menu

অজানার ডাকে

কণিকা রশীদ

  • ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ০৬ ডিসেম্বর ২০১৮
image

শিল্পী : সঞ্জয় দে রিপন

গত সতের দিন ধরে অন্ধ রজব আলী বসে আছে বকুল গাছের তলায়। ঘন অন্ধকারের এক গহিন জগতে এখন তার দিন যাপন। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার! এ হেন জীবনের জন্য কোন আক্ষেপ নেই তার। কারণ সে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে, তার এই জীবনের জন্য সে-ই দায়ী। ভাবে, নিজের কর্মফলের শাস্তি ভোগ করছে সে। কেবল বেঁচে থাকার আনন্দেই সৃষ্টিকর্তার কাছে বারবার কৃতজ্ঞতা জানায় রজব আলী। সে তো ভাবতেই পারেনি, সেই নিষ্ঠুর, নির্মম দিনগুলোর পরও সে বেঁচে থাকতে পারবে। এই সুন্দর দেশটাকে দেখতে না পেলেও, উপলদ্ধি করতে পারবে। এখনও তার বুকের গভীরে উজ্জ্বল হয়ে আছে শৈশবের, প্রথম কৈশোরের কত শত স্মৃতি। স্মৃতির সেই সোনার খনি মনে মনে হাতড়ে দিব্যি দিন কেটে যায় রজব আলীর।

অথচ একদিন কিনা ছিলো এই রজব আলীর! নিজের বোকামি, গোয়ার্তুমি আর ভুল সিদ্ধান্তের জন্য সব হারাতে হলো ওকে। এমনকি, নিজের নামটা পর্যন্ত। বকুল তলায় বসে থাকা অন্ধ ভিক্ষুকের নাম ‘রঞ্জন’ যেন মানায় না। নিজেকে তাই রজব আলী নামেই চিনতে চেষ্টা করে ও। ওর সাথে এসে জুটেছে যে টোকাই মন্টু, সেও ওকে রজব আলী নামেই চেনে। প্রতিদিনই সকাল দশটা থেকে দুপুর তিনটা পর্যন্ত ডিউটি করে রজব আলীর সঙ্গে। অর্থাৎ, ঐ সময়টুকুর জন্য মন্টু হাত ধরে রজব আলীকে নিয়ে যায় বড় রাস্তায়, সিগন্যাল বাতির কাছাকাছি। গাড়িগুলো সিগন্যালে থামলেই গাড়ির কাছে মন্টু নিয়ে যায় ওকে। সব গাড়ি না হলেও, অধিকাংশ গাড়ির যাত্রীরাই গাড়ির কাঁচ নামিয়ে অন্ধ রজব আলীকে টাকা-পয়সা দেয়। তারপর বিকেল হলে মন্টু আবার ওকে রেখে যায় গাছ তলায়। সকাল পর্যন্ত চলার মতো কিছু খাবার-দাবার কিনে দিয়ে যায় রজব আলীকে। তাতেই যেন রজব আলী ধন্য। বাকি সব টাকা হাতিয়ে নেয় মন্টু। কিছু টাকা অবশ্য জমা দিতে হয় ভিক্ষুকদের সর্র্দারের হাতে। কিন্তু সে সব নিয়ে রজব আলীর কোন মাথাব্যথ্যা নেই। নেই কোন অভিযোগ। অথচ এই অভিযোগ আর অসন্তোষের কারণেই তো ঘরছাড়া হয়েছিলো রজব আলী অর্থাৎ সেদিনের রঞ্জন। আদর ভালবাসা মমতা সব কিছুর বন্ধন কেটে পা বাড়িয়েছিলো অজানার পথে।

রঞ্জন নামের ছেলেটা বাবা মায়ের সাথে এক বাড়িতেই তো ছিলো দীর্ঘ সতের বছর। তবু মায়ের মুখটা মনে করতে চাইলে আজও মনের পর্দায় ভেসে ওঠে আরও দু’তিনটা মুখ। মায়ের মুখটাকে ঝাপসা দেখায় তখন। স্পষ্ট হয়ে ওঠে মরিয়ম, বেনু, আফিয়া কিংবা জুলেখা খালার মুখ। কারণ ওদের কারো না কারো সাথেই কেটেছে শৈশব আর বাল্যকালের সারাটা দিন। রাতে কেবল মায়ের সাথে ঘুমানোর সুযোগ হয়েছে। সেও কেবল শিশুকালে। একটু বড় হতেই ‘বড় হয়ে গেছো’, বলে আলাদা ঘরে শোবার ব্যবস্থা হয়েছে রঞ্জনের। অর্থাৎ তখন থেকেই রাতেও মায়ের স্পর্শ থেকে, মায়ের সৌরভ থেকে বঞ্চিত হতে হয়েছে রঞ্জনকে। আর তখন থেকেই এক অদ্ভুত অতৃপ্তি, এক অজানা পিপাসা ঘন কুয়াশার মত ঘিরে থাকে ওকে। এক অজানা কষ্ট যেন ম্লান করে দিতে থাকে ওর জীবনের আনন্দগুলোকে। খুব ছোটবেলায় দু’একবার বলেছে “আমার তো জ¦র মা! আজ অফিসে যেও না!” মা চমৎকার করে হেসেছেন- “তাই কি হয়, বোকা ছেলে! অফিসে তো যেতেই হবে।” সত্যিই তো, সকলেই তো বলে, মা অনেক বড় চাকরি করেন। অনেক তাঁর দায়িত্ব। তিনি কীভাবেইবা বাড়িতে বসে থাকবেন? ছোট্ট রঞ্জনকেই তাই বুঝতে হয়েছে মায়ের অপারগতা। মা বুঝতে পারেননি ছোট্ট রঞ্জনের বুকের ভেতরের করুন আকুতি।

কত ঝড়ের রাতে বিদ্যুৎ চলে গিয়ে অন্ধকারে ছেয়ে গেছে সারা বাড়ি। বাজ পড়ার শব্দে কেঁপে উঠেছে ঘরদোর। কিংবা প্রবল জ¦রের তাপে প্রলাপ বকেছে রঞ্জন। আর সেই সব অসহায় মুহূর্তে মায়ের বুকে লুকোবার প্রবল ইচ্ছের ঝড় উঠেছে ওর বুকের ভেতর। কিন্তু কোথায় মা! তিনি অনেক বড় চাকরি করেন বলেই অনেক বড় তার দায়িত্ব। এমন ছোটখাটো বিষয়গুলো দেখার জন্য সময় নষ্ট করার মত সময় কোথায় তার কাছে! এগুলো তো আফিয়া কিংবা মরিয়মই সমাধান করতে পারে। তাই মা নিশ্চিন্তে তাঁর নিজ দায়িত্ব পালন করেছেন। আর এমনি করে ভাবার কারণেই অভিমানের পাহাড় জমেছে রঞ্জনের বুকের ভেতরে। বাবার ব্যাবসার ঝামেলা তো আরও জটিল। কীভাবে তিনি সময় দেবেন রঞ্জনকে? তাঁর পক্ষেও সম্ভব হয়নি রঞ্জনের সাথে সময় কাটাবার। মায়ের অভাব পূরণ করবার। এমনি করেই বাবা মায়ের প্রতি তৈরি হওয়া অভিমানগুলোই ধীরে ধীরে পরিণত হয়েছে ক্ষোভে।

