menu

অন্য ভুবনের বাসিন্দা

রেজাউল করিম খোকন

  • ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ০৮ নভেম্বর ২০১৮
image

শিল্পী : সঞ্জয় দে রিপন

তেইশ চব্বিশ বছর ধরে সযত্নে রেখে দেয়া রুমানার লেখা সবগুলো চিঠি পড়া কখন শেষ হয়ে গেছে টের পায় না হাসান। অনেকটা ঘোরের মধ্যে রয়ে যায় সে। রুমানা দেখতে কেমন, এখনও সে জানে না। আজও তার মুখোমুখি হয়নি সে। রুমানার কোনো ছবিও দেখেনি সে। কল্পনায় মনের পর্দায় শুধু এঁকেছে সেই মেয়েটির ছবি। এখন রুমানারও বয়স বেড়েছে। এই মাঝ বয়সে পৌঁছে তার মনে অনেক পরিবর্তন হলেও এখনও সে হাসানকে ঠিক মনে রেখেছে। এখনও তাকে খুব কাছের একজন মানুষ মনে করে। এতোদিন পর টেলিফোন নম্বর জোগাড় করে তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। রুমানা তার জীবনে ঘটে যাওয়া আরও অনেক কথা তাকে জানাতে চায়।

তার সঙ্গে পত্র যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর রুমানার জীবনের আর কোনো কথাই জানে না হাসান। তখন যদি সে নিজে তৎপর হতো, ঢাকায় এসে রুমানার কথামতো দেখা করতো তার না বলা মনের সব কথা জানার চেষ্টা করতো তাহলে তাদের জীবনের ছকটা হয়তো অন্যরকম হতো। দুই ভুবনের বাসিন্দা না হয়ে এক ভুবনে হয়তো তাদের বসবাস হতো আজ। আজকের এই পরিণতির জন্য নিজেকে দায়ী ভেবে অনুশোচনায় ভরে যায় হাসানের মন। নিজেকে অপরাধীর কাঠগড়ায় দাঁড় করায় আর ধিক্কার দিতে থাকে।

সারাটা রাত অস্থিরতা তাড়া করে ফেরে। হাসান ঘুমোতে চেষ্টা করে অনেক। কিন্তু দু’চোখে ঘুম আসতে চায় না। রুমানার শেষের দিককার চিঠিগুলোর কথা বারবার মনের মধ্যে তোলপাড় করতে থাকে। রুমানা তাকে একান্ত কিছু কথা বলার জন্য শুধু ছটফট করছিল শেষ চিঠিটিতে। কিন্তু কীভাবে বলবে ঠিক বুঝে উঠতে পারছিল না। চিঠিতে তো সবকিছু খুলে বলা যায় না।

গত কয়েকদিনে আসলেই সব কিছু এলোমেলো করে দিয়েছে রুমানা। ঘর-সংসার অফিসের কাজকর্মে ছন্দপতন না ঘটলেও ভেতরে ভেতরে দারুণ এক অস্থিরতা আর উত্তেজনা বয়ে বেড়াচ্ছে হাসান।

ধানমন্ডি লেকের দক্ষিণ পাশে দুই নম্বর রোডে রেস্টুরেন্ট। আর একটু এগিয়ে গেলেই রাইফেল স্কোয়ার মার্কেট।

রেস্টুরেন্টের ভেতরে গিয়ে বসে অপেক্ষা করাটাই বরঞ্চ ভালো।

তেমন ভিড় নেই। নিরিবিলি শান্ত সুনসান পরিবেশ।

হাসান ঘড়ি দেখে। দুটো বেজে গেছে।

তখনই দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে সালোয়ার-কামিজ পরা এক মহিলা। উজ্জ্বল শ্যামলা বর্ণের মহিলার চুলগুলো এখনও ভেজা। হয়তো কিছুক্ষণ আগে স্নান সেরেছে। মেকআপ-এর চিহ্ন নেই মুখে। স্বাভাবিক সৌন্দর্য আর লাবণ্য ছড়িয়ে আছে সেখানে। তাকে দেখে বয়সটা ঠিক অনুমান করা যায় না। বয়স হলেও তার ছাপ পড়েনি চেহারা কিংবা ফিগারে। চমৎকার স্মার্ট ভঙ্গিতে হেঁটে আসছে সে।

রুমানা বলেছিলো সে সালোয়ার-কামিজ পরে আসবে, কোনো সাজগোজ করবে না, ওর চুলগুলো থাকবে খোলা আর কপালে থাকবে টিপ।

