menu

সাহিত্যে নতুন স্বর নির্মাণের প্রত্যয়ে

শালুক-সাহিত্যসন্ধ্যা ‘প্রতিস্রোত’-২

কামরুল হাসান

  • ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ১৬ মে ২০১৯

http://print.thesangbad.net/images/2019/May/15May19/news/Untitled-11.jpgশালুক-সাহিত্যসন্ধ্যা প্রতিস্রোত ২-এর নির্ধারিত তারিখ ছিল গত ১০ মে বেলা দুইটায়। আমি পৌঁছে গেলাম যথাসময়ে। পাঠক সমাবেশে এসে পৌঁছেছেন কতিপয় অংশগ্রহণকারী কবি, আয়োজকরা তো ছিলেনই। ধীরে অংশগ্রহণকারীগণ এসে জড়ো হচ্ছিলেন। পাঠক সমাবেশের দক্ষিণ পশ্চিম কোনায় কাঠের নিচু প্লাটফর্মের উপর টকটকে লাল রঙের কয়েকটি চেয়ার সাজানো, শূন্য সবগুলোই, তারা রয়েছে, আয়োজকদের মতোই, অতিথি অপেক্ষায়। উপরে ঝুলছে ব্যানারটি যাতে আজকের অনুষ্ঠানে কী কী ঘটতে যাচ্ছে তার একটি সংক্ষিপ্ত সূচি দর্শক এক লহমায় দেখে নিতে পারবেন। সেই সূচির দিকে তাকালে মনে হবে এ অনুষ্ঠানটি বহুমাত্রিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক; বহুস্বরকে ধারণ করার মতো উচ্চাভিলাষী।

ততক্ষণে ঘড়ির কাঁটা পৌনে তিনটার ঘর ছুঁয়েছে। সূচনাসঙ্গীত দিয়ে শুরু হলো। সূচনাসঙ্গীত গাইলেন কানাডা প্রবাসী ছায়ানটের প্রাক্তন শিক্ষার্থী জান্নাতুল ফেরদৌস। সূচনা সঙ্গীতের পর প্রারম্ভিক কথামালায় ওবায়েদ আকাশ শালুকের চারিত্র ও দর্শন সম্পর্কে শ্রোতাদের সামান্য অবহিত করলেন। তিনি বললেন, শালুক লেখকের স্বাধীনভাবে কথা বলায় বিশ্বাস করে, সে কোন প্রতিষ্ঠান বা রক্তচক্ষুকে পরোয়া করে না। লিটল ম্যাগাজিন বলেই শালুক সাহসী, স্পর্ধী, শক্তিমান ও প্রচলবিরোধী। স্রোতের উজানে সে চলে, তাই সে প্রতিস্রোত।

‘সাহিত্যের স্বতন্ত্র স্বর : নির্মাণ বিনির্মাণ’ শিরোনামের প্রবন্ধটি লিখেছেন কবি ও প্রাবন্ধিক মাহফুজ আল-হোসেন। তিনি প্রবন্ধটি পাঠের আগে ওবায়েদ আকাশ সামান্য ভূমিকায় বললেন, কবি বা লেখকের স্বতন্ত্র স্বর যদি না থাকে, তবে টেকা যাবে না। জীবনানন্দের কথা উদ্ধৃত করে ওবায়েদ বললেন, ‘অনেক লোকের মাঝে বসে/ আমার নিজের মুদ্রা দোষে/ আমি একা হতেছি আলাদা’। এই আলাদা হওয়াটা জরুরি। ওবায়েদ আরো বললেন, ‘শালুকের সাহিত্য সভা কোনো প্রচলিত সাহিত্যসভা নয়, এ সভায় কোন সভাপতি বা প্রধান আতিথি বা বিশেষ অতিথি নেই। আমরা আপনাদের কথা শুনে ঋদ্ধ হবো, আপনারা আমাদের কথা শুনে ঋদ্ধ হবেন।

http://print.thesangbad.net/images/2019/May/15May19/news/Untitled-10.jpgমাহফুজ আল-হোসেন জীবনের পশ্চিমাভিসারী বেলায় এসে দুহাতে লিখছেন কবিতা, সঙ্গে প্রবন্ধ। যদিও তিনি বলেছিলেন এ কাজের জন্য তিনি নিজেকে যোগ্য মনে করেন না, কিন্তু তার রচনায় পরিশ্রম ও মেধার সাক্ষ্য রয়েছে।