অথচ এই সবই তো রঞ্জনের অভিমানি মনের অবুঝ অভিযোগ। কারণ বাবা মা তো চাকরি করবেনই। সেটাই স্বাভাবিক। যথেষ্ট উপার্জন না হলে সন্তানের সব রকম চাহিদা মিটিয়ে ওর সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে দেবেন কীভাবে? সন্তানের জন্যই তো তাঁরা সারাদিন কষ্ট করেন। কিন্তু কী জানি কেন, রঞ্জনের আবেগি মন বাবা মায়ের সার্বক্ষণিক এই ব্যস্ততা মেনে নিতে পারেনি। তাই তো ওর বুকের ভেতর জমতে থাকে অভিমানের মেঘ। অথচ বাবা মা রঞ্জনের কোন ইচ্ছে কখনও অপূর্ণ রাখেননি। বাড়িতে সব সময় দু’জন ব্যস্ত থেকেছে ওর সেবায়। যাদের ও খালা বলে জানে। বাইরে খেলতে যেতেও কোন বাঁধা নেই রঞ্জনের। কেবল সঙ্গে করে নিয়ে যেতে হয় রমজান চাচাকে। যার দায়িত্ব বাইরে খেলতে গেলে রঞ্জনকে দেখে রাখা। কিন্তু অদ্ভুত! এত রকম সুযোগ সুবিধাও রঞ্জনকে ভাল লাগায় না। বরং বন্ধুদের কাছে নিজেকে কেমন বোকা বোকা লাগে ওর। যেন ওদের কাছে নিজেকে বড় খেলো মনে হয়। কতবার খেলতে যাবার আগে রমজান চাচাকে অনুরোধ করেছে, যেন সে রঞ্জনের সঙ্গে না যায়। কিন্তু ওটাই তো ওর চাকরি। তাই ও সঙ্গে যাবেই। রঞ্জন যখন পাড়ার বন্ধুদের সঙ্গে মাঠে খেলবে, রমজান চাচা তখন পলকহীন চোখে চেয়ে থাকবে ওর দিকে। বড় অস্বাস্তিকর সেই অনুভূতি!

ছোটবেলায় তবু এসব নিয়ম মেনে নিয়েছিলো রঞ্জন। কিন্তু ক্লাস ফাইভ-এ পড়বার সময় থেকেই ওর খারাপ লাগতে শুরু করলো। ও খেয়াল করলো কত কত দূর থেকে ওর বন্ধুরা খেলতে আসে এই মাঠে। আর ওর বাড়ির কাছেই মাঠ। তবু ওর সঙ্গে একজন লোক থাকে। সঙ্গে আবার জলের বোতল! ক্লাস সিক্স-এ পড়বার সময় থেকেই এই ব্যাপারগুলোতে ও আপত্তি জানাতে শুরু করলো। কিন্তু কোন লাভ হলো না। আর তারপরই রঞ্জন মৃদু প্রতিবাদ করতে লাগলো। কারণ প্রতিবাদ না করে ওর কোন উপায় রইলো না। এই অদ্ভুত নিয়মগুলো মানতে মানতে বন্ধুদের সবার চোখে ও কেমন আলাদা একজন হয়ে উঠলো। ও উপলদ্ধি করলো এভাবে চলার কারণেই ওর নিজের কোন মতামত, নিজস্ব কোন বক্তব্য কখনই প্রাধান্য পায় না। তাই ওকে প্রতিবাদী হয়ে উঠতেই হলো। কিন্তু তবুও মৃদু লয়ে, প্রায় একেবারে নিঃশব্দে রঞ্জনের অজান্তে কবে কখন যেন বন্ধুমহলে ছড়িয়ে গেলো ওর নতুন নাম ‘ছোট্ট খোকা’। অসহায় নিরুপায় রঞ্জনের যেন কিচ্ছু করার রইলো না। কেবল ক্ষোভ জমতে লাগলো বুকের ভেতর। প্রতিবাদী হয়ে উঠলো মন। ধীরে ধীরে জেদী একগুঁয়ে হয়ে উঠলো ও। বন্ধুদের দেওয়া নামটাকে উপেক্ষা করার জন্য, আর সেটাকে ভুল প্রমাণ করবার জন্যই বোধহয় অবশেষে রঞ্জন একটা ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললো। অন্য পাড়া থেকে আসা ওর চেয়ে বয়সে বড় ছেলেদের সাথে বন্ধুত্ব করে নিলো। দু’চারজন পুরনো বন্ধু রঞ্জনকে ছেড়ে যেতে পারলো না। তাই ওরাও মিশতে লাগলো রঞ্জনের বড় বন্ধুদের সাথে। কিন্তু তারপরও রঞ্জনের মন সুস্থির হলো না। ক্লাস নাইন-এ উঠে ওর সব ক্ষোভ জমে গিয়ে মনের মধ্যে তৈরি হলো এক প্রবল বিদ্রোহ। কিছুতেই যেন বাড়িতে মানিয়ে নিতে পারছিলো না। বুকের ভিতরে এক তীব্র অসহায় যন্ত্রণা ওকে ক্ষত বিক্ষত করে তুললো।

কিন্তু ওর কষ্টের আসল কারণ যে ও নিজেই সেটা বোঝার মতো স্থিরতাটুকু পর্যন্ত রইলো না রঞ্জনের। ভাল-মন্দের বোধ যেন পথ হারিয়ে ফেললো অল্পদিনেই। তাই তো ওর ভালত্বকে, বাবা-মা’র প্রতি শ্রদ্ধাবোধকে, তাঁদের প্রতি বাধ্য থাকাকে বয়সে বড় সেই সব বন্ধু এবং বন্ধুর বন্ধুরা ওর দুর্বলতা বলে পরিহাস করলে ও প্রতিবাদ করতে পারলো না। বরং ও যে ‘ছোট্ট খোকা’ নয়, সেটা প্রমাণ করার জন্য নানা রকম দুঃসাহসী কাজ করতে উৎসাহী হয়ে উঠলো। অদ্ভুত এক ঝোঁকের মধ্যে দিয়ে রঞ্জন এমনি করে চলতে লাগলো। অথচ ও বুঝতেও পারলো না ঐ সব বন্ধুরা মোটেও ওর প্রকৃত শুভাকাংক্ষি নয়। আর রঞ্জনের এই বুঝতে না পারাই বয়ে আনলো ওর দুর্ভাগ্য। খুব ধীরে ধীরে ও জড়িয়ে যেতে লাগলো ওদের বন্ধুত্বের আবরণে ঢাকা নির্মমতার এক সূক্ষ্ম জালে। ও বুঝতেও পারলো না, যাদের ও বন্ধু ভাবছে, ওর সব চেয়ে সহায় ভাবছে তারাই ওর সব চেয়ে বড় শক্র। আর সে কারণেই নির্দ্বিধায় রঞ্জন পা বাড়ালো অজানার পথে।

