menu

ধারাবাহিক

অভিযাত্রিক

মুজতাবা শফিক

  • ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ০৮ আগস্ট ২০১৯
image

শিল্পী : সঞ্জয় দে রিপন

(পূর্ব প্রকাশের পর)

নবম অধ্যয়

মডেল স্বপ্নার সঙ্গে মুখোমুখি বসে আছে একে চৌধুরী। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে রুমে অনেক আলো, আর অনেক মানুষ। ঠিক এভাবে স্বপ্নার সঙ্গে দেখা হোক, চায়নি আকবর! কিন্তু বিধিবাম। বেশ কিছদিন ধরেই একটি টেলিভিশন চ্যানেল থেকে ফোন আসছিল। এবছর বিজনেজপারসন অফ দ্য ইয়ার হয়েছে আকবর। একটি ইন্টারভিউর জন্য তাকে ডাকা হচ্ছে। এই নিয়ে আজিজ সাহেবের সঙ্গেও কথা হয়। আজিজ সাহেব বললেন অনুষ্ঠানটা করে ফেলতে। তাই আজকে চলে এসেছে একে চৌধুরী। এসে দেখে অনুষ্ঠানের সঞ্চালক হচ্ছে স্বপ্না চৌধুরী।

ব্যক্তি স্বপ্নাকে জানার বা চেনার কোনো আগ্রহ আকবরের কখনোই ছিল না! আর এটা তার স্বভাব নয়। এই বিষয়ে তার কোন আগ্রহ কোনকালেই ছিল না! কিন্তু স্বপ্নার বুদ্ধিমত্তা, জ্ঞান তাকে মুগ্ধ করে। মডেল স্বপ্না শুধু রূপবতী নয়, বেশ জ্ঞানী বটে! ব্যবসা বাণিজ্যের ক্ষেত্রে আজকের বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট, সেই সঙ্গে বৈশ্বিক অবস্থান, সেটা নিয়ে ভালো ধারণা রাখে স্বপ্না! একটি মেয়ে যে সুন্দরী হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বুদ্ধিমতী হতে পারে আজ নতুন করে আবিষ্কার করে আকবর! ইন্টারভিউর পর কফি খেতে খেতে এসবই চিন্তা করছিল সে!

-ক্যান আই অফার ইউ সাম কফি!

একদম নিজের অজান্তেই মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসে আকবরের।

-বেশ চলুন না! আমাদের এই বিল্ডিংটাতেই ভালো কফির শপ আছে। বসা যেতে পারে।

এভাবেই কফি শপে বসা। পনের তলায় একটা খোলা টেরাসে এই কফি শপ। নিচের রাস্তায় ভিড়ভাট্টা আর ট্রাফিক জ্যাম দেখা যাচ্ছে। কিন্তু নাগরিক ব্যস্ততা এই উঁচু টেরাসে এসে পৌঁছায় না! আকবর মন দিয়ে স্বপ্নার কথাগুলো শুনছিল! মেয়েটা শুধু বুদ্ধিমতী শুধু নয় যথেষ্ট রসবোধ আছে তার কথায়, “জামাই আদর” হয়, কিন্তু “বউ আদর” হয় না কেন বলুন তো? জামাইকে যদি আদর করা যায়, বউ কে কেন যায় না?

আকবর কিছু বলে না। মনে মনে ভাবে, “কথা সত্য”।

-আবার ধরুন, “বউ পাগল” হয় কিন্তু “জামাই পাগল” কিন্তু হয় না! মানে যে লোকটা বউকে খুব ভালোবাসে সে হয়ে গেলো বউ পাগল মানে খারাপ আর কি! কিন্তু মেয়েদের তো জামাইকে ভালো বাসতেই হবে! স্বাভাবিক। তাই জামাই পাগল বলে কিছু নেই!

বলেই হি হি করে হাসতে থাকে স্বপ্না!