মাহফুজ আল-হোসেনের প্রবন্ধটিতে সাহিত্যের, বিশেষ করে কবিতার, একটি সুলিখিত ইতিহাস, এরিস্টটলের অনুকরণতত্ত্ব থেকে, গ্রিক ট্রাজেডির তিন অমর নাট্যকার, নিউ ক্লাসিজমের স্বপ্নবাসবদত্তা, তার অমর রূপকার শেক্সপিয়র, রেস্টোরেশন যুগের আলেক্সান্ডার পোপ, রোমান্টিক যুগের শেলি, কিটস, বায়রন, রবীন্দ্রনাথ, আধুনিক যুগ, পঞ্চকবি, উত্তরাধুনিক যুগÑ সবই ফুটে উঠল।

প্রথম আলোচক ড. মাসুদুজ্জামান প্রতিস্রোত আসরের প্রশংসা করলেন এই বলে যে বহুকাল পরে এমনি একটি সাহিত্য আন্দোলন তিনি দেখতে পাচ্ছেন। বললেন, মাহফুজ আল-হোসেনের আজকের প্রবন্ধের বিনির্মাণকে তিনি সৃষ্টি বলে অভিহিত করলেন। প্রবন্ধটিকে সারগর্ভ মেনে নিয়ে তিনি একথা বল্লেন যে, এতে ইতিহাস, যে ইতিহাস আমরা কমবেশি জানি, প্রস্ফুটিত হলেও নন্দনতত্ত্বের ধারাগুলো প্রস্ফুটিত হয়নি। হতো যদি টেক্সট ধরে ধরে আলোচনা হতো। স্বতন্ত্র স্বর প্রসঙ্গে জীবনানন্দ বলেছিলেন নিজেকে নিজে অনুকরণ করতে চাইনি, অর্থাৎ কবিও বৈচিত্র্যপ্রয়াসী, কিন্তু সব মিলিয়ে কত স্বতন্ত্র জীবনানন্দের স্বর। তিনি কৃত্তিবাস, শতভিষা, হাওয়া ৪৯ প্রভৃতি কালজয়ী লিটল ম্যাগাজিনের প্রসঙ্গ তুলে এই বলে সমাপ্তি টানলেন যে, লিটল ম্যাগাজিনই পারে নতুন স্বর, স্বতন্ত্র স্বর তুলে আনতে, সে স্বর গোষ্ঠীবদ্ধ হতে পারে।

দ্বিতীয় আলোচক মুজতবা আহমেদ মুরশেদ, তিনি প্রতিস্রোতের আদি আড্ডার একজন। মনে হলো, আজ তাকে কথার জাদুতে পেয়ে বসেছে। স্বতন্ত্র স্বর সম্পর্কে বল্লেন, বনে কত ভিন্ন ভিন্ন স্বরে ডাকে পাখিরা। কাকও পাখি, কোকিলও তাই। তাদের স্বরের ভিন্নতা সুস্পষ্ট, কিন্তু কোন স্বর আমাদের প্রিয়? সৃষ্টি করতে হবে সুমিষ্ট স্বর। তিনি যে প্রস্তুত তার বিভিন্ন নমুনা তিনি রাখছিলেন।