কয়েকদিন পর এক সন্ধ্যায় ক্রিকেট খেলার সঙ্গীদের দু’পক্ষের মধ্যে কোন একটা বিষয় নিয়ে তর্ক বেঁধে গেলো। দু’কথা, চার কথার পরই উত্তেজিত হয়ে উঠলো সবাই। আর তারপরই শুরু হলো হাতাহাতি। উত্তেজিত হয়ে উঠলো রঞ্জনও। ধাই করে ঘুষি মেরে বসলো বিপক্ষের একজনকে। জীবনে প্রথম কাউকে আঘাত করলো রঞ্জন। ওর সেই সব বন্ধু সাগর, রেহান, রহমান সকলেই বাহবা দিলো রঞ্জনকে। সাহসী বলে পিঠ চাপড়ে দিলো। আর রঞ্জন বুঝতেও পারলো না, এটাই ওর খারাপ হয়ে যাওয়ার প্রথম পদক্ষেপ। তারপরই ওর ছোটবেলার বন্ধু অনু আর জুবায়েরের সাথে ওরাও রঞ্জনের ‘বেষ্ট ফ্রেন্ড’ হয়ে উঠলো। তাই ওদের কথামতই চলতে লাগলো রঞ্জন। বাড়ির নিয়ম-কানুন আর একদমই মানতে ইচ্ছে করে না ওর। প্রায়ই রাত করে বাড়ি ফেরে। পড়াশোনায় মন নেই একেবারেই। নিয়ম শৃঙ্খলা, আর সব পাওয়ার একঘেয়েমিই বোধহয় ওকে অসুখী করে তুলেছিলো। না পাওয়ার কষ্টটুকু তেমন ছিলো না বলেই বোধহয় বৈচিত্র্যহীন মনে হয়েছিলো নিজের জীবনটাকে।

এক সন্ধ্যায় সাগর বললো- “চলো, আজ রাতে সকলে বাড়ির বাইরে রাত কাটাবো।” বলেই আড়চোখে তাকালো রঞ্জনের দিকে- “রঞ্জন অবশ্য পারবে না। রঞ্জন তুমি বরং বাড়ি চলে যাও।” রঞ্জন চকিতে ফিরে তাকালো। ওদের উপহাসের ইঙ্গিতটা বুঝতে দেরি হলো না ওর। তাতে যেন বিভ্রান্ত হয়ে উঠলো রঞ্জন। আর সে কারণেই, রাতে যে বাড়িতে ফিরে যাওয়াই উচিত- এই বোধটা পর্যন্ত হারিয়ে ফেললো ও। তাই রঞ্জন রাতে বাড়ি না ফেরার সিদ্ধান্তই নিলো। নষ্ট হয়ে যাওয়ার এটা ছিলো ওর দ্বিতীয় পদক্ষেপ। সারারাত ওদের সাথে কবরস্থানে বসে রইলো। সাহসিকতার বড়াই করলো মনে মনে। ওদের মধ্যে কেউ কেউ সেখানে বসে ধূমপানও করলো। পরদিন সকালে বাড়ি ফিরে মায়ের নির্ঘুম অসহায় চেহারাটা দেখে এক ঝলক খারাপ লাগা উঁকি দিলো রঞ্জনের বুকের গভীরে। একবার ক্ষণিকের জন্য মনে হলো, কাজটা ভাল হয় নি। মিথ্যে বলতে হলো মা’কে ‘অসুস্থ বন্ধুকে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলো বন্ধুরা সকলে মিলে।’ মা বিশ্বাস করলেন। কিন্তু ঐ ক্ষণিকের খারাপ লাগাটা স্থায়ী হলো না রঞ্জনের মনে। কারণ খারাপ হয়ে ওঠা নতুন জীবনে ঐ রাত ওকে খানিকটা বৈচিত্র্য তো এনে দিতে পেরেছে! তাই কাজটা ভাল না মন্দ সে বিচার মনে রইলো না আর। নিয়ম শৃঙ্খলা না মেনে, নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে পেরে এক অন্য রকম আনন্দ বোধ করলো রঞ্জন। নিজেকে বড় হয়ে যাওয়া এক মুক্ত পুরুষ ভাবতে ভাল লাগলো ওর। কিন্তু পরাধীনতার এক সূক্ষ্ম জালে নিজের অজান্তেই জড়িয়ে পড়ল রঞ্জন। বাড়ির ভালবাসা আর মমতার শৃঙ্খল ছিঁড়ে নির্মমতার এক কঠিন ফাঁদে আটকে পড়ল শেষ পর্যন্ত।