হাসান এবার চিনতে পারে রুমানাকে। মনে মনে এতোদিন রুমানার যে ছবি এঁকে রেখেছিলো তার সঙ্গে মিল না থাকলেও এই মুহূর্তে রুমানাকে বেশ লাগছে দেখতে। এই বয়সেও তার মধ্যে নিটোল একটা সৌন্দর্য ছড়িয়ে আছেÑ যা যে কাউকে মুগ্ধ করবে।

হাসান দাঁড়িয়ে রুমানার আগমনটা দেখছিলো, ঠিক সামনে আসতেই নিশ্চিত হওয়ার জন্য বলে, ‘আপনি মানে তুমি রুমানা তো, আই এম হাসান।

হাসানের কথা বলার ভঙ্গি দেখে হেসে ফেলে রুমানা।

‘আরে বাবা, আমিই মিসেস রুমানা আফরোজ, দরজা দিয়ে ঢোকার সময় তোমাকে দেখেই আমি চিনেছি, আমি যেমনটা ভাবতাম তুমি ঠিক তেমনই, কোনো নড়চড় নেই। আমার প্রি অ্যাজমশন একেবারে মিলে গেছে। আমাকে দেখে তুমি পুরোপুরি হতাশ এ ব্যাপারে আমি হানড্রেড পাসের্ন্ট শিওর। তোমাকে তো আগেই অনেকবার বলেছি, আমি সে রকম নই মোটেই, তুমি আমাকে যেমনটি কল্পনা করেছ তেমনটি নই, আমি একটা পেতœী, দেখলে তো এবার, রুমানার রসিকতায় হাসানও হাসতে থাকে।

হাসান ও রুমানা মুখোমুখি বসে।

‘আমাকে এক নজর দেখেই তুমি কীভাবে কনফার্ম হলে আমিই রুমানা’? এরকম পোশাকে এলোচুল কপালে টিপ দিয়ে অন্য কোনো মহিলাও তো আসতে পারতো’।

‘আমার মনের ভেতর থেকে কে যেন বলে দিচ্ছিলো তুমিই রুমানা’, দার্শনিক ভঙ্গিতে বলে হাসান।

‘ওমা তাই বুঝি, তোমার মনের মধ্যে আবার কে বাস করে গো’? রুমানা রসিকতার সুরে বলে।

‘আমার ভীষণ ক্ষিদে পেয়েছে খাওয়া শুরু করে দিইÑ কী বলো?’ কথা বলতে বলতে রুমানা নিজেই প্লেটে খাবার বাড়তে থাকে এবং হাসানের দিকে এগিয়ে দেয়। তারপর নিজের জন্য নেয়।

তারপর রুমানা বলতে শুরু করে, তোমার সঙ্গে চিঠিপত্র যোগাযোগ থাকতেই শিহাবের সাথে আমার পরিচয়। ঢাকাতেই আমাদের আলাপ এবং পরিচয়। বিমানের কেবিন ক্রু মানে এয়ার হোস্টেস হিসেবে আমি তখন দেশ-বিদেশে যাই। আকাশেই সময় কেটে যায়। যখন ফ্লাইট থাকতো না ঢাকায় নিজেকে বড্ড নিঃসঙ্গ মনে হতো। সময়গুলো কাটতেই চাইতো না, হাঁপিয়ে উঠতাম। চিঠিপত্রের মাধ্যমে তোমাকে যেভাবে আপন ভাবতে শুরু করেছিলাম তোমার খুব কাছাকাছি চলে এসেছিলাম তোমাকে সামনা-সামনি না দেখে, টেলিফোনে কথা না বললেও তোমার মনটা সম্পর্কে আমার স্পষ্ট একটা ধারণা হয়ে গিয়েছিলো। আমি ঠিকই বুঝে নিয়েছিলাম, খুব ভদ্র শান্তশিষ্ট একজন মানুষ তুমি। তুমি সবেমাত্র চাকরিতে ঢুকেছ। তখন আমি একটা আশ্রয় খুঁজছিলাম ঢাকা শহরে। আমার জীবনের জন্য একটা নির্ভরতার খুব প্রয়োজন ছিলো। শিহাবের সান্নিধ্যে যাবার পর মনে হলো তার উপর আমি নির্ভর করতে পারি। চাকরি-বাকরি করতো না সে। বুয়েট থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করার পর এখানে-ওখানে চাকরির সন্ধানে ছিল। ঢাকা শহরে তারও কোনো স্থায়ী ঠিকানা ছিল না। থাকতো তার এক ফুফুর বাসায়। ওখানে থেকেই পড়াশোনা করতো। বেকার জীবনেও থাকতো ফুফুর বাসাতেই। বড়লোক ফুফুর বাসার টুকটাক কাজ-কর্ম, ব্যাংকে গিয়ে ইলেকট্রিক বিল, গ্যাস বিল লোনের কিস্তির টাকা জমা দেয়ার কাজ করা ছাড়া আর করার কিছুই ছিল না। তেমন একটা ছেলেকেই আমার কেন যে ভালো লেগে গিয়েছিলো, তাকেই আমার অনিশ্চিত জীবনের একজন নির্ভরযোগ্য মানুষ ভাবতে শুরু করেছিলাম, জানি না।