শালুক সম্পাদক কবি ওবায়েদ আকাশ মুজতবা আহমেদ মুরশেদের আলোচনার একটি বাক্য ‘স্বতন্ত্র স্বরে লিখবো ভাবলে নতুন লেখকের জন্য তা বিপজ্জনক হতে পারে’র প্রশংসা করলেন। আলোচনাক্রম ভেঙে তিনি সমকাল সম্পাদক মুস্তাফিজ শফিকে আহ্বান জানালেন কবিতা পড়তে, কেননা তাকে ফিরতে হবে। ব্যস্ত সম্পাদকের ফুরসত মেলে না নিজ সন্তানদের সাথে ইফতার করার। ছুটির দিনে তিনি তাদের কথা দিয়েছেন। তিনি দুটি কবিতা পড়লেন। প্রথম কবিতার নাম ‘জুয়াড়ি’, দ্বিতীয় কবিতার নাম ‘মায়া’। দ্বিতীয় কবিতাটি তার খুব প্রিয় বললেও আমার ভালো লাগলো প্রথম কবিতাটি। ‘মায়া’ নস্টালজিক আর তাতে রয়েছে নস্টালজিয়ার তালিকা (ক্যাটালগিং)।

তৃতীয় আলোচক স্বপন নাথ আলোচনার শুরুতেই দশ মিনিটের টানাপোড়েন নিয়ে নিজের অস্বস্তির কথা জানালেন। মুজতবা আহমেদ মুরশেদের মতো ইনিও প্রস্তুত। কোন চিরকুট বা বই নয়, তিনি লিখে নিয়ে এসেছেন এক আস্ত প্রবন্ধ। বলেন, মঙ্গলগ্রহে শোনা চাপাকান্না, যা ধারণ করেছে নাসার চতুর যন্ত্র, তা বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করছেন মঙ্গলের ভূস্তরের বিন্যাস ও গঠন, মঙ্গলের প্রাগৈতিহাসিক চিত্র। তিনি থামলেন আরেক অ্যালেন গিনসবার্গের বিখ্যাত ‘হাউল’ কবিতা পাঠের মধ্য দিয়ে। তিন আলোচকের মাঝে যে এক অন্তঃসলিলা মিলটি আবিষ্কার করলাম তার কয়েকটি যেমন-

১। তারা প্রবন্ধটিকে সুলিখিত বলেছেন।

২। টেক্সট ধরে ধরে আলোচনা হলে ভালো হতো মনে করেন।

৩। প্রবন্ধটি মারাত্মকভাবে কবিতামুখী।

চতুর্থ আলোচক ওবায়েদ জানালেন তত্ত্ব নয়, তিনি কথা বলবেন অন্যভাবে। তিনি মঞ্চে বসে থাকা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কবি ও প্রাবন্ধিক মাসুদুজ্জামানকে দেখিয়ে বললেন, মাসুদ ভাই তাকে তাইওয়ান থেকে Contemporary World Poetry নামের একটি সংকলন পাঠিয়েছিলেন। সেখানে মুদ্রিত ফরাসি কবিতা ওবায়েদকে আকৃষ্ট করে। সে আকর্ষণ থেকে ওবায়েদ কিছু ফরাসি কবিতা অনুবাদ করেন। একবার কবি নির্মলেন্দু গুণ বিদেশি কবিতার এক সংকলনে কবিতা চাইলে ওবায়েদ সেই অনূদিত ফরাসি কবিতা পাঠালেন। নির্মলেন্দু গুণ কবিতাগুলো গ্রহণ করলেন না এই বলে যে ওগুলো যে ফরাসি কবিতা তা বোঝার কোন উপায় নেই। অর্থাৎ ফরাসি উপাদান অনুপস্থিত। এ দ্বারা যে মেসেজটি ওবায়েদ সকলকে দিলেন তা হলো কবিতাকে আপন মৃত্তিকাসংলগ্ন হতে হবে। এ কারণেই ইংরেজি বা ফরাসি নয়, আমাদের এখন বেশি আকৃষ্ট করে লাতিন আমেরিকা ও আফ্রিকার সাহিত্য।