এক সন্ধ্যায় বন্ধুদের খুঁজতে খুঁজতে রঞ্জন যখন ক্লান্ত, তখন দেখতে পেলো ওদের। উত্তরের মাঠটার বড় কদম গাছটার তলায় বসে গল্প করছে ওরা চারজন। ওকে দেখে সকলে ‘এসো’ ‘এসো’ করলো বটে, কিন্তু কেমন যেন একটু অন্যরকম লাগলো রঞ্জনের। তবে সেটা মুহূর্তের জন্য। পরমুহূর্তে ও আবার সেটা ভুলেও গেলো। পরের দিনও রঞ্জন যখন ওদের কাছে এলো, রঞ্জনের কেন যেন মনে হলো ওরা কিছু একটা নিয়ে কথা বলছিলো, যা ওকে দেখে থামিয়ে ফেললো ওরা। তবে বিষয়টা নিয়ে বেশিক্ষণ ভাবলো না ও। ঘরে ফেরার সময় পথ চলতে চলতে রেহান বললো- “আমরা সকলে বেড়াতে যাওয়ার কথা ভাবছি। চট্টগ্রামে যাবো। তারপর রাঙামাটি, কাপ্তাই সব ঘুরবো। তুমি কি যেতে চাও আমাদের সাথে?” রঞ্জন বিনা দ্বিধায় বলে উঠলো- “অবশ্যই যাবো। কেন যাবো না!” এমনিতেই দু’এক দিন ধরে রঞ্জনের মনে হচ্ছে, বন্ধুরা বোধহয় ওর থেকে একটু দূরে সরে যাচ্ছে। আর তার ওপর ও যদি বলে- ‘যাব না’ তাহলে হয়তো বন্ধুত্বই টিকিয়ে রাখা যাবে না। এই বন্ধুদের ও কখনই হারাতে চায় না। সাগর বললো- “তোমার মা তো এখন দেশের বাইরে গেছেন। কাকে বলে যাবে, বাবাকে?” রঞ্জন হাসলো- “সে তো মা’কে প্রায় প্রতি মাসেই যেতে হয়। সে জন্য কী আমি বেড়াতে পারবো না! যেভাবেই হোক আমি যাবই।” বন্ধুরা মুগ্ধ হওয়ার ভান করলো। ওর মনোবলের প্রশংসা করলো। রহমান জানতে চাইলো- “কবে আসবেন তোমার মা? আমরা তো কালই রওনা হবো ভাবছি।” “মা বোধহয় পরশু আসবেন। তাতে কোন অসুবিধা নেই। আমি কাল তোমাদের সাথে যাবো।” বললো রঞ্জন। সবাই খুব খুশির ভাব করলো। কত যে মজা হবে সে সব নিয়ে কথা বলতে বলতে পথ চলতে লাগলো ওরা। মোড়ের মাথায় এসে সাগর বললো- “কাল রাত ন’টায় তুমি ঠিক এখানেই থেকো। আমরা তোমাকে এখান থেকেই তুলে নেবো, কেমন!” বলেই যে যার বাড়ির পথ ধরলো। কেবল ওর ছোট বেলার বন্ধু জুবায়ের চলতে লাগলো রঞ্জনের সাথে। খানিক পথ এসে জুবায়ের হঠাৎ বললো- “রঞ্জন, তুমি কী সত্যিই যাবে?” রঞ্জন মৃদু হাসলো। বললো “কেন যাবো না!” দু’কদম হেঁটেই আবার জুবায়ের জিজ্ঞেস করলো- “কাকীমাকে না জানিয়ে যাওয়াটা কি ঠিক হবে, রঞ্জন?” এবার রঞ্জন সশব্দে হেসে ফেললো- “কী ব্যাপার জুবায়ের, তুমি কি চাও না আমি যাই? নাকি আমার আগের ভয় পাওয়া মনটা এখন তোমার মধ্যে ঢুকে পড়েছে!” জুবায়ের ম্লান হাসলো, কিছুই বললো না। রঞ্জনের বাড়ির কাছাকাছি এসে জুবায়ের বললো- “আমি যে বেড়াতে যাওয়ার ব্যাপারে তোমাকে এতবার জিজ্ঞেস করেছি, সেটা ওদের সামনে বলো না যেন! আর যাওয়ার ব্যাপারটা আর একবার ভেবে দেখতে পারো।” রঞ্জন হাসতে হাসতে হাত রাখলো জুবায়েরের কাঁধে। জুবায়ের ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো ওর দিকে। ল্যাম্পপোস্টের অস্পষ্ট আলোয় রঞ্জনের মনে হলো ও যেন কিছু একটা বলতে চায়। কিন্তু মুহূর্তকাল কেবল চেয়ে রইলো জুবায়ের, কিছুই বললো না। তারপর চলে গেলো। বাড়ি ফিরলো রঞ্জন।

পরদিন সন্ধ্যায় স্কুলের ব্যাগেই দু’একটা কাপড় আর প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ভরে রাখলো রঞ্জন। ওর পড়ার টেলিলের ওপর রাখলো একটা ছোট চিরকুট ‘বাবা বেড়াতে যাচ্ছি। শনিবার ফিরবো’ তারপর খাওয়া-দাওয়া সেরে ব্যাগ কাঁধে বেড়িয়ে পড়ল রাস্তায়। বের হওয়ার সময় শুনতে পেলো আফিয়া খালার বিরক্তিমাখা কণ্ঠস্বর। বলছে “এত রাতে আবার বাইরে যাচ্ছো? বুবু এসে শুনলে খুব রাগ করবে।” রঞ্জন এ সব শাসন এখন আর গ্রাহ্য করে না। তাই নির্লিপ্তভাবে নেমে এলো পথে। মোড়ের মাথায় দাঁড়াতেই পাঁচ মিনিটের মধ্যেই একটা মাইক্রোবাস এসে থামলো। ভেতর থেকে রেহান চেঁচালো “দৌড়ে এসো।” রঞ্জন ছুটে গিয়ে উঠলো গাড়িতে। পরক্ষণেই চলতে শুরু করলো গাড়ি। রঞ্জন দেখলো সকলেই আছে গাড়িতে। খুশিমাখা গলায় বললো- “আমার ভীষণ ভাল লাগছে। তোমাদের জন্য এমন একটা বেড়ানোর সুযোগ হলো।” সকলেই সমস্বরে বলে উঠলো- “সত্যিই খুব মজা হবে।” কী জানি কেন, কেবল জুবায়ের চুপটি করে বসে রইলো। গাড়ি ছুটে চললো বাতাসের গতিতে। নানা গল্পগুজবের মধ্যে ব্যস্ত রইলো রঞ্জন। অন্য কোন দিকেই খেয়াল দিলো না। খেয়াল করলে ও নিশ্চয়ই দেখতো গাড়ির ভেতরের পরিবেশ খুব ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হচ্ছে।

তিন ঘণ্টা প্রায় পেরিয়ে গেছে। গল্পের উচ্ছ্বাস অনেকটাই কমে গেছে। সেই সময় হঠাৎ গাড়িটা থামলো। রেহান আর সাগর নেমে পড়ল গাড়ি থেকে। তাই দেখে রঞ্জন বললো “আমরাও নামবো?” যে গাড়ি চালাচ্ছিলো তার নাম ইউনুস। সে বিরাট গম্ভীর্য গলায় এনে বললো- “চুপ করে বসে থাকো। আর কাউকে নামতে হবে না।” রঞ্জন ভীষণ অবাক হলো। ড্রাইভারের আচরণের সাথে মেলাতে পারলো না ওকে। কিন্তু কিছু বললো না। বাইরে গভীর অন্ধকার। তবু তারই মধ্যে গাড়ির সামনে পেছনে কী যেন করলো সাগর আর রেহান। ঠুক ঠাক মৃদু শব্দ হলো দু’একবার। মনে হলো কিছু একটা ঠিক করা হলো গাড়ির। ওরা গাড়িতে উঠে বসতেই আবার চলতে শুরু করলো গাড়ি। আর এতক্ষণ পরে মুখ খুললো জুবায়ের- “তোমরা গাড়ির নাম্বার-প্লেট বদলে নিলে, তাই না?” বাঘের মতো গর্জে উঠলো ইউনুস- “একদম চুপ থাক্। একটা কথাও বলবি না।” সঙ্গে সঙ্গে গাড়ির ভেতরের ঘন অন্ধকারটা আরও ভারি, আরও থমথমে হয়ে উঠলো। কেউ কোন কথা বললো না। আর এতক্ষণ পর রঞ্জন বুঝতে পারলো ইউনুস ভাড়া গাড়ির ড্রাইভার নয়। সাগর আর রেহানের বন্ধু। যদিও সেটা ওরা পরিষ্কার করে বলেনি। কিন্তু সামনের সিটে বসা সাগর আর ইউনুস মাঝে মধ্যেই ফিসফিস করে নিজেদের মধ্যে কিছু একটা গোপন কথা বলছিলো। রেহানও মাঝে মাঝে গলা বাড়িয়ে যোগ দিচ্ছিলো তাতে। একমাত্র জুবায়েরই চুপচাপ বসে ছিলো রঞ্জনের সাথে একদম পেছনের সিটে।