এয়ার হোস্টেসদের বিয়ে করার ব্যাপারে কর্তৃপক্ষের নানা রকমের বিধিনিষেধ থাকে। অফিসের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে তাদের না জানিয়ে অনেকটা লুকিয়েই একদিন শিহাবের সঙ্গে আমার বিয়ে হয়ে গেলো। বিয়েতে শিহাবের তেমন আগ্রহ বা তাড়া না থাকলেও আমি নিজেই তৎপর হয়েছিলাম বিয়ের জন্য। কারণ আমি ঢাকা শহরে একটা ঠিকানা গড়তে চেয়েছিলাম, নিজের নিরাপত্তা এবং নিশ্চিত জীবনের জন্য।

বিয়ের পর আমরা ছোট্ট একটা ফ্ল্যাটে উঠলাম। দেড় রুমের ছোট্ট ফ্ল্যাট। কোনোভাবে মাথা গোঁজার ব্যবস্থা হয়েছিল। আমার ধারণা ছিল, বিয়ের পর শিহাবের মধ্যে একটা পরিবর্তন আসবে। দায়িত্ববোধ জাগবে আমার ব্যাপারে, কেয়ারনেস ভাব আসবে। কিন্তু আমাদের দাম্পত্য জীবন একবছর পূর্ণ হয়ে যাবার পরেও তার মধ্যে কোন পরিবর্তন এলো না।

ততোদিনে আমার বিয়ের ব্যাপারটা অফিস জেনে গেছে। তাদের না জানিয়ে বিয়ে করায় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে আমাকে গ্রাউ-েড করা হয়। ব্যাপারটা আমার কাছে অপমানজনক মনে হয়। তীব্র অভিমানে এয়ার হোস্টেসের চাকরিটা ছেড়ে দিই।

শিহাবের মধ্যে তখনও দায়িত্ববোধ না জাগায় আমি অবাক হয়ে যাই। যার উপর ভরসা করে আমি ঢাকা শহরে নিজের একটা ঠিকানা গড়তে তাকে বিয়ে করেছিলাম সে-ই আমার উপর নির্ভরশীল হয়ে উঠেছিল দিনে দিনে। ফুফুর বাড়ি ছেড়ে আমার সঙ্গে ভাড়া করা ফ্ল্যাটে থাকলেও নিজে উপার্জন করে আপন যোগ্যতায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার কোনো তাগিদই সৃষ্টি হয়নি শিহাবের মধ্যে। নিজে একজন ইঞ্জিনিয়ার হওয়া সত্ত্বেও এয়ার হোস্টেস-এর চাকরিতে ভালো বেতন হওয়ায় আমার উপার্জন-এর উপরই নির্ভর করতে শুরু করেছিলো। আমাকে আরও বেশি করে উপার্জনের জন্য নানা রকম ধান্ধার জন্য প্ররোচিত করতে শুরু করেছিল।

এয়ার হোস্টেসদের বিদেশ থেকে স্বর্ণ এবং অন্যান্য মূল্যবান জিনিসপত্র এনে ব্যবসা-বাণিজ্য করার নানা সুযোগ থাকে। এছাড়া কেউ কেউ স্বর্ণ পাচারকারী, মাদক ব্যবসায়ীদের বাহক হিসেবে কাজ করে লাখ লাখ টাকা উপার্জন করতো। আমাকেও অনেক অফার দেয়া হয়েছিল। কিন্তু আমার বিবেক কোনোদিনই তেমন কাজকে সমর্থন করতে পারেনি। অনেক লোভনীয় অফার পেলেও আমি তাতে সাড়া দিইনি। শিহাব এসব জানতো। আমাকে অনেকভাবে প্ররোচিত করতে চেয়েছে সে। রাতারাতি বড়লোক হওয়ার জন্য অবৈধভাবে টাকা-পয়সা উপার্জনের জন্য আমাকে অনেক চাপাচাপি করেছে। কিন্তু আমি অটল ছিলাম আমার নীতিতে।