কবি ওবায়েদ আকাশ গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের সাক্ষাৎকার সংবলিত পুস্তক Fragrance of Guava বা পেয়ারার ঘ্রাণ থেকে উদ্ধৃত করে বল্লেন, আমরা যে জাদুবাস্তবতার দেখা পাই মার্কেসের লেখায় তাকে মার্কেস বলেছেন লাতিন আমেরিকার বাস্তবতা, জাদু নয়, বাস্তব ঘটনা । এইচ জি ওয়েলস ছোটগল্পের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেছিলেন যে লেখা ১০ থেকে পঞ্চাশ মিনিটে পড়ে শেষ করা যায় সেটাই ছোটগল্প, এডগার অ্যালেন পো সময়সীমা বেঁধে দেন ৩০ থেকে ৯০ মিনিটের ভেতর, আর কাফকার ছোটগল্প শেষ হয়ে যায় কয়েক মিনিটেই। অর্থাৎ ছোটগল্প যখন প্রথম সৃষ্টি হয়েছিল, সেটি ছিল নির্মাণ। আর আর এই সংজ্ঞাভুক্ত গল্পগুলো হচ্ছে বিনির্মাণ।

বাজারে একপ্রকার রেডিও পাওয়া যেত টু ইন ওয়ান, পরে এলো থ্রি ইন ওয়ান। ইলেকট্রনিক্স জগতে এখন যেভাবে integration হচ্ছে, যেভাবে মোবাইলের ভিতর ঢুকে পড়েছে ক্যামেরা, ভয়েস http://print.thesangbad.net/images/2019/May/15May19/news/Untitled-13.jpgরেকর্ডার, টেলিভিশন ও রেডিও তাতে তা হলো ফাইভ ইন ওয়ান। শালুকের এই অনুষ্ঠানটি হলো ফাইভ ইন ওয়ান। সেই পঞ্চ তালিকার নাম্বার ওয়ান শেষ হতেই পাক্কা দু’ঘণ্টা পার। পৌনে তিনটায় শুরু হয়ে শেষ হলো পৌনে পাঁচটায়। আলোচনার ঐ দোর্দন্ড প্রতাপের যুগে কবিতা যে কোণঠাসা হবে, অনুমিত। কবিদের বলা হলো একটি করে কবিতা পড়তে। প্রথম যিনি পড়তে এলেন সেই বর্ষিয়ান কবি আবদুর রাজ্জাক বল্লেন, তাঁর সাথে একটিই কবিতা আছে। তাঁর কবিতা ‘সূর্যাস্ত বা মৌরসী’ কবিতার নামটির মতোই বহুমাত্রিক। খোকন মাহমুদ পড়লেন ‘একজন সোমনাথ আমার বন্ধু ছিল’। সরদার ফারুক তার কাব্য ‘যূথিকা নার্সারি’ থেকে দুটি কবিতা পড়লেন। আদিত্য নজরুলের কথা শোনা যাচ্ছিল না, কেননা মাইক কাজ করছিল না। পিতার নামের

সামনে কী করে লিখব ‘মৃত’ পঙক্তিটি ভালো লাগলো। ভাস্কর আবেদীনের ‘অবরুদ্ধ’ কবিতাটির শুরুটা, আদিত্য নজরুলের মতোই, বেশ চমকপ্রদ। সিলেট থেকে এসেছেন কবি মোহাম্মদ হোসাইন। তিনি পাঠ করলেন দুটি কবিতা ‘নীতিশাস্ত্র’ যার প্রথম পঙক্তি ‘নীতিশাস্ত্রের হরফগুলো পোকায় খেয়েছে’, আমার ভালো লাগলো। পরের কবিতি ‘কচি কচি লাবণ্যর চারা’ কবিতাটিও ভালো লাগলো।