এতক্ষণ পরে হঠাৎ রঞ্জনের মনে এলো কথাটা। তাই ও বলে ফেললো- “হোটেলে কি বুকিং দেওয়া আছে? তা নয়তো হঠাৎ গেলে কি রুম পাওয়া যাবে?” সাগর কেমন চিবিয়ে চিবিয়ে এক অদ্ভুত গলায় বললো- “না চাঁদু, রুম তো বুক করা হয় নি।” সাগরের গলাটা রঞ্জনের কেমন অস্বাভাবিক লাগলো। তবু ও সেটাকে গুরুত্ব দিলো না। ভাবলো মজা করছে। বললো- “গিয়ে যদি রুম পাওয়া না যায়, কোথায় থাকবো আমরা?” রেহান কেমন বিশ্রী শব্দ করে একটা চাপা হাসি হাসলো। বললো “কেন চাঁদু , পাহাড়ের গুহায়! যেখানে তোমাকে কেউ খুঁজে পাবে না!” ওর কথা শেষ হতেই সকলে এক সঙ্গে হেসে উঠলো। রঞ্জনের গা শিউরে উঠলো হঠাৎ। সে শিহরণ ছুঁয়ে গেলো জুবায়েরকেও। গাড়ির ভেতরের ঘন অন্ধকারে জুবায়ের খুব মৃদুভাবে রঞ্জনের হাতে হাত রাখলো। আর অদ্ভুত ব্যাপার! এত দীর্ঘ সময় ধরে যে ব্যাপারটা রঞ্জন একটুও বুঝতে পারে নি, একটুও আন্দাজ করতে পারে নি, জুবায়েরের একটু মৃদু স্পর্শে তা যেন জলের মতো স্পষ্ট হয়ে উঠলো রঞ্জনের কাছে। রঞ্জন তাই অন্য হাতটা রাখলো জুবায়েরের হাতের ওপর। এই প্রথম মায়ের মুখখানা স্পষ্টভাবে ভেসে উঠলো রঞ্জনের বুকের ভেতর।

আরও প্রায় দেড় ঘণ্টা পর নিস্তব্ধতা ভেঙে রেহান জিজ্ঞেস করলো- “ইউনুস, আর কতক্ষণ?” ইউনুস বললো- “এই তো, এবার প্রস্তুতি শুরু করতে পারো।” বলেই গাড়িটা থামিয়ে দিলো ও। সাগর সামনে থেকে এসে একদম পেছনের সিটে বসা জুবায়ের আর রঞ্জনের সাথে বসলো। মুহূর্তেই চলতে শুরু করলো মাইক্রোবাসটা। পাঁচ মিনিটও হয়নি। হঠাৎ একটা কিছু ছেঁড়ার আওয়াজ শুনলো রঞ্জন। অন্ধকারে ঠাওর করতে পারলো না। আর, কিছু বুঝে ওঠার আগেই ছেঁড়া টেপটা ওর মুখে চেপে আটকে দিলো সাগর। রঞ্জন এতটাই হতভম্ব হয়ে গেলো যে কোন রকম জোর করবারও চেষ্টা করলো না। রেহানও এবার এসে যোগ দিলো সাগরের সাথে। দু’হাতে শক্ত করে চেপে ধরলো রঞ্জনের হাত দু’টো। সাগর শক্ত করে বেঁধে ফেললো ওর হাত দু’টো। পরমুহূর্তেই রঞ্জনের চশমাটা ছিনিয়ে নিলো রেহান। আর তারপরই চোখ দু’টোও পেঁচিয়ে দিলো মোটা কালো টেপ দিয়ে। জুবায়ের খুব মৃদু গলায় বললো “থাক না।” ও তো এমনিই যাচ্ছে। আর ও তো এমনিতেই চোখে ভাল দেখতে পায় না।” চাপা গর্জনে ভয়াবহ গলায় খিঁচিয়ে উঠলো ইউনুস- “একদম চুপ। এই সাগর, ওর মুখেও টেপ লাগা।” সত্যিই ওর মুখেও টেপ আটকে দিলো সাগর। হতবাক হয়ে গেলো রঞ্জন। যেন নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারলো না। মনটা দমে গেলো ফুটো হয়ে যাওয়া বেলুনের মতো। মন খারাপের মেঘেরা হু হু করে ঢুকে পড়তে লাগলো ওর ফাঁকা হয়ে যাওয়া বুকের গভীরে। রেহান, সাগর, রহমান ওর কত দিনের বন্ধু! তাহলে, কী হচ্ছে এসব! গত রাতে ল্যাম্পপোস্টের নিচে দেখা জুবায়েরের সেই চেহারাটা মনে পড়ল রঞ্জনের। বুঝতে পারলো, ওর বলতে না পারা কথাটা।

রঞ্জনের চোখ, হাত বাঁধা হলে সাগর এবার জুবায়েরর দিকে মনোযোগী হলো। জুবায়ের যদি ঠিকভাবে ওর শর্তগুলো পালন না করে, তাহলে ওকে কী করা হবে, সেগুলো আবার ওকে স্মরণ করিয়ে দিলো ওরা। সাগর আর রেহানের কথা থেকে এবার পুরো ব্যাপারটা বুঝতে পারলো রঞ্জন। জুবায়ের ওদের পরিকল্পনায় অংশ নিতে চায়নি। কিন্তু ওরা ওকে ভয় দেখিয়েছিলো। যদি ও যেতে রাজি না হয় তাহলে কেবল ওকে নয়, ওর আদরের ছোট বোন জুলিকেও ওরা মেরে ফেলবে। রঞ্জনের সাথে ওর দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব। তাই ও গেলে রঞ্জনকে সহজেই রাজি করানো যাবে। সে কারণেই ভয়-ভীতি দেখিয়ে ওকে সঙ্গে আসতে বাধ্য করেছে ওরা। বলেছে, সঙ্গে গেলে ওর বা ওর বোনের কোন ক্ষতি করবে না ওরা। ওরা জুবায়েরকে ধমকাচ্ছিলো আর কথাগুলো বলছিলো। গভীর অন্ধকারে, নিঃশব্দে কাঁদছিলো জুবায়ের। ওর চোখের জল বড় বড় ফোঁটায় ঝরছিলো রঞ্জনের ডান হাতের কনুই এর ওপর। জুবায়েরের জন্য মমতার উষ্ণতা অনুভব করলো রঞ্জন।