এর মধ্যে আমি মা হবার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠি। শিহাবও চাইতো আমি ওর সন্তানের মা হই। কিন্তু পর পর কয়েকবার আমার মিসক্যারেজ হয়ে যায়। আমি নিজেও তাতে বেশ ভেঙে পড়ি।

এয়ার হোস্টেস-এর চাকরিটাকে আমাদের সমাজে তখনও খুব ভালোভাবে নিতে পারেনি। আমার আত্মীয়স্বজনদের অনেকেই এ নিয়ে আড়ালে আজেবাজে কথা বলতো। আবার কেউ কেউ সামনাসামনি এমন আচরণ করতো যেন আমি খুব খারাপ একটা কাজ করছি, নষ্ট হয়ে গেছি। এই সমাজে আমার পরিচয় একজন নষ্ট নারী হিসেবে। আমি অবশ্য এসব একদম কেয়ার করতাম না। কারও অপমান গায়ে মাখতাম না।

নিজের ব্যাপারে আমার মধ্যে এক ধরনের শক্তিশালী আত্মবিশ্বাস ও প্রত্যয় ছিল। আমি কোনো খারাপ কিছু করছি না, নিজের যোগ্যতা, মেধা ও শ্রম দিয়ে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হতে চাইছি। আমার মধ্যে কোনো পাপবোধ নেই। নিজের পরিশ্রমে জীবনে সুখ শান্তি আনতে চাইছি।

আমি কোনোভাবেই পরাজিত হবো না, তেমন বিশ্বাস ছিল। কিন্তু পরপর কয়েকবার মিসক্যারেজ হয়ে যাওয়ায় এবং শিহাবের সংসার ও বৈষয়িক জীবনে চরম উদাসীনতা ইত্যাদির পর এয়ার হোস্টেসের চাকরিতে গ্রাউন্ডেড করে দেয়ার ঘটনা আমাকে ভীষণভাবে বিপর্যস্ত করে তুলেছিলো। আমি অনেক দিশেহারা হয়ে পড়েছিলাম। অনেকটা জেদের বশে চাকরিতে ইস্তফা দিয়েছিলাম।

একটানা নিজের অতীত জীবনের কথাগুলো বলতে বলতে কিছুটা হাঁপিয়ে ওঠে রুমানা। গলাটাও শুকিয়ে গেছে। বোতল থেকে গ্লাসে পানি ঢেলে নিয়ে কয়েক ঢোক খায়।

‘তারপর কী হলো?’ কৌতূহলী হয়ে হাসান জানতে চায়।

এয়ার হোস্টেসের চাকরিটা এভাবে হঠাৎ করেই ছেড়ে দেবো কল্পনাও করতে পারেনি শিহাব। আমাকে সোনার ডিম পাড়া রূপকথার সেই হাঁস ভাবতে শুরু করেছিল সে। চাকরি ছেড়ে দেয়ার পর রীতিমতো ক্রেজি হয়ে উঠলো। আমার সঙ্গে ওর দুর্ব্যবহার চরমে পৌঁছুলো। প্রথমদিকে মুখ বুঁজে সহ্য করলেও একসময় আমি প্রতিবাদ শুরু করলাম। এতে আরও বেপরোয়া হয়ে উঠলো শিহাব।

আমি আগেই জেনেছিলাম জুয়ার নেশায় মেতেছে সে। আমার কাছ থেকে টাকা নিয়ে জুয়ার আড্ডায় গিয়ে সব হারিয়ে আসতো। আমার উপার্জন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জুয়ার আড্ডায় গিয়ে টাকা ওড়ানোর সুযোগ হারিয়ে ফেললো। ভেবেছিলাম এবার সব ঠিক হয়ে যাবে। ভালো হয়ে যাবে লোকটা। কিন্তু আমার কাছ থেকে টাকা না পেয়ে বাইরে যার তার কাছ থেকে ধারকর্জ শুরু করে দিলো। নিজের সামাজিক অবস্থান, প্রেস্টিজ, শিক্ষাদীক্ষা সবই জলাঞ্জলি দিয়ে অল্পদিনেই অনেক টাকা ধার করায় ঠিকভাবে বাসায় বসবাস করা তার জন্য অসম্ভব হয়ে পড়লো। পাওনাদারদের নানা হুমকি, অশোভন আচরণ, নানা ধরনের কুপ্রস্তাব, দুর্ব্যবহার আমাকেও অতিষ্ঠ করে তুলেছিলো।

