদের। কিন্তু অনন্যা এখন আর তার সাথে থাকে না! অনন্যা তার মায়ের সাথে অন্য এক পৃথিবীতে থাকে। আর অনন্যাকে ছাড়া মুমিনের পৃথিবীতে সময় থমকে গেছে সেই থেকে!

গতকাল ঠিক এই সময়টাতে নাইমুনের বাসায় গিয়েছিলো মুমিন!

- অনন্যাকে নিয়ে কই যাবে বললে?

দরজায় দাঁড়িয়ে নাইমুন ঝাঝালোভাবে জিজ্ঞেস করে। অনন্যাকে নিয়ে মাঝে মাঝে বাইরে যাবার অনুমতি পায় মুমিন। বাবা আর মেয়ে মিলে দারুণ সময় কাটায়। কিন্তু সেটা দিনেরবেলা! সন্ধ্যার এই সময়টায় নাইমুন মেয়েকে ছাড়তে চায় না! দরজায় বাবার গলা শুনে ছুটে আসে অনন্যা! বাবার জন্য সেওতো পাগল! কত কত কথা জমে আছে তার বাবার সাথে। ইদানীং সে মারভেল কমিকস্ পড়ছে। কোন সুপার হিরো বাবার পছন্দ জানাটা খুবই জরুরি!

অনেক কষ্টে নাইমুনের সম্মতি পায় মুমিন। বাসার বাইরে এসেই অনর্গল কথা বলে অনন্যা। তার সব জমিয়ে রাখা কথা,

- বাবা, তুমি কি স্পাইডারম্যন নাকি সুপারম্যান নাকি ক্যপ্টেন এমেরিকা হতে চাও।

- আমি ক্যপ্টেন বাংলাদেশ মা!

- ধুর বলো না! ক্যপ্টেন বাংলাদেশ হওয়া যায় না!

ইদানীংকার বাচ্চারা অনেক পরিণত। এই জেনেরেশন-এর বাচ্চা হওয়ার কারণে অনন্যা এম্নিতেই অনেক কিছু বুঝে। আর অনন্যা অন্য বাচ্চাদের চাইতেও পরিণত। বাবা আর মায়ের মাঝে যে বিস্তর দূরত্ব সেটা সে ভালোই টের পায়। মায়ের চোখে বাবার প্রতি তাচ্ছিল্য, ভর্ৎসনা তাকে গভীরভাবে স্পর্শ করে! তাই ছোট্ট বুকটা দিয়ে সে যতটুকু পারে বাবাকে আগলে রাখতে চায়! বাবা তো তার সুপার হিরো!

একজন বেকার বাবা তার মেয়েকে নিয়ে কই যাবে! অনেক চিন্তা করে মেয়েকে নিয়ে শিশু পার্কে আসে মুমিন! পার্কে রাইডে চড়ার প্রতি অনন্যার একেবারে আগ্রহ নাই! তার ইচ্ছা শুধু বাবার সাথে গল্প করবে। পার্কের একদম কোনার দিকে বাবা আর মেয়ে বসেছে! আধো আলো আর অন্ধকারে কেমন আপার্থিব লাগছে সব কিছু! খিল খিল করে হাসছে আর অনর্গল কথা বলে যাচ্ছে অনন্যা! সামনের দাঁত দুটো নেই। তাই কথা অর্ধেক বেরিয়ে যাচ্ছে। মুমিন ভাবে, মেয়ের হাসিটা মায়ের চায়েও সুন্দর হয়েছে! নাইমুনের হাসি দেখলে মনে হতো আধার ফুঁড়ে রোদ ঝলমল করছে!