আরও কিছুক্ষণ পর গাড়িটা যেন ঢালু একটা জায়গা দিয়ে নামলো বলে মনে হলো রঞ্জনের। তারপর আবার চললো প্রায় ঘণ্টাখানেক। অবশেষে ঘন অন্ধকারে ছাওয়া একটা নির্জন জায়গায় এসে থামালো মাইক্রোবাসটা। সকলে নেমে পড়ল গাড়ি থেকে। জুবায়ের হাত ধরে নামালো রঞ্জনকে। তারপর অস্পষ্ট সামান্য আলোতেই জুবায়ের জায়গাটা দেখার চেষ্টা করলো। সাগর বললো- “সব ঠিক আছে তো?” “হ্যাঁ, কালই আমি ব্যবস্থা করে রেখে গেছি।” বললো ইউনুস। বলেই স্তূপ করা কেটে রাখা গাছের ডালপালা দিয়ে ঢেকে রাখলো মাইক্রোবাসটা। এমনিতেই চারিদিকে ঘন গাছপালায় ছেয়ে আছে জায়গাটা। তাই সহজে কারও নজর পড়বে না গাড়িটাকে। এবার সকলে চলতে শুরু করলো। তারাদের অস্পষ্ট আলোয় পথ চিনিয়ে নিয়ে চললো ইউনুস। ছোট বড় পাহাড়ের ফাঁকফোকর দিয়ে চলতে লাগলো ওরা। শরীর কাত করে সরু ফাঁকগুলো দিয়ে যাওয়ার সময় রঞ্জনের ভীষণ অসুবিধা হচ্ছিলো। তাই জুবায়ের ওকে সাহায্য করছিলো। বেশ অনেকটা সময় ধরে এ পাহাড়ের ফাঁক দিয়ে, ও পাহাড়ের কিনারা গলে, সরু থেকে আরও সরু পথ অতিক্রম করে একটা জায়গায় থামলো এসে ওরা। রঞ্জন কিছুই দেখতে পেলো না। কিন্তু জুবায়ের পুরো পথটাই দেখলো। আর আশ্চর্য হয়ে ভাবতে লাগলো ‘এমন দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে এমন একটা দুর্গম লুকোন জায়গার সন্ধান ওরা পেলো কীভাবে! তাহলে কী এর আগেও ওরা এ রকম অপরাধমূলক কাজকর্ম করেছে!’ ভাবতেই সারা শরীর শিউড়ে উঠলো জুবায়েরের। কিন্তু জুবায়েরকে চরম আশ্চর্যের সীমায় পৌঁছে দিয়ে ওরা তখন আরও একটু ডান দিকে হাঁটলো। পাহাড়ের ফাঁকে খনিকটা হাঁটতেই একটা সুরঙ্গপথ দেখতে পেলো। মাথা নিচু করে, প্রায় হাঁটুর কাছে মাথা নামিয়ে তার ভেতরে ঢুকতে হলো সকলকে। ঘন, গভীর, ঘুটঘুটে অন্ধকারকে লাইটারের মৃদু আলোয় চোখ-সওয়া করে নিয়ে ক্লান্ত শ্রান্ত সকলেই বসে পড়লো মাটিতে।

কত বেলা হয়েছে বুঝতে পারলো না রঞ্জন। ওদের কথায় কেবল বুঝতে পারলো যে রাত ফুরিয়েছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই সাগর আর ইউনুস বেরিয়ে গেলো। বলে গেলো রেহান আর জুবায়ের যেন সতর্ক থাকে। নিজেদের ব্যাগ খুলে সামান্য কিছু শুকনো খাবার দিয়ে গেলো ওদের। তারপর রাতে যখন ওরা ফিরলো, ওদের কথা শুনে স্তব্ধ হয়ে গেলো রঞ্জন। ওরা রঞ্জনের বাবাকে ফোন করে রঞ্জনের জন্য এক কোটি টাকা মুক্তিপণ চেয়েছে। ফ্যাকাসে হয়ে গেলো রঞ্জনের চেহারা। ওর শরীর কাঁপতে লাগলো তির তির করে। নিজের বোকামির জন্যই আজ ওর এই পরিণতি, ভেবে বুক ফেটে কান্না বেরিয়ে এলো। কাঁদতে কাঁদতেই বললো- “আমার চোখটা একটু খুলে দেবে?” ইউনুস অদ্ভুত গলায় এক পৈশাচিক হাসি হাসলো- “সত্যি তো, এখনই পট্টি বেঁধে রাখার দরকার কী। সময়মত টাকাটা না পেলে তখন দেখা যাবে, কী করা যায়।” ওর গলার স্বর, ওর অভিব্যক্তি এমন ভয়ঙ্কর হয়ে উঠলো যে, ভয়ে আতঙ্কে শিউড়ে উঠলো রঞ্জন, সঙ্গে জুবায়েরও। ইউনুস একটানে খুলে দিলো রঞ্জনের চোখে বাঁধা টেপটা। পকেট থেকে ছোট একটা কৌটা বার করে কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই রঞ্জনের চোখে কিছু একটা মাখিয়ে দিলো ও। তীব্র যন্ত্রণায় ছটফট করতে লাগলো রঞ্জন। নিঃশব্দে কাঁদতে লাগলো জুবায়ের। ও তো জানে গ্লুকোমায় আক্রান্ত রঞ্জন চশমা ছাড়া এমনিতেই দেখতে পায় না। তার ওপর আবার চোখ নিয়ে এত অত্যাচার! রঞ্জনের চোখ খুলে দিলেও সত্যিই ও আর দেখতে পেলো না চোখে। সেই থেকেই গভীর অন্ধকারে ছেয়ে গেলো ওর জীবন।