অনেক টাকার ঋণের ভারে বিপর্যস্ত অসহায় শিহাব তখন পালিয়ে বেড়াতে শুরু করলো। বাসায় থাকতো না প্রায় সময়ে। অনেক গভীর রাতে বাসায় ফিরতো। আমি একাকী কীভাবে থাকছি, সংসার কীভাবে চলছে আমি খেয়েছি না অনাহারে আছি সেদিকে তার কোনো ভ্রুক্ষেপ ছিলো না।

আমার নিজের কিছু গয়নাগাটি ছিল। সেগুলো বিক্রি করে কয়েকদিন চলার পর আমার হাত একেবারে শূন্য হয়ে যায়। কার কাছে গিয়ে হাত পাতবো? ঢাকা শহরে আমাকে সাহায্য করার মতো আপনজন বলতে তখন কেউ ছিল না পাশে।

পরিবারের কারও মতামত না নিয়ে নিজের সিদ্ধান্তে শিহাবকে বিয়ে করেছিলাম। এ কারণে নিজের অসহায় অবস্থার কথা জানিয়ে আত্মীয়-স্বজনদের কাছে সাহায্য-সহযোগিতা চাওয়ার অবস্থা ছিল না।

কথাগুলো বলতে গিয়ে রুমানার গলাটা ধরে আসে। কয়েক মুহূর্ত কিছু বলতে পারে না। চুপ থাকে।

তারপর আবার বলতে শুরু করে সে, ‘তখন আমি একটা কিন্ডারগার্টেন স্কুলে চাকরি নিই, বেতন খুব বেশি ছিল না। তারপরেও আমি মহাসংকটের মধ্যে সামান্য খড়কুটো অবলম্বন করে উত্তরণের পথ খুঁজছিলাম। একসময় আমার স্কুলের চাকরির কথা জেনে যায় শিহাব। আমার কাছে জুয়া খেলার জন্য টাকা চাইতে শুরু করে।

আমি তাকে একটি টাকাও দেবো না, কঠিন ভাষায় জানিয়ে দিই। জবাবে সে আমার গায়ে হাত তোলে।

আমি তখন চরম সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি। শিহাবকে ডিভোর্স দিয়ে ওর ভাড়া করা ফ্ল্যাট থেকে চলে আসি।’

‘এরপর কোথায় গিয়ে উঠলে তুমি আর তোমার স্কুলের চাকরির কী হলো?’ হাসান অনেক উত্তেজনা নিয়ে জানতে চায়।

রুমানার মুখে তার জীবনের গল্প শুনতে শুনতে হাসান নিজেও কেমন যেন হয়ে যায়। গল্প উপন্যাস নাটক সিনেমার কাহিনির মতো মনে হতে থাকে সবকিছুই। ভেতরে চেপে থাকা উত্তেজনা প্রকাশ পায় তার কাছে।

‘শিহাবকে ডিভোর্স দিয়ে আমি গিয়ে উঠি আমার এক বান্ধবীর ফ্ল্যাটে।’ আরেকটা মেয়েকে নিয়ে দু’জনে মিলে দু’রুমের একটা ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে থাকতো সে।