আকবর মুগ্ধ হয়ে স্বপ্নার কথাগুলো শুনছিল আসলে উপরে উঠতে উঠতে সে বোধহয় খুব নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েছে। সবচাইতে উঁচু যে পাহাড়টা, সেই তো সবচাইতে নিঃসঙ্গ! নয় কি? আর সব পাহাড়গুলো তার চাইতে অনেক দূরে। উপরে ওঠার এই খেলায় মানবিক সব সম্পর্কগুলোও এখন হারিয়ে গেছে আকবরের জীবন থেকে। একটা মেয়ের সঙ্গে বিছানার বাইরেও যে সম্পর্ক তৈরি করা যায়, সেটা শিখে উঠতে পারেনি আকবর! মেয়েরা যে বন্ধু হতে পারে ভাবেনি সে! স্বপ্নার কথা শুনে এরকমটাই ভাবছিল আকবর!

-আমি অনেক হাসি! জানেন কেন?

হাসতে হাসতেই বলে স্বপ্না।

-কেন বলুন তো!

-আমার হার্টে একটা ফুটো আছে! যে কোন দিন নাই হয়ে যেতে পারি। তাই খুব হাসি! যতটুকু পারি হেসে নিচ্ছি!

বলেই আবার হি হি করে হাসতে থাকে স্বপ্না।

-আচ্ছা, আপনাকে কি বলে ডাকা যায় বলুন তো! একে চৌধুরী বলে কি ডাকা যায়? আবার আকবর নামটাও কেমন!

-আপনি আমাকে “চান ভাই” বলে ডাকতে পারেন!

খুব আস্তে আস্তে বলে আকবর!

এই নামে তাকে পৃথিবীতে মাত্র একজন ডাকতো! আকবরের ছোট বোন নাফিসা! একটাই বোন ছিল আকবরের। পিঠাপিঠি বোন। সারাক্ষণ ছায়ার মতো পিছনে পিছনে ঘুরতো। সব কিছু তার চান ভায়ের সঙ্গে করতে হবে। নদীতে সাঁতার কাটতে যাবে আকবর, পিছন পিছন নাফিসা হাজির। একদিন সাতার কাটতে যেয়ে আকবর দেখে পিছনে নাফিসা নেই। কোথাও নেই। লাশ পাওয়া গেল পরের দিন ভাটিতে। অনেকদিন পর নাফিসাকে আবার মনে পড়ে গেলো আকবরের।

স্বপ্না তখন অবাক হয়ে আকবর কে দেখছে! “চান ভাই” কেন বলবে ঠিক বোঝে না সে। আকবর আর কিছু বলে না! ঝুপ করে সন্ধ্যা নেমে আসে! অন্ধকারে নিশ্চুপ মুখোমুখি বসে থাকে আকবর আর স্বপ্না!

দশম অধ্যায়

পিনাকী লোকটা কে প্রথম দেখায় আমার ভালো লাগে নি! ফেব্রুয়ারি মাসের শেষের দিক। দেশে এখনও তেমন গরম পড়েনি। উল্টো আমার কাছে তো রীতিমতো শীত লাগছে! কিন্তু এরই মধ্যে লোকটা দিব্যি শর্টস আর টি-শার্ট পরে ঘুরছে। এতো লম্বা ঢ্যাঙ্গা লোকটাকে এই পোশাকে উদ্ভট দেখাচ্ছে। আজকাল কার যুগে কেউ ডিব্বা থেকে পান খায়? কিন্তু এই লোকটা একটার পর একটা পান খেয়ে চলছে। সেই সঙ্গে সিগারেট! বিপত্তিটা আরও বেড়ে গেল, যখন দেখলাম লোকটা আমার দিকেই এগিয়ে আসছে,

-আপনি কি লেখক মুজতাবা শফিক?

আমি মুচকি হেসে ঘাড় নাড়লাম। আসলে আমাকে কেউ রাস্তঘাটে চিনে ফেললে ভালোই লাগে। কিন্তু মাঝে মাঝে এরকম উটকো লোকের পাল্লায় পড়তে হয়!

-জ্বী আমার নাম পিনাকী বন্দ্যোপাধ্যায়। আপনার লেখার আমি ভীষণ ভক্ত। আপনি মাঝে মাঝে টিভির টকশগুলোতেও আসেন! তাই না? আপনার কথা আমার ভালো লাগে।

সত্যি বলতে কি, এরকম পরিবেশে একজন ভক্ত পেয়ে ভালোই লাগছে। সব লেখকেরই লাগে!