অনন্যা খিল খিল করে হাসছে আর অনর্গল কথা বলে যাচ্ছে! হঠাৎ মুমিনের মনে হয় সব অন্যায়ের শোধ নেওয়া প্রয়োজন। সবকিছুর একটা ভারসাম্য থকতে হবে! এই সমাজের এত এত অন্যায় তার কোন কিছুর প্রতিশোধ তো সে নিতে পারেনি! সালেহা বেগমের অন্যায়ের শোধ, নাইমুনের অন্যায়ের শোধ, বরকতের অন্যায়ের শোধ। মুমিনের মনে হয়, এই সমাজের সে একজন নপুংশক মানুষ মাত্র। কিছুই কি সে করতে পারে না?

অনন্যা অবাক হয়ে বাবার দিকে তাকায়! মুমিন তখন থরথর করে কাঁপছে। মনে হয় তার শরীরে তীব্র দাহন। রক্তবর্ণ চোখ।

- বাবা তোমার কী হলো! তুমি এমন করছো কেনো! তোমাকে দেখতে একটা উলফের মতো লাগছে কিন্তু!

অনন্যা এবার সত্যি ভয় পেয়ে যায়। মুমিন তখন ঘোর লাগা চোখে তার দিকে তাকিয়ে আছে আর এলোমেলো পায়ে এগিয়ে আসছে।

- বাবা, তুমি বসো! একটু পানি খাও!

- উত্তরের বরফ গলছে মা! ভূতের মতো বলে থাকে মুমিন!

- বরফ সব গলে যাচ্ছে! পোলার বিয়ারগুলো আর বাচবে না মা! ওরা সীল মাছ খেয়ে বেঁচে থাকে। বরফ না থাকলে ওরা কিসের উপর দাঁড়াবে! কিসের উপর দাঁড়িয়ে শিকার করবে! সব মারা যাবে! সব মারা যাবে!

ডুকরে কেঁদে ওঠে মুমিন! অনন্যা অস্থির হয়ে ওঠে,

- বাবা কী বলছো! কিছু বুঝতে পারছি না! চলো বাসায় চলো! আমি মার কাছে যাবো।

- বড় ভুল হয়ে গেছে মা! আমাদের বলি দিতে হবে! নিজেকে বধ করতে হবে। যজ্ঞের আগুন জ্বলছে! এখুনি বলি চাই -! চল মা আমরা যাই -

মুমিন পাগলের মতো দৌড়াছে। অনন্যার হাত ধরে হ্যাঁচকা টান দেয় সে! মুমিনের সাথে তাল মিলাতে পারে না অনন্যা! মাটিতে পড়ে যায়! মুমিন তখন অনন্যাকে কোলে তুলে নেয়! পার্কের অন্ধকার দিকটার আরো গভীরে হারিয়ে যায়! আর দেখা যায় না তাদের।

দশম অধ্যয়

স্যুটকেস্টা উদ্ধার হয় বক্স কাল্ভার্ট রোডের পাশে আবর্জনার স্তূপের ভেতর। মায়ের দোয়া হোটেলের ওয়েটার বরকত ছেলেটাই প্রথম খুঁজে পায়! ভোর ছয়টায় তাকে হোটেলে আসতে হয়। সাতটা থেকে লোকজন নাস্তার জন্য ভিড় করবে দোকানে। তাই একটু পা চালিয়ে আসছিলো সে। মোড়ের কাছে খোলা ডাস্টবিনে আবর্জনার স্তূপ। তার মাঝে পড়ে আছে স্যুটকেসটা। নীল রঙ্গের স্যুটকেসটা দেখেই চিনতে পারে সে। মনে পড়ে যায় অদ্ভুত কাস্টমারটার কথাও! শুধু ভাত আর ডাল খাচ্ছিলো! নাম জিজ্ঞেস করা হয়ে ওঠেনি। কাছে এসে স্যুটকেসের শক্ত চেনটা একটু একটু করে খোলে বরকত। ভীষণ শক্তভাবে লেগে আছে! মনে হয় অনেকদিন খোলা হয় নি! কিন্তু ভারি স্যুটকেসটায় কী আছে এই কৌতূহলে সে চেষ্টা চালিয়ে যায়! ওই কাস্টমারের কাছে দামী কিছু ছিলো বলে মনে হয় না। চোরাই মাল হবার সম্ভাবনা আছে। লোকটার ভাবচক্করে অবশ্য এরকমটাই মনে হচ্ছিলো! অনেক ঘাম ঝরিয়ে তবে স্যুটকেস খুললো!