পরদিন সাগর আর ইউনুসের সাথে রেহানও বেরিয়ে গেলো। কারণ আজ মুক্তিপণের টাকাটা পাওয়ার কথা। জুবায়েরকে দায়িত্ব দিয়ে গেলো রঞ্জনের খেয়াল রাখবার। যাবার সময় আরও একবার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের পরিণতির ভয় দেখিয়ে গেলো ওকে। ওরা চলে যাওয়ার পর দু’বন্ধু নির্বাক বসে রইলো অনেক, অনেকক্ষণ। তারপর ধিক্কার দিতে লাগলো নিজেদের। নিঃশব্দে আবার কাঁদতে লাগলো জুবায়ের। ওর প্রতি জুবায়েরের এই মমতামাখা কান্না মোটেই দেখতে পেলো না রঞ্জন। নিজেদের বোকামি, গোয়ার্তুমিকে ধিক্কার দিতে দিতে পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেললো দু’জনেই। কীভাবে বন্ধু চিনতে ভুল করলো ওরা! কীভাবে নিজেদের বাবা-মাকে বুঝতে পারলো না! ভেবে অসহায়তায় আর হতাশায় হাহাকার করতে লাগলো বারবার। গুহার মুখ থেকে আলো সরে গিয়ে ধীরে ধীরে ছেয়ে গেলো গভীর অন্ধকারে। জুবায়ের বুঝলো রাত হয়ে গেছে। তারপর একসময় আবার আলো ফুটলো। তবুও সাগররা ফিরলো না। আলো আর আঁধারের এই পরিক্রমার হিসেবে জুবায়ের বুঝতে পারলো তিন দিন পেরিয়ে গেছে। শুকনো খাবার আর পানির তলানি পরে আছে কেবল। সাগরদের ফিরে আসার অপেক্ষায় আরও একটা দিন অপেক্ষা করলো ওরা। কিন্তু লাভ হলো না। সাগর, ইউনুস বা রেহান কেউ ফিরে এলো না। কেমন করেইবা ফিরবে! রঞ্জনের বাবা ছেলের জীবন রক্ষার জন্য ঠিকই এসেছিলেন টাকা নিয়ে। সে টাকা ওদের হাতে দেওয়া মাত্রই চারিদিকে লুকিয়ে থাকা কিছু পুলিশ সদস্য ঘিরে ধরেছিলো ওদের। আর তাতে ঘাবড়ে গিয়ে দিশেহারা হয়ে আচমকা গুলি ছুঁড়তে শুরু করলো ইউনুস। নিজেদের আত্মরক্ষার জন্য, রঞ্জনের বাবাকে রক্ষা করবার জন্য পুলিশ সদস্যরাও বাধ্য হলো গুলি ছুঁড়তে। আর তাতে সাগর আর ইউনুসের সব ঔদ্ধত্য ফুরিয়ে গেলো। ওরা লুটিয়ে পড়ল গাছপালায় ঘেরা সেই জায়গাটায়, যেখানে ওরা ওদের মাইক্রোবাসটা লুকিয়ে রেখেছিলো। পায়ে গুলি লেগেও পালাতে চেষ্টা করেছিলো রেহান। পুলিশের ধাওয়ায় টাল সামলাতে না পেরে পাহাড়ের ওপর থেকে পড়ে গেলো ও। তলিয়ে গেলো গভীর খাদের অতল গহ্বরে।

পুলিশের লোকজন চারিদিকটা তন্ন তন্ন করে খুঁজেও কোন হদিস পেলো না রঞ্জনের। পাহাড়ের ফাঁকে ফাঁকে ঐ রকম অবিশ^াস্যভাবে যে এগিয়ে যাওয়া যায়, সেটা তারা যেন ভাবতেও পারলো না। অতখানি গহিনে, খাদের অতখানি কিনারায় যে মানুষ পৌঁছাতে পারে, সে ধারণাটাই যেন হলো না ওদের। খাদের ঐ ভয়ঙ্কর কিনারায় এক অন্ধকূপের গহ্বরে দু’টো অসহায় ছেলে মৃত্যুর প্রতীক্ষায় প্রহর গুনছে ভাবতেও পারলো না ওরা! তাই ওরা ধরেই নিলো, এখানে নয় অন্য কোথাও লুকিয়ে রেখেছে রঞ্জনকে। রঞ্জন আর জুবায়ের এ সবের কিছুই কিন্তু জানতে পারলো না। তারও পরদিন জুবায়ের বললো “রঞ্জন, হয় ওরা পুলিশের হাতে ধরা পরেছে, না হয় পুলিশের ভয়ে পালিয়ে গেছে। তাই ফিরছে না। কিন্তু আমরা এখন কী করবো। এখান থেকে পালানোর চেষ্টা করবো?” রঞ্জন ভয়াতুর গলায় বললো “কিন্তু যদি ওরা ফিরে এসে আমাদের গুহা থেকে বের হতে দেখে? তাহলে তো আমাদের মেরে ফেলবে, আর জুলিকেও!” ভাবতেই ভয়ে চুপটি করে বসে রইলো দু’জনে।

পরদিন ভোরে গুহার মুখে আলো ফুটতেই কোথা থেকে যেন এক ঝাঁক সাহস এসে ভর করলো জুবায়েরের বুকের ভেতর। হাত রাখলো ও রঞ্জনের কাঁধে। বললো- “রঞ্জন এভাবে থাকলে ক্ষুধায় তৃষ্ণায় দু’চার দিন পর এমনিই মরে যাবো। তার চেয়ে চলো বাঁচার চেষ্টা করে দেখি।” তারপর ক্ষুধায় তৃষ্ণায় আধমরা দু’জন বেরিয়ে এলো গুহা থেকে। রঞ্জনের হাত জড়িয়ে ধরে চলতে লাগলো জুবায়ের। আর মনে মনে ভাবতে লাগলো ‘সত্যিই কী রঞ্জনকে নিয়ে বের হতে পারবো এই গোলক ধাঁ ধাঁ থেকে!’ দীর্ঘ সময় ধরে ইতিউতি খুঁজতে খুঁজতে যখন ওরা গাছপালায় ছাওয়া সেই জায়গাটাতে পৌঁছালো, তখন বেলা গড়িয়ে সন্ধ্যা হয় হয়। ক্লান্ত বিধ্বস্ত হয়ে গাছের তলায় শুয়ে রইলো দু’জনে। ভোর বেলা হাঁটতে হাঁটতে হাইওয়েতে ওঠার পর একটা ট্রাক সাহায্য করলো ওদের। বন্ধুদের সঙ্গে পিকনিকে এসে পথ হারিয়ে ফেলেছিলো, বলে জুবায়ের জানালো ওদের। শহরের কাছাকাছি এনে ওদের নামিয়ে দিলো ট্রাকের লোকেরা। রাস্তার ধারে গাছ তলায় ঘাসের ওপর অনেকক্ষণ দু’জনে চুপচাপ বসে রইলো। সংগত কারণেই থানায় যোগাযোগ করবার সাহস পেলো না ওরা। কারণ সাগরদের সম্পর্কে ওরা সঠিকভাবে কিছুই জানে না। যদি ওরা ফিরে আসে? যদি রঞ্জনকে সাহায্য করবার জন্য জুবায়েরকে ওরা মেরে ফেলে? আর ঐ ছোট্ট জুলিকেও? তাই ওরা সে কথা ভাবতেও চাইলো না। সুদীর্ঘ এক সময় নীরবতায় আচ্ছন্ন হয়ে রইলো দু’জন। তারপর বেলা বাড়লে নীরবতা ভেঙে হঠাৎ জুবায়ের বললো “রঞ্জন, নিজের অনিচ্ছায় অনেকখানি অন্যায় করে ফেলেছি তোমার সাথে। তারই শাস্তি পাচ্ছি। এখন তোমাকে বাড়ি অবধি পৌঁছে দিতেও পারলাম না। সাগররা জানলে আমার বড় বিপদ হবে! আমি তোমাকে নিরাপদ কোন জায়গায় রেখে যাই। পুলিশের লোকেরা নিশ্চয়ই কেউ না কেউ দেখবে। তোমাকে সাহায্য করবে। আমিও এখন বাড়ি ফিরতে পারবো না। অন্য কোন শহরে লুকিয়ে থাকবো, যেন সাগররা জানতে না পারে। তুমি আমাকে ক্ষমা করে দিও!” বলতে বলতে গলা ধরে এলো জুবায়েরের। রঞ্জন দু’হাত বাড়িয়ে জড়িয়ে ধরলো ওকে। বললো “তুমি তো আমাকে অনেকভাবে বোঝাতে চেষ্টা করেছিলে। আমি বুঝি নি। আমার দুর্ভাগ্য। আমাকে প্রাণে বাঁচিয়েছো সে জন্য চির জীবন কৃতজ্ঞ থাকবো।” এর পরই রঞ্জনকে বকুলতলায় বসিয়ে দিয়ে চলে গেছে জুবায়ের। আর ক্ষুধায়, তৃষ্ণায়, ক্লান্তিতে, অবসাদে মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে রঞ্জন। ওর মনে হয়েছে বিশাল বিশ^ প্রান্তরে জুবায়ের যেন ওকে ভাসিয়ে দিয়ে চলে গেছে। বুকের ভেতরটা যেন একদম শূন্য হয়ে গেলো ওর। বোধ, বুদ্ধি, আবেগ, অনুভূতি সব যেন মিলিয়ে গেছে শূন্যে। তাই নিজের অস্তিত্বটুকুও যেন উপলদ্ধি করতে পারছে না ও। ক্লান্ত, বিদ্ধস্ত, মলিন চেহারা আর ধূলায় ধূসরিত ময়লা কাপড় পরা অপরিচ্ছন্ন, ক্ষুধায় কাতর অন্ধ রঞ্জনকে তাই সহজেই নিজের আয়ত্বে নিয়ে নিয়েছে মন্টু।