‘স্কুলের চাকরিটা তখন আমার একমাত্র অবলম্বন হয়ে উঠেছিলো। ওটা ছাড়ার কোনো উপায় ছিল না। আমাদের এই সমাজে সিঙ্গেল মেয়েদের একাকী জীবনযাপন কতো কঠিন ব্যাপার তখনই টের পেতে শুরু করলাম। পদে পদে নানাজনের সন্দেহ আর অনেক কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে হয়। সমাজে এটাকে কেউ সহজভাবে গ্রহণ করতে চায় না। আজেবাজে কথা শুনতে হয়। কেউ কেউ একাকিত্বের সুযোগ নিয়ে নানা ফায়দা লুটতে ফন্দিফিকির করে। ব্যাপারগুলো আমার জীবনে আরেক দুর্বিষহ অভিজ্ঞতা বয়ে আনতে শুরু করে। তখনই হঠাৎ একদিন শাহেদ চৌধুরী, যিনি পরবর্তীতে আমার হাসব্যান্ড, তার সাথে পরিচয় হয়। লোকটার বিয়ের বয়স পেরিয়ে গেছে। কিন্তু বাবা ব্যবসাবাণিজ্য গার্মেন্টস ই াস্ট্রি এক্সপোর্ট-ইমপোর্টের নানা বিষয় দেখতে গিয়ে বিয়েশাদী করা হয়ে ওঠেনি। ভাইবোন আরও থাকলেও তারা কেউ তার মতো যোগ্য এবং দায়িত্ববান ছিল না। ফলে পুরো ব্যবসা-বাণিজ্যের দেখভাল তাকেই করতে হতো। নিজের আলাদা সংসার করার কথা ভুলেই গিয়েছিল মানুষটা। আমার সাথে পরিচয় এবং আলাপের পর কেন জানি আমাকে তার ভীষণ ভালো লেগে যায়। এর আগে কোনো মেয়ের সঙ্গে তেমন অন্তরঙ্গ হওয়ার তাগিদ অনুভব করেনি সে। আমার সঙ্গে তার বয়সের কিছুটা ব্যবধান থাকলেও একসময়ে আমিও তার প্রতি দুর্বল হয়ে পড়ি। তাকে আমার ভালো লেগে যায়। একদিন শাহেদ চৌধুরী সরাসরি আমাকে বিয়ের প্রস্তাব দিলে আমি আমার সব কথা তাকে খুলে বলি। শিহাবের সঙ্গে আমার বিয়ে এবং ডিভোর্সের বিষয়টা জানার পরেও আমাকে নিয়ে নতুন জীবন শুরুর ব্যাপারে অটল থাকে সে।

আমি নিজেও তখন সিঙ্গেল নারী হিসেবে এই ঢাকা শহরে একাকী জীবন-যাপন করতে গিয়ে নানা বিরূপ অভিজ্ঞতা অর্জনের কারণে শক্ত একটা অবলম্বন খুঁজছিলাম নিশ্চিত জীবনের আশায়। শাহেদ চৌধুরী অনেক ধনাঢ্য পরিবারের সন্তান, তাদের অর্থবিত্ত প্রাচুর্য অনেক। সমাজে তাদের প্রভাব প্রতিপত্তি এবং সম্মান! সে তুলনায় আমি নিতান্তই সাধারণ ঘরের মেয়ে। বাবা নেই, মা থাকেন মফস্বল শহরে। আমাদের অর্থবিত্ত বলতে তেমন কিছুই নেই। আমি বাড়িতে মায়ের কাছে গিয়ে থাকবো সে উপায়ও নেই। পরিবারের অমতে ঢাকায় প্রেম করে বিয়ে করেছিলাম, সেই বিয়েটা টিকেনি। নিজে তেমন কোনো চাকরি বাকরি নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হতে পারিনি। আমি পদে পদে পথ চলতে গিয়ে আমার অসহায়ত্ব অনুভব করছিলাম। তাই নিজেকে সেই অসহায় অবস্থা থেকে টেনে তুলতে অনেকটা মরিয়া হয়েই শাহেদ চৌধুরীর প্রস্তাবে রাজি হয়ে যাই। আমাদের বিয়ে হয়ে যায় একদিন। বধূবেশে আমি শাহেদ চৌধুরীর বাড়িতে উঠে আসি। তার সংসারে এসে উপলব্ধি করি মানুষটার সত্যি খুব ভালো মনের। আমার আগে একবার বিয়ে হয়েছিলো শিহাবের সঙ্গে, কয়েক বছর দুঃসহ দাম্পত্য জীবন কেটেছে আমার- সবই ভুলে গেলাম শাহেদ চৌধুরীর সান্নিধ্যে এসে। শ্বশুরবাড়ির লোকজনও আমাকে সহজভাবে গ্রহণ করেছিলো। শিহাবের সাথে থাকতে গিয়ে আমি আত্মবিশ্বাস হারিয়ে যে অন্ধকার হতাশার মধ্যে হাবডুবু খাচ্ছিলাম, তা দূর হয়ে গেলো। লেখাপড়া শুরু করার ব্যাপারে আমার স্বামী আমাকে নানাভাবে উদ্বুদ্ধ করেছিলো। যে কারণে এক চান্সেই পাস করলাম পরীক্ষাগুলোতে। স্রেফ স্বামীর উপর সবকিছুতে নির্ভরশীল না থেকে নিজে নিজে কিছু করার জন্য উদ্যোগী হলাম। বড় বড় কয়েকটা অফিসে দুপুরের লাঞ্চ তৈরি করে সাপ্লাইয়ের জন্য ক্যাটারিং সার্ভিস চালু করলাম নিজের একান্ত চেষ্টায়। আমার স্বামীর অর্থবিত্তের অভাব ছিলো না। আমার বাড়িতে আয়ের ধান্ধা করার কোনো প্রয়োজন না থাকলেও শাহেদ আমার উদ্যোগকে পুরোপুরি সমর্থন করলো। এ কাজে নানাভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করলো। অল্পদিনের মধ্যেই আমার ক্যাটারিং বিজনেজ বেশ জমে উঠলো। ঘর সংসার করে পাশাপাশি আমি এই বিজনেজটা বেশ চালিয়ে যাচ্ছি। ঢাকায় বেশ অনেকগুলো ব্যাংক এবং কর্পোরেট অফিসে আমার ক্যাটারিং সার্ভিস থেকে রেগুলার লাঞ্চ সাপ্লাই হয়। এতোসব কিছুর পেছনে শাহেদ চৌধুরীর মানে আমার স্বামীর অবদান সবচেয়ে বেশি। যখনই আমি যা করতে চেয়েছি সেটা সাপোর্ট করেছে, প্রয়োজনে সাহায্য করেছে। আজ আমার অর্থবিত্ত, প্রভাব, প্রতিপত্তি, সম্মান, পরিচিতি সবই হয়েছে, নিজেকে শক্ত ভিত্তির উপর দাঁড় করাতে সক্ষম হয়েছি। এখন আমার মধ্যে কোনো হতাশা নেই, দুঃখ বেদনা নেই, আমার আত্মীয়স্বজনরাও এখন আমাকে নিয়ে গর্ব করে। তারা খুব বড় গলায় আমার পরিচয় দেয়। হাসান, এখন আমার কোনো দুঃখ নেই, আমার মধ্যে না পাবার কোনো বেদনা নেই।’