স্যুটকেসের ভিতর মুমিনের লাশ পড়ে আছে। দেখে মনে হয় পরম তৃপ্তিতে সে ঘুমিয়ে আছে! ঠিক গর্ভের শিশুর মতো! পা আর হাত ভাঁজ করা। শরীরটা গুটলি পাকিয়ে আছে! বেশ অনেকদিন আগে মরে যাওয়া মুমিনের লাশ! ভয়ে ছিটকে, দৌড়ে পালিয়ে যায় বরকত। দৌড়াতে দৌড়াতে সে তার ভাগ্যকে অভিশাপ দিতে থেকে। কার মুখ দেখে আজ ঘুম থেকে উঠেছিলো ভাবে সে! নির্ঘাৎ মার্ডার কেসে ফেসে যাচ্ছে! পুলিশ ধরলে আর ছাড়ন নাই। কিছু বোঝার আগেই পাঁচ ছয় বছর জেল খাটা সারা হয়ে যাবে!

- ওই শালা বান্দীর পুত কাস্টমার নিজে নিজে স্যুটকেসে ঢুকলো কেম্নে! ভাবে বরকত! কিছুই হিসাব মেলে না! বরকত হাপাতে হাপাতে হোটেলে এসে ঢোকে! এই ঘটনা কাউকে বলা যাবে না! কথা মুখ থেকে বের হলেই ধরা!

সাব ইন্সপেক্টর বিনয় ঘোষ নতুন পুলিশে যোগ দিয়েছেন! খুব বেশি লাশ তার দেখা হয়ে ওঠেনি! আর এই রকম কোন কেস হতে পারে, তার কল্পনায় ছিলো না! হাতে গ্লাভস পড়ে লাশটা খুব ভালো করে নেড়েচেড়ে দেখছিলো সে! কোথাও কোনো আঘাতের চিহ্ন নেই! গলায় কোন দাগ নেই যে গলা টিপে মারা হয়েছে! ধস্তা ধস্তির কোন আলামত নেই! তাহলে কি বিষ খাইয়ে মেরে কেউ লাশ স্যুটকেসে ঢুকিয়ে রেখেছে? রেপ টেপের কোনো বিষয় আছে কি? পুরুষের লাশ অবশ্য! আজকের দিনে সব সম্ভব! পোস্ট মার্টেম ছাড়া কিছু বোঝা যাবে না। সব চাইতে মুশকিলের বিষয় হচ্ছে লাশটা কার বোঝার উপায় নাই। লাশের সাথে মানিব্যাগ, মোবাইল কিছু নাই। এমনকি টাকা পয়সা, কোন কাগজ কিছুই নাই!

বিনয় ঘোষ উঠে দাঁড়ায়! লোকের ভিড় জমে গেছে! উৎসুক জনতা ইতিউতি উঁকি দিয়ে লাশ দেখছে!

- আশেপাশে খোঁজখবর নেও! দেখো কেউ একে চেনে কিনা! আর দেখো কোথাও সিসি টিভি লাগানো আছে নাকি !

বিনয় ঘোষ আরো কিছু তড়িৎ সিদ্ধান্ত সঙ্গে আসা পুলিশ সদস্যদের জানিয়ে গাড়িতে উঠে বসে। পুলিশের চাকরিতে ঢোকার আগে থেকেই ডিটেক্টিভ গল্পের সে এক বিরাট পোকা! কিন্তু এরকম অদ্ভুত গল্প সে কোনোদিন পড়েনি!