-বসুন না।

লোকটা পাশের চেয়ারে ধপ করে বসে পড়ে। নায়লা আমার স্ত্রী, আড় চোখে এতক্ষণ সব দেখছিল। লোকটা পাশে বসে পড়তেই আমার দিকে কটমট করে তাকালো। তার মানে হচ্ছে “উটকো লোকটাকে কেন পাশে বসালে!” দীর্ঘ ৩০ বছরের সংসার জীবনে এসব চোখের ভাষা সব আমার মুখস্থ হয়ে গেছে।

ছোট বেলায় এ রকম রকেটে করে বাবা-মায়ের সঙ্গে বেশ কয়েকবার বরিশাল গিয়েছিলাম। সরকারি চাকরি সূত্রে বাবার পোস্টিং ছিল বরিশালে। আবার পড়শোনার জন্য আমরা মার সঙ্গে ঢাকায় ছিলাম। তাই প্রায়ই এই রকেটে করে, ঢাকা বরিশাল করতে হতো! রকেটের জার্নিটা দারুণ ছিল। বিশেষ করে ডেকে বসে নদীর দৃশ্য দেখা! সেই সঙ্গে মনে পড়ে ভেটকি মাছের ফ্রাইয়ের কথা। আমার আবার ভালো কিছু খেলে অনেক দিন মনে থাকে! অন্য অনেক কিছুই হয়ত ভুলে যাই, কিন্তু ভালো খাবারের কথা মনে থাকে। মাঝে মাঝে ভাবি, পৃথিবীর সব রস আমি জিহ্বা দিয়েই আস্বাদন করে গেলাম!

ভার্সিটিতে পড়ার সময়, আমার প্রাক্তন প্রেমিকা একবার আমাকে ভার্সিটিতে খুঁজছে। ক্যাম্পাসে, যেখানে আমার আসার কথা সেখানে আমি তখন পৌঁছুতে পারিনি। কারণ ক্যান্টিন দিয়ে যাবার সময় দেখি ইলিশ মাছ ভাজা হচ্ছে। বেশ বড়সড় একটা পেটি নিয়ে আমি খেতে বসে গেলাম। আমার তৎকালীন প্রেমিকা আমার দেরি দেখে ক্যাম্পাসে আমাকে খোঁজাখুঁজি শুরু করে। সেটা মোবাইলের যুগ ছিল না যে চট করে ফোনে কল দিয়ে পেয়ে যাবে! খুঁজতে খুঁজতে ক্যান্টিনে এসে দেখে আমি ইলিশ মাছ ভাজা নিয়ে বসে আছি। আমার প্রেমিকা, সঙ্গে সঙ্গে প্লেটে পানি ঢেলে দিল। সেই না খাওয়া ইলিশ মাছের পেটিটা এখনও আমার মনে গেঁথে আছে। প্রেমিকা চলে গেছে। কিন্তু মাছটা না খাওয়ার দুঃখ রয়ে গেছে!

আমাদের এই রকেটে সেই ভেটকি মাছের ফ্রাই পেলাম না! এটা নাকি এখন আর পাওয়া যায় না। রকেটের নাম হচ্ছে “বসুন্ধরা-৩”। আমেরিকাতেও এরকম ক্রজে গেছি বহুবার, কিন্তু আমাদের এই রকেটটি কিন্তু কোন অংশে কম নয়। তাছাড়া আমার নিজের দেশের নদী, আমার নিজের দেশের মানুষ, ব্যাপারই আলাদা। ডেকে বসে আমি আর আমার স্ত্রী অপরূপ নদীর দৃশ্য উপভোগ করছিলাম। ঠিক এই সময়ে এই পিনাকী ভদ্রলোক এসে হাজির। আমি ভদ্রতা করে বসতে বলাতে, সে বসেও পড়লো!

ঠিক কি আলাপ করা যায় বুঝতে পারছিলাম না,

-আপনার নামটা কিন্তু খুব আনকমন, কী বলেন!

- ঠিক বলেছেন, আপনার নামটাও

পিনাকী হেসে বলে!

- পিনাকী শব্দের মানেটা যেন কী?