বলতে বলতে আবেগে গলা জড়িয়ে আসে রুমানার। হাসান বেশ কয়েকমুহূর্ত তার দিকে তাকিয়ে থাকে। শত প্রতিকূলতা অনেক কঠিন বাধা অতিক্রম করে শেষ পর্যন্ত জীবনযুদ্ধে জয়ী একজন নারীর সামনে মুখোমুখি বসে আছে সে। রুমানাকে নতুনভাবে আবিষ্কার করে সে এই মুহূর্তে।

রুমানার জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো সিনেমা নাটকে দেখা কাহিনির মতো বেশ নাটকীয়। হাসান জানতে চায়:

‘আচ্ছা রুমানা, এই পৃথিবীতে সবচেয়ে কঠিন কাজ কী জানো?’

‘কাউকে ক্ষমা করা, এর চেয়ে কঠিন কাজ মনে হয় আর কিছু নেই।’

‘এর চেয়ে সহজ কাজও বোধ হয় আর কিছু নেই আমার মনে হয়।’

‘আচ্ছা, রুমানা তুমি কি আমাকে ক্ষমা করতে পেরেছ?’

‘এ কথা বলছো কেন?’

‘আমি জানি আমাকে ক্ষমা করে দিতে তোমার কষ্ট হবে, তবুও আমি বলবো, আমাকে ক্ষমা করে দিও।

‘ছিঃ ওভাবে বলছো কেন? আমি তো তোমাকে কোনোভাবেই দায়ী করি না, এটা নিয়তির খেলা, আমাদের ভাগ্যে এমনই লেখা ছিল, ভাগ্যের লিখন তো আর খ ানো যায় না, আমাদের ওটা মেনে নেয়া ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।’

‘কিন্তু তারপরও আমি নিজেকে অপরাধী ছাড়া আর কিছু ভাবতে পারি না, আমার বুকের মধ্যে চেপে আছে সেই বোধটা যা আমাকে তাড়া করে ফিরছে, স্বস্তিতে থাকতে দিচ্ছে না’