ইন্সপেক্টর ইব্রাহিম খলিল একজন পোড় খাওয়া মানুষ! পুলিশে চাকরি করছেন বহু বছর ধরে। বিকেল বেলা বিরস মুখে কাহিনীটা শুনছেন বিনয়ের কাছ থেকে। গল্পটার মধ্যে কোন আগ্রহ পাচ্ছেন না তিনি! আলসারের ব্যথাটা বেড়েছে! সেটা নিয়েই তিনি বেশি চিন্তিত! বউটাকে কত বলছেন দুপুরে খাবার পাঠাতে। কিসের কী! তার নাকি সময় হয় না! এখন দিনের পর দিন বাইরের খাবার খেয়ে তিনি আলসার বাঁধিয়ে বসেছেন! “মরলে বুঝবি”, মনে মনে বলে ইন্সপেক্টর ইব্রাহীম সাহেব! ওষুধের টাকাটা শ্বশুর বাড়ি থেকে আদায় করতে পারলে হতো!

এদিকে বিনয় ঘোষ কেস অনেকদূর এগিয়ে নিয়ে এসেছেন! খুঁজে খুঁজে বের করে এনেছেন সেই ডাক্তার আকমল সাহেব, রিকশাওয়ালা মজিদ মিয়া আর ওয়েটার বরকতকে। অবাক করা ব্যাপার, তিনজনের ভাষ্য একই রকম! তিনজনই বলছে, স্যুটকেসের ভিতর পাওয়া লাশ যে ব্যক্তির, সেই এই স্যুটকেস বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছিল! আজকাল কোন ইনভেশটিগেশনে সব চাইতে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে মোবাইল ফোন আর সিসি টিভি ক্যমেরার ফুটেজ। মোবাইল ফোন পেলে এই ব্যক্তির গতিবিধি সহজেই ট্র্যাক করা যেতো। কল লিস্ট থেকে এই লোকের নাম ধাম, পরিবার, বন্ধু বান্ধব সবার পরিচয় বের করা যেতো! কিন্তু এর কাছে কোনো মোবাইল ফোন নেই! আজব! কোনও সিসি টিভিতেও এই বান্দাকে দেখা যাচ্ছে না! কী অদ্ভুত! এখন এই তিন জনের কথা বিশ্বাস করা ছাড়া উপায় নেই।

থানায় নিজে রুমে বসে এই সব আজব কল্পকাহিনি শুনছিলেন ইন্সপেক্টর ইব্রাহিম সাহেব! পেটের ব্যথাটা শুধু বাড়ছেই। আর পারা যাচ্ছে না! ওষুধ খেতে হবে!

- তাইলে তরা কইতেছস এই লাশ নিজে নিজে স্যুটকেস টাইনা নিজেই মইরা তারপর স্যুটকেসে ঢুইকা পড়ছে।

ব্যথায় ভালো করে হাসতে পারেন না ইব্রাহীম সাহেব।

- স্যার, ঘটনা কিন্তু সত্য!

ডাঃ আকমল সাহেব তড়বড় করে বলেন!

- বত্রিশ নাম্বারের ব্রিজ পার হইয়া এই পাগলা স্যুটকেস নিয়া পার্কে ঢুকছিলো! তারপর বয়া বয়া কলা আর রুটি খাইতেছিলো! আমি নিজে কথা বলছি সার। অর কিন্তুক ডায়াবেটিস আছে।

- আমার রিকশায় উঠছিলো সার!

এই বার মজিদ মিয়া জানায়!

- ঝিকাতলার মোড়ের কাছে থন উঠছিলো। তারপর সারাডা দিন আমার নষ্ট করছে সার। একবার কাঁটাবন যায় একবার নীলক্ষেত যায়। এরে খোঁজে হেরে খোঁজে।! শেষে যাইয়া মতিঝিল নামায় দিছি!

- আমগো মায়ের দোয়া হোটেলে ভাত খাইতে আইছিলো! সন্ধ্যার কালে! খালি ভাত আর ডাইল নিছিলো! লগে এই স্যুটকেস দেখছি সার।

বরকত আসল কথাটা আর বলে না! ভোর বেলা সেই যে প্রথম স্যুটকেস খুলে লাশটা দেখে তা আর জানায় না!