শালুক প্রথম বছরগুলোতে ছিল কেবলি কবিতাকেন্দ্রিক পরে তাতে যুক্ত হয় ছোটগল্প। আজ দুজন গল্পকার ইশরাত তানিয়া ও শেলী সেনগুপ্তা এসে তাদের গল্প থেকে পাঠ করলেন। ততক্ষণ পর্যন্ত পুরুষশাসিত ঐ মঞ্চে দুজন নারীর উপস্থিতি কৃষ্ণচূড়া বনে রাধাচূড়ার বৃক্ষ বসাল, মায়াময় ও মোহনীয় হয়ে উঠল মঞ্চটি। এই যে দুপাশ থেকে দুটি করিডোরের মতো স্পেসে টকটকে লাল চেয়ার পেতে বসে আছেন কবি ও লেখকগণ, তাতে অনেক সুলক্ষণাই ছিলেন।

ইশরাত তানিয়া প্রথমেই জানালেন ওবায়েদ আকাশের কাছে তার ব্যক্তিগত ঋণ রয়েছে। তার প্রথম ছোটগল্প ছাপা হয় যে লিটল ম্যাগাজিনে তার নাম ‘শালুক’; প্রথম যে দৈনিকে তার নাম ‘সংবাদ’। ‘শালুক’ এবং ‘সংবাদ সাময়িকী’ দুটোরই সম্পাদক কবি ওবায়েদ আকাশ। ওবায়েদের ভক্তকুলের সংখ্যা ঈর্ষাজনক, আর এটা বাড়ছেই। স্বপন নাথ তাকে বলেছিলেন ‘শালুকের আকাশ’, মাহফুজ আল-হোসেন বলেছিলেন ‘নির্ভরতার আকাশ’। ইশরাত তানিয়া তার গল্পগ্রন্থ ‘বীজপুরুষ’ থেকে ‘বর্তমান অবর্তমানে’ থেকে একটি অংশ পড়ে শোনালেন এই বলে যে খ-িত পাঠ থেকে একটি গল্পকে বোঝা যায় না। ঐ আংশিক পাঠের অনুরোধ এসেছিল সময়াভাবের কারণে। শেলী সেনগুপ্তার গল্প ‘খাটিয়া’ও সমাজ বাস্তবতার এক দলিল। অনাকর্ষণীয় এক ভাষায় লেখা তার গল্পটি আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে শেষাংশে এসে।

আমার পেছনে এসে বসেছেন কবি শোয়াইব জিবরান। সঙ্গে তার প্রিয় সহধর্মিণী। শোয়াইবকে ডেকে নেয়া হলো মঞ্চে। শোয়াইব জিবরানের কবিতা ‘লালবসন্তের গান’-এর প্রথম পঙক্তি ‘যেদিন আমাদের পিতাকে হত্যা করা হয়েছিল’ বলে দেয় এটি বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লেখা।

একটু আগেই আমার ডাক পড়েছে মঞ্চে। আজ যে বাইশজন কবি কবিতা পড়বেন, তার প্রথম নামটি ছিল আমারই। কিন্তু আমি নোট নিচ্ছি দেখে সম্ভবত ওবায়েদ আমাকে আগে ডাকেননি।

বিজ্ঞানের সাথে কবিতার কোন বিরোধ আছে কিনা ওবায়েদ আকাশের এ প্রশ্নে আকাশের দিকে অনেকখানি এগিয়ে থাকা Astrophysicist সন্দীপন ধর উত্তর দিলেন, কোন বিরোধ নেই। বিজ্ঞান ও কবিতা একই গ্রন্থের দুটি আলাদা অধ্যায়। শক্তি চট্টোপাধ্যায় দিল্লি গেলে এর বাড়িতেই থাকতেন। তিনি বলেছিলেন যে দূরের আকাশকে আমরা টেলিস্কোপ দিয়ে কাছে এনে দেখি, কবিরাও সে আকাশকে তাদের পঙ্ক্তিতে কাছে এনে দেখান। সন্দীপন ধরও ওবায়েদের ভক্ত। বল্লেন, কলকাতা বই মেলায় ওবায়েদ আকাশের যে বইটি তিনি সংগ্রহ করেছিলেন, সেটি তিনি সঙ্গে করে এনেছেন কবির অটোগ্রাফ নেবার জন্য। আমার পরে কবিতা পড়লেন কবি সাকিব লোহানী। যখন মঞ্চ থেকে নেমে আসি মাহফুজ আল-হোসেন এবং আরো কয়েকজন আমার কবিতার প্রশংসা করেন।