এভাবেই জীবনের এক প্রান্ত থেকে বিপরীত প্রান্তে পৌঁছে গেলো রঞ্জন। রঙিন কৈশোরকে সুন্দরভাবে অতিক্রম করবার আগেই সম্পূর্ণ বিপরীত এক জীবনের সম্মুখীন হতে হলো ওকে। তাই হয়তো জীবনের সব অনুভূতি হারিয়ে ফেলেছে ও। বুকের ভেতরের স্মৃতির সোনার খনি সযত্নে লালন করে রঞ্জন। কিন্তু কিছুমাত্র প্রয়াস নেই সেই জীবনকে খুঁজে পাবার। সেই জীবনে ফিরে যাবার। কিন্তু কেন? হয়তো বাবা মা’কে সর্বদা অভিযুক্ত করবার লজ্জায়। হয়তো নিজের র্নিবুদ্ধিতার কারণে কঠিন তিক্ততা ছেয়ে গেছে মগজের আর হৃদয়ের কোণে কোণে। কিংবা হয়তো সেই দুঃসহ দিনগুলোতে আতঙ্কগ্রস্ত অবস্থায় পাহাড়ের গুহায় ফেলে এসেছে ওর সব অভিযোগের সাথে সব অনুভূতিও। কে বলতে পারে!

ম্রিয়মাণ, সংকুচিত, লজ্জিত অন্ধ রঞ্জন হয়তো আর কখনই ফিরে যেতে পারবে না তার স্বাভাবিক জীবনে। হয়তো রজব আলী হয়েই কাটিয়ে দেবে তার স্খলিত জীবন। কিংবা হয়তো বিধাতা আবার তাকে ফিরিয়ে দেবেন তার প্রত্যাশিত সুন্দর স্বাভাবিক জীবন ও জগতে। কে জানে!

প্রতিদিনের মত আজও সন্ধ্যায় অবসাদে নিমজ্জিত রঞ্জন চিত হয়ে শুয়ে ছিলো বকুল গাছের তলায়। ঝিঁ ঝিঁ’র ডাকে বধির হয়ে আসছিলো তার কান দু’টো। হঠাৎ কী যেন মনে হলো রঞ্জনের। ঝিঁ ঝিঁর একটানা ডাকের সাথে সুর মিলিয়ে রঞ্জনও গুন গুন করতে লাগলো। বলতে লাগলো- “মা, বাড়ি যাবো। আর কখনই যাবো না অজানার ডাকে।” ঠিক সেই সময় একটা গাড়ি এসে থামলো বকুল গাছের কাছাকাছি। কয়েকজন নেমে এলো গাড়ি থেকে। গাড়ির হেড লাইটের আলোয় ওরা গভীর মনোযোগে দেখতে লাগলো রঞ্জনকে। কারা ওরা! মন্টু হতবাক হয়ে চেয়ে রইলো। পুলিশের লোকজন উৎসাহি পদক্ষেপে এগিয়ে আসতে লাগলো রঞ্জনের দিকে।

  • সিকদার আমিনুল হক সম্পর্কে

    বাল্যবন্ধু পীযূষকান্তি সাহা

    সাক্ষাৎকার

    newsimage

    [কবি সিকদার আমিনুল হকের ডাকনাম দীপক। দীপকের বাল্যবন্ধু পীযূষকান্তি সাহা। বর্তমানে তিনি

  • আজ সিকদার আমিনুল হকের ৭৭তম জন্মদিন : শ্রদ্ধাঞ্জলি

    সিকদার আমিনুল হকের গদ্য রচনা

    ফারুক মাহমুদ

    newsimage

    সিকদার আমিনুল হক মূলত কবি। ‘বিপুলপ্রজ’ কবি হিসেবে তাঁর খ্যাতিও রয়েছে। বেঁচে

  • আমার বাবা উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর হবেন

    সালমান তারিক মিশা

    newsimage

    ছোটবেলা থেকে আমি খুব একা থাকতাম। স্কুলে ভর্তি হই ১৯৭৫ সালে গভর্নমেন্ট

  • মহাদেব সাহার কবিতা

    newsimage

    [মহাদেব সাহা ষাটের দশকের অত্যন্ত জনপ্রিয় কবি। তিনি আধুনিক বাংলা কবিতায় একটি

  • নিরাপত্তা রক্ষী

    এম নাঈম

    newsimage

    লাশটি মাটির ওপর মুখ থুবড়ে পড়ে আছে আর গ্রামের মানুষরা চারিদিকে জটলা

  • মহাস্থানের হাজার বছর

    সৌম্য সালেক

    newsimage

    নাটককে প্রাচীন কলাশাস্ত্রবিদগণ ‘দৃশ্যকাব্য’ হিসেবে আখ্যায়িত করছেন। নাটকের মধ্যে বিশেষ কালপ্রবাহ আসতে

  • এ সংখ্যার কবিতা

    newsimage

    চতুর্দশপদী চিঠি মার্গারিটার কাছে ফাউস্ট মাহফুজ আল-হোসেন আমায় তুমি ক্ষমা কোরো না গ্রেচেন, আর করবেই