menu

অভিভাবক আনিসুজ্জামান

প্রবালকুমার বসু

  • ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ১৮ ফেব্রুয়ারী ২০২১
image

আনিসুজ্জামান / জন্ম : ১৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৩৭; মৃত্যু : ১৪ মে ২০২০

একজন ব্যক্তি যখন তাঁর সমসময়ে, সমাজে অভিভাবক স্বরূপ হয়ে ওঠেন, যে-কোনো সমস্যার সমাধান পেতে মানুষ তাঁর দিকে তাকিয়ে থাকে, তা শুধু তাঁর কাজের নিরিখে হয় না। মেধা ও মণীষার পাশাপাশি তাঁর জীবন-যাপন, সামাজিক সমস্যার মোকাবিলায় তাঁর ভূমিকা নির্ণয় করে দেয় তাঁর অবস্থান। বাঙালির সাংস্কৃতিক মননে ও বাংলাদেশের সামাজিক জীবনে অধ্যাপক আনিসুজ্জামান এমনই এক ব্যক্তিত্ব ছিলেন, যাঁকে যত ওপর থেকেই দেখি না কেন, ঘাড় উঁচু করেই দেখতে হতো। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম হওয়া থেকে একটি নব্য জন্ম নেওয়া দেশের সাংস্কৃতিক ও কিছুটা সাংবিধানিক রূপরেখা গড়ে দেওয়ার পিছনে তাঁর মতো আর কারো সক্রিয় ভূমিকা রয়ে গিয়েছে বলে আমার জানা নেই। ১৯৩৭ থেকে ২০২০ তাঁর এই পূর্ণ জীবনে তিনি ব্রিটিশ ভারত, পাকিস্তান আর স্বাধীন বাংলাদেশ, এই তিন রাষ্ট্রের নাগরিক, যা গড়ে দিয়েছিল তাঁর “বিপুলা পৃথিবী”, যেখানে আমরা পাই এক শতাব্দির ভাঙা গড়া আর বাঙালির ইতিবৃত্ত। পাকিস্তানে বাংলা ভাষার রাষ্ট্রীয় অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে তিনি ছাত্রাবস্থা থেকেই বরাবর ছিলেন সম্মুখসারির যোদ্ধা। ছাত্রাবস্থাতেই প্রকাশিত হয় তাঁর পুস্তিকা ‘রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন কী ও কেন?’ ১৯৬৪-তে প্রকাশিত ‘মুসলিম মানস ও বাংলা সাহিত্য’ বাংলা সংস্কৃতির গবেষণায় এক অপরিহার্য অবলম্বন। ১৯৮২ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর গবেষণা গ্রন্থ ‘আঠারো শতকের বাংলা চিঠি’, ১৯৮৪-তে ‘পুরনো বাংলা গদ্য’ যা যে কোনো জাতির-সংস্কৃতির বিবর্তনের ইতিহাসের এক পূর্ণাঙ্গ সূত্র। এর বাইরেও ‘স্বরূপের সন্ধানে’, ‘বাঙালি নারী’, ‘মুসলিম বাংলার সামায়িক পত্র’ বা আরো অনেক সৃষ্টি রয়ে গিয়েছে- যা বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির ভাণ্ডারে অমূল্য রতন হিসেবেই পরিগণিত হবে অনাগত ভবিষ্যতের কাছে। স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধানের বাংলা ভাষ্য প্রণয়ণের গুরুদায়িত্ব অর্পিত ছিল তাঁরই উপর। আমার সম্পাদিত ভারতের স্বাধীনতার পরবর্তী পঞ্চাশ বছরের বাংলা কবিতার ইংরেজি তর্জমা ‘সাইনপোস্ট’ হাতে ২০০২ সালের কোনো এক দুপুরে সেইসময় ‘যাপনচিত্র’ পত্রিকার সম্পাদক বর্ণালী রায়কে সঙ্গে নিয়ে আনিসুজ্জামান এসেছিলেন আমার অফিসে। তাঁর সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত পরিচয় না থাকলেও তাঁর লেখালেখির সঙ্গে বা সংবাদপত্রে প্রকাশিত ছবির সঙ্গে আমি নিবিড়ভাবে পরিচিত। এইভাবে যে তাঁর মতো এক ব্যক্তিত্ব আমার মতো অপরিচিত ও নগণ্য কারো অফিসে চলে আসতে পারেন, এ ছিল আমার কল্পনাতীত। আমার দ্বিধা দেখে বললেন- এমন একটি বই যিনি সম্পাদনা করেছেন তাঁর সঙ্গে গিয়েই আলাপ করা উচিৎ। এতটাই বিস্ময়াবিষ্ট হয়েছিলাম যে, খুব বেশি কথা বলতে পারিনি। কিন্তু বুঝতে পেরেছিলাম প্রকৃত গুণীজন কাউকে সমাদর জানাতে, সে যতই নব্যগণ্য হোক, কোনো কুণ্ঠা বোধ করেন না। এরপর যত কাছাকাছি এসেছি আবিষ্কার করেছি এক পরম স্নেহশীল, উদার ও আধুনিক মানুষকে, যাঁর আশ্রয়ে এক ধরনের নির্ভরতা পাওয়া যায়, অনেকটা অন্ধের স্পর্শের মতো। এই নির্ভরতা আমাকে সাহস দিয়েছিল তাঁকে আনিসদা বলে ডাকতে।

