menu

অপ্পো কথার গপ্পো

লিটন চক্রবর্তী মিঠুন

  • ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ১১ অক্টোবর ২০১৮
image

আর দশটা বিষয়ের মতো সাহিত্যও হরেক রকম। নানা তার চেহারা, বিচিত্র তার নাম। উপন্যাস হলো সাহিত্যের তুলনামূলক নবীন একটি শাখা; বাংলা সাহিত্যে সে তো কৈশোর পেরোয়নি বলেই অনেকে মনে করেন। আমাদের বাংলাদেশে, তাবড় কিসিমের উপন্যাস লেখা শুরু হয় সাতচল্লিশের আত্মঘাতী দেশ ভাগের বছর পর থেকে। অবশ্য পূর্ববাংলার বেশ কজন দেশভাগের আগেই উপন্যাস লেখা ও প্রকাশ করেছেন কলকাতা থেকে। কিন্তু, যেটাকে পুরোদস্তুর বাংলাদেশি কথাসাহিত্য বলি তা কিন্তু মোটাদাগে ৪৭-পরবর্তী ঘটনা। পাকিস্তান অর্জনের ভাতঘুম থেকে পূর্ববাংলা সবে আড়মোড়া ভাঙতে শুরু করেছে। জহির রায়হানের মহান উপন্যাস হাজার বছর ধরে ছিল সে কান্ডকারখানারই একটা সাহিত্যিক শুরুয়াত। সে ভারিক্কি যুক্তিতক্কো বরং আজকের মতো মুলতবি থাক। বইটি কীভাবে আমাদের বেশ ক’টা প্রজন্মকে দোলা দিয়েছে, নাড়িয়েছে, বরং তার একটা বয়ান পেশ করি।

বইখানা ছিল আমাদের সময়ে নবম-দশম শ্রেণির পাঠক্রমে। গত শতাব্দীর ষাটের দশকের পটভূমিতে স্থিত উপন্যাসটি আমাদের গ্রামীণ জীবন ও সংস্কৃতির কোলাজের মতো ফুটে উঠেছে। নিবিড়ভাবে গ্রাম, শহরের হাওয়া লাগেনি বললেই চলেÑ বাংলাদেশের এরকম একটা প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের হাসি-কান্না, খাওয়া-রান্না, গালাগালি, গলাগলি (গোলাগুলি নয় কিন্তু), টাল্টিবাজি, শাদিবাজি কী না ছিল বইটিতে। ছিল বলছি কেন, আছে। আরো আছে ভোরবিহানে শাপলা তোলা, রাত জেগে অন্যের পুকুরের মাছ চুরি, পুথি শোনা, বউপেটানো, চার-পাঁচটা বিয়ে করা কত কিছু। বুড়ো মকবুলের বউদেরকে খাটানো আর আবুলের বউ মেরে ফেলার বাতিক কাহিনির করুণ কিন্তু বাস্তব সত্য আমাদেরকে ছুঁয়ে যায়। হাত নিশপিশ করেÑ এই বুঝি আবুলকে ধরে ক্যালানি দিই, মকবুলকে এক চোট ঝেড়ে দিই! আবার, মন্তু-টুনি-আম্বিয়ার ত্রিকোণ প্রেমের জটিলতা-মধুরতা আমাদের রোমান্টিকতাকে উস্কে দেয়। আমরা সদ্য কৈশোর পেরুনো বালক-বালিকার দল কল্পনায় ভাসতে থাকি আনেবানে। যখন ঢেঁকিতে ধান ভানতে ভানতে আম্বিয়া গান ধরত, ‘স্বপ্নে আইলো রাজার কুমার, স্বপ্নে গেলো চইলারে।/ দুধের মতো সুন্দর কুমার কিছু না গেলো বইলারে’Ñ আমি হলপ করে বলতে পারি আমাদের অনেকেই সে রাজার কুমার হবার খোয়াব দেখেছে। কোন সহপাঠিনী, প্রতিবেশিনী, কিংবা কল্পসুন্দরীর সাথে মনে মনে রঁদেভু-অভিসারে হারিয়ে গেছে।