যাইহোক, সবার কথা শুনে তেমন ভাবান্তর দেখা যায় না ইব্রাহীম সাহেবের। বিনয় কে শুধু ডেকে বলেন,

- তিন ডারে ভিতরে চালান করো! ভালো করে ডলা দাও! অরা তিন ডা মিলা কাম ডা সারছে! লাশ পোস্ট মোর্টেমের জন্য পাঠায় দেও! দেখি কি রিপোর্ট আসে!

বাসার দিকে রওনা দেন ইব্রাহীম সাহেব। এই লাইনে তিনি একজন অভিজ্ঞ মানুষ! অতি প্রাকৃতে তিনি বিশ্বাস করেন না! আর তাই মানুষের নীচতা তাকে অবাক করে না! এই কেস টা তার কাছে অভিনব মনে হয় না ! অতি সাধারণ সাদা মাটা ঘটনা !

পরিশিষ্ট

এখন আর হাঁটতে পারেন না সালেহা বেগম! বয়স বাড়ার সাথে সাথে পাল্লা দিয়ে ওজন বেড়েছে। সেই সাথে ডায়াবেটিস, গিটে বাত আর কত কী! এখন তাই হুইল চেয়ারটাতে বসে থাকেন। আমান হুইল চেয়ারটা কিনে দিয়েছে তাই রক্ষা! এটাতে চড়ে যা একটু নড়াচড়া করা যায়। সন্ধ্যা হলে বেডরুমের জানালাটার কাছে এসে বসেন সালেহা বেগম! জানালাটা থেকে গলির মুখটা পর্যন্ত দেখা যায়! সন্ধ্যা হলে গুটিগুটি পায়ে মুমিন বাসায় আসে। মুমিন কখনো জানতে পারেনি এই সময়টায় তার জন্যই অপেক্ষা করেন সালেহা বেগম! আজো বাসায় আসেনি মুমিন! দুদিন ধরে বাসায় আসে না! সালেহা বেগম জানেন ছেলেটা বাসায় আসে শুধু দুমুঠো খেতে। সারাদিন কোথায় কোথায় যায়! কিছু পেটে পড়ে কি না কে জানে! একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে সালেহা বেগমের বুক থেকে! মুমিন কোথায় চলে গেলো?

সালেহা বেগমের নিজের বাবার কথা মনে পড়ে! মুমিন দেখতে ঠিক অবিকল তার বাবার মতো! আর এই কারণেই ছোট বেলা থেকেই মুমিনের উপর চাপা রাগ সালেহা বেগমের! তার বাবা ছিলেন গ্রাম্য এক টাউট! লোকের কাছ থেকে টাকা ধার নেয়া, বিভিন্নভাবে ঠকানো, মামলায় জড়ানো এই সব ছিলো তার পেশা!

একদিন গ্রামের লোকজন তাকে ধরে ফেলে! তাদের বাড়ির উঠোনে। সালেহা বেগমের তখন অল্প বয়স। কিন্তু সেই স্মৃতি জোনাকির আলোর মতো তার মনে জ্বলে আর পরক্ষণেই নিভে যায়! এত মারার পরও তার বাবা মরলেন না! বিছানায় পড়ে গেলেন! সাতটা বছর শুধু বিছানায় কাটিয়েছেন তার বাবা। আর তার মা ছিলেন পৃথিবীর মতো, সর্বংসহা! বাবার সব অত্যাচার তিনি মেনে নিয়েছিলেন! সালেহা বেগমকে বলতেন,

- তরা বড় হ। মানুষ হ।

বাবা বিছানায় পড়ে যাবার পরও, সেই অমানুষটার সেবা করে গেছেন শেষ দিনটা পর্যন্ত! কিন্তু রাতে কাঁদতেন মা। সালেহা বেগম অসংখ্যবার শুনেছেন সেই কান্না। সবাই ঘুমিয়ে গেলে, ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতেন! তার মুমিন ছেলেটা ভালো মানুষ। নেহাত সংসারী হতে পারেনি! ছোট ভাই আমানের মতো বুদ্ধি সে ধরে না কিন্তু অন্যায় কাজ করে না! এই সব ভালো মানুষের আজ আর সমাজে দাম নাই! সালেহা বেগম ভাবেন ছেলেটা শুধু যেনো সুখী হয়!

