menu

বিপুল জীবনানন্দ

আজও অসম্পূর্ণ উত্তরপত্রের এক সুদীর্ঘ প্রশ্নপত্র

এমিলি জামান

  • ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ০৭ ফেব্রুয়ারী ২০১৯

http://print.thesangbad.net/images/2019/February/06Feb19/news/Untitled-22.jpg১৯৯৯ সনে বাংলা সাহিত্যের অন্যতম সর্বাধিক পাঠকপ্রিয় শক্তিধর কবি জীবনানন্দের জন্মশতবার্ষিকী উদ্যাপিত হয়েছে। অনন্য সাহিত্য-প্রতিভা জীবনানন্দের দেহাবসানের পর পেরিয়ে গেছে সুদীর্ঘ ৬৪ বছর (১৯৫৪-২০১৮)। কিন্তু এখনো সাহিত্যের বৈঠকে তাঁকে জড়িয়ে কৌতূহলী প্রশ্নের অন্ত নেই। প্রশ্নগুলোর সব ক’টিই যদি প্রশ্নকারীদের সাহিত্য-বোধ ফুটিয়ে তুলত, তাহলে কোনো কথা ছিল না। কিন্তু দুর্ভাগ্য আমাদের এটাই যে, সাহিত্যের বৈঠকে নির্জলা সাহিত্যপ্রেমীরাই যে একমাত্র উপবিষ্ট হন, তা না। দু-চারজন সত্যিকারের সাহিত্য-বিশারদ অবশ্যই মূল্যায়নযোগ্য। এরা ছাড়া কাগজের অবয়বে কলমের ঘোড়দৌড় দেখানো গুটিকয় কলমচালক কারো কারো পক্ষপাতদূষ্ট বিচারের রায়ে সাহিত্য-গবেষক ও সাহিত্য-সমালোচকের অভিজাত তকমা অর্জন করে ফেলেছেন। আর, এদের অতি তৎপরতার কারণেই জীবনানন্দের “ধূসর” শব্দটি একমাত্র আক্ষরিক অর্থেই পঠিত হয়েছে এযাবতকাল (দ্রষ্টব্য: ফয়জুল লতিফ চৌধুরী সম্পাদিত “জীবনানন্দ বিবেচনা”)। আক্ষরিক অর্থের বাইরে জীবনানন্দ স্বয়ং যা বোঝাতে চেয়েছিলেন তার কিছুটা উপলব্ধি করেছিলেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। জীবনানন্দের “ধূসর পান্ডুলিপি” (১৯৩৬) পড়ার পর রবিকবি জীবনানন্দকে চিঠি লিখে জানিয়েছিলেন- “তোমার কবিতাগুলি পড়ে খুশি হয়েছি। তোমার লেখায় রস আছে, স্বকীয়তা আছে এবং তাকিয়ে দেখার আনন্দ আছে।” (দ্রষ্টব্য: আবদুল মান্নান সৈয়দ সম্পাদিত জীবনানন্দ দাশের প্রকাশিত-অপ্রকাশিত কবিতাসমগ্রের ‘প্রবেশক’)।

যাহোক, রবিকবির “তাকিয়ে দেখার আনন্দ” নিঃসন্দেহে এক দারুণ আনন্দ-বার্তা, যা জীবনানন্দকে ইতিবাচক মানসিকতা নিয়ে বিচার করতে অন্তত কিছুসংখ্যক পাঠককে অবশ্যই উৎসাহিত করেছে। জীবনানন্দের ‘মৃত্যুর আগে’ কবিতাটি (উল্লেখ্য যে, ১৯৩৮ সনে রবীন্দ্রনাথ সংকলিত ‘বাংলা কাব্য পরিচয়’-এ কবিতাটি স্থান পায়) কোন অর্থেই বেদনা-জারিত মৃত্যুকথন না। বরঞ্চ, সপ্রাণ আনন্দমুখর জীবনের বয়ান। পৌষ-সন্ধ্যায় “নরম নদীর নারী ছড়াতেছে ফুল কুয়াশার” তারপর, যে মাঠে ফসল নাই তার শিয়রেও “চাঁদ এসে দাঁড়ালো” এসবের মধ্যে মরে যাওয়ার কোনো বিষণ্ন ছবি আঁকা হয় নি। ব্যক্তিগত বিষণ্নতা নিয়ে দেয়ালে ঠেস দিয়ে বসে অবিরল নয়নাশ্রু ঝরাতে ঝরাতে যে বর্ণাঢ্য সৃষ্টিসম্ভার সাহিত্য-কোষাগারে জীবনানন্দ জমা দিয়েছেন, তা কি তিনি নির্মাণ করতে পারতেন!? তাবড় তাবড় জীবনানন্দ-সমালোচকদের কারো কারো ব্যক্তিগত জীবনও হয়তো বেদনা-কণ্টকিত। কিন্তু, সমালোচনা লিখে হাত গুটিয়ে বসে না থেকে তাদের ভেতর থেকে অন্তত একজনও তো ‘বনলতা সেন’-এর মতো শিল্পোত্তীর্ণ সুদীর্ঘ একটি কবিতা পাঠকসাধারণকে উপহার দিতে পারতেন। সাহিত্য-শিল্পী হয়ে ওঠার পূর্বশর্ত যে অর্থকষ্ট এবং জীবনসঙ্গিনীর অবহেলা, কতিপয় http://print.thesangbad.net/images/2019/February/06Feb19/news/Untitled-23.jpgপান্ডিত্যঋদ্ধ ব্যক্তির এ-জাতীয় ধারণা ও বিশ্বাস আসলে ভিত্তিহীন। তাই, গঙ্গাজলে গঙ্গাপূজা সারতে জীবনানন্দের স্বনির্মিত বাক্য ঋণ করে বলতে হয়- ‘সকলেই কবি নয়, কেউ কেউ কবি’। কলমের গায়ে ধাক্কা-গুঁতো দিলেই যে কবিতা নির্মিত হয়, তা সত্য না। স্নায়ুর গভীরে জন্ম নেয়া কবিতাই কবির কলম, কাগজের অবয়বে চিত্রিত করে। আর, এ জাতীয় চিত্রণ জীবনানন্দের কলম-তুলি অসংখ্যবার করেছে। তাইতো তাঁর কাছ থেকে আমরা উপহার পেয়েছি বনলতা সেন, হাওয়ার রাত, আট বছর আগের একদিন-এর মতো অসংখ্য রসোত্তীর্ণ ও মানসম্পন্ন কবিতা। ‘আট বছর আগের একদিন’ কবিতার ইনট্রিকেসি সাধারণ মাপের পাঠকের মনেও জটিল এক জিজ্ঞাসার জন্ম দেয়। সার্বিক প্রাপ্তির ঐশ্বর্যময়তা নিয়েও কেন একজন আত্মহননের পথ বেছে নেয় (!?)। এরকম জিজ্ঞাসার জন্ম দিয়েছেন বলেই জীবনানন্দ আমাদের আধুনিকতাপুষ্ট ডিজিটাল যুগেও আধুনিক বলেই স্বীকৃত। প্রাপ্তির অর্থ সবার কাছে একরকম না। মানুষে মানুষে পার্থক্য রয়েছে, যাকে বলা যায় ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য। একজন কখনোই অন্যজনের কাছে পঠন-পরবর্তী শেষ হয়ে যাওয়া বই না। প্রত্যেকেই প্রত্যেকের কাছে অস্পষ্ট। আর, এজন্যেই কারো আত্মহত্যার সঙ্গত কারণ খুঁজে পাওয়া দুঃসাধ্য। তবে কবিরা কিছু পরিমাণ দার্শনিকতাও অন্তর্ধারণ করেন বলেই কবিতায় উল্লিখিত ব্যক্তির আত্মহননের কারণ জীবনানন্দ অনুমান করেছেন। জীবনানন্দ বলেছেন-

অর্থ নয়, কীর্তি নয়, সচ্ছলতা নয়-

আরও এক বিপন্ন বিস্ময়-

আমাদের অন্তর্গত রক্তের ভেতরে-

খেলা করে,

আমাদের ক্লান্ত করে,

... ... ...

লাশকাটা ঘরে-

সেই ক্লান্তি নাই

সংবেদনশীল জীবনানন্দ আধুনিক জটিল জীবন-উৎকণ্ঠা যথার্থই শনাক্ত করতে পেরেছেন। এই উৎকণ্ঠার সহজ নাম উচ্চাকাক্সক্ষা অর্থাৎ হাই অ্যাম্বিশন (ঐরময অসনরঃরড়হ)। জীবনানন্দ একে ‘বিপন্ন বিস্ময়’ নাম দিয়েছেন, যা একটি কাব্যময় শব্দবন্ধ। সীমাহীন উচ্চাকাক্সক্ষা আমরা ইংরেজ কবি টেনিসনের (যিনি ছিলেন রাজকবি) ‘ইউলিসিস’ কবিতার শিরোনাম-চরিত্রেও প্রত্যক্ষ করি। ইউলিসিস জীবনকে তলানি পর্যন্ত উপভোগ করতে চেয়েছে। জীবন তার কাছে বিজয় আর উদ্যাপনের অন্য নাম। আসল কথা হচ্ছে, “বাঁধা গরুর কাটা ঘাস” ধরনের ম্যাড়মেড়ে জীবন সবাইকে পূর্ণ তৃপ্তি দিতে পারে না। সাহিত্যশিল্পী প্রমথ চৌধুরীও বলেছেন, “আধুনিক সুসভ্য মানুষ মাত্রেই অসন্তুষ্ট মানুষ।” গুণী সাহিত্যশিল্পী বুদ্ধদেব বসু ‘আট বছর আগের একদিন’-এর কাব্য নায়কের আত্মহত্যার বিষয়ে এক উজ্জ্বল ব্যাখ্যা দিয়েছেন। সেটা হচ্ছে- ‘মৃত্যু পার হয়ে বেজে উঠল জীবনের জয়ধ্বনি আর সেই সঙ্গে নির্বোধ ও পাশবিক জীবনের প্রতি চৈতন্যের বিদ্রƒপ’। জীবন-বাস্তবেও এজাতীয় আত্মহত্যার একাধিক দৃষ্টান্ত রয়েছে। ক্ষুরধার প্রতিভার অধিকারী তারকা-সহিত্যশিল্পী আর্নেস্ট হেমিংওয়েও হয়তো কোনো শৈল্পিক অসন্তুষ্টির কারণেই স্বেচ্ছামৃত্যু বেছে নিয়েছিলেন।

১৮৯৯ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি ব্রিটিশ-ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির (বর্তমান বাংলাদেশ) অন্তর্গত বরিশাল শহরে জীবনানন্দের জন্ম। জীবনানন্দের ডাক নাম ছিল মিলু। তাঁর পিতৃকুল ছিল অধুনা বাংলাদেশের ঢাকা জেলার বিক্রমপুর পরগনার অধিবাসী। তাঁর দাদামশায় সর্বানন্দ দাশগুপ্ত (১৮৩৮-১৮৮৫) বিক্রমপুর থেকে এসে বরিশালের স্থায়ী বাসিন্দা হন। তিনি ব্রাহ্মধর্মে দীক্ষা নিয়েছিলেন। জীবনানন্দের মা কুসুমকুমারী দাশ ছিলেন গৃহবধূ। কিন্তু, কাব্য-প্রতিভার অধিকারিনী। তাঁর সুপরিচিত কবিতা ‘আদর্শ ছেলে’ (আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে/ কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে) আজও শিশু-কিশোরদের পাঠ্যবইয়ের পাঠ্য-কবিতা। জীবনানন্দ মা-বাবার জ্যেষ্ঠ সন্তান ছিলেন। তাঁর ভাই অশোকানন্দ দাশ ও বোন সুচরিতা দাশ যথাক্রমে ১৯০৮ ও ১৯১৫ সালে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা সত্যানন্দ দাশগুপ্ত অল্পবয়সে স্কুলে ভর্তি করার পক্ষে ছিলেন না বলে বাড়িতে মায়ের কাছেই জীবনানন্দের বাল্য শিক্ষা শুরু হয়। প্রত্যুষে পিতৃকণ্ঠে উপনিষদ-আবৃত্তি আর জননী-কণ্ঠে গান শুনে তাঁর ঘুম ভাঙত। লাজুক প্রকৃতির হলেও কৈশোরে জীবনানন্দ খেলাধুলা, বাগান করা, বেড়ানো, সাঁতার কাটা ইত্যাদি পছন্দ করতেন। ১৯০৮ সালের জানুয়ারি মাসে আট বছরের বালক জীবনানন্দকে বরিশাল ব্রজমোহন বিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেণিতে ভর্তি করানো হয়। ১৯১৫ সালে ঐ বিদ্যালয় থেকে জীবনানন্দ প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। দু বছর পার বরিশাল ব্রজমোহন কলেজ থেকে উচ্চ-মাধ্যমিক পরীক্ষায় একই ফল লাভ করেন। ১৯১৯ সালে কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ইংরেজিতে অনার্সসহ বি.এ ডিগ্রি লাভ করেন। ঐ বছরই ব্রহ্মবাদী পত্রিকার বৈশাখ সংখ্যায় তাঁর প্রথম কবিতাটি ছাপা হয়। কবিতাটির নাম ছিল ‘বর্ষ আবাহন’। কবির নাম কবিতার পাশে ছাপা হয়নি তখন। শুধু ‘শ্রী’ শব্দটি ছাপা হয়েছিল কবিকে সম্মান জানাতে। ১৯২১ সালে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে দ্বিতীয় শ্রেণিতে স্নাতকোত্তর (এম.এ) ডিগ্রি লাভ করেন। তারপর তিনি আইন পড়তে শুরু করেন। ১৯২২ সালে কলকাতা সিটি কলেজে টিউটর হিসেবে অধ্যাপনা শুরু করেন এবং আইন-পড়া ছেড়ে দেন। জীবনানন্দের কর্মজীবন শান্তিপূর্ণ ছিল না। সুস্থির জীবিকার অভাবে তিনি সমস্ত জীবন কষ্ট পেয়েছেন। ১৯৫৪ সালে তিনি হাওড়া গার্লস কলেজে কর্মরত ছিলেন। ঐ বছরই ট্রামের ধাক্কায় আহত হয়ে জীবনানন্দ মৃত্যুবরণ করেন।

http://print.thesangbad.net/images/2019/February/06Feb19/news/Untitled-24.jpgতারুণ্যের সূচনা-পর্বেই জীবনানন্দের কাব্যপ্রতিভা আলোয় আসতে শুরু করে। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ ১৯২৫-এর জুন মাসে মৃত্যুবরণ করলে তাঁর স্মরণে জীবনানন্দ ‘দেশবন্ধুর প্রয়াণ’ নামে একটি ব্রহ্মবাদী কবিতা রচনা করেন। এই কবিতা বঙ্গবাণী পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। তাঁর প্রথম কাব্যসংকলন ‘ঝরা পালক ’-এ কবিতাটি পরবর্তীকালে স্থান পেয়েছিল। ‘দেশবন্ধুর প্রয়াণ’ পাঠ করার পর কবি কালিদাস রায় মন্তব্য করেছিলেন, “এ ব্রহ্মবাদী কবিতাটি নিশ্চয়ই কোনো প্রতিষ্ঠিত কবির ছদ্মনামের রচনা।” ১৯২৫ সালেই তাঁর প্রথম প্রবন্ধ স্বর্গীয় ‘কালীমোহন দাশের শ্রাদ্ধ বাসরে’ ব্রহ্মবাদী পত্রিকার পরপর তিনটি সংখ্যায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়। একই বছরে কল্লোল পত্রিকায় ‘নীলিমা’ কবিতাটি প্রকাশিত হলে তা অসংখ্য নবীন কাব্যপ্রেমীর মন ও মনোযোগ আকর্ষণ করে। সময়ের ব্যাপ্ত পরিসরে ‘নীলিমার’ প্রতিভাদীপ্ত কবি আরো এগিয়ে যান। কলকাতা, ঢাকা এবং অন্যান্য জায়গার সাহিত্য পত্রিকায় তাঁর কবিতা ছাপা হতে থাকে। পত্রিকাগুলির মধ্যে ছিল কল্লোল, কালি ও কলম, প্রগতি প্রভৃতি। জীবনানন্দের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ঝরা পালক’ ১৯২৭ সালে প্রকাশিত হয়। ঐ সময় থেকেই জীবনানন্দ তাঁর পারিবারিক উপাধি দাশগুপ্তের বদলে শুধু দাশ লিখতে আরম্ভ করেন। জীবনানন্দ দাশ ধীরে ধীরে দখল করে নেন অসংখ্য কাব্যপ্রেমীর মানস-সিংহাসন। তাঁর কানায় কানায় শিল্পরসে পূর্ণ অনন্য কবিতা ‘বনলতা সেন’ সম্পর্কে গুণী সাহিত্য-গবেষক মাহবুব সাদিক যে বিদগ্ধ মন্তব্য করেছেন, তা নিঃসন্দেহে উল্লেখযোগ্য সাহিত্য-মূল্য বহন করে। তিনি বলেছেন- “হাজার বছর ধরে কেউ পথ হাঁটেনি- কিন্তু সচেতন পাঠক জানেন মানুষের অভিজ্ঞতা ও অভিজ্ঞানের জগৎ কোন একক মানুষের নয়। আর, বিগত হাজার বছর তো ইতিহাসের অতীত কোন কাল নয়- এ কালটি বলতে গেলে প্রতিটি মানুষের অভিজ্ঞতারই অন্তর্গত। অতীত-মানুষের অভিজ্ঞতা ও অভিজ্ঞান সঞ্চিত হয়ে আছে মানুষের জ্ঞানের বিপুল ভান্ডারে। একালের যে কেউ তাই হাজার বছরের ভান্ডারে ডুব দিতে পারেন অনায়াসে- বলতে পারেন অতীতের দীর্ঘ ইতিহাস ও ঐতিহ্য তিনি ভ্রমণ করে এসেছেন। প্রকৃত কবির অভিজ্ঞতা ও অভিজ্ঞান এভাবেই চিত্রিত হয় শিল্পসফল কবিতায়।”

যে যে সাহিত্য ও সাহিত্যিক-গবেষক মাত্রাধিক আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান হয়ে জীবনানন্দের ইনট্রিকেট পার্সোনালিটির (ভাবিয়ে তোলা ব্যক্তিত্ত্ব) গায়ে নৈরাশ্যবাদী, দুঃখবাদী ইত্যাদি তকমা নির্দ্বিধায় সেঁটে দিয়েছেন, তাঁরা যে গভীর জ্ঞানের পরিচয় দিয়েছেন, তা বলা যায় না। মানসিক আঘাতে কষ্ট পেলেও জীবনানন্দ মানুষ ও সমাজকে নৈরাশ্যবাদী করে তোলার আয়োজনে মেতে ওঠেন নি। তিনি নিজেও যে পুরোপুরি হতাশা-সমুদ্রে নিমজ্জিত হয়েছিলেন, একথাও জোর দিয়ে বলা যায় না। আশার আলোও তাঁর শিল্পিত পংক্তিমালায় কখনো কখনো ঝলসে উঠেছে। যেমন-

মানুষ তবুও ঋণী পৃথিবীর কাছে।...

সুচেতনা, এই পথে আলো জ্বেলে- এ পথেই পৃথিবীর ক্রমমুক্তি হবে।

সে অনেক শতাব্দীর মনীষীর কাজ;

এ বাতাস কী পরম সূর্যকরোজ্জ্বল;

প্রায় ততদূর ভাল মানবসমাজ

আমাদের মতো ক্লান্ত ক্লান্তিহীন নাবিকের হাতে

গড়ে দেব, আজ নয়, ঢের দূর অন্তিম প্রভাতে।

জীবনানন্দের ‘রূপসী বাংলা’-র কবিতাগুলোয় দেখা যায় যে তিনি এক বিচিত্র মধুর বিস্ময় আর প্রশান্তি-স্নিগ্ধ অনুসন্ধিৎসা নিয়ে গ্রামবাংলার অমলিন প্রকৃতির সৌন্দর্য-সুধা পান করছেন।

আবার আসিব ফিরে ধানসিড়িটির তীরে- এই বাংলায়

হয়ত মানুষ নয়- হয়তবা শঙ্খচিল শালিখের বেশে;

হয়ত ভোরের কাক হয়ে এই কার্তিকের নবান্নের দেশে

... ... ...

আবার আসিব আমি বাংলার নদী মাঠ ক্ষেত ভালোবেসে

জলাঙ্গির ঢেউয়ে ভেজা বাংলার এ সবুজ করুণ ডাঙায়।

বর্তমান-জন্মে পুরোপুরি দেখা হয়ে উঠলো না, পরবর্তী জন্মে আবার দেখার সুযোগ ঘটবে, এজাতীয় কাব্যগ্রাহ্য প্রত্যাশা কোনো অর্থেই হতাশা-পীড়িত জীবনানন্দকে তুলে ধরে না। তুলে ধরে স্বদেশপ্রেমী ও মর্ত্যপ্রেমী জীবনানন্দকে। তাঁর ‘বনলতা সেন’ ও আরো গুটিকয় প্রেমের কবিতায়ও মানব-প্রার্থিত আশা ও আনন্দের পেলব ছোঁয়াচ রয়েছে। তাতে আরো রয়েছে শিল্পের অমিত মাধুরীদীপ্ত চমকে দেয়া সজ্জা।

জীবনানন্দ-চর্চাকে পরিপূর্ণ সার্থকতায় পৌঁছে দিতে চাইলে সামগ্রিক বাংলা-সাহিত্য, বাংলা-সাহিত্যের অমর রচয়িতাবৃন্দ এবং অতুলনীয় জীবনানন্দ সবই আমাদের অসংখ্যবার পুনর্ভ্রমণ করতে হবে। ‘ঝরা পালক’ আর ‘ধূসর পান্ডুলিপি’-র পর্ব পেরিয়ে ‘মহাপৃথিবী’ ও ‘বনলতা সেন’ পর্বে এসে পৌঁছুতে কাব্যভ্রমণে জীবনানন্দকে যে বিপুল প্রাণশক্তি ও শিল্পশক্তি ব্যয় করতে হয়েছে, তার জন্যে নেতিবাচক সমালোচনার বদলে নিঃসন্দেহে তাঁর প্রাপ্য আমাদের আন্তরিক প্রশংসা। আরো একজন জীবনানন্দ বাংলা-সাহিত্যের অঙ্গনে চটজলদি আবির্ভূত হবেন না, এটা বললে হয়তো খুব বেশি ভুল বলা হবে না। ইংরেজ কবি রবার্ট ফ্রস্ট বলেছিলেন- “যেতে হবে বহুদূরে ঘুমিয়ে পড়ার আগে” (Many miles to go before we sleep.)। আমরা যারা সাধারণ পাঠক তাদের অনেকেই কিন্তু নির্দ্বিধায় বিশ্বাস করি যে জীবনানন্দ (অন্তত কবি জীবনানন্দ) ঘুমিয়ে পড়ার আগে বহুদূরই গিয়েছিলেন তাঁর উত্তেজনা আর শিহরণ-ঝংকৃত কাব্য-অভিযানে। মানস-ভ্রমণে তিনি আসলেই ‘হাজার বছর ধরে’ হেঁটেছিলেন এ পৃথিবীর পথে।

[লেখকের কৃতজ্ঞতা স্বীকার- জীবনানন্দের জীবনচিত্রে ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে প্রকাশিত পত্রিকা ভারত-বিচিত্রা থেকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ঋণ করা হয়েছে।]

  • হাসান আজিজুল হকের সাক্ষাৎকার

    ‘আমি যা কিছু লিখেছি-
    মাটি থেকে পেয়েছি’

    সাক্ষাৎকার গ্রহণ : ওবায়েদ আকাশ, কাজী রাফি, খন্দকার মুনতাসীর মামুন

    newsimage

    ওবায়েদ আকাশ : লেখকদের মধ্যে একটা ব্যাপার দেখা যায় যে, এ কাজটি

  • বইমেলার পরিবেশ ও সংস্কৃতির সমৃদ্ধি

    ওবায়েদ আকাশ

    newsimage

    বইমেলা যখনই কোনো রাজনৈতিক সুস্থ পরিবেশে অুনষ্ঠিত হয়েছে; তখনই এর ফলাফল নিয়ে

  • অসীম সাহার কবিতা

    newsimage

    অমৃত-গরল জ্যোৎস্নাকে ফেরাতে নদী ছুটে যাচ্ছে সমুদ্রের কাছে! টাইটানিক গতি তার। ডুবে যাচ্ছে বেদনার তীব্র

  • মিনার মনসুরের কবিতা

    আমার আজব ঘোড়া

    newsimage

    গল্পগুলোর ডানা ছিল ঘোড়াটিই আমাকে নিয়ে গিয়েছিল রূপকথার সেই মাঠে। দিগন্তছোঁয়া তার পৌরুষ।

  • ধারাবাহিক উপন্যাস ৬

    ‘মৌর্য’

    আবুল কাসেম

    newsimage

    পূর্ব প্রকাশের পর মন্দাকিনী মহামূল্যবান একজোড়া জুতো পরিয়ে দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াতে বললো।

  • ক্যান্ডি

    মূল: নয়নরাজ পান্ডে
    অনুবাদ: ফজল হাসান

    newsimage

    জেলার প্রধান কার্যালয়ের সামনে পাজেরো গাড়ি থেকে নেমে আমার ব্যক্তিগত সহকারী এবং

  • মহাদেশের মতো এক দেশে ৬

    কামরুল হাসান

    newsimage

    হক্‌সবুরি রিভার স্টেশনে একা বসে আছি প্রকৃতির অমলিন ঔদার্যের ভিতর। স্টেশনের ওভারব্রিজ