আবার, ভূতেপাওয়া সখিনার ডায়লগ শুনে হেসে লুটোপুটি খায়নি কে? কুসংস্কার-অন্ধবিশ্বাস যা-ই বলুন, গ্রামের আন্ধার রাস্তায় ভূতের ভয় আমাদের অনেকের গায়ে পিলপিলিয়ে ওঠে, এখনও। যাহোক, সালেহার কূটনামি আর টুনির গুটিবাজি আমাদেরকে আশেপাশের অনেক মতলববাজ মানুষের চেহারাসুরত ইয়াদ করিয়ে দেয়নি এমনটা হয়নিÑ এটা আমি দলিলে লিখে দিতে পারি। ফের, সুরত আলীর সুর করে পুঁথি পড়া আর বাকিদের তা শুনতে শুনতে চোখ ভিজে যাওয়াÑ গ্রামজীবনের সরলতা-স্নিগ্ধতার পেহচানপত্রটি আমাদের নিজের চিনতে শিখিয়েছে। সে সরলতার প্রতিমা ডিশ-এন্টেনার ধাক্কায় আর গেজেট বাবাজীর চাক্কায় পড়ে প্রায় অক্কা পেয়েছে। আমাদের কারুরই যে পুথিপাঠ শোনার অভিজ্ঞতা নেই বললেই চলে। তবে, যুগের তমদ্দুন আপনি এড়াবেন কী করে! আজকের ডিজিটাল প্রজন্ম (যার শরিক আমরাও) তাই এসবের সাথে নিজেদের মেলাতে পারবে কি না সন্দ আছে। হিন্দি-উর্দুভাষী অনেক আধুনিক, টেক-স্মার্ট (প্রযুক্তিদুরস্ত) যুবক-যুবতী শায়েরি লেখে, আবৃত্তি করে। আধুনিক বিষয়বস্তু, থিম আর ডিকশন নিয়েই। ইউটিউবেই আপনি তা খুঁজে পাবেন। আধুনিক বাংলা পুঁথি লেখা হবে কি?

সে যাকগে। লেখক জহির রায়হান ছিলেন রাজনীতি ও সমাজসচেতন মানুষ। মুনশিয়ানার সাথেই তিনি পূর্ব বাংলার লোককথা, ছড়া, প্রবাদ, বিয়ের গীত ব্যবহার করেছেন। পুঁথিগুলো আমার কাছে লেগেছে তাঁর হাতের কামাল। যেমন:

শুন শুন বন্ধুগণরে, শুন দিয়া মন।

ভেলুয়ার কথা কিছু শুন সর্বজন।

কী কহিব ভেলুয়ার রূপের বাখান।

দেখিতে সুন্দর অতিরে রসিকের পরাণ ॥

আকাশে চন্দ্র যেনরে ভেলুয়া সুন্দরী।

দূরে থাকি লাগে যেন ইন্দ্রকূপের পরী ॥

আর আমাদের একটি লোকভাষাকে তিনি জুড়ে দিয়েছেন চরিত্রদের মুখে। সে ভাষার একটা নেশা নেশা আবেশ আছে। খাঁটি বাঙাল ভাষা যে! আমাদের সুন্দরী আম্বিয়াকে যেন তাড়াতাড়ি মন্তুর কাছে বিয়ে দেওয়া হয়, তাই জন্যে মকবুল রশিদকে বলছেÑ ‘তোমরা এইটার একটা ফয়সালা কইরা ফালাও মিয়া। ওই মাইয়া বেশিদিন থাকবো না। বহু লোকের চোখ পইড়ছে’। রশীদের জবাবÑ ‘মাইয়ার হাঁপানি, শেষে বাড়ির সক্কলের হাঁপানির অইবো’। আহা, কী নিজ্জলা ভাষা, অন্তর-নিঙড়ানো আঞ্চলিক বুলি! আমার, আমাদের শেকড়ের ধ্বনি-প্রতিধ্বনি। দেখা যাচ্ছে, পাত্র-পাত্রীর ভাষা তৈরিতে লেখক পাক্কা ওস্তাদ। কোনও রকম উৎপটাং ভাষিক প্রসাধনী মেখে ভুয়া-মেকি জবানের সংলাপ বানাবার আজাইরা চেষ্টায় লিপ্ত হননি তিনি। শুধু তিনিই নন, সকল মহান কথাশিল্পীরই এটা একটা কমন আস্পেক্ট।

বেশ কয়েক বছর আগে উপন্যাসটির চলচ্চিত্রায়ন করা হয়েছে। করেছেন জহিরপত্নী সুচন্দা। খুব উঁচুদরের কাজ হলেও, শুনেছি, বাণিজ্যিকভাবে পোড় খায় ছবিটি- পোশাকী ভাষায় বলতে গেলে, ফ্লপ খেয়েছে বক্স-অফিসে। তবে মন্তুর চরিত্রে রিয়াজ, মকবুলের ভূমিকায় এটিএম শামসুজ্জামান আর টুনির চরিত্রে ঐশী মেয়েটা ঘ্যামা অভিনয় করেছেন। ছবির একটি গান “তুমি সুতোয় বেঁধেছ শাপলার ফুল নাকি আমার মন” তো জবর হিট হয়েছে। বারবার শোনার মতো গান এক পিস বটে! এমন মনমোচড়ানো গান আমি কমই শুনেছি। একটা চৌকস মার্কেটিং টিম যদি ছবির প্রমোশনে নামত, তবে দেদার ব্যাবসা করতে পারত। বেশ ক’টা পুরস্কার-টুরস্কারও বাগাতে পারতো পারতপক্ষে। আমার মতো উপন্যাসটির ভক্তদের অনেকে অন্তত তা-ই মনে করি।