মেয়েকে স্কুলের জন্য রেডি করাচ্ছে নাইমুন! স্কুলের গেট আটটায় বন্ধ হয়ে যাবে। সকালবেলাটা তাই খুব তাড়াহুড়া! এদিকে মেয়েকে স্কুলে নামিয়ে তাকে ব্যাংকে যেতে হবে। ড্রাইভার এখনো আসেনি! কী করবে বুঝে না নাইমুন!

আর অনন্যার এদিকে কথাই শেষ হয় না! তার বেশিরভাগ গল্পই বাবাকে নিয়ে! বাবা যে তার সুপার হিরো! শেষবার বাবার সাথে কী কী কথা হয়েছে তাই বার বার বলছে অনন্যা,

- মা পোলার বিয়ার কি! বাবা বলছে পোলার বিয়াররা সব মরে যাচ্ছে!

তুমি জানো কিছু!

নাইমুন ধমক লাগায়,

- খেতে খেতে কথা বলো অনন্যা!

- বাবা আমাকে আইসক্রিম কিনে দিলো তারপর বলল সব পোলার বিয়ার মরে যাচ্ছে।

- তোর বাবা তোকে আইসক্রিম কিনে দিলো! টাকা পেলো কই!

নাইমুন জানে অনন্যা বাড়িয়ে বলছে। বাবার প্রতি মেয়ের অনেক টান। মাঝে মাঝে তাই বাবকে নিয়ে বাড়িয়ে বলে, বাবা আমাকে এটা দিয়েছে ওটা দিয়েছে! মনে মনে হাসে নাইমুন কিছু বলে না।

গাড়িতে উঠতে উঠতে আবার একই কথা বলে অনন্যা,

- বল না মা! পোলার বিয়াররা কেনো মরে যাচ্ছে! আর বাবা কবে আসবে! পুরাটা তো শোনা হলো না!

- আসবে!

ছোট করে বলে নাইমুন! দুদিন হলো মুমিন ফোন করে নি! দিনে একবার হলেও সে ফোন করে মেয়ের খোঁজ নেয়! কোথায় গেলো মুমিন?

ইন্সপেক্টর ইব্রাহীম খলিল লাশের পোস্ট মার্টেম রিপোর্ট দেখে এবার সত্যি অবাক হলেন। এই প্রথম তার মনে হয়, এই কেসের মধ্যে অতি প্রাকৃত কিছু থাকতে পারে। রিপোর্টে মার্ডারের কোন আলামত পাওয়া যায় না! মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে ডাক্তার অবশ্য কিছু বলতে পারেননি! কিন্তু এটা কোনো মার্ডার কেস নয়! ইব্রাহীম সাহেব সাব ইন্সপেক্টর বিনয় ঘোষকে ডেকে পাঠান,

- অই তিনজন কি হাজতে!

- জ্বী সার! এখনো হাজতে।

- লাশের খোঁজে কেউ আসছিলো!

- না সার!

- অই তিনজনের ফ্যামিলিকে খবর দেও! বিশ হাজার কইরে টাকা নিয়া ছাড়বা! আর লাশটা কেউ নিতে না আসলে, কোনো মেডিকেলে বেইচা দেও!

আলসারের ব্যথাটা আবার বাড়ছে! বাড়ির দিকে পা বাড়ান ইন্সপেক্টর ইব্রাহীম!

(সমাপ্ত)