- পিনাকী হচ্ছে শিব।

আমি মনে মনে বলি, “আপনাকে দেখে কিন্তু মনে হচ্ছে মহিষাসুর”। ওই যে দেবী দুর্গা যাকে বধ করছে! বিশাল গোফ আর কোঁকড়া চুল! কিন্তু আলাপ করতে যেয়ে পরে মনে হলো, ভদ্রলোক খুবই ইন্টারেস্টিং ক্যারেকটার। পিনাকী হচ্ছেন একজন সাইকো থেরাপিস্ট। এতক্ষণ তারই বিভিন্ন রোগীর আলাপ হচ্ছিল!

...সাইক্রিয়াট্রিস্ট আর সাইকো থেরাপিস্টের মাঝে পার্থক্য কী?

আমি জানতে চাই।

-আমি আসলে কোন ড্রাগস বা মেডিসিন ব্যবহার করি না। আমার কাজ হচ্ছে শুধু কাউন্সেলিং করা। কথা বলে রোগীকে মোটিভেট করা। তাকে সঠিক পথটা চিনিয়ে দেয়া!

-তা এই যে আপনার কয়েকজন রোগীর কথা বললেন, ইয়াকুব সাহেব, ওয়াকিল পাশা আর একে চোধুরী এদেরকেও কি কাউন্সেলিং করছেন! শুধু কাউন্সেলিং?

-নিশ্চয়। আর আমার চিকিৎসা তো শুধু চেম্বারে হয় না! আমি আবার একটু অন্যভাবে চেষ্টা করছি! আমার এই রোগীদের নিয়ে আমি বেড়াতে বেরিয়েছি। বেড়াতে বেড়াতেই চিকিৎসা চলবে।

-বলেন কী! তার মানে আমাদের এই রকেটে মানে লঞ্চে কি ওরা আছে! আলাপ করিয়ে দেয়া যায়?

আমি এবার নড়েচড়ে বসি। লেখালিখির কিছু উপাদান পাওয়া যাবে মনে হচ্ছে!

-নিশ্চয়ই! ওই যে দেখছেন একজন টেকো ভদ্রলোক ঝালমুড়ি খাচ্ছেন, উনি ইয়াকুব সাহেব। ওই যে ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি, সুন্দর ছেলেটা ও ওয়াকিল পাশা আর ওই যে দূরে দাঁড়িয়ে আছে, একে চৌধুরী।

বলেই ফ্যাচফ্যাচ করে হাসতে লাগলো পিনাকী। মানুষের হাসি যে এত বিশ্রী হতে পারে এই প্রথম দেখলাম।

-হাসির কি হলো বুঝলাম না!

আমি একটু রেগেই বলে ফেললাম!

-রেগে যাচ্ছেন কেন ভাই! আমাকে তো আমার রোগীদের প্রাইভেসিটা দেখতে হবে, তাই না! রোগীদের সঙ্গে আপনাকে কোনভাবেই পরিচয় করানো যাবে না ভাই। আর নামগুলো সব বানিয়ে বলেছি। তবে ডিটেইলসগুলো ঠিক আছে। আর হ্যাঁ, ওরা আমাদের আশেপাশেই আছে।

আকাশে তখন কৃষ্ণপক্ষের চাঁদ উঠেছে। আমাদের রকেটটা নদীর গভীর দিয়ে যাচ্ছে। এখন আর নদীর পাড় দেখা যাচ্ছে না! ডেক থেকে দেখা যাচ্ছে শুধু অথৈ পানি তার ওপর ঝলমলে তারার চাদর। পিনাকী খুব ভালো তারা চেনেন। আমাকে আঙ্গুল দিয়ে দেখাচ্ছেন, “ওই যে ওটা সপ্তর্ষী, ওটাকে শুকতারা”। আমার কাছে মনে হলো; এই যে আমাদের এই ছুটে চলা, তার সঙ্গে সব তারাগুলোও তো ছুটে চলছে। এই পৃথিবী, এই সূর্য, এই পুরো ছায়াপথ কোন এক অজানা অভিযানে ছুটে চলছে! আমাদের ধীশক্তির বাইরের কোন এক অজানা রহস্যের দিকে ধাবিত হচ্ছে এক মহা অভিযান! আর, মহাবিশ্বের এই সু বিশাল অভিযানে আমরা গুটি কয়েক অভিযাত্রিক মাত্র!

