menu

কমলকুমার বিষয়ে ভাব প্রকাশ

মামুন হুসাইন

  • ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ০৩ অক্টোবর ২০১৯
image

কমল কুমার মজুমদার / জন্ম : ১৭ নভেম্বর ১৯১৪; মৃত্যু : ৯ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৯ প্রতিকৃতি : এম এ কুদ্দুস

আমাদের জন্মের বছর সুনীল গাঙ্গুলী ঘোষণা করলেন- ‘কমলকুমার মজুমদারের অন্তর্জলী যাত্রা এ বছরের সর্বশ্রেষ্ঠ কবিতার বই এবং উপন্যাস এবং সামাজিক নিবন্ধ। এবং যা কিছু’। ‘গ্রন্থ নীরবতার সন্তান’- জীবনানন্দের এই উচ্চারণ স্তব্ধ করে, কী রসায়নে একটি গ্রন্থ এত তীব্র-বিপুল জলস্রোতের মত ‘নয়নাভিরাম মায়াময়’ কলিকাতা নগরে আছড়ে পড়ছে- খানিকটা বৃদ্ধ হয়ে কখনও ভেবেছি বটে! কিন্তু তখনই নিজের জন্য ঝাপসা-অস্পষ্ট উচ্চারণ তৈরি করতে-করতে আবারও চপেটাঘাত- ‘যে কমলকুমার মজুমদার পড়েনি কলকাতা তাকে শিক্ষিত মনে করে না।’ বলতে কী, কলকাতা থেকে যোজন-যোজন দূরে অবস্থান করে, অশিক্ষিতপটুতা মিলিয়ে যখন ‘মল্লিকা বাহার’, রুক্সিনীকুমার, অন্তর্জলী যাত্রা ও সুহাসিনী পমেটম’-এর স্মৃতি বাঁচিয়ে মনে মনে কমলকুমার বিষয়ে মায়া বাড়ানোর পথ খুঁজছি, তখন ’৭১-এর মার্চে সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়কে লেখা একটি চিঠিতে তৎকালীন পূর্ববঙ্গের মৃত্যুকাল নিয়ে, তাঁকে উদ্বিগ্ন দেখতে পাই- “...ইদানীং কলিকাতার তথা পূর্ববঙ্গের অবস্থা আমাকে একাধারে বিচলিত ও বিমর্ষ করিয়াছে;... কাহারও মনে দুঃখের লেশমাত্র নাই; পদ্মার এইদিকে ভারি মজা হইতেছে, এই সুযোগ!... একবার ভাব, লক্ষ লক্ষ লোক প্রাণ হারাইতে আছে- শিশুরা হত্যা, রমণীরা ধর্ষিতা, নিরীহ মূঢ় তাবিজ পরা হাত মাটিতে লুটাইয়া পড়িতেছে। কত, ‘বাঁচান’ ‘বাঁচান’ বলিয়া ক্রন্দন রোল সেখানকার আকাশ বাতাসকে মথিত করিতেছে- ...‘আল্লারে’! বলিয়া শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করিতেছে। ইহা ধর্মযুদ্ধ। সেই ধর্মযুদ্ধ লইয়া আমরা কি করিতেছি? বঙ্কিমবাবুর, ছাঁদে বলিতে ইচ্ছা হয়, ধন্য মুজিবর, তোমাকে ধুলা ছোঁওয়া কুর্ণিশ জানাইতেছি,... তোমার লোকেদের মরিতে বল আমরা দারুণভাবে পদ্য ছড়া ইত্যাদি লিখিব- আল্লাহর কিরে মুজিব যুদ্ধ থামাইয়ো না;... কলিকাতায় ক্রন্দনের স্থান নাই ক্রন্দন প্রবণতা খবরের কাগজ শুষিয়া লইয়াছে- পূর্ববাংলায় কি যে হইতেছে তাহা যাহারা ৪২ রায়েট মন্বন্তর দেখিয়াছে তাহারা কিছু আঁচ করিয়াছে; কি ভয়াবহ কি বুক-আঁচড়ান ব্যাপার।... মনে কয় পূর্ববঙ্গের কোথাও পশুপাখি নাই, গুলির আওয়াজে অন্যত্র পালাইয়াছে, কোথাও অন্ধ, বৃদ্ধ পথ খুঁজিতেছে- কোথাও খাদ্য নাই- জল নাই, বালিকারা আপন জন্মকে ধিক্কার দিতেছে কেননা তাহারাও জানিল তাহারা রমণী।... আমি রেডিও শুনিতে পারি না- বারবার মনে হয় ‘হায় বেচারা’ মধ্যে মধ্যে রাতে ঘুম ভাঙ্গিয়া যায়- ‘বাজান’ ‘বাজান’ শুনি। আমার একমাত্র রোদনে ছাড়া আর কিসেই বা অধিকার থাকিতে পারে।’ চিঠির বাক্যে-শব্দে আমাদের জনপদের জন্য ওঁর উদ্বেগ, ভয় এবং মায়া জড়িয়ে থাকলে একবার ভাবি- নকশাল আন্দোলনের পটভূমিতে একটি-দুটি গল্প লিখলেও তৎকালীন পূর্ববঙ্গের এই উদ্বাস্তুদশা নিয়ে কমলকুমার মহাশয় যদিবা কোন সাহিত্যকর্ম তৈরি করতেন, তাহলে কেমন দাঁড়াত কে জানে? মায়া বাড়ানোর ছলে ফের খুঁজে পেতে আবিষ্কার করি- ‘রুক্সিনীকুমার’ গল্পে একদা-পূর্ববঙ্গের জিলা চাঁদপুর থেকে উপেনের কাছে একটি চিঠি এসেছিল- ‘...বাবা উপেন তুমি কেমন আছ, অনেকদিন হয় তোমার পত্র না পাইয়া বড়ই চিন্তায় আছি;’ চিঠির ভেতর ছড়ানো এই উদ্বেগ-ভয়ে ডুবে যেতে-যেতে ‘চাঁদপুর’ শহর ঝুপ করে হারিয়ে যায়, আর আমরা আবারও কমল মজুমদারের পূর্ববঙ্গ বিষয়ক নতুন অনুষঙ্গ খোঁজার জন্য হন্যে হই; বইপুস্তকের পৃষ্ঠায় আবিষ্কার হয়- একবার তিনি ময়নামতী এসেছিলেন, আর এসেছিলেন রাজশাহীর খেতুরীর মেলায়। কোলকাতা মেডিকেলে ভূমিষ্ঠ কমল মজুমদার চব্বিশ পরগণা, রিখিয়া, মুঙ্গে, লখনউ, হয়ে কিভাবে ৮০ বছর আগে খেতুরির বৈষ্ণব মেলায় এসেছিলেন তার একটি অস্পষ্ট কাহিনী কল্পনা করতে শুরু করি। হয়ত মায়া তৈরির জন্য আমি অনেককাল পর কমলকুমার খেতুরির মেলায় যে পথে গিয়েছিলেন, অথবা সম্ভাব্য যে অচীন পথে হেঁটেছিলেন সেই পথ খুঁজতে নামি।

চিঠির বাক্যে-শব্দে আমাদের জনপদের জন্য ওঁর উদ্বেগ, ভয় এবং মায়া জড়িয়ে থাকলে একবার ভাবি- নকশাল আন্দোলনের পটভূমিতে একটি-দুটি গল্প লিখলেও তৎকালীন পূর্ববঙ্গের এই উদ্বাস্তুদশা নিয়ে কমলকুমার মহাশয় যদিবা কোন সাহিত্যকর্ম তৈরি করতেন, তাহলে কেমন দাঁড়াত কে জানে? মায়া বাড়ানোর ছলে ফের খুঁজে পেতে আবিষ্কার করি- ‘রুক্সিনীকুমার’ গল্পে একদা-পূর্ববঙ্গের জিলা চাঁদপুর থেকে উপেনের কাছে একটি চিঠি এসেছিল- ‘...বাবা উপেন তুমি কেমন আছ, অনেকদিন হয় তোমার পত্র না পাইয়া বড়ই চিন্তায় আছি;’

বরেন্দ্র শহর থেকে ৩০ কি.মি. পশ্চিমে গেলে বসন্তপুর গ্রাম পড়ে, সেখান থেকে খেতুরির হাঁটা পথ অথবা রিক্সা-ভ্যান। শ্রী নরোত্তম ঠাকুর মহাশয় পদ্মার জলে লীন হয়ে যাচ্ছেন- এই ছবি দেখতে দেখতে পথ হাঁটি, অথবা ভিড় উজিয়ে দেখতে পাই ঠাকুরের আসন, ভজনটুলি এবং তমাল বৃক্ষ। আমাদের বন্ধুরা খেতুরির ফোটো সেশান শেষ করে ঘরে ফিরে এলে, আমি খুঁজে-খুঁজে কমলকুমারের খেতুরী-উপাখ্যান দেখতে থাকি আবার; আমাদের যুদ্ধের বছর তিনি (০৬.১০.৭১) একদা খেতুরীধামের স্মৃতি বর্ণনা করছেন গল্পকার উদয়ন ঘোষ এর কাছে- ‘... একবার পূর্ববাংলা আমার যাইবার প্রয়োজন ঘটে, কুমিল্লা ইত্যাদি ময়নামতি দেখিয়া আমি রাজশাহী যাই, এখানেতে এক চমৎকার মিউজিয়াম ছিল, আর মুসলমান প্রধান জায়গা, নিচে পদ্মা, ইহার একস্থানে এক দিবস জনৈক উকিল ভদ্রলোকের সহিত সাক্ষাৎ হয়- লোকটি মাতাল, মদ খাইতেছিল। কহিল ‘আপনি- তুমি কি গোদাগাড়ী ঘাট যাইবে’, অপরাধী হইলাম, ‘আজ্ঞে মহাশয় না, কহিলেন, তবে এখানে আসিলে কেন, উত্তর করিয়াছিলাম’, ‘খেতুরি যাইব তাই খবর করিতে আসি’... আমি উকিল, আমার চাকুরি যাইবার তরাস নাই... ঐ সব জায়গা গিয়া হইবে কি। বলিয়া উঠিয়া দ-ায়মান হওয়ত বাহু বিস্তারিয়া তর্জ্জনী এমতভাবে চালনা করিয়াছেন যে এ যাবৎ পদ্মা নিস্ক্রিয় ছিল, আজ্ঞা মানিল বহমানতা লাভ করিল, উহার বুকে চর উজাইয়াল, কিম্ আলোর চিহ্ন দেখা যাইল;... ভদ্রলোক কহিলেন, ঐ স্থানে যাও, মধ্যরাতে পদ্মা স্পর্শ করইত প্রশ্ন কর তারাগনের প্রতি চাহিয়া প্রশ্ন কর, ‘আমি কে, মা না পথ ছাড়িলে খাতুরী গিয়া কি হইবে, ...ঐ স্থানে এক বিচিত্র আঙ্গুটির রূপ ধারণ করিল, সমস্ত কিছু শোভাময়ী হইল, শুধুমাত্র জলের গতির শব্দ, আর মাঝিদের গন্তব্য ঘাটের নাম ধরিয়া ডাক- আমাদের নাম ধরিয়া ডাকিতেছে!’ বলতে কী, আমাদের অন্ধচিত্ত এই অন্তর্গত আহ্বানে সাড়া না দিলেও কমলমজুমদার নামক এক ‘খেলার প্রতিভা’ শতবর্ষ আগে এমনি এক দৈববাণী আবাহন করেছিলেন তাঁর অর্ন্তজ্ঞানে। বললেন ‘সংখ্যা আমার ভাই’ এবং ‘গল্প অর্থই পুরাতন পৃথিবী: বিশ্বাস, সম্পর্ক, বুকে টানা!’ ঢোকরা কামারের ধ্যান ও জ্যামিতী লোপাট করে পুরাতন পৃথিবীর এক জল¯্রােতের পাশে তিনি আবারও অনুভব করেন- কেউ ‘আমাদের নাম ধরিয়া ডাকিতেছে!’ কমল মজুমদার ধ্যানমগ্ন হন, আর দূর থেকে কেউ কথা বলেন- ‘জয় জয় রঘুবীর রামকৃষ্ণ পৃথিবী করুণাময় হউক, মদীয় চক্ষুদ্বয় পবিত্র অশ্রু নির্মিত হইয়াছে, আমি রামকৃষ্ণ কথা লিখি; প্রকৃতিরে পথ প্রদর্শন করুক ধরিত্রী তাহার সকল জলোচ্ছাসিত নদী দ্বারা আমার মানসে শুদ্ধ সিঞ্চিড়া বর্তিত হইয়াছে;- আমি রামকৃষ্ণ কথা শুনিয়াছি;... এখন চৈতন্য দান করিতে প্রসন্ন হউন,... আমি দৃশ্যসকলের দ্রষ্টা, শব্দের শ্রোতা, মননের কর্ত্তা- ...’ ‘সম্পূর্ণ ভালবাসাই আমার ধর্ম, তাই ঠাকুরের কৃপায় লিখিয়া থাকি, লেখার বিষয় নহে...। ...‘ঠাকুর করুণ, যাহাতে আমরা অতীব গ্রাম্য- আমাদের নিজস্ব জীবনের ঘটনা সরলভাবে লিখিয়া ব্যক্ত করিতে পারি।’ আমরা লক্ষ্য করবো- কমলকুমার, অথবা কমলবাবু অথবা কানুদা অথবা কনুদেব ¯্রষ্টা হয়ে, শ্রোতা হয়ে, মননের কর্তা হয়ে এবার কলকাতা শহরে এক আশ্চর্য ‘খেলার দৃশ্যাবলী’ বর্ণনা করতে করতে নতুন এক ‘খেলার আরম্ভ’ ঘটান। কিন্তু আমাদের ঊনবুদ্ধি এইসব খেলার মীমাংসাতে যাওয়ার সাহস পায় না তক্ষণি। ফলে ওঁর অঙ্ক ভাবনা, সঙ্গীত জগত, নাট্যপ্রতিভা, উডকাট, টেরাকোটা, খালাসীটোলা, সত্যজিৎ, জ্যঁ রেনোয়া ইত্যাকার ‘দৈত্যকাহিনী’ পেছনে সরে গেলে কেবলই অনুভব হয়, কোথাও যেন একখ- মায়া রহিয়া গেল! তখন কমলকুমারের পেছন ফেরা, তাঁর কথার জট, স্বরলিপি, মাধবপ্রেম, মুখোশ ধারণ, লোকশিল্প, বাগবিত-া ইত্যাদি মিলিয়ে গভীর তত্ত্ব-তালাশ আমার শ্রমবিমুখ আত্মা সহজে আয়ত্ব করতে পারে না। থাকে, খানিকটা মিলিয়ে যেতে-যেতে লেগে থাকে পুরনো অস্পষ্ট দাগের মত, অথবা খানিকটা তক্ষণি বিস্মৃত হই। হয়ত তখন স্মরণে আসে কুয়োর ব্যাঙের কথা। কিন্তু কমলকুমার বলেন, আগ্রা শহরের অন্য এক ব্যাঙের কথা- ‘ব্যাঙটি ঘুমায়। আপনার স্থূল দেহটিকে অনেকখানি জায়গার উপর ছড়াইয়া দিয়া মেলাইয়া দিয়া বিছাইয়া দিয়া সে ঘুমায়।... মানুষ একা কতটুকু কিন্তু মনে মনে সে কত বড়।... আগ্রার কেল্লার দেওয়ান-ই-খাসের একটি ম্লান ঘরে ব্যাঙ ঘুমাইতেছিল মানুষে ঘুমের মধ্যে আয়না দেখিতে পারে না, কেননা তাহারা ভগবানের নিকটে স্বপ্ন দেখার সৌখিনতা চাহিয়াছিল; ... কুম্ভকর্ণ অনেক বিদ্বান ছিলেন, অনেক তথ্য জানিতেন। আমাদের ধারণা তিনি ঘুমে ডুবিয়া ছিলেন সত্যই তিনি ঘুমাইতেছিলেন। কিন্তু একথাও কথা যে তিনি অনেক কিছু জানিয়া ঘুমাইতেছিলেন, না, অনেক কিছু ঘুমাইয়া জানিয়াছিলেন।... অন্য কেহ সে কথা বলিতে অপারগ।’ এই অপারগতার অপরাধ মাথায় নিয়ে ব্যাঙের শীত নিদ্রায় জড়িয়ে গেলে আধো ঘুম, আধো জাগরণে তখন মূর্খ জ্ঞানের ¯্রােত অথবা ‘স্বপ্ন দেখার সৌখিনতা’ আসে আমাদের। শতবর্ষ আগের এই লোকটির ধূসর ফোটোগ্রাফ ছুঁয়ে দেখি একবার- কোলকাতা শহর থেকে অনেক কষ্টে যোগাড় করা কতিপয় ছবির রক্ষণাবেক্ষণ- একটি বাবা মা, একটি ঠাকুমার সঙ্গে শিশু কমলকুমার, অপর ছবি পাসপোর্টের জন্য তোলা যৌবনের কমলকুমার, ‘বাবু’ কমলকুমার, আর সাউথ পয়েন্ট স্কুলের লাইব্রেরির টেবিল, যেখানে কমল মজুমদার পাঠ গ্রহণ করতেন, যেখানে ‘নকশাল’ বিরোধিতার পরেও, পত্রিকা-নথিপত্র ইতিহাসের উপাদান, এই বিবেচনায় লুকিয়ে রেখেছিলেন কয়েক গুচ্ছ ‘দেশব্রতী’; অথবা ধরা যাক, যেখানে বসে তিনি নিজের অন্তর্জলী যাত্রার নিঁখোজ চিত্রনাট্য রচনা করেছিলেন, নাকি মিথ্যা বানিয়ে বলবো, কমলবাবু এই টেবিল-চেয়ারে তাঁর ‘তেইশ’ গল্পের একটি উজ্জ্বল বাক্য লিখেছিলেন- ‘আমারে একটা ওষুধ দে, যাতে- মনের সাদে ভিক্ষে করতে পারি...।’ আমাদের ওষুধহীন-রুগ্ন ঘুম ঘুম শরীর ভিক্ষুক-মন নিয়ে কমলবাবুর প্রণোদনায় মুলতানের বেশ্যা পল্লী দেখে, রায়ট দেখে, স্যাঙ্গুভেলি রেস্ট্ুরেন্ট দেখে, রিখিয়ার জলকষ্ট দেখে, রাধাপ্রসাদগুপ্ত দেখে, অশোকমিত্র দেখে, ক্যালকাটা ফিল্ম সোসাইটি দেখে, এ্যালাচ ও লবঙ্গ পানের উৎসব দেখে, নাট্যদল হরবোলা দেখে, বিষ্ণু দে দেখে, হাজরা রোডের তেতলাবাড়ি দেখে, বাংলার সাধক নামক তথ্য চিত্র দেখে, বাবার মৃত্যু দেখে, চটের ব্যাগে ফরাসি বই দেখে, লক্ষণের শক্তিশেল দেখে, নকশাল ব্যাপারে আমাদের প্রেম দেখে, মায়ের মৃত্যু দেখে, এ্যালোপ্যাথ বিরোধিতা দেখে, আর দেখে ১৯৭৯-এর ৯ই ফেব্রুয়ারি- যেদিন হোমিও-ভক্ত কমল মজুমদার ও অ্যালোপ্যাথ-ভক্ত বনফুল দু’জনই মৃত্যুবরণ করেন কোলকাতার সংস্কৃতি-কারখানায়। পরদিন সন্দীপন চট্টোপাাধায় খবর তৈরি করলেন- ‘গত ১০ ফেব্রুয়ারির সকালবেলা থেকে সাহিত্যকে আমি পুরোপুরি ঘৃণা করতে শিখেছি।’ যদিও ‘ঘৃণা’ বিষয়ে এরকম তীব্র চৌকস বক্তব্য দেয়ার পরেও সন্দীপন আরো অনেক দিন পর্যন্ত সাহিত্য সেবা করেছিলেন, কিন্তু লক্ষ্যণীয়, ‘ঘৃণা’ প্রকাশ বিষয়ে শ্রীযুক্ত কমলকুমার অনেকখানি নার্ভাস ছিলেন- ‘আমার নিজের দেখিয়াছি অতীব মাত্রায় যধঃৎবফ, ঘৃণা আছে ও দুর্দ্ধর্ষ হিংসাবৃত্তি আছে। এমত বৃত্তির জন্য আমি নিজেই বড় নার্ভাস। ... নিজেই ক্রমে রৎড়হরপধষ’; কমলমজুমদার ‘নার্ভাস’ হচ্ছেন- কথাটা খটকার মত লাগলেও এবার তাঁকে ডুবে যেতে দেখি বিশুদ্ধ রসিকতার জগতে। নাকি বলবো, ‘নার্ভাসনেস’ এড়ানোর জন্যই তিনি ‘রসিক’ হওয়ার মুখোশ আঁটলেন মুখে। বিশুদ্ধ কিছু রসিকতা এবং বিশুদ্ধ ইয়ার্কি নিয়ে কমল মজুমদারের এই ব্যাখ্যানপর্ব উজিয়ে আমরা এবার শুনি- তিনি সত্যজিৎ তথা ‘ঢ্যাঙার বেল্ট কেনা দেখছেন, ‘পদ্যকার’ জীবনানন্দকে দেখছেন, ‘ন্যাকা গলা’র শঙ্খ ঘোষকে দেখছেন, দেখছেন ‘হাফপ্যান্ট পরা’ সুধীন দত্তকে, (বুঝলেন বাবু আপনাদের সুধীনদত্ত একটি চোর) আর দুর্দ্ধর্ষ রসিকতার চূড়ান্ত অংশ হিসেবে হঠাৎই ক্যালকাটা কালচারাল ইন্ডাস্ট্রির বিশিষ্ট কুশীলবদের হিন্দি ছবি দেখার জোর নেমন্তন্ন দিয়ে অ্যালকোহল নেয়ার টেবল ম্যানার্স শেখাচ্ছেন- ‘স্ত্রীকে মদ্যপানে গোপন করতে হলে কাঁচা মুসুরির ডাল চিবোবে।’ ... ‘খালি পেটে মদ খাবে না, যদি নিতান্তই খেতে হয়, তাহলে কিছুটা মাখন খেয়ে নেবে।’ তবে, ‘বাংলাখান,... অ্যাংলো ইন্ডিয়ান খেলে পেটে দেবদাস হবে।’ ইতিহাস বলে কমলমজুমদার ‘দেবদাস’ না হয়েই শরৎবাবু বিষয়ক একটি নোট রচনা করেছিলেন ১৯৭৭-এ (‘শরৎবাবু সাহিত্যের এক সৌন্দর্য’); এদিকে লাগাতার বিশুদ্ধ রসিকতা প্রদর্শনের আর এক উপায় হিসেবে দেখালেন, বহুদিন পর্যন্ত ছবি ও মূর্তি মাটিতে পুঁতে এ্যান্টিকের গুণে আরো চড়া দামে গছিয়েছেন সাহেবদের কাছে, (??) তস্কর সুধীন দত্তের চরণাংশ নিয়ে গল্পের নাম করছেন, ‘অনিত্যের দায়ভার’, আর বললেন- ‘আমার বই ২৯ খানা বিক্রি হয়েছিল, তারপর ৩০ জনই দোকানে বই ফেরত দিয়ে গেছে।’

আমার ‘চৌখস’ বন্ধুরা এইরকম বিবিধ হাস্যতামাশা বিস্মৃত হয়ে আমাকে এবার শেখালেন- কমল মজুমদার বাংলা গদ্যে চিত্র আবিষ্কার করেছেন, তিনি ভাষাকে আক্রমণ করে তৈরি করেছেন নতুন এক সৌন্দর্য; বললেন- তিনি ফৈয়াজ খাঁর কাছে গান শিখেছিলেন, নকশাল বিষয়ে গল্প লেখার পরেও বর্ণাশ্রমের পক্ষে ছিলেন, মাছের ব্যবসা করলেন, সাহেব হলেন; তারপর এক মুটের ‘বাবু কেতনা বাজা হ্যায়?’- এই ‘বাবু’ ডাক শুনে নাকি তাঁর মোহভঙ্গ হল। তিনি এবার সাহেবী কাপড়-জামা বিসর্জন দিয়ে পরলেন লম্বা পাঞ্জাবী, ধূতি এবং লপেটা, চটি আর এক ফাঁকে লিখলেন একটি হলফনামা- ‘আমার মস্তিষ্ক সন্ন্যাসধর্মে পরিপূর্ণ সঠিক বাঙালী। আমি যদি ধঁঃড়নরড়মৎধঢ়যু লিখি তাহা হইলে তাহাতে বাঙালিত্বের কম্পন তাহাতে বহিবে।’

বাঙালিত্বের কম্পন খোঁজার ছলে, কিম্বা কমলকুমারের নিখোঁজ আত্মজীবনীর সন্ধানে আমরা আবার কমলকুমারের সাঁওতাল পরগণায় যাই- দেখি কমলকুমার মাথায় টিকি রেখে সংস্কৃতি শিখছেন, দয়াময়ীর সাথে ওয়াল ম্যাগাজিন করছেন, আর হঠাৎই ঝগড়া করে হয়ে গেলেন চিরকালের ট্রুয়েন্ট। এবার কমলকুমার ভ্রাতা-নীরদমজুমদারের সাথে শুরু করলেন সাইকেল ভ্রমণ, অথবা আত্মজীবনীর উপকরণ খুঁজতে-খুঁজতে বহুকাল পর কোলকাতা শহরে আবিষ্কার করলেন তার হারানো সেই বাইসাইকেল অথবা আবিষ্কৃত হল সিনেমার গল্পের মত কোন এক ‘বাইসাইকেল থিভস্।’ ধরা যাক, হারানো বাইসাইকেলের শোক ভোলার জন্য তিনি লিখলেন- ‘...আমি চেষ্টা করি মানুষকে কেমন দেখিতে, মানুষ যে কষ্ট পাইতেছে, তাহার জানা জগত দিয়া- বিশ্বাস দিয়া তাহা বুঝি’। ...‘আমার মতন মার্বেল জীবন কেহই অতিবাহিত ও নিঘিন্নেœ অর্থাভাব কেহই ভোগ করিবে না।’ মানুষ দেখার এবং জগত বোঝার এই সুকঠিন ব্রত নিয়ে যখন কেবলই অনুভব করছেন ‘আমার ভাব লাগে’, তখন সমস্ত কোলকাতা শহর বুক পকেটে নিয়েও তিনি নিজেকে তীব্র বান্ধবহীন বিবেচনা করতে শুরু করেন- ‘আমি বড়ই নিঃসঙ্গ! আমার আত্মীয় বন্ধু স্বজন কেহ আর বহুকাল নাই।... আমি খুব একা।’ তীব্র কোলাহলের নিঃসঙ্গতায়, ধরা যাক তিনি রূপচাঁদ পক্ষীর কলকাতা বিষয়ক কবিতাটি তার চটের ব্যাগ থেকে তখন আলাদা করছেন। অথবা একা হয়ে হেঁটে চলছেন, পুরনো টাকশাল ও বাদুড় বাগানে বিদ্যাসাগরের বাসভবন ছুঁয়ে কালিঘাটের মন্দিরে, অথবা তিনি পড়েছেন জেমস ফ্রেজারের আঁকা কোলকাতা-রাজ্যের প্রাচীন সব ছবি নিয়ে। নাকি বলবো, সোলার টুপি বিষয়ে এইমাত্র নোট নিয়ে তিনি একা হয়ে এবার দেখছেন মন্দিরের টেরাকোটা- যেখানে মূর্তির সরলতা, মূর্তির মায়া এবং ভারি নরম ¯িœগ্ধ ও ঠা-া ছায়ার অবিরত শোভা!

কে জানে, এই একাকিত্ব উদ্যাপনের জন্যই তিনি হয়ত জড়িয়ে গিয়েছিলেন এক আশ্চর্য সুশৃঙ্খল বিশৃঙ্খলায়। দেখা যাবে, স্কুল পলাতক কমলকুমার শিক্ষকতাকে ‘ছিনাল জীবিকা’ বিবেচনা করেও সমস্ত জীবন স্কুলের আর্টস এ্যান্ড ক্রাফ্ট মাস্টার হিসেবে থেকে গেলেন। দেখা যাবে চিলড্রেন অপেরা প্রতিষ্ঠা করে প্রাণশক্তি ক্ষয় করতে-করতে হাঁপানি উদ্যাপন করছেন জানালার শিক ধরে, কারণ ‘সাফারিং’-এর মধ্যে একটা গ্রাঞ্জর আছে।’ ...‘বুড়ো বয়সে একটা কিছু নিয়ে থাকতে হবে তো, হাঁপানিটা গেলে কী নিয়ে থাকবো গো?’ চার্লস ল্যাম্ব-এর একটি কথা মিলিয়ে শরীর এবং অসুখ বিষয়ক প্রপঞ্চটি নতুনভাবে পাঠ করি- ‘হাউ সিকনেস এনলার্জেস দ্যা ডাইমেনশান অব আ ম্যানস্ সেল্ফ টু হিমসেল্ফ।’ রোগকে সাহিত্যে সেই যে ‘মেটাফোর’ হিসেবে দেখানোর চল, সেখানে হাঁপানির বর্ণনা না পেলেও টিউবারকুলোসিস-এর প্রসঙ্গ ঘুরে- ঘুরে আসে, যখন যক্ষাকে ভাবা হচ্ছে দারিদ্র্যের রোগ, ভালবাসার রোগ কিংবা আত্মার রোগ। স্মরণে আসে ‘ম্যাজিক মাউন্টেন’-এর খানিকটা উচ্চারণ- অসুখের উপসর্গ আসলে ভালবাসার শক্তির এক ভিন্নতর প্রকাশ, অথবা সব অসুখই শেষ পর্যন্ত রূপান্তরিত হয় ভালবাসায়। সাহিত্য পড়–য়া বন্ধুদের হাত বদল করা বইয়ের ভেতর পাঠ করি, যক্ষা দুই মহান কবিকে পর্যায়ক্রমে আক্রান্ত করলেও কিটসকে সান্ত¡না দিচ্ছেন শেলি- যক্ষা তাঁর হয়, যিনি কেবলমাত্র তোমার মতো অসাধারণ সব ভার্স রচনা করতে পারেন; নাকি আমরা ভাববো কাফকার চিঠির কথা- ১৯১৭-এর সেপ্টেম্বরে যক্ষা আক্রান্ত কাফকা বন্ধু ম্যাক্সব্রডকে লিখছেন- আমার ফুসফুস এবং মাথা আমার অজান্তেই একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। ‘গোলাপ সুন্দরী’র বিলাস যদিওবা যক্ষা হাসপাতালের খানিকটা আভাস তৈরি করেছেন, কিন্তু কমলকুমার নিজে হাঁপানির সঙ্গে মাথার এমন কোন চুক্তিপত্র তৈরি করেছিলেন কিনা আমরা না জানলেও ওঁর কষ্ট আঁচ করতে পারি সহজেই- ‘...সিঁড়ির এক ধাপ নামলে বা উঠলে আমাকে কষ্ট পাইতে হয়।... এমনই হাঁপানিতে পীড়িত যে... স্কুল যাওয়া স্থগিত রাখিয়াছি। অদ্য কয়েক দিবস হইল আমি জাগিয়া রাত কাটাইতেছি- এমন অসুখ শত্রুরও যেন না হয়।... রাতে আমি কাজই করিতে পারি না; হাঁপানি বড় বিশ্রী অসুখ!’ সহজেই অনুমেয়- শরীরের এই আক্রমণ বাঁচিয়ে কমলকুমার উডকাট করতেন, পেন্সিলে স্কেচ করতেন, জনগণনা বিভাগের রিপোর্ট লিখতেন, লিখতেন বারোঘর এক উঠোন নিয়ে, লিখতেন লুপ্তপূজাবিধি, লিখতেন বঙ্গীয় শিল্পধারা, লিখতেন সোলার কাজ, লিখতেন পূর্ববঙ্গ সংগ্রাম বিষয়ে, আর লিখতেন বাগান বিষয়ক বিবিধ রচনা।

(বাকি অংশ পরবর্তী সংখ্যায়)

  • ষাটের দশকে বিচরণ-

    কবি মানস ও কাব্য ভাবনা

    মারুফ কামরুল

    newsimage

    পঞ্চাশের একটা ছাপ ষাটের দশকে পড়লেও এই দশকের আলাদা বৈশিষ্ট্য দাঁড়িয়েছে; কিছু প্রতিভা উঠে এসেছে। পঞ্চাশ ও ষাটের একটা

  • অঞ্জনা সাহার কবিতা

    newsimage

    অভিসন্ধি, চৈতন্যলোকে, জয়যাত্রা

  • সবার জন্য নন্দনতত্ত্ব

    আবদুস সাত্তার

    ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরির স্বাভাবিক মেয়াদ শেষ হয়েছে বেশ কয়েক বছর হয়ে গেল। কিন্তু এখনও প্রাচ্যকলা বিভাগের ছাত্রছাত্রীদের

  • বৃষ্টির সেই অন্ধকারগুলো

    গৌতম গুহ রায়

    newsimage

    পুড়ে যাওয়া বা ছেকা খাওয়া রুটির মতো খসখসে সন্ধ্যার ভেতর চন্দ্রা চোখ

  • সাময়িকী কবিতা

    বাণিজ্য নগরীর দিকে গোলাম কিবরিয়া পিনু একটি গাভী, তার বাছুরের সাথে থাকতে পারে

  • নীলিমা ইব্রাহিমের ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ কাব্যের সাহিত্যমূল্য

    নাজনীন বেগম

    newsimage

    বাংলাদেশের শিক্ষা, সাহিত্য এবং সংস্কৃতির প্রগতিশীল বলয়ে অন্যতম বলিষ্ঠ নেতৃত্ব ড. নীলিমা ইব্রাহিমের পুরো জীবন ছিল সার্বজনীন

  • পতনের পর

    আসমা চৌধুরী

    newsimage

    ঘরে ঢুকে মিষ্টি একটা গন্ধ পায় শরীফ। রান্নাঘরে ভালোকিছু রান্না করছে সায়মা। মন