‘হাসান মন থেকে সব কিছু ঝেড়ে ফেলে দাও, আমি বলছি, তোমার কোনো অপরাধ নেই, ভাগ্য আমাদের আজ এভাবে নিয়ে এসেছে সেটা তো খারাপ কিছু নয়। আমি, তুমিÑ কেউ কি খারাপ আছি। আমি আমার সন্তান সংসার নিয়ে বেশ আছি। আমার নিজস্ব একটা ভুবন গড়ে উঠেছে যেখানে আমি চমৎকার জীবন যাপন করছি। তুমিও তোমার সংসার কর্মজীবন নিয়ে ভালো আছো, খুব ভালো বউ পেয়েছো, চাকরি বাকরি আর সংসার করে যাচ্ছ। কোন অপূর্ণতা তো নেই তোমার আমার কারও মধ্যে।

কথা বলতে বলতে বেশ অনেকটা সময় পেরিয়ে যায়। হাসান অনুভব করে এবার বাসায় ফেরা দরকার। রুমানার বাসা থেকে বেরিয়ে হাসান যখন ধানমন্ডির দুই নম্বর রোডে তখন সন্ধ্যা নামতে শুরু করেছে। শহরের এই ব্যস্ত জনপদে এখন অনেক মানুষের ভিড়। অফিস ফেরত নারী-পুরুষ বাস ধরার জন্য লাইন ধরে আছে। একের পর এক বাস আসছে। আর তাতে যাত্রীরা উঠছে কিংবা নামছে। এখন বাসায় ফেরার জন্য হাসানকেও কোনো একটা বাসের জন্য লাইনে দাঁড়াতে হবে। এখান থেকে ওর বাসাটা বেশ অনেকটা দূরে বাসাবো এলাকায়।

এখানে রুমানার সঙ্গে দেখা করতে আসার আগে দুপুরে তার মনের মধ্যে যে উত্তেজনা টগবগ করছিল তা এখন আর নেই। তার বদলে এখন তার মনে নতুন এক অনুভূতি ছড়িয়ে আছে। না দেখা এক নারী রুমানা এতোদিন ধরে তার মনের গভীরে চাপা কৌতূহল হয়ে ছিলো। আজ রুমানার মুখোমুখি হয়েছে হাসান। তার জীবনের অনেক অজানা কথা জেনেছে। রুমানাকে নতুনভাবে আবিষ্কার করেছে। অনেক বছর আগে যে রুমানাকে চিনেছিলো, জেনেছিলো শুধুমাত্র চিঠিপত্রে যোগাযোগের মাধ্যমে সেই রুমানা অনেক ঘাত-প্রতিঘাতের মুখোমুখি হয়েছে, প্রতিকূল পরিস্থিতি আর দুর্ভাগ্যের শিকার হয়েছে, বঞ্চনা আর প্রতারণার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে করতে শেষ পর্যন্ত জয়ী হয়েছে। সেদিন রুমানার ডাকে সাড়া দিতে পারেনি সে। তখন যদি রুমানার ডাকে সাড়া দিয়ে সব দ্বিধা সংকোচ ঝেড়ে ফেলে ঢাকা এসে তার পাশে দাঁড়াত, তার সব দুঃখ কষ্ট আর অসহায়ত্বের অংশীদার হতো, তাহলে হয়তো রুমানার জীবনের ছকটা অন্যরকম হতো। এ জন্য নিজেকে অপরাধী ভাবলেও রুমানা অনেক প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই করে জয়ী হয়েছে, মাথা তুলে সম্মানের সাথে জীবনযাপন করছে। সে এখন সমাজে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছে এবং সুখে আছে ভেবে হাসানের মনটা প্রশান্তিতে ভরে যায়। এখন অন্য ভুবনের বাসিন্দা রুমানা। তাকে মন সরাতে পারে না হাসান। হৃদয়ের গহীনে ঠাঁই হয়ে গেছে তার। সেখান থেকে তাকে মুছে ফেলা সম্ভব নয় কোনভাবেই।

হাঁটতে হাঁটতে হাসান এলিফ্যান্ট রোডে চলে এসেছে কখন খেয়ালই হয় না। পাশে একটা মিউজিক শপে চমৎকার একটি গান বাজছে। কান পাতে হাসান। কেউ একজন গাইছেন ‘তুমি রবে নীরবে’। এই মুহূর্তে রবীন্দ্রনাথের এ গানটা হাসানের মনে তোলপাাড় জাগায়। রুমানার জন্য মনটা কেমন করে ওঠে! তখনই কিছুক্ষণ আগে বিদায়ের সময় রুমানার কথাগুলো মনে পড়ে যায়। হাঁটতে হাঁটতে আরও অনেকদূর চলে এসেছে হাসান। এখন আর গানটা শোনা যায় না। কিন্তু মনের মধ্যে তার অনুরণ বয়ে গেছে।