তবে আফসোসের কথা এটাই যে বইটা এখন আর নাইন-টেনের সিলেবাসে নেই। ফলে, দেশের শিক্ষার্থীদের সিংহভাগই বইটি পড়েনি বলেই ধরে নিচ্ছি। কেননা, আমার কমনসেন্স বলে- আপনারাও আশা করছি সহমত হবেন- সিলেবাসে না থাকলে আজকালকার বিদ্যার্থীদের বেশিরভাগই সাহিত্যের বইকেতাব ঘাঁটে না। এতে যে মার্কস পাওয়ার মওকা নেই। ভূতের বেগার খেটে ফায়দা কী! পাঠ্যবইই আগাগোড়া পড়ে কি না, খোদা মালুম।

কিন্তু, একটা প্রজন্ম যারা ওই কিশোর বয়েসে বইটা পড়েছে, বা এখনো যারা পড়ছে, তাদের কাছে এটা সিন্দুকে তুলে রাখার মতো অভিজ্ঞতার ধন। সারা জীবন গপ্পো করার মতো নিখাদ পুঁজি। বইটা নিদেনপক্ষে এটা সাবিদ করেছে যে, মানবিক আবেদন, অকৃত্রিমতা আর বলার মতো গল্প হলে একটা সাহিত্যকর্ম পন্ডিতের চ্যাম্বার ছিঁড়েফুঁড়ে আমপাঠকের হৃদয়ে মসনদ পাততে পারে। প্রসঙ্গক্রমে এটাও বলে রাখতে চাই, বিশ্বমঞ্চে কেষ্টুবিষ্টু হতে চাওয়া বাংলাদেশকে তার সাহিত্যকেও হাইলাইট করতে হবে। তামাম দুনিয়াকে জানান দিতে হবে, আমাদের ভাষা ও সাহিত্য কতটা তাকতদার, কতটা প্রকাশশীল। অনুবাদের মাধ্যমে হাজার বছর ধরের মতো বইগুলাকে সীমানা ডিঙিয়ে জগতের মাহফিলে নিয়ে আসা চাই। সমঝদার ভাইলোক, আওয়াজ দিন। পরিশেষে বলব, বেঁচে থাকুক বইখানা হাজার বছর ধরে। জহির রায়হানকে থাম্বস-আপ। জিয়ো গুরু!

  • বিশেষ সাক্ষাৎকার

    কিছুটা এমার্জেন্সি কবির বাঁচার মধ্যে থাকে

    অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত

    newsimage

    প্রশ্ন : এই যে এত বছর বিদেশে থাকা, বছরে একবার করে আসা,

  • সমর সেন : কেন প্রাসঙ্গিক

    দারা মাহমুদ

    newsimage

    কবি বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত ‘কবিতা’ পত্রিকা হাতে পেয়ে রবীন্দ্রনাথ দু’জন অপরিচিত তরুণ

  • কবি জাহাঙ্গীরুল ইসলাম

    স্মৃতি ও কবিতা থেকে

    সৈকত রহমান

    newsimage

    জাহাঙ্গীরুল ইসলাম সম্পর্কে কিছু বলতে বা লিখতে যদি যাই, দেখি আমাদের ব্যক্তিগত

  • রমা চৌধুরী

    মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক নভেলায়

    খালেদ হামিদী

    newsimage

    আমার মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক একমাত্র উপন্যাসিকা ‘সব্যসাচী’তে রমা চৌধুরী আছেন, নভেলাটির শেষাংশে, এভাবে:

  • দিদি ও আমার দিন-যাপনের খসড়া

    আলাউদ্দিন খোকন

    newsimage

    ২ সেপ্টেম্বর ২০১৮, বিকেল ৫টা। দিদি চট্টগ্রাম মেডিকেলের আইসিইউ-তে। জন্মাষ্টমির বন্ধ চলছে।

  • এ সংখ্যার কবিতা

    newsimage

    একটি মনোরম সন্ধ্যার আর্তি কাজী সুফিয়া আখতার বেঙ্গল বইয়ের লাইব্রেরিতে বুধবার বিকেলে হঠাৎ করেই

  • জনক

    শামীম আহমেদ

    newsimage

    বাড়ির আঙিনায় ঢুকেই মনটা খারাপ হয়ে গেল সৈকতের। চারদিকে বিদঘুটে অন্ধকার। জেনারেটর