ব্যক্তি পরিচয়ের সীমানা বিস্তৃত হয়েছে পারিবারিক সম্পর্কে। বউদিও কাছে টেনে নিয়েছেন পরম স্নেহভরে। আমার প্রথম বাংলাদেশ যাওয়া ২০০৬ সালে, আনিসদার আমন্ত্রণে ও ব্যবস্থাপনায়। ঢাকায় থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন উনিই। মধ্যে দিন দুয়েকের জন্য সস্ত্রীক কক্সবাজার গিয়েছিলাম। ফেরার ব্যবস্থা ছিল বাসে, যানজটের জন্য ফিরতে বেশ দেরি হচ্ছিল। প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা দেরি করে বাস যখন ঢাকা টার্মিনালে পৌঁছল তখন রাত বারোটা বেজে গিয়েছে। ঢাকা শহরটা চিনি না, যেখানে থাকার ব্যবস্থা, তার ঠিকানা জানা থাকলেও তার অবস্থান জানা ছিল না। একরাশ দুশ্চিন্তা নিয়ে বাস টার্মিনাসে ঢুকতে ঢুকতেই দেখি অত রাতেও পুত্র আনন্দকে নিয়ে আনিসদা উপস্থিত। বললেন, খবর নিয়ে জানলাম বাস পৌঁছবে মধ্যরাত পার করে। ভাবলাম তোমরা আসবে কী করে তাই আনন্দকে নিয়ে এলাম যাতে তোমাদের থাকার জায়গায় পৌঁছে দিতে পারি। একে কি শুধুই সৌজন্য বলব, নাকি এক মহৎ হৃদয় উদ্ভূত স্নেহময় ভালোবাসার প্রকাশ। তাঁর মহৎ হৃদয় অকৃপণভাবে প্রশ্রয় দিয়েছে এই কনিষ্ঠজনকে। কলকাতায় এলে, বা দিল্লিতে এলে প্রথম যে কয়েকজনকে ফোন করতেন, বিস্মিত হই, তার মধ্যে আমিও পড়তাম। বেশ কিছুদিন যোগাযোগ না হলে নিজেই ফোন করে কুশল বারতা জানতে চাইতেন। একসময় আবিষ্কার করেছি সম্পর্কটা এমন এক জায়গায় পৌঁছেছে, যেখান থেকে আবদার করা যায়। হয়ত কোনো বইয়ের প্রয়োজন হয়েছে, অথবা কোনো লেখার, কলকাতায় আসার সময় নিজে নিয়ে এসেছেন সেই বই বা লেখা। কখনো ভুলে যাননি। কালি ও কলম পত্রিকায় কত তরুণ লেখকের লেখা নিয়ে ওঁকে দিয়েছি। শুধু জিজ্ঞেস করেছেন- তোমার পছন্দ তো? কখনো আবদার করেছি ঢাকায় আমার একটা একক কবিতা পাঠের আসর হতে পারে না? কখনোবা বই প্রকাশের। কোনো আবদারই কখনো ফেরাননি। ২০১২ সাল থেকে চাকরি সূত্রে আমার নিয়মিত বাংলাদেশ যাওয়া শুরু। প্রতি মাসেই প্রায় দু-চার দিনের জন্য ঢাকা বা চট্টগ্রাম যেতে হতো। আমি এসেছি জানলে যে কোনোভাবে সময় বার করে নিতেন তিনি। কোনো অন্যথা হয় নি। ওঁর বাড়িতে আমি অবধারিত অতিথি। একবার উনি ঢাকায় ছিলেন না। রাত্রে ফেরার কথা। পরদিন ভোরেই আমি দিল্লি ফিরব, সেবার আর দেখা হবে না। শোয়ার আয়োজন করছি, রাত প্রায় এগারোটা। হোটেল রিসেপশন থেকে ফোন- আনিসুজ্জামান স্যার আপনার সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন। তড়িঘড়ি করে রিসেপশনে পৌঁছতে বললেন, ঢাকায় পৌঁছতে দেরি হয়ে গেল। তোমার সঙ্গে একবার দেখা হবে না, তাই এলাম। এই মানবিক স্পর্শ খুব কম জনের কাছ থেকেই পেয়েছি। আমার