পরিশিষ্ট

আমার স্ত্রী নায়লা ততক্ষণে কেবিনে চলে গেছেন! আমি পিনাকীকে বললাম,

-আপনি এতক্ষণ যে গল্পগুলো বললেন, তাদের পরিণতি কি হতে পারে! আপনি কি শেষটা ধারণা করতে পারেন?

-নিশ্চয় পারি!

এবার আমি বাঁকাভাবে হাসলাম,

-কীভাবে?

-আপনি দাবা খেলেছেন ভাই? ৩২টি ঘুঁটি আর ৬৪টি ঘর। খেলতে গেলে কত রকম পারমাটেশন কম্বিনেশন হয়?

-কয়েক কোটি হবে হয়ত।

-ঠিক তাই। আমাদের জীবনের ও কোটি কোটি পারমাটেশন কম্বিনেশন হতে পারে। এই রাস্তায় গেলে এমন হবে আবার ওই রাস্তায় গেলে আরেক রকম। কিন্তু একটা সম্ভাবনার কথা বলা যায়। অনুমান করা যায়। সেই ভাবে বলতে পারি।

-বেশ শুনি আপনার অনুমান!

ঢাকায় ফেরার কিছুদিন পর ইয়াকুব সাহেবের কোলন ক্যানসার ধরা পড়ে। হয়ত অসুখটা তিনি অনেক আগেই বাধিয়েছিলেন টের পাননি। যখন টের পাওয়া গেল, ক্যানসারের তখন লাস্ট স্টেজ। ইয়াকুব সাহেবে কে বাঁচানো গেল না! ইয়াকুব সাহেবের শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী লাশটা গ্রামে নিয়ে আসা হয়ছে, কবর দেবার জন্য। ছেলে টিংকু অস্ট্রেলিয়া থেকে আসতে পারেনি। ছুটি পায় নি নাকি! ইয়াসির ঠিক করে ইয়াকুব সাহেব কে মায়ের কবরের পাশেই কবর দেবে। মায়ের কবরটা আসলে হারিয়ে যায়নি, নদী তে ভেসেও যায়নি! কবরটা যেখানে আগে ছিল সেখানেই আছে। ইয়াসির মিথ্যা বলেছিল। মায়ের মৃত্যুর সময়টা মনে করে ইয়াসির। কি কষ্টের সময় গেছে সেটা। শেষের দিকে মায়ের চিন্তা শক্তি লোপ পেয়েছিল। শুধু ইয়াকুব সাহেবের নাম ধরে ডাকতেন। ইয়াকুব সাহেব তখন সিঙ্গাপুর! কি এক অফিসের ট্রেনিং এ গেছেন। ইয়াসির রাহেলা ভাবীকে ফোন করেছিল কয়েকবার। রাহেলা বিশ্রীভাবে ধমক দিয়ছিল ইয়াসির কে,

...“তোর ভাইকে কি আমি সিঙ্গাপুর থেকে ধরে নিয়ে আসব?”

শেষের দিকে মা ইয়াসিরকে মনে করতেন ইয়াকুব। ইয়াসির ঘরে ঢুকলেই মনে করতেন ইয়াকুব সাহেব এসছেন,

-ইয়াকুব আসছিস বাবা?

মা মারা যাবার অনেক দিন পর ইয়াসির সাহেব গ্রামে এসেছিলেন। ২০ বছর পর হঠাৎ ইয়াকুব সাহেবের মায়ের কবর দেখার শখ হলো! ইয়াসির অভিমানে মায়ের কবরটা লুকিয়ে ফেলে। সেই মায়ের পাশেই আজ কবর হচ্ছে ইয়াকুব সাহেবের!

পাশার মেয়েটা পাশাকে ডাকে “বুবাই”। পাশার খুব ভালো লাগে ডাকটা। কিন্তু তারপর মেয়েকে শোধরানোর চেষ্টা করে,

-বুবাই না, বোকা মেয়ে, বলো বাবা!

মেয়ে পাশার বুকের ওপর পা ছড়িয়ে বসে ফোকলা দাঁতে হাসে! এই দৃশ্যটা দেখে নিশিও হাসে, পাশার স্ত্রী। মেয়ের নাম রেখেছে পাশা, “অরণী”!

-অরুনা, অরনী একটু কাছাকাছি হয়ে গেল না!