শালুকের প্রতিস্রোতের আসরের পঞ্চ তালিকার তৃতীয় আইটেম বইমেলায় প্রকাশিত দশটি নির্বাচিত বই নিয়ে আলোচনা। প্রথম পাঁচটি বই নিয়ে আলোচনা করলেন মাহফুজ আল-হোসেন। তিনি একেকটি বই পাঠকসমুখে তুলে ধরেন আর সংক্ষিপ্ত পরিচিতি দেন।

আলোচিত বইগুলো ছিল- মামুন হুসাইনের উপন্যাস ‘শরীর সংক্রান্ত কূটালাপ’, অশোক করের কাব্যগ্রন্থ ‘পরাবাস্তবের আড়ালে’, সাদ কামালীর উপন্যাস ‘যুদ্ধ শেষে প্রেমের গল্প’, সুহিতা সুলতানার কবিতার বই ‘জলে ভরা মেঘের দিকে’, হাইকেল হাশমীর অনুবাদে ‘বাংলাদেশের উর্দু ছোটগল্প’, মুজিব ইরমের কাব্যগ্রন্থ ‘পাঠ্যবই’, ওবায়েদ আকাশের কাব্য সংকলন ‘স্বতন্ত্র কবিতা’, মাহফুজ আল-হোসেনের কবিতার বই ‘সুবাসিত শব্দের ঘুমঘোর’ শেলী সেনগুপ্তার উপন্যাস ‘আধিয়া’ এবং সাঈদ আজাদের উপন্যাস ‘অগ্নিপ্রভাত’।

শেষ পর্বে রইল কেবল কবিতাপাঠ, কেননা অতিথির সাথে বাক্যালাপ হয়ে গেছে। একে একে কবিতা পড়লেন একগুচ্ছ কবি। অরবিন্দ চক্রবর্তীর কবিতা ‘বুমেরাং বা একঝাঁক আগামী’ চিন্তাপ্রসূত উত্তরাধুনিক ঢঙের। পরের কবি আরো তরুণ, তার নামটিও বেশ অপ্রচলিত। কৌস্তুভ শ্রী নামের এই নবীন স্থপতিবিদ মঞ্চে বসেছিলেন। তার কবিতাটি মাকে নিয়ে মুগ্ধতা ছড়ানো। ‘আমার মা এক অবাক শিশু’ কবিতার সারল্য ভালো লাগলো। আরেক তরুণ কবি অভি জাহিদের ‘ঘুড়ি সংক্রান্ত জনজীবন’-এ প্রতিশ্রুতি আছে। কবি সুহিতা সুলতানা গত বছর তার মাকে হারিয়েছেন। সেই শোক কিছুতেই কাটিয়ে উঠতে পারছেন না। বল্লেন, আমার সব কবিতাই মাকে নিয়ে। ‘জলে ভরা মেঘের দিকে’ কাব্য থেকে তিনি পড়লেন মাকে নিয়ে লেখা কবিতা। এরপরে যিনি পড়লেন তার নাম ও কবিতা দুটোই আমি মিস করলাম বা শুনেও মনে রাখতে পারলাম না। এর কারণ হতে পারে তথ্যের ভারে ভারি হয়ে ওঠা আমার মস্তিষ্ক ও নোটবুক। মস্তিষ্ক কাজ না করলে নোটবুক তো অসহায়। তার পরের জনের নাম পেলাম অর্ধেক। http://print.thesangbad.net/images/2019/May/15May19/news/Untitled-12.jpgমিজান ছোটগল্প নিয়ে এমফিল করছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। তার কবিতার নাম ‘নতুন চাঁদের হাসি’। বুঝলাম মস্তিষ্ক কাজ করছে। মাহফুজ আল-হোসেনের কবিতা ‘আমার আকাশসমূহ’ জড়ো হলো একটি আকাশে (ওবায়েদ আকাশ)। মনিরুল মোমেন আমার ফেসবুক বন্ধু। তিনি ‘তিতাস’ নামের লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদনা করেন। তাকে দেখে বয়স্ক মনে হলেও সে ওবায়েদের চেয়ে বয়সে অনেক ছোট। পাঠ্য পুস্তক নিয়ে কাজ করা বাংলা ভাষার এই শিক্ষক মাঝে মাঝে কবিতা লেখেন। তিনি মঞ্চে আসার আগে তিনি ওবায়েদের কাছে জানতে চান তিনি সঙ্গমের কবিতা পড়বেন নাকি পরকীয়ার? ওবায়েদ সেটা সহাস্যে মঞ্চে ঘোষণা দিয়ে বলেন, আমি বলেছি, দিনের বেলা আর সঙ্গমের কবিতা পড়ার দরকার নাই। পরকীয়াই পড়ো। সবাই হতবাক কিন্তু পুলকিত। সবাই হেসে ওঠে।