কাব্যনাট্য সংগ্রহরে ভূমিকা লিখেছিলেন তিনি। রাতের মধ্যে শেষ করে পরদিন সকালে আমার উড়ান ধরার আগে হোটেলে পৌঁছলেন ভূমিকা নিয়ে। বললেন, পছন্দ না হলে বোলো, বদলে দেব। আমার মনে হয়েছিল তার প্রখর পাণ্ডিত্য, প্রজ্ঞা এই সবকে অতিক্রম করে গেছে যে বৈশিষ্ট্য তা হলো তাঁর মানবিক উদ্ভাস, মানুষ আনিসুজ্জামান। যে চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ও গুণ একজনকে বিশিষ্টতা দেয় তার মধ্যে প্রধানতম তাঁর আধুনিক মনস্কতা। এই আধুনিক মনস্কতা এক নির্ভীক পক্ষপাতহীন ধর্মনিরপেক্ষ অবস্থান বা মতামত যা সমসাময়িক অথবা প্রচলিত অবস্থান থেকে এগিয়ে থাকে। অধ্যাপক আনিসুজ্জামান ছিলেন সেই রকমই একজন আধুনিক মানুষ, দুই বাংলার নিরিখেই। আধুনিকতার আরো এক বৈশিষ্ট্য পাণ্ডিত্যের ভারে আক্রান্ত না হয়ে পড়া, যা আনিসুজ্জামানের ক্ষেত্রেও হয়নি। তাই তাঁর লেখা গদ্য এত সাবলীল ও সহজ। যে কোনো গম্ভীর বিষয়কে সহজ ও প্রাঞ্জল করে ব্যাখ্যা করেন উনি। তাঁর গদ্যশৈলীর আরো একটা বড় গুণ বিষয় থেকে বিষয়ান্তরে না যাওয়া। অর্থাৎ যে বিষয় নিয়ে লিখছেন সরাসরি সেই বিষয়টাকেই তুলে ধরা বা প্রতিষ্ঠা করা, আনুষঙ্গিক তত্ত্ব উপস্থাপন না করা। এতে পাঠ প্রক্রিয়া অনায়াস হয়। বিশ্বায়নের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের চিন্তা ভাবনার পরিধি বিস্তৃত হলেও সেই চিন্তাভাবনার মনন হয়ে এসেছে সংকীর্ণ। সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক সমস্ত প্রেক্ষাপটেই সিদ্ধান্ত হচ্ছে ব্যক্তিস্বার্থের নিরিখে। ব্যক্তিস্বার্থের এই দুর্বলতা ঢাকতে মানুষকে পরতে হচ্ছে মুখোশ, কখনো একাধিক মুখোশ। ফলে ন্যায্য কথাটা আর সে বলে উঠতে পারছে না, সমস্ত কিছুতেই মন জুগিয়ে কথা বলতে হচ্ছে। এরকম পারিপার্শ্বিক অবস্থায় খুব অল্প কয়েকজন ব্যক্তিস্বার্থ অতিক্রম করে সঠিক কথা বলতে সংশয়ান্বিত হন না। সাধারণ মানুষ তখন তাঁদের দিকেই তাকিয়ে থাকেন নির্ভরতা বা আশ্রয় খুঁজতে। আনিসুজ্জামান ছিলেন এমনই এক বিশিষ্ট জন, যিনি সঠিক কথাটা বলতে কখনো পিছপা হননি। নিজের মত প্রকাশেও দ্বিধান্বিত হন নি। মানুষের কর্মময় জীবন গড়ে তোলে তার পারিপার্শ্বিক। তার মনের আধ্যাত্মিক বিকাশ বহুলাংশে নির্ভর করে এই পারিপার্শ্বিকতার উপর। এই আধ্যাত্মিক বিকাশ আসলে ধ্যানলোকে উদ্ভাসিত সত্যের পরিচয় যা উন্মোচিত করে দৈনন্দিন জীবনযাত্রার যথাযথ অবস্থান। ব্যক্তির নিরিখে তিনি আর তখন নিজেতেই আবদ্ধ থাকেন না, নিজেকে বিস্তৃত করে হয়ে ওঠেন একটি জাতির পরিচয়। ঠিক এমনটিই ঘটেছিল অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের ক্ষেত্রেও।