ভ্রু কুচকে জানতে চায় নিশি! পাশা কিছু বলে না। নিশি ও বেশি ঘাটায়নি। মৃত মানুষের সঙ্গে তো প্রতিযোগিতা চলে না! অরুনা পাশার জীবনে এখন অতীত। আর নিশি হচ্ছে বর্তমান। এটাই সত্য! অরুণার কিছু স্মৃতি পাশা যক্ষের ধনের মতো আঁকড়ে রেখেছে। সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই স্মৃতিগুলো তো বাড়ার আর সুযোগ নাই! নিশির সঙ্গে পাশার জীবন পড়েই আছে। কত কত নতুন স্মৃতি তৈরি হবে তাদের! সেখানে অরুণার তো কোন স্থান নেই!

ফাতেমার নতুন এক মাস্টার জুটেছে। জায়গীর মাস্টার আকবর। সারাক্ষণ তাকে শিখাচ্ছে,

-মেক্সি না বোকা ম্যাক্সি। কি ফুটো বলো, ফোটো বলো।

তারপর এই শাড়ি কেন পরছো ওইটা পরো। এটার রংটা ভালো না।

এই কঠিন শাসন খুবই উপভোগ করছে ফাতেমা। আজকাল প্রায়ই আকবর বলে,

-তুমি তো দেখি একদমই হাসো না!

আজিজ সাহেব আর আজিজ সাহেবের বউকে হজে পাঠিয়েছেন আকবর। দুই বুড়োবুড়ি খুশি। মডেল স্বপ্নার সঙ্গে প্রায় কথা হয় আকবরের। ফাতেমার সঙ্গেও খুব ভালো বন্ধুত্ব স্বপ্নার! বাসায় আসে। স্বপ্নার হার্টের সমস্যাটা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। এটা নিয়ে খুব মনঃকষ্টে ভোগে আকবর। কিন্তু স্বপ্নাকে একদম বুঝতে দেয় না!

হঠাৎ করে চাঁদটা মেঘের আড়ালে চলে গেছে। কালো আকাশের মাঝে চিকচিক করছে তারাগুলো। রকেটের একটানা ঘড়ঘড় শব্দ ছাড়া আর কোন শব্দ শোনা যাচ্ছে না। আমি বলি,

-আপনি এমনভাবে বলছেন পিনাকী বাবু, মনে হচ্ছে সব সিনেমার মতো আপনার চোখে ভাসছে!

পিনাকী কিছু বলেন না! তার মুখটা এই আলো আধারীতে কেমন যেনো অপার্থিব লাগছে। অনেক্ষণ পর থেমে থেমে পিনাকী বলে,

-শিবের আরেকটা নাম কি জানেন তো ভাই?

আমি বলি,

-জানি না তো!

পিনাকী মুচকি হেসে বলে,- মহাকাল! (সমাপ্ত)

  • গল্পে দেশভাগ

    উদ্বাস্তু

    পলাশ মজুমদার

    newsimage

    আমার সঙ্গে বিক্রমপুর যেতে পারবেন? কেন নয়! অবশ্যই পারব। কখন যেতে চান? আগামীকাল

  • গল্পে মুক্তিযুদ্ধ

    গোমতী নদীর তীরে

    ফারহানা রহমান

    newsimage

    গোমতী নদীর আইল বরাবর খুব সাবধানে পা ফেলে ফেলে প্রায় সীমান্তের কাছে

  • গল্পে মাতৃপ্রেম

    মা

    সাঈদ আজাদ

    newsimage

    ওই দেখো, বাবা কখন এসে উঠানে ঘোড়ানীমগাছের তলে প্লাস্টিকের চেয়ারে বসে আছে।

  • এ সংখ্যার কবিতা

    newsimage

    হাহা হাহা হাহা হাহা আনোয়ারা সৈয়দ হক হাহাকারে জর্জরিত সময়ের নদী উত্তাল তরঙ্গ আর বাতাসের

  • প্রত্যয়ী ভবিষ্যতের বাতিঘর

    মুনীরুজ্জামান

    newsimage

    ‘প্রত্যয়ী স্মৃতি ও অন্যান্য’ কবি প্রবন্ধকার শিল্পসমালোচক আবুল হাসনাতের নতুন গ্রন্থ। প্রকাশ