কিন্তু এ মোমেন বান্দা পড়লেন সঙ্গমের কবিতাই। তীব্র শরীরীপ্রেমের কবিতাটি প্রতীকী, এ হলো শিল্পের সঙ্গম। তিনি শোয়াইব জিবরানকে ডক্টর বলাতে বন্ধুপ্রতিম শোয়াইব বলে ওঠেন, ডক্টর বাদ। কবীর হোসেন, মাহফুজ আল-হোসেনের মতো লেট ব্লুমিং। তার প্রথম কাব্য প্রকাশিত হয়েছে এবছর। তার ‘প্রাণীকুলে আমার কবিতা’ প্রতীকী এবং মজার। প্রথমে বলেছেন ‘কবিতা না হলেই আমি খুশি’ আর কবিতা পাঠে বুঝলাম তার কবিতা প্রাণীকুল বুঝলেও মানুষ বোঝে না।

শাহেদ কায়েসকে অনেকক্ষণ ধরেই খোঁজা হচ্ছিল। কিন্তু সে মাঝে মাঝেই, যেভাবে সে স্বদেশ ছেড়ে বিদেশ যায়, সেভাবেই উধাও হয়ে যাচ্ছিল। তাকে খোঁজার জন্য ওবায়েদ আকাশ যখন চিঠি লিখবে বলে মনস্থির করে, তখনি ‘চিঠি’ কবিতাটি নিয়ে শাহেদ হাজির। ‘চিঠি আর ফিরে এলো না’ দিয়ে শুরু কবিতায় শ্রীমতি তারকামন্ডলী থেকে নক্ষত্রের মতো চিঠির অক্ষর ঝরে পড়ে।

ঘড়ি ঘুরে আসে ইফতারের দিকে। ওবায়েদ আকাশ যত সম্ভব কবিকে কবিতা পাঠের সুযোগ দিতে চান। মনজুর শামসের কবিতার নামটিও মস্তিষ্কের এন্টেনায় ধরা পড়ল না। শুধু মনে রইল তিনি কবিতার বাইরে কথাসাহিত্য ও অনুবাদ নিয়েও কাজ করেন। এতক্ষণ যিনি প্রফেশনাল ক্যামেরা গলায় ঝুলিয়ে সকলের ছবি তুলছিলেন সেই মিঠুন রাকসাম তো আসলে কবি। মিঠুনের প্রথম কাব্য প্রকাশ করেছেন ওবায়েদ আকাশ। মিঠুন, ইশরাত তানিয়া এবং আরো অনেকের মতোই কৃতজ্ঞ। কবি মাহাবুব মিত্রের কবিতা একটি ভুল ছবি কী করে সকল জ্যামিতির মাঝে ছড়িয়ে পড়ছে তার ব্যঞ্জনাগাথা। আহমেদ শিপলু যে কবিতাটি পড়লেন তা ঐ শেলী সেনগুপ্তের মতো অতিসম্প্রতি লেখা। কাল রাতে হঠাৎ মানুষের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে তিনি কবিতাটি লিখেছেন যা তার ‘মন’ সিরিজের ১০ নম্বর কবিতা হয়েছে। শেষ লাইনটি ছিল, ‘মন যদি পাওয়া যায়, তবে মানুষ নামের একটি সূত্র তো পাওয়া যাবে।’ সর্বশেষ কবিতা পড়লেন ফটেগ্রাফি দলের তরুণ সদস্য রিসতিয়াক আহমেদ। ওবায়েদ অবশ্য বারবারই ঘোষণা দিচ্ছিলেন ইফতারের আয়োজন আছে, আপনারা কেউ ইফতার না নিয়ে যাবেন না।

এর মধ্যে অনেক আগেই অনেকে চলে গেছে বাসায় ইফতার করার জন্য। তখন মাগরেবের আজানের ধ্বনি ছড়িয়ে পড়েছে শাহবাগ অঞ্চলে। শেষ মুহূর্তে সবাই জড়ো হলো গ্রুপ ছবি তুলতে। আর সে ছবি তোলা কি শেষ হয়, আজান শেষ হয়ে আসে, ক্যামেরার ক্লিক ক্লিক চলতেই থাকে। এরপর ইফতারির প্যাকেট যদিবা পাওয়া গেল, খাবারের জায়গা মিলল না। কেননা পাঠক সমাবেশের ভেতরে আহার নিষেধ। কেউ কেউ প্রবেশপথে দাঁড়িয়ে খেয়ে নিল, আমরা কতিপয় নেমে যাই নিচে, জাদুঘরের পেছনে যে পুকুর আছে তার পাশে। ছোলা, মুড়ি, পেঁয়াজো, মিষ্টি- এই ছিল ইফতার, সঙ্গে অনিবার্য পানির বোতল।

  • সাহিত্যের স্বতন্ত্র স্বর নির্মাণ-বিনির্মাণ

    মাহফুজ আল-হোসেন

    newsimage

    সারসংক্ষেপ সাহিত্য হচ্ছে মানুষের নান্দনিক ভাষিক অভিব্যক্তি এবং এর মাধ্যমে সাহিত্যস্রষ্টা তাঁর কালের

  • শওকত ওসমানের অগ্রন্থিত কবিতা

    মুখোমুখি

    newsimage

    সম্প্রতি বাংলা সাহিত্যের এক কর্মী জনাব ভূঁইয়া ইকবাল, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের জদুঘরের আবদুল

  • এ সংখ্যার কবিতা

    newsimage

    তিনটি কবিতা আনোয়ারা সৈয়দ হক তুমুল সিম্ফনি আজ তুমুল সিম্ফনি আজ আকাশে বাতাসে ঘোর অন্ধকারে

  • নিমগ্ন ও নির্লিপ্ততার কবি হায়াৎ সাইফ

    জুনান নাশিত

    newsimage

    কবি হায়াৎ সাইফের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘সন্ত্রাসে সহবাস’। ‘ওয়্যার অন টেরর’, ‘টেরোরিস্ট’ এসব

  • অসম্পূর্ণ গল্প (পর্ব ৩)

    মুজতাবা শফিক

    newsimage

    (পূর্ব প্রকাশের পর) পঞ্চম অধ্যয় লোকটাকে বুকের উপর থেকে ঠেলে উঠায় নাইমুন। সুযোগ পেয়ে

  • ২০১৯ সালে প্রকাশিত দশটি গ্রন্থ

    newsimage

    শরীর সংক্রান্ত কূটালাপ মামুন হুসাইন মামুন হুসাইন তাঁর সমকালের কথাশিল্পীদের মধ্যে স্বতন্ত্র। স্বতন্ত্র বিষয়ে,

  • জিগমে সিংগায়া ওয়াংচুক!

    আহমেদ মুশফিকা নাজনীন

    newsimage

    প্রথম যখন ভুটানে যাই তখন অপির (আমার বর) উপর একটু বিরক্ত হয